ক্রাইম ব্রাঞ্চের সিনিয়র ডিটেকটিভ ইশতিয়াক খান তার পেশাগত জীবনের শেষ পর্যায়ে আছেন। এখন তার অবসরের পালা। কিন্তু একমাত্র মেয়ে লিয়ানা হঠাৎ খুন হয়ে গেল। খুনি কে তা জানার আগেই জানা গেল লিয়ানা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইশতিয়াক খানের পুরো জগতটাই পাল্টে গেল মুহূর্তেই। মেয়ের খুনি কে তা বের করার পাশাপাশি তাকে ছিন্ন করতে হবে এক চক্রান্তের জাল। সেই জালের মূল লক্ষ ইশতিয়াক খানকেই ফাঁদে ফেলা। ইশতিয়াক খান কি পারবেন মেয়ের খুনি কে তা বের করতে? কিংবা মেয়ের উপর যে মাদক-ব্যবসায়ীর উপমা যোগ হয়েছে, তা মুছে দিতে?
Shariful Hasan hails from Mymensingh, Bangladesh. He has spent his childhood by the banks of Brahmaputra river. He completed his Masters in Sociology from University of Dhaka and is currently working in a renowned private organization.
Shariful's first novel was published on 2012 titled Sambhala. With two other books, this captivating fantasy trilogy has received widespread acclimation both within and beyond the borders of Bangladesh. The Sambhala Trilogy was translated in English and published from India.
Although his inception consisted of fantasy and thriller, he has later worked on a variety of other genres. These works have been received fondly by the Bangladeshi reader community. Lot of his works have also been published from different publications in West Bengal.
Award- Kali O Kalam Puroshkar 2016 for 'অদ্ভুতুড়ে বইঘর'
প্রত্যাশা পুরণ করতে পারেনি প্রিয় শরীফুল হাসান ভাই। ব্রাঞ্চের সিনিয়র ডিটেকটিভ হিসেবে ইশতিয়াক হাসান এবং পুলিশের স্পেশাল টিম প্রত্যেকের তদন্ত কার্যক্রম ছিল শিক্ষানবিসদের মতো। মেইন কালপ্রিট কে তাও খুব সহজে অনুমেয়। পুরো গল্পে ভাবনা চিন্তা কিংবা চমকে দেওয়ার মতো কিচ্ছু নেই। তারপরও শরীফুল হাসানের সাবলীল গদ্যের জন্য একবার হলেও পড়া যায়।
পঞ্চাশোর্ধ একজন ডিটেকটিভ ইশতিয়াক খান যিনি আগে 'ড্রাগস এন্ড নার্কোটিকস প্রিভেনশন টিম' এ পুলিশের স্পেশাল ফোর্সে কাজ করেছেন। ঢাকার অলিগলির অনেক মাদকের বড় বড় ব্যবসায়ীদের ধরেছেন কিন্তু শেষ পর্যায়ে অবসরে যাবেন এমন সময়ে নিজের ভার্সিটি পড়ুয়া একমাত্র মেয়ে লিয়ানা খুন হলো। এবং খুনের পর জানা গেল লিয়ানা নাকি মাদকের ব্যবসার সাথে জড়িত। স্ত্রীহারা ইশতিয়াক খান মেয়ে হারিয়ে পুরো একাকি হয়ে গেলেন। কিন্তু মেয়ের খুনি কে আর কেন তাকে খুন করা হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর যখন তিনি জানার জন্য মাঠে নামলেন দেখলেন তার জন্য ষড়যন্ত্রের ফাঁদ বিছিয়ে রাখা। কোনো না কোনোভাবেই তিনি সেই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন বারবার। কিন্তু ফাঁদে পড়লেও তাকে প্রমাণ করতে হবে যে একজন সিনিয়র ডিটেকটিভের মেয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিলনা। আর সেটা তিনি কিভাবে প্রমাণ করবেন তা নিয়েই শরীফুল হাসানের 'রেড পয়জন'।
বেশ অনেকদিন পর লেখক শরীফুল হাসানের বই পড়া হলো। উনার লাস্ট সম্ভবত 'প্রতিচ্ছায়ারা জেগে থাকে' বইটা পড়েছিলাম এবছরের শুরুর দিকে। 'রেড পয়জন' সম্ভবত লেখকের সবথেকে কম পরিধির বই। তবে কম পরিধির হলেও প্রত্যেকটা অধ্যায় খুব ছোট ছোট হওয়ায় দ্রুত পড়ে যেতে পেরেছি। কাহিনী খুবই সাধারণ এবং প্রেডিক্টেবল কিন্তু তারপরেও শেষ পর্যন্ত আসলে কি হয় সেটা জানার আগ্রহ নিয়েই পড়েছি। তবে লেখকের আগের বইগুলো যারা পড়েছেন তাদের কাছে এই বইটা সেগুলোর তুলনায় অনেকটা দুর্বল লাগতে পারে। তবে বই যেহেতু অনেক ছোট তাই ট্রাভেলে এই বই অনায়াসে নিয়ে পড়া যায়। বই পড়া শেষ হলে মনে হতে পারে কি যেন পাইনি কি যেন পাইনি কিন্তু এত চিকন বইয়ে এর থেকে বেশি কিছু থাকলে জিনিসটা আরো জটিল মনে হত। তবে সহজ-সরল লেখা,কোনো জড়তা নেই এমন লেখা হলেই আমার মনেহয় এসব বই ভালোলাগে বেশি।
যাইহোক কাহিনীতে আসি এবার। শুরুতেই ইশতিয়াক খান তার মেয়েকে হারান। স্ত্রী হারানোর পর মেয়ে হারিয়ে একজন বাবার যে অসহায়ত্ব সেটা খুব সুন্দরভাবেই ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসিকায়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া উঠতি বয়েসীরা কিভাবে খুব সহজেই মাদকের মত ভয়াবহ জিনিসে জড়িয়ে পড়ছে আর কিভাবে আমাদের সমাজে পানির মত এসব মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হচ্ছে সেটাও লেখক বেশ সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন। শেষদিকে এসে পুলিশ আর ইশতিয়াক খানের মধ্যে ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ও বেশ উপভোগ করেছি।
এবার আসি এন্ডিং এ। একটা বইয়ের এন্ডিং আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারন পুরো বইটা আমার কাছে একটা যাত্রা বলে মনে হয়। 'রেড পয়জন' বইতে সেই যাত্রা শুরু থেকে আমি উপভোগ করেছি এখন শেষবেলায় এসে যদি সেই যাত্রার সওয়ারী থেকে ছিটকে পড়ে যাই তবে স্বাভাবিকভাবেই ভালো লাগবেনা। বইটার এন্ডিং আমার কাছে মোটামুটি ভালো লেগেছে। বইয়ের কাহিনীর সাথে আমার কাছে মনে হয়েছে এন্ডিং এমনটাই হওয়া দরকার ছিল। কাহিনীর হিসাবে ৮০ পৃষ্ঠার একটা বইয়ে যদি আমি শেষে এসে একেবারে মাথা ঘুরানো টুইস্ট আশা করি তাহলে সেটা অবশ্যই পাঠক হিসেবে আমার বোকামি।
তবে সব কথার শেষ কথা 'রেড পয়জন' বই সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে। মোদ্দা কথা বইয়ের সাথে সময়টা ভালো কেটেছে আমার।
বাবা মেয়ের গল্প, যে গল্পের শুরুতেই মেয়েটা খুন হয়ে যায় এর পরে বাবা একা সেটার তদন্ত করে, ভালো লেগেছে আমার কাছে বইটা কিন্তু শরিফুল ভাই বাংলা সাহিত্য বর্তমানে এমন একজন লেখক যার কাছে আমারা ৮০ পেজের বই আর আশা করি না, আমাদের আশা আরো বড়।
ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে লড়াইটা ইশতিয়াক খানের সেদিন থেকে শুরু হলো যেদিন স্ত্রী চলে গেলেন তাঁকে ছেড়ে চিরতরে ওই অসীম মহাশূন্যের পানে। সেদিন থেকে বোধহয় তাঁর ভূমিকা শুধু বাবা নয়, মায়ের মতোও হয়ে গেছে। ছোট্ট মেয়ে লিয়ানা এবং নিজের পেশাগত দায়িত্ব ক্রাইম ব্রাঞ্চের সিনিয়র ডিটেকটিভ।
বাবা এমনি এক মানুষ যার সাথে আমাদের দূরত্বটা বরাবরই বেশি মায়ের থেকে। মায়ের কাছে অনেক কথা মন খুলে বলা যায় কিন্তু বাবাকে সবকিছু আসলে বলতে পারি না কেনো জানি। বাবাদের ভালোবাসা অনুভব করতে হয় গভীরে। কারণ তাঁরা ওভাবে আসলে বুঝতে দেন না নিজেদের ভালোবাসাগুলো কখনো। তাই একটা সময় সন্তানের সাথে যেন একটা দূরত্ব এসে যায়। ঠিকভাবে হয়তোবা বুঝতেও পারেন না সন্তানের মনের কথা। স্বাধীনতা দিয়ে সন্তানের অমঙ্গল ডেকে ফেলেছিলেন বোধহয় ইশতিয়াক খান। এবং সেটাই তাঁর জীবনের বড় ক্ষতি করে দিয়ে গেল।
লিয়ানা সবসময় বাবাকে আগলে রাখতো। রান্না করতো, ঘরের অনেক কাজই ছিলো তাঁর দায়িত্ব। মাঝে মাঝে রাতের বেলা বারান্দায় বসে বাবার চুলে বিলি কাটতে কাটতে লিয়ানা সুন্দর ভরাট গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনাতো। ইশতিয়াক খানের জীবন হচ্ছে লিয়ানাময়। কিন্তু মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়ে ভুল করেছিলেন বোধহয় কারণ লিয়ানার জীবনে আসে সিফাত।
সিফাতের সাথে সম্পর্ক হুট করেই যেন হয়ে গেল লিয়ানার। লিয়ানা বুঝতেও পারেনি মাত্র অল্প সময়ের মধ্যেই ওরা কীভাবে এত ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। সিফাতের মায়ের অসুখের জন্য লিয়ানা বাবার থেকে টাকা নিয়েও দিয়েছিল সিফাতকে। লিয়ানা ভালোবাসতো সিফাতকে। মেয়েদের মন তো, যাকে ভালোবাসে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে ভালোবাসে। লিয়ানা তাই সিফাতের সাথে কোথাও যেতে দ্বিধায় পড়েনি। কিন্তু সিফাত? আসলেই কী লিয়ানাকে ভালোবাসতো?
"ছেলেবেলার দিন ফেলে এসে সবাই আমার মত বড় হয়ে যায় জানিনা কজনে আমার মতন মিষ্টি সে পিছুডাক শুনতে যে পায় আয় খুকু আয়… আয় খুকু আয়…"
লিয়ানা বোধহয় বাবার শেষ ডাকটা শুনতে পেলো না। একের পর এক আঘাত পেটের কাছে রক্তের ফোয়ারা ভিজিয়ে দিয়ে গেল যেন মাটি। লিয়ানা ভাবতেও পারেনি আস্তিনে সাপ নিয়ে ঘুরছে সে। যে সাপ তাঁকে দংশন করে দিলো হঠাৎ করেই। এবং ছুড়ির আঘাত করতে লাগলো সেদিন রাতে নির্বিচারে। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়েছিল লিয়ানার লাশটা। এবং যখন বাবা ইশতিয়াক খান এলেন মরদেহ শনাক্ত করতে, আদরের মেয়ের নিথর দেহ দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ঢুকড়ে কেঁদে উঠলেন।
কিন্তু সবচেয়�� যে বিষয়টি ইশতিয়াক খানকে শক করলো তা হচ্ছে পুলিশ লিয়ানার ব্যাগ থেকে কতগুলো ইয়াবা পেয়েছে। এবং পোস্টমর্টেমে লিয়ানার পাকস্থলীতেও সেই�� ইয়াবা ছিলো। পুলিশের ধারনা হলো লিয়ানা হয়ত ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি বিক্রি করতো। কিন্তু এটা অসম্ভব! লিয়ানার মতো কোমল স্বভাবের মেয়ে কীভাবে ইয়াবা সেবন করতে পারে! না না ইশতিয়াক খান কিছুতেই এটা মানতে পারবেন না।
পৃথিবীতে বিশ্বাস নামক জিনিসটা সবার উপরে আসে না। সবাই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারে না। লিয়ানা কী বিশ্বাস করে ঠকেছে? কে তাঁকে খুন করলো? কাজটা কী সিফাতের? কিন্তু যাকে ভালোবাসা যায় তাঁকে কীভাবে খুন করা যাবে? খুনের পেছনে কারণ কী? ইশতিয়াক খানের মাথায় ঘুরছে একের পর এক প্রশ্ন। নিজে আইনের লোক হয়ে কিছুতেই মেয়ের খুনিকে তিনি ছাড়বেন না। আর তাঁর মেয়ে যে মাদক সেবন করতো না সেটাও প্রমাণ করতে হবে। তাঁর ওমন কোমল মেয়েটার মাথায় এতবড় কলঙ্কের কালিমা তিনি লাগতে দেবেন না।
মেয়েটা তাঁর মরে গেছে কিন্তু ইশতিয়াক খান ভাবলেন মেয়েটা হয়তো এখনো কষ্টে আছে নিজের উপর এতবড় কলঙ্কের বোঝা নিয়ে। লিয়ানা মাদকসেবী নয়, লিয়ানাকে কেউ টার্গেট করেছে। কিন্তু কারা? সিফাতকে খুঁজতে হবে। আরো অনেক কাজ বাকি। তবে ডিপার্টমেন্ট এর আরেক সিনিয়র অফিসার বন্ধু আলী আসগর কিছুতেই তাঁকে এই কেসে অংশ নিতে দিবেন না। জুনিয়র অফিসার আদনান বেশ চৌকস, কেসটা সে দেখছে। যা করার সে করবে এই হচ্ছে আলী আসগরের কথা। কিন্তু ইশতিয়াক খান কী এভাবে চুপ করে বসে থাকতে পারবেন?
অনেকগুলো প্রশ্ন, রেড পয়জনে বিষাক্ত চারপাশ, মুখোশের আড়ালে অদৃশ্য অপরাধীকে খুঁজতে হবে, মৃত মেয়ের শোক। এই গল্পটা এক বাবার গল্প। সবকিছু ছাপিয়ে এক বাবার লড়াই উঠে আসবে সন্তানের খুনীকে শান্তি দিয়ে সন্তানকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দেয়া। কিন্তু ঘটনা ক্রমশ গভীরে ডুব দিচ্ছে। ইশতিয়াক খানের পথটা এত সহজ হবে না।
~ নামকরণ ~
এই বইটির নাম "রেড পয়জন" কেনো এই প্রশ্নটা শুরু থেকেই আমার মনে ছিলো। পয়জন সবসময়ই বিষাক্ত। কিন্তু এটা কী ধরনের পয়জন? উত্তর হচ্ছে এটা ইয়াবা। এই লাল রঙের মাদকদ্রব্য যেন লাল বিষ হয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছে সমাজকে।
এই মাদক কেড়ে নিয়েছে লিয়ানাকে তাঁর বাবার বুক থেকে। বর্তমান প্রজন্ম মাদকের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই মাদক হচ্ছে রেড পয়জন। আস্তে আস্তে বিষের ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। বইটির গল্পে লাল বিষ ইয়াবা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্নিং পয়েন্ট।
~প্রচ্ছদ ও খুঁটিনাটি ~
চিরকুটের বইয়ের প্রোডাকশন ভালো। এবং ভেতরের প্রিন্ট গুলো বেশ ঝকঝকে। এবং প্রচ্ছদটা আমার ভালো লেগেছে কারণ বাবা মেয়ের গল্পটা প্রচ্ছদে ফুটে উঠেছে অনেকটাই। সব মিলিয়ে বই ইচ্ছেমতো যেভাবে খুশি রেখে পড়া যায়।
~শরীফুল হাসানের লেখার সাথে অভিজ্ঞতা ~
এই অংশটি হচ্ছে আমার প্রথম পড়া শরীফুল হাসানের লেখার সম্পর্কে। অনেকে বলবে তাঁদের পড়া শরীফুল হাসানের প্রথম বই বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রান, ছায়াসময়, যেখানে রোদেরা ঘুমায় এসব বইয়ের নাম বলবে। কিন্তু আমার পড়া প্রথম বই হচ্ছে "রেড পয়জন"।
এই ছোট্ট বইটা দিয়েই পাঠক হিসেবে বলা যায় অফিশিয়ালি শরীফুল হাসানের বই পড়া হলো। এবং প্রথম অভিজ্ঞতাতেই যে জিনিসটা লক্ষ্য করলাম লেখক দারুন গুছিয়ে গল্প বলতে পারেন। কারণ ছোট্ট এই উপন্যাসিকাটিকে কিন্তু আকর্ষণীয় করেছে এর গল্প প্রেজেন্টেশন।
একটা ছোট্ট সাদামাটা গল্পকে কীভাবে উপভোগ্য করতে হয় শরীফুল ভাই সেটা বেশ ভালো জানেন। লেখনশৈলী সাবলীল, শব্দ নির্বাচনে ভারিক্কি ভাব দূর করেছেন। খুব সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং শেষটাও সুন্দর লাগলো একদম মনের মতো।
শরীফুল হাসানের লেখায় প্রথম পড়া বই এটা আমার। কিন্তু আমি শরীফুল হাসানকে চিনেছি আমার হাসবেন্ডের মাধ্যমে। অসম্ভব বইপোকা আমার হাসবেন্ড শরীফুল ভাইয়ের সবগুলো বই পড়েছে এবং তাঁর কালেকশনে একটা বাদে বোধহয় সবগুলো বই আছে। একটা বাদ কারণ সেটা প্রিন্ট আউট ছিলো। সবসময় আমাকে শরীফুল হাসানের লেখা পড়তে সাজেস্ট করতো। "বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রান" ছিলো আমার আগে পড়ার টার্গেট কিন্তু তাঁর আগে রেড পয়জন পড়ে ফেললাম। হাসবেন্ড শুনে বললো আমি যেন এবার সবগুলো পড়ে ফেলি ওনার লেখা।
প্রথম পড়া বই হিসেবে বেশ সন্তুষ্ট আমি এবং শরীফুল হাসানের লেখার বলা যায় আরেকজন পাঠক বাড়লো। দারুন লিখেছেন, এবং আশা করছি এই ধারা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে।
শরীফুল হাসানের কাছ থেকে এমন অপরিপক্ক, আনকোরা, দূর্বল প্লটের থ্রিলার আশা করিনি। পাঠকদের জন্য পরামর্শ থাকবে আগে ভালো কোনো অনুবাদ থ্রিলার পড়া থাকলে এই বই পড়ে আপনি আশাহত হবেন এবং আপনার মূল্যবান সময় বৃথা যাবে।
লেখক শরীফুল হাসানের সবচেয়ে বড় গুণ তিনি এমনভাবে গল্প বলেন, পাঠকের সাথে সেই গল্পে এক ধরনের সংযোগ স্থাপন হয়। চমৎকার লেখনশৈলীতে কোনো জড়তা নেই, আড়ষ্ট ভাব নেই। অতিরঞ্জিত করার বিষয় নেই। গল্পের এক প্রকার ধারা থাকে, সেই ধারা অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে হয়। সাবলীল ভঙ্গিতে গল্প তো এমনভাবেই বলতে হয়, যেখানে পাঠক বুদ হয়ে যায়। সাদামাটা গল্পও এখানে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। লেখকের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা এখানেই, যেখানে সাদামাটা একটা গল্পকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে তোলা যায়। আর এই কাজ খুব সহজভাবে পারেন শরীফুল হাসান।
লেখকের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসিকা “রেড পয়জন” শেষ করলাম। জনরা হিসেবে বইটিকে ক্রাইম থ্রিলার হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কিংবা রিভেঞ্জ থ্রিলার বললেও ভুল হবে না। এই গল্পের মূল চরিত্র ইশতিয়াক খান। ‘ড্রাগস এন্ড নার্কোটিকস প্রিভেনশন টিম’-এর নীতিবান যোদ্ধা। কাজ করেছেন ন্যায় নিষ্ঠার সাথে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গজিয়ে ওঠা মাদক চোরাচালানের র্যাকেট ভেঙেছেন। তাই হয়তো শত্রুপক্ষের অভাব নেই, যারা ছোবল মারার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
কোন একটি অপারেশন শেষ করে আয়েশ করে বসে আছেন ইশতিয়াক খান। খবর এলো তখনই। একটি জায়গায় যেতে হবে। মাদক চোরাচালান নির্মূল টিমের প্রধান ও ইশতিয়াক খানের বন্ধু আলী আসগরের কথায় সেখানে গেলেন ইশতিয়াক। কে জানত, জীবনের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা অপেক্ষা করছে সেখানে। মা ম রা একমাত্র মেয়ে লিয়ানার ছুরিবিদ্ধ লাশ লুটিয়ে আছে মাটিতে। কার এত আক্রোশ থাকতে পারে, এভাবে একজনকে মে রে ফেলতে পারে! তার পৃথিবী এখ���নে টলে গিয়েছে। জীবনের সব আশা ভরসা শেষ হয়ে গিয়েছে। তবুও মেয়েটার এই পরিণতি কে করেছে, খুঁজে বের করতে হবে। বাবা হিসেবে মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি। ব্যর্থ বাবা হলেও মেয়ের উপর ঘটে যাওয়া এই অন্যায্য ঘটনার শেষ দেখতে হবে।
তদন্তে উঠে আসে লিয়ানা না-কি ইয়াবা আসক্ত ছিল। ভদ্র, শান্তশিষ্ট মেয়েটি সত্যিই ইয়াবা সেবন করত? শুধু তা-ই নয়, তদন্ত কর্মকর্তা আদনান দাবি করছে লিয়ানা না-কি ইয়াবা সরবরাহের সাথেও যুক্ত ছিল! মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাই বলে এই দিন দেখতে হলো? তার নিজের মেয়ে এমন করবে বিশ্বাস হতে চায় না। এর পেছনে কোনো বিশাল ষড়যন্ত্র আছে। যা তাকে আর তার মেয়েকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চায়। কিন্তু এভাবে তো হেরে যাওয়া যাবে না।
নিজেকে তদন্ত করে চাইলেও মেয়ের কেসে এভাবে তদন্ত করা যায় না। উপরমহল থেকে ছুটি দিয়েছে দীর্ঘদিনের। তাই বলে বসে থাকতে পারে না সে। অফিসিয়াল না হোক, আনঅফিসিয়াল তদন্ত তো চালানো যায়। মেয়ের বন্ধুদের খোঁজ নিতে হবে। সিফাতের সাথে লিয়ানার কী সম্পর্ক? তদন্ত করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় নিজেরই ফেঁসে যাওয়ার উপক্রম ইশতিয়াক খানের। তারপরও হাল ছাড়া যাবে না।
লিয়ানার মৃত্যু না, এই ঘটনার বীজ লুকিয়ে আছে অনেক গভীরে। পুরোনো এক ঘটনার প্রতিশোধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আর তাতে একের অধিক প্রাণ এভাবে শেষ হয়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে…
আগেই বলেছি, শরীফুল হাসানের লেখনশৈলী সাবলীল, দুর্দান্ত। এই বইতেও তার ধারা বজায় ছিল। পুলিশ প্রসিডিউয়াল গল্প সাধারণত ধীর গতির হয়। কিন্ত এই বইটির গতি ছিল দ্রুততর। খুব অল্প সময়ে ছোট্ট এই উপন্যাসিকা পড়ে শেষ করে ফেলা যায়। কোনো বাড়তি বর্ণনার আশ্রয় নেননি লেখক। যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই। লেখকের এই পরিমিত ব্যবহার ভালো লেগেছে।
সেই সাথে স্বল্প পরিসরে চরিত্র নিয়ে যেভাবে কাজ করেছেন, তার জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার। বেশি চরিত্র ছিল না এখানে। তবুও অল্প-স্বল্প সুযোগে প্রতিটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে যে চরিত্রগুলো গল্পের মূল চরিত্র ছিল। আমি লেখকের বর্ণনার অনেক বড় ভক্ত। এই ছোট্ট বইতে, যেখানে একের পর এক ঘটনা দ্রুতগতিতে ঘটে চলেছে, সেখানেও তিনি দারুণ কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। যে বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হতে হয়।
ইঁদুর-বিড়াল খেলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পুলিশি তদন্ত, টুকরো কিছু চমক বইটিকে প্রানবন্ত করে তুলেছে। কিছু কাকতালীয় ঘটনা অবশ্য ছিল। যদিও খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। বইতে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা (যাকে বিষ বলাটাই শ্রেয় মনে হয়) আর এর বিশাল র্যাকেট নিয়ে বইয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। কে জানে, হয়তো সবটাই সত্যিই। প্রযুক্তির এই যুগে নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা একটি প্রজন্মকে খুব দ্রুত ধ্বংস করে দিতে পারে। পারে না?
তদন্ত প্রক্রিয়া লেখক যেভাবে বর্ণনা করেছেন, ভালো লেগেছে। প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন কাজে পারদর্শী। একজনই সব পারে এমন অতিরঞ্জিত বিষয় ছিল না। পুলিশে চাকরি করলেও একজন অফিসার যার বয়স হয়েছে, সে যে প্রযুক্তির সব জানবে না এই বিষয়টি ভালো লেগেছে। একদম ন্যাচারাল ছিল বিষয়টা। লেখকের এই ধরন ভালো লাগে। কোনো চরিত্রকে তিনি অতিরঞ্জিত হিসেবে দেখান না। যে চরিত্র যেভাবে গল্পে নিজেকে নিবেদন করে, ঠিক সেভাবেই গল্প এগিয়ে চলে।
শেষটা পছন্দনীয়। এভাবে সমাপ্তি টানলে অতৃপ্ত কিছু থাকে না। ভালো লেগেছে। ছোট্ট এই উপন্যাসিকা বেশ উপভোগ্য। সম্পাদনার ঘাটতিও তেমন চোখে পড়েনি দুয়েকটা ছাপার ভুল ছাড়া। প্রচ্ছদটা পছন্দ হয়েছে। একজন বাবা তার মেয়েকে আগলে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে প্রচ্ছদে। কিন্তু দিন শেষে সবসময় পারা যায় কি?
গতমাসে শরিফুল হাসান ভাইয়ের লেখা, তার অন্যতম ক্লাসিক মাস্টারপিস উপন্যাস "ছায়াসময়" শেষ করেছিলাম। উপন্যাসটা এততটা সুন্দর ছিল যে সমগ্র মাস জুড়েই এর মুগ্ধতা ছড়িয়ে ছিল। অন্য যে বই পড়ি না কেন, ছায়াসময়ের মতন মেন্টালি এট্যাচ হতে পারছিলাম না কোনটার সঙ্গেই। মাস ঘুরতে না ঘুরতে হাতে তুলে নি তার লেখা আরেকটা উপন্যাস, নাম - "রেড পয়জন"।
খুব ছোট্ট সাইজের একটা বই। এক বসায় শেষ করে ফেলার মতন। চিরকুট প্রকাশনী থেকে বের হওয়া বইটা মূলত একটা ক্রাইম থ্রিলার। থ্রিলার এই মুহুর্তে পড়তে ভাল লাগছিল না কারণ এই বইটার সাইড বাই সাইড আরেকটা বই পড়ছি, সেটা হচ্ছে " নেমেসিস" লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। একই সময় দুইটা থ্রিলার পড়তে কখনই ভাল লাগে না আমার। কিন্তু শরিফুল হাসানের একটা বই পড়ে তার উপর আমার প্রত্যাশার মাত্রাটা বেশি ছিল। লেখকের লেখার স্টাইল আমার কাছে অসম্ভব ভাল লাগছিল তার একটা বই পড়েই। ছায়াসময়কে করে আমি নির্দিষ্ট করে কোন জনরায় ফেলতে পারছিলাম না। একই সাথে এটা ছিল সামাজিক উপন্যাস এবং ক্রাইম থ্রিলার। দুইমিশালী গল্পটা ভালই মুহুর্ত দিয়েছিল আমাকে। সেই এক্সপেক্টেশনের উপর ভর করেই রেড পয়জন পড়া শুরু করি। কিন্তু...
গল্পের প্রধান চরিত্র ছিলেন ইশতিয়াক খান। ইনি কর্মরত ছিলেন "ড্রাগস এন্ড নারকোটিক্স প্রোভেনশন টিম" এর সাথে। একাধিক সফল অভিযান প্রচলনা করে টিমের কাছে সম্মানীয় এবং প্রশংসনীয় একজন চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ এই কমিটির প্রধান "আলী আসগর" ছিলো তার বন্ধু মানুষ। সময় ভালই কাটছিল ইশতিয়াক খানের কিন্তু হঠাৎ জীবন নেমে আসে গাঢ় এক অন্ধকার যার মাঝে হারিয়ে যান তিনি। তার একমাত্র মেয়ে লিয়ানাকে ছুড়ি দিয়ে একাধিকবার আঘাত করে হ ত্যা করা হয়। কিন্তু কেন?! তদন্তে বের হয়ে আসে লিয়ানা ইয়াবাতে আসক্ত এবং সে ইয়াবা বিক্রি করা এক দলের সাথেও সে জড়িত ছিল। দীর্ঘ দিন সম্মানের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসা ইশতিয়াক, তার একমাত্র মেয়ের এমন অধঃপতনের সংবাদ শুনে একবারে মুষড়ে পড়েন কিন্তু কোন ভাবেই এটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তার মেয়ে নেশাগ্রস্ত। এতটুকু ভরসা তার মেয়ের প্রতি তার ছিল। কিন্তু তাকে এ বিষয়ে তদন্ত করা থেকে বের করে দেয় তার বন্ধু আসগর, এবং তার স্থানে এর তদন্তের দায়িত্ব পরে অফিসার আদনানের উপর। কিন্তু প্রতিশোধ পরায়ন পিতা তার মেয়ের প্রতি হওয়া অনাচর এবং অপবাদের সুষ্ঠ তদন্ত করার দায়িত্ব অন্যের প্রতি দিতে একবারে নারাজ ছিলেন। অফিশিয়ালী তাকে রিলিজ করে দিলেও আনঅফিশিয়ালি সে তদন্ত শুরু করে এবং ঘটনার পর্যায়ক্রমে বের হয়ে আসতে থাকে অনেক অনেক অজানা রহস্য।
বইটা থ্রিলার হয়েও, আমাকে সত্যি বলতে তেমন থ্রিল দিতে পারে নাই। বইটা পড়তে পড়তে একাধিক প্লট হোল চোখে বাঁধছিল। এছাড়া কে আসল কালপিট হতে পারে তা শুরুতেই বুঝে ফেলছিলাম আর এটা বুঝতে আমার কোন রকেট সায়েন্স পড়ার প্রয়োজন পরে নাই।
থ্রিলারের মূল আকর্ষণই যদি শুরুতে টের পাওয়া যায়, তবে বাকিটা পথ এগোতে খুবই বিরক্তিকর হয়ে উঠে। গল্পটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, বলিউড মুভির কোন স্ক্রিপ্ট পড়ছি কারণ কিছু কিছু স্থানে গল্পের টুইস্ট গুলা বলিউড লেভেলের ই লাগছিল। অথচ আমি লেখকের লেখা ছায়াসময় বইটা পড়ার সময় প্রতিটা মুহুর্ত মুগ্ধতার সাথে উপভোগ করছিলাম যার তেমন কোন বৈশিষ্ট্য এই বইটার মধ্যে না পেয়ে বেশ আশাহত হয়েছিলাম। কিন্তু শরিফুল হাসান ভাইয়ের লেখনশৈলী প্রশংসনীয়। পাঠককে বইয়ের পৃষ্টার সাথে আটকে রাখার যাদু বল তার মাঝে বিশেষ ভাবে বিদ্যমান। সুতরাং আমিও পড়ে গেছি শেষ অব্দি না থেমেই।
বইয়ের ইন্ডিংটাও খুবই খাপছাড়া লেগেছে। হুট করে শেষ হয়ে গেল এমনটা লাগল। শেষ মুহুর্তের সাসপেন্স ছিল খুবই স্বল্প সময়ের জন্য।
আমার মনে হয়, রেড পয়জনকে যদি উপন্যাস আকারে না লিখে, লেখক যদি গল্প আকারে পাবলিশ করতেন তবে বেশি উপভোগ্য হত। উপন্যাস হওয়ায় সবার প্রত্যাশা স্বাভাবিক ভাবেই ব��শি ছিল যেটা বইটা ফুলফিল করতে ব্যর্থ হয়েছে।
শরিফুল হাসান একের পর এক অসাধারণ সব উপন্যাস দিয়েছেন তার পাঠকদের। এতে স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি তার ভক্তদের এক্সপেক্টেশন বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য রেড পয়জনকে তার লেখা অন্যান্য গল্প উপন্যাসের তুলনায় যথেষ্ট কাঁচা এবং দুর্বল লেগেছে। লেখকের থেকে আরো ভাল কিছুই সবসময় প্রত্যাশা থাকে। যা আশাকরি ভবিষ্যতে তিনি ডেলিভার করতে পারবেন।
#ফ্ল্যাপ: ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের সিনিয়র ডিটেকটিক ইশতিয়াক খান তার পেশাগত জীবনের শেষ পর্যায়ে আছেন। এখন তার অবসরের পালা। কিন্তু একমাত্র মেয়ে লিয়ানা হঠাৎ খুন হয়ে গেল। খুনি কে তা জানার আগেই জানা গেল লিয়ানা ইয়াবা ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিল। ইশতিয়াক খানের পুরো জগতটাই পাল্টে গেল মুহূর্তেই। মেয়ের খুনি কে তা বের করার পাশাপাশি তাকে ছিন্ন করতে হবে এক চক্রান্তের জাল। সেই জালের মূল লক্ষ্য ইসতিয়াক খানকেই ফাঁদে ফেলা। ইশতিয়াক খান কি পারবেন মেয়ের খুনি কে তা বের করতে? কিংবা মেয়ের উপর যে মাদক-ব্যবসায়ীর কালিমা যোগ হয়েছে, তা মুছে নিতে?
#কাহিনী_সংক্ষেপ: ঘটনার শুরু হয় লিয়ানা আর সিফাতের মাধ্যমে। ফেসবুক থেকে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে ২ জনের। ছয় মাসের প্রেমের পর আজকের এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তারা ঘটনাক্রমে সপ্নীল রিয়াল স্টেটের টিনের ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। সময়ের ক্রমে লিয়ানার হঠাৎ অনুভূত হয় পেটের মধ্যে কিছু একটা আচমকা ঢুকে গেছে। হাত দিয়ে বুঝতে পারলো ব্যথা, ভেজা, আঠালো অনুভূতি। এরপর শুরু হয় রহস্য বিচ্ছেদ অভিযান। ' ড্রাগস এন্ড নার্কোটিভ প্রিভেনশন টিম' নামের পুলিশ ফোর্সের স্পেশাল টিমের সিনিয়র ডিটেকটিভ ইশতিয়াক খান। তার ই মেয়ে লিয়ানা খুন হয়ে পরে আছে সপ্নীল রিয়াল স্টেটে। শুধু তাই নয় সেই খুন হওয়া মেয়েটার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে সে ইয়াবা খেতো, করতো ইয়াবা ডিস্ট্রিবিউট। তার মেয়ের খুনের রহস্য আর এই মিথ্যা ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়তে নিজেই ফিল্ডে কাজ শুরু করে দেন ইশতিয়াক খান। এই গল্প একজন সাহসী বাবার, যে ডিপার্টমেন্টের সাহায্য ছাড়া, একা একা একটা ক্রিমিনাল টিমের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করে তার মেয়ের খুনের সাথে জড়িতদের শাস্তি এবং মেয়েকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারার গল্প। এই গল্প রেড পয়জন এর গল্প। যার বিষ ছেড়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজে।
ভুলবশত বইটা পড়লাম আজকে। প্রথমবারের মতো লেখকের কোনো বই দ্বিতীয়বার পড়া হলো। ভুলবশত বলার কারণ আমি লেখকের অন্য একটা বই "অচিন পাখি" পড়তে চাচ্ছিলাম। সেটাও আগে পড়েছি একবার। সাড়ে এগারোটা থেকে একটা পর্যন্ত হাতে সময় ছিলো আমার, এই সময়ে একটা বই শেষ করার জন্য। রেড পয়জন পড়লাম। বইটা আগে একবার পড়া থাকলেও এবারও খুব মনোযোগ দিয়েই বইটা পড়েছি। একদমই ছোট একটা থ্রীলার বই এটা। আমি বলতে চাচ্ছি, আদনানকে কেন্দ্র করে অথবা ইশতিয়াক সাহেবকে কেন্দ্র করে এটা একটা ভালো সিরিজ হতে পারে কিংবা দুজনেরই যুগলবন্দীতে। আমি জানিনা লেখকের এরকম কোনো প্ল্যান আছে কিনা তবে হ্যা সত্যিই এটা খুব ভালো একটা সিরিজের প্রথম বই হতে পারে। বইটা পড়া শুরু করার আগেও পৃথিবী শান্ত ছিলো। বইটা শেষ করে নিউজফিডে ঢুকে দেখি দখলদারবাহিনী সাহায্যকারী জাহাজগুলোকে আক্রমণ করা শুরু করেছে। একটা বিশাল রাতে আমি এই বইটা পড়লাম। তাছাড়াও একটা বাজার অপেক্ষা করছিলাম উচলের বার্সা বনাম পিএসজি ম্যাচটার জন্য। বিভীষিকাময় এই রাত্রে এই বইটা পড়া হলো একদমই ভুলবশত। মজার ব্যাপার এই বইটা প্রথম যে রাতে পড়েছিলাম ওই রাতটাও বিভীষিকাময় ছিলো।বইমেলার পর হঠাৎ করেই চিরকুট যখন ছোট বইটা বের করে, কোনোকিছু না ভেবেই পছন্দের লেখকের বইটা কিনে ফেলেছিলাম, তারপর বইটা পড়ার ভাগ্য হয়েছিলো ঐতিহাসিক ৫ আগষ্ট।
1st read 5 August - 3 Stars 2nd read 1 October - 4 Stars
গরম গরম হাতে পেয়েই পড়ে ফেললাম শরীফুল হাসানের ক্রাইম থ্রিলার নভেলা “রেড পয়জন”। ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বইটির অপেক্ষায় ছিলাম। মূল প্লট শুরু করতে লেখক একদমই সময় নেননি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইটি দারুণ গতিশীল। বেশ ছোট কলেবরের বই হওয়ায় এখানে চরিত্রগুলো সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি। গল্পে কোনো চরিত্র তেমন একটা স্পেস পায়নি মূল এন্টাগোনিস্ট ইশতিয়াক হাসান ছাড়া। প্লটটা বেশ ভালোই কিন্তু মনে হলো যে শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে গেল। বইয়ের কলেবর আরেকটু বড় হলে আরো ভালো লাগতো।
আমার পড়া এটাই শরীফুল হাসানের প্রথম ক্রাইম থ্রিলার। এর আগে উনার লেখা ফ্যান্টাসি ও সামাজিক উপন্যাসগুলো পড়া হয়েছিল। সে হিসেবে বলব এ জনরাতেও উনি বেশ ভালোভাবেই উতরে গিয়েছেন। সামনে উনার থেকে আরো ক্রাইম থ্রিলার আশা করি, তবে আরো বড় কলেবরে। আগ্রহীরা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। ভালো লাগবে আশা করি। চিরকুটের প্রোডাকশন নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। এই ছোট বইটিতেও তারা তাদের সেরাটাই দিয়েছে।
গত বছরের কোনো একটা মিষ্ট্রি বক্সে বইটা পেয়েছিলাম। সকালে বেশ ভারী একটা গল্প শেষ করার পর ছোট সহজপাঠ্য হিসেবে বইটা শুরু করি। তবে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই যে শেষ হয়ে যাবে এতটা আশা অবশ্য করিনি। এবার আসি বইয়ের আলোচনায়।
এককথায় খারাপ না। ছোট্ট পরিসরে কমপ্লিট প্যাকেজ যাকে বলে, ঠিক তাই। সহজ সরল গল্পের বুনন এবং তার সহজ অনুমেয় সমাধান। মাত্র ৮০ পৃষ্ঠার মধ্যে যেভাবে লেখক কাহিনীটা গুছিয়ে ফেলেছেন, সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়।
- বইটা কি নিয়ে? - মেয়ের মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করতে যেয়ে একজন ডিটেকটিভ বাবাকে কিসের এবং কাদের সম্মুখীন হতে হয়েছে তা নিয়ে।
এর বেশি বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে।
- পড়বেন কিনা? - কখনও হাতে সময় কম থাকলে বা মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করবে না এমন কিছু পড়তে চাইলে পড়তে পারেন। খারাপ লাগবে না। তবে খুব বেশি আশা না করায় ভালো।
'রেড পয়জন' শরীফুল হাসানের লেখা রিভেঞ্জ থ্রিলার।৮০ পৃষ্ঠার উপন্যাস, বরাবরের মতই শরীফুল হাসানের দারুণ গল্প বলার ধরণ। যেহেতু ৮০ পৃষ্ঠার বই তাই লেখক কোন ভনিতা ছাড়াই মূল কাহিনীতে চলে গেছেন। গল্প দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। ছোট বই হওয়াতে সবগুলো চরিত্র বিকাশের তেমন একটা সুযোগ পায় নি।মেইন কালপ্রিট অনেকটাই অনুমেয় ছিল।লেখক এবারে কিছুটা হতাশ করেছেন।সবমি���িয়ে হালকা ধাঁচের একটা রিভেঞ্জ থ্রিলার।
লেখক শরীফুল হাসানের এতো চমৎকার, চমৎকার বই পড়েছি। যার কারণে এখন প্রত্যাশা বেশি থাকবে এইটাই স্বাভাবিক।
৮০ পৃষ্ঠার ছোট বইটি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে নি। আমার মনে হয় বইটি টেনেহিঁচড়ে আরেকটু বড় করলে মন্দ হতো না। তবে গল্পের প্লট সুন্দর ছিল। শরীফুল হাসানের লেখনী সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। লেখকের লেখনীর জন্য তিন তারা দিলাম।
অনেক ক্লিশেড একটা থ্রিলার যা খুব অল্প সময়ে পড়ে শেষ করা যায়। কিছুটা টান টান উত্তেজনা থাকলেও থাকতে পারতো, না থাকাতেও খুব সমস্যা নেই, কাহিনী বেশ দ্রুত এগিয়ে যায়। ইশতিয়াক খান-আদনান জুটি একটা সিরিজ হতেই পারে। আরও সময় নিয়ে এন্থলোজি সিরিজ করাই যায়।
প্রচ্ছদ টা নামটা যতটা সুন্দর, গল্প টা ঠিক ততই বাজে। মডিফাইড বাংলা সিনেমা গল্প পড়লাম মনে হল। এসব বই আবার বইনগরের মত পেজে মিস্ট্রি বক্সে গছিয়ে দেওয়াও হয়।
গল্পের শুরুটা......... আকাশ মেঘলা। হাওয়া দিচ্ছে খুব। বৃষ্টি নামতে পারে যে-কোনো সময়। মোটরসাইকেলের পেছনের সিটে বসে হাওয়ায় দু'হাত মেলে দিল লিয়ানা। উড়ে যেতে পারলে ভালো হতো। সঙ্গী তো আছেই। সিফাত। শ্যামলা গড়নের শক্ত-পোক্ত এক যুবক এই মুহূর্তে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। বাতাসে ওর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল উড়ছে। . . . সন্ধ্যা হতে এখনও বেশ খানিকটা সময় বাকি। বাসায় ফিরতে হবে এই তাড়া আছে লিয়ানার। কিন্তু সিফাতের সঙ্গও ভালো লাগে। যতোটুকু সময় একসাথে কাটে, ততোটুকুই আনন্দে কাটে। বাকি সময়টা বাসায় কাটে একাকী।
বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ছে। দৌড়ে টিনের ঘরে ঢুকে গেল লিয়ানা। ধীর পায়ে হেঁটে এলো সিফাত। এমনিতেই সিফাত একটু গম্ভীর ধরনের, কথা বলে খুব কম। আজ ওকে আরও বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছে। দুজনের পরিচয় ফেসবুকে। সেখান থেকে যে প্রেম হতে পারে, ভালোবাসা হতে পারে, এটা কখনও কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু হয়ে গেছে। গত ছয়মাস ধরে দুজনের প্রেম চলছে।
সিফাত টিনের ঘরে ঢুকল। তাকাল লিয়ানার দিকে। ওর দৃষ্টিটা অন্যরকম। এরকম দৃষ্টি ওর চোখে আগে কখনও দেখেনি। সিফাত এগিয়ে এসে ওকে চেপে ধরল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল লিয়ানার, আবার ভালোও লাগছিল। ওর শরীরে কেমন একটা গন্ধ। খুব আপন আপন লাগে। মাথার উপর টিনের চালে বৃষ্টির অবিরাম পতনের শব্দে, কানে তালা লাগার জোগাড়। সিফাত ওকে প্রায় আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখের দিকে তাকাল লিয়ানা। সিফাত ওকে ধরে আছে ঠিকই, কিন্তু ওর চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কিছু একটা লুকাচ্ছে। কী লুকাচ্ছে?
পরমুর্হূতেই পেটের ঠিক কাছটায় অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো লিয়ানার। মনে হলো কিছু একটা আচমকা পেটের মধ্যে ঢুকে গেছে! ব্যথা হচ্ছে কেন? হাত দিয়ে চেপে ধরল জায়গাটা। হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরল। রক্তে হাত ভিজে গেছে। তাকাল সিফাতের দিকে। সিফাত এখনও অন্য কোথাও তাকিয়ে আছে। কিন্তু ওর হাতের লম্বা ধারাল ছু*রিটা চোখ এড়াল না লিয়ানার। কী হচ্ছে এসব! সিফাতের হাতে ছু*রি কেন? কিন্তু .... সিফাত আ*ঘা*ত করেই যাচ্ছে।
কেন সিফাত? কেন?
প্রশ্নটা কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে। মেঝেতে লিয়ানার দেহটা র*ক্তা*ক্ত অবস্থায় রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাইরে এসে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিল সিফাত। একবার পেছন ফিরেও তাকালো না।
পড়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়াঃ বর্তমান সময়ের উঠতি বয়স অর্থাৎ কৈশোর বয়সের ছেলেমেয়ের একটা করুন পরিনতি তুলে ধরেছেন লেখক গল্পের এই অংশটুকুতে। এই সময়ে ছেলে মেয়েরা একে অন্যের প্রতি অল্পতেই আকৃষ্ট হয়ে যায়। অল্পতেই একে অপরকে সর্বস্ব দিয়ে বিশ্বাস করে ফেলে। একে অন্যকে নিয়ে বিভিন্ন কাল্পনিক স্বপ্ন দেখতে থাকে। তখন একে অন্যকে একান্ত ভাবে নিজের করে নিরিবিলি ভাবে কিছু সময়ে কাটাতে আনন্দ অনুভব করে থাকে। সেই কাটানো সময়টুকুই হয়ে উঠে তাদের জন্য অনেক আনন্দের অনেক সুখকর। আর বর্তমান সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই ধরনের সম্পর্কগুলো একটু দ্রুতই গড়ে উঠে। আর কিশোর কিশোরীর এতো সহজে গড়ে উঠা সম্পর্কের সুযোগ নিয়ি কিছু সুযোগসন্ধানী বা প্রতিশোধ পরায়ণ মানুষ বিভিন্ন ষড়যন্ত তৈরীতে লিপ্ত হয় যায়। সেরকমই একটা ষড়যন্তের শীকার এই উপরের গল্পাংশটুকুর নায়ক-নায়িকা সিফাত ও লিয়ানা। লিয়ানার একাকিত্ব জীবনে সিফাত একটুকরো আনন্দ নিয়ে সহজেই প্রবেশ করে ফেলে এবং শেষ পরিনতি হয় তাদের এ পৃথিবী হতে মর্মান্তিক বিচ্ছেদ। আর এর প্রকৃত কারণ খুজতে খুজতে বিভিন্ন ঘটনার সংমিশ্রনে শেষ হয় লেখক শরীফুল হাসান এর বই “রেড পয়জন”। বের হয়ে আছে কিছু মুখোশধারী ভালো মানুষের আসল রূপ। যারা কিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে লোকচক্ষুর আড়ালে কিছু অবৈধ কার্যকলাপে যুক্ত হয়ে গোপনে গোপনে টাকার কুমিরে পরিনত হতে চায় কিন্তু যখন দেখে যে তার এই পথে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে তখন তার হয়ে উঠে প্রতিশোধ পরায়ন। এরকমই একটা অবৈধ কার্যকলাপ অর্থাৎ মাদক ব্যবসায়ী এবং তার সাথে সঙ্গ দেয়া মানুষের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছেন লেখক তার ”রেজ পয়জন” গল্পের মাধ্যমে।