বস্তির দুটো কামরা নিয়ে বাস করে অভিজিৎ শাক্য ভট্টাচার্য ওরফে পটা। বাবা বহু আগে, মা কিছুদিন হল চলে গেছেন। একা মানুষটি সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করে~ পেরেক থেকে পোর্সেলিন, কস্তুরী থেকে কঙ্কাল। এই শেষোক্ত বস্তুটি একটি তান্ত্রিককে সাপ্লাই করে বাসে ফেরার পথেই হল এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। সেখান থেকে ফিরে আসার পর অভিজিতের জীবনে এক মহা বিপর্যয় হয়ে নেমে এল এক অদ্ভুত স্বপ্ন। তা তাকে ঘুমোতে দেয় না— সে যতই ওষুধ খাওয়া হোক বা পরিশ্রম হোক। প্রায় পাগল হওয়ার আগের অবস্থায় বস্তিরই বাসিন্দা এক ভূয়োদর্শী মানুষের পরামর্শে সে বেরিয়ে পড়ল এই স্বপ্নরহস্যের সমাধান খুঁজতে। আর তারপর... তারপর আমরাও তার সঙ্গে পথে নামলাম। তারই সঙ্গে আমরাও কখনও ঘামে, কখনও বৃষ্টিতে ভিজলাম। কখনও ভয় পেলাম, আর কখনও ভালোবাসলাম। চিরন্তন ভারতবর্ষ তার অপার রহস্য আর অনন্ত ঐশ্বর্য নিয়ে নতুন করে দেখা দিল আমাদের সামনে। স্বদেশবাসীর দিনযাপনের যাবতীয় গ্লানি আর সৌন্দর্য, দারিদ্রের কশাঘাতে লাঞ্ছিত কঠোর বাস্তব আর আকাশে-বাতাসে মিশে থাকা হাজার-হাজার বছরের মিথ, সর্বোপরি ছাইয়ের নীচে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা এক অদ্ভুত দর্শন ও বিশ্বাস— এরা আমাদের টেনে নিল কালস্রোতে। মুক্তি হল আমাদেরও। কিন্তু যাত্রা শেষ হল না। এ যে এক অনন্তযাত্রা! এই ধরনের বইয়ের সমালোচনা করা বড়ো কঠিন কাজ। এর বিষয়বস্তু, এর বিভিন্ন চরিত্র ও তাদের মুখে শোনা-জানা নানা কথা, গল্প, বিশেষত দর্শনের সামনে পড়লে নুনের পুতুল হয়ে সমুদ্রের গভীরতা মাপার মতো অবস্থা হয়। তবে হ্যাঁ, অসামান্য নানা উপমা, চিত্রকল্প এবং প্রায় বিদ্যুৎগতি গদ্যের মধ্য দিতে এগিয়ে যেতে-যেতেও কিছু জিনিস চোখে লাগে। যেমন~ কথাগুলো সাজানোর সময় কিছু-কিছু ফ্রেমের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। বড়ো বেশি জাম্প-কাটের মতো করে এক ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমে সরে গেছি আমরা— হয়তো পথচলার সময় ক্রমাগত দৃশ্যান্তরের অনুষঙ্গেই। আরেকটু সময় নিয়ে, আরেকটু বড়ো পরিসরে, আরও ধীর লয়ে মানুষগুলোর গল্প আর মাঝের ইতিহাস বললে বইটা আরও বড়ো হত, আরও ভালো হত। এযুগে আমাদের জন্য তো এই লেখাগুলোই ভূমার সান্নিধ্যসুখ দেয়। তারা আকারে একটু বড়ো হলে, ক্ষতি কী? সবচেয়ে বড়ো কথা, অভিজিতের এযাত্রা বিপন্মুক্তি ঘটলেও তার জীবনের অনেক ধাপ, অনেক পথচলা এখনও আমাদের দেখা বাকি থেকে গেছে। তাই বই শেষ হতেই প্রশ্ন জাগে, তারপর? আশা করি, লেখক আমাদের নিরাশ করবেন না। এই অমৃতগর্ভা দেশের আরও অনেক মানুষ, আরও অনেক বিশ্বাস ও ভাবনার আখ্যান অভিজিৎ ও তার বাইকের সঙ্গে আমরাও নিশ্চয় জানতে পারব। প্রকাশক ত্রুটিহীন মুদ্রণের সাহায্যে বইটির রুচিশীল পরিবেশনে যথাযথ সঙ্গত করেছেন। বইটি পাঠকের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাঁরা আগামী দিনে বোহেমিয়ানের সঙ্গে আমাদেরও এমন স্বপ্নদর্শনের আরও সুযোগ দেবেন নিশ্চয়। ভরসা থাকুক।
বইয়ের প্রচ্ছদে দুজন সন্ন্যাসী বসে আছেন, একে অপরের দিকে মুখ করে। তাঁদের মাঝখানে লেখককে দেখা যাচ্ছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কলকাতার এক বস্তির নিবাসী অভিজিৎ শাক্য ভট্টাচার্য, যার বাবা মা নেই, অবিবাহিত। এই অভিজিৎ বাবু হঠাৎ একদিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন এবং তার জীবনে শুরু হয় এক অদ্ভুত সমস্যা। তিনি রোজ দেখতে থাকেন একটাই স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন তাকে ঘুমোতে দেয় না। সেই স্বপ্নের উৎস সন্ধানে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন ঘর ছেড়ে। বোহেমিয়ানের এই যাত্রায় শুধু বিহার, লক্ষৌ, বেনারস নয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন কিছু অদ্ভুত মানুষ। রয়েছে বিহারের ভাভুয়াতে দেবী মুন্ডেশ্বরী মন্দিরে অদ্ভুত এক বলির কথা, রয়েছে পিন্ডারিজি বা মির্জা সাহেবের সাথে অলৌকিক সাক্ষাৎকার, রয়েছে বানারসের সেই রহস্যময় অঘোরী সাধু বাবা, পাশাপাশি রয়েছে কিছু অসাধু লোকজনও। তারপর ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত, সাধুসঙ্গ এবং নানান গতিতে উপন্যাস তার নিজের ধারায় বয়ে গেছে। তার কিছুটা নিখাদ চোখের সামনে দেখা ঘটনা, কিছু কল্পনা। লেখক ভূমিকাতে স্বীকারও করেছেন মূল ঘটনা তাঁর নিজের জীবন থেকে নেওয়া। বাকিটুকু কল্পনা। এই গল্পের কোনো আদি নেই, তাই কোনো অন্তও নেই।
লেখক রাজাধিরাজ ভট্টাচার্য একজন বোহেমিয়ান, ঘুরতে ভালোবাসেন, সাধুসঙ্গ ভালোবাসেন কিন্তু আদতে তিনি একদম আমার আপনার মতন সাধারণ মানুষ। তিনি সাধারণ মানুষের চোখে সাধুসঙ্গ দেখেছেন। তাঁর এই উপলব্ধি ব্যক্ত হয়েছে একজন সাধারণ মানুষের জবানিতে, একজন বোহেমিয়ানের আত্মকথনে। বহু সাধকের প্রসঙ্গ এসেছে গল্পে। গুমনামি বাবার প্রসঙ্গও এসেছে। স্বপ্নের ব্যাখ্যার কিছু সহজ দিকনির্দেশ করার চেষ্টা করেছেন লেখক। উপন্যাসের শেষাংশ যথাযথ।