লেখক শরীফুল হাসানের সবচেয়ে বড় গুণ তিনি এমনভাবে গল্প বলেন, পাঠকের সাথে সেই গল্পে এক ধরনের সংযোগ স্থাপন হয়। চমৎকার লেখনশৈলীতে কোনো জড়তা নেই, আড়ষ্ট ভাব নেই। অতিরঞ্জিত করার বিষয় নেই। গল্পের এক প্রকার ধারা থাকে, সেই ধারা অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে হয়। সাবলীল ভঙ্গিতে গল্প তো এমনভাবেই বলতে হয়, যেখানে পাঠক বুদ হয়ে যায়। সাদামাটা গল্পও এখানে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। লেখকের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা এখানেই, যেখানে সাদামাটা একটা গল্পকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে তোলা যায়। আর এই কাজ খুব সহজভাবে পারেন শরীফুল হাসান।
লেখকের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাসিকা “রেড পয়জন” শেষ করলাম। জনরা হিসেবে বইটিকে ক্রাইম থ্রিলার হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। কিংবা রিভেঞ্জ থ্রিলার বললেও ভুল হবে না। এই গল্পের মূল চরিত্র ইশতিয়াক খান। ‘ড্রাগস এন্ড নার্কোটিকস প্রিভেনশন টিম’-এর নীতিবান যোদ্ধা। কাজ করেছেন ন্যায় নিষ্ঠার সাথে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গজিয়ে ওঠা মাদক চোরাচালানের র্যাকেট ভেঙেছেন। তাই হয়তো শত্রুপক্ষের অভাব নেই, যারা ছোবল মারার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।
কোন একটি অপারেশন শেষ করে আয়েশ করে বসে আছেন ইশতিয়াক খান। খবর এলো তখনই। একটি জায়গায় যেতে হবে। মাদক চোরাচালান নির্মূল টিমের প্রধান ও ইশতিয়াক খানের বন্ধু আলী আসগরের কথায় সেখানে গেলেন ইশতিয়াক। কে জানত, জীবনের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা অপেক্ষ�� করছে সেখানে। মা ম রা একমাত্র মেয়ে লিয়ানার ছুরিবিদ্ধ লাশ লুটিয়ে আছে মাটিতে। কার এত আক্রোশ থাকতে পারে, এভাবে একজনকে মে রে ফেলতে পারে! তার পৃথিবী এখানে টলে গিয়েছে। জীবনের সব আশা ভরসা শেষ হয়ে গিয়েছে। তবুও মেয়েটার এই পরিণতি কে করেছে, খুঁজে বের করতে হবে। বাবা হিসেবে মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি। ব্যর্থ বাবা হলেও মেয়ের উপর ঘটে যাওয়া এই অন্যায্য ঘটনার শেষ দেখতে হবে।
তদন্তে উঠে আসে লিয়ানা না-কি ইয়াবা আসক্ত ছিল। ভদ্র, শান্তশিষ্ট মেয়েটি সত্যিই ইয়াবা সেবন করত? শুধু তা-ই নয়, তদন্ত কর্মকর্তা আদনান দাবি করছে লিয়ানা না-কি ইয়াবা সরবরাহের সাথেও যুক্ত ছিল! মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাই বলে এই দিন দেখতে হলো? তার নিজের মেয়ে এমন করবে বিশ্বাস হতে চায় না। এর পেছনে কোনো বিশাল ষড়যন্ত্র আছে। যা তাকে আর তার মেয়েকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে চায়। কিন্তু এভাবে তো হেরে যাওয়া যাবে না।
নিজেকে তদন্ত করে চাইলেও মেয়ের কেসে এভাবে তদন্ত করা যায় না। উপরমহল থেকে ছুটি দিয়েছে দীর্ঘদিনের। তাই বলে বসে থাকতে পারে না সে। অফিসিয়াল না হোক, আনঅফিসিয়াল তদন্ত তো চালানো যায়। মেয়ের বন্ধুদের খোঁজ নিতে হবে। সিফাতের সাথে লিয়ানার কী সম্পর্ক? তদন্ত করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় নিজেরই ফেঁসে যাওয়ার উপক্রম ইশতিয়াক খানের। তারপরও হাল ছাড়া যাবে না।
লিয়ানার মৃত্যু না, এই ঘটনার বীজ লুকিয়ে আছে অনেক গভীরে। পুরোনো এক ঘটনার প্রতিশোধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আর তাতে একের অধিক প্রাণ এভাবে শেষ হয়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে…
আগেই বলেছি, শরীফুল হাসানের লেখনশৈলী সাবলীল, দুর্দান্ত। এই বইতেও তার ধারা বজায় ছিল। পুলিশ প্রসিডিউয়াল গল্প সাধারণত ধীর গতির হয়। কিন্ত এই বইটির গতি ছিল দ্রুততর। খুব অল্প সময়ে ছোট্ট এই উপন্যাসিকা পড়ে শেষ করে ফেলা যায়। কোনো বাড়তি বর্ণনার আশ্রয় নেননি লেখক। যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই। লেখকের এই পরিমিত ব্যবহার ভালো লেগেছে।
সেই সাথে স্বল্প পরিসরে চরিত্র নিয়ে যেভাবে কাজ করেছেন, তার জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার। বেশি চরিত্র ছিল না এখানে। তবুও অল্প-স্বল্প সুযোগে প্রতিটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে যে চরিত্রগুলো গল্পের মূল চরিত্র ছিল। আমি লেখকের বর্ণনার অনেক বড় ভক্ত। এই ছোট্ট বইতে, যেখানে একের পর এক ঘটনা দ্রুতগতিতে ঘটে চলেছে, সেখানেও তিনি দারুণ কিছু বর্ণনা দিয়েছেন। যে বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হতে হয়।
ইঁদুর-বিড়াল খেলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পুলিশি তদন্ত, টুকরো কিছু চমক বইটিকে প্রানবন্ত করে তুলেছে। কিছু কাকতালীয় ঘটনা অবশ্য ছিল। যদিও খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। বইতে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা (যাকে বিষ বলাটাই শ্রেয় মনে হয়) আর এর বিশাল র্যাকেট নিয়ে বইয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। কে জানে, হয়তো সবটাই সত্যিই। প্রযুক্তির এই যুগে নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা একটি প্রজন্মকে খুব দ্রুত ধ্বংস করে দিতে পারে। পারে না?
তদন্ত প্রক্রিয়া লেখক যেভাবে বর্ণনা করেছেন, ভালো লেগেছে। প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন কাজে পারদর্শী। একজনই সব পারে এমন অতিরঞ্জিত বিষয় ছিল না। পুলিশে চাকরি করলেও একজন অফিসার যার বয়স হয়েছে, সে যে প্রযুক্তির সব জানবে না এই বিষয়টি ভালো লেগেছে। একদম ন্যাচারাল ছিল বিষয়টা। লেখকের এই ধরন ভালো লাগে। কোনো চরিত্রকে তিনি অতিরঞ্জিত হিসেবে দেখান না। যে চরিত্র যেভাবে গল্পে নিজেকে নিবেদন করে, ঠিক সেভাবেই গল্প এগিয়ে চলে।
শেষটা পছন্দনীয়। এভাবে সমাপ্তি টানলে অতৃপ্ত কিছু থাকে না। ভালো লেগেছে। ছোট্ট এই উপন্যাসিকা বেশ উপভোগ্য। সম্পাদনার ঘাটতিও তেমন চোখে পড়েনি দুয়েকটা ছাপার ভুল ছাড়া। প্রচ্ছদটা পছন্দ হয়েছে। একজন বাবা তার মেয়েকে আগলে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে প্রচ্ছদে। কিন্তু দিন শেষে সবসময় পারা যায় কি?
▪️বই : রেড পয়জন
▪️লেখক : শরীফুল হাসান
▪️প্রকাশনী : চিরকুট প্রকাশনী
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৫/৫