"ছোট গল্প লেখার নানা ধরণের ব্যাপার স্যাপার আছে। আমি গল্প পড়ে আরাম পাচ্ছি কিনা সেই বিষয়টাকেই বিবেচনায় রাখি, লেখার সময়ও সেই ব্যাপারটা নজরে থাকে। আফিন্দী সাহেব আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেন প্রথম গল্পটাতেই। গল্পের নাম ‘জুতা’। আমি সিলেটে যাইনি, কিন্তু ক্ষুধার্ত দুই চরিত্রের সাথে আমিও সিলেটের পথে নেমে পড়ি। ছোট গল্পের শেষ থাকতে হবে কিংবা হবে না, এ নিয়ে বিস্তর আলাপ-সালাপ আছে। আমি সেইসব আলাপে যেতে চাই না। তবে গল্পের শেষটায় পাঠক ধাক্কা খাবেন, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
এরপর একে একে গল্প এলো। দ্বিতীয় গল্প ‘গৌরা’। গল্প নিয়ে নিরীক্ষা অনেকেই করেন। নতুন লেখকদের অনেকে ঝুঁকি নেন, অনেকে নেন না। আফিন্দী সাহেব ঝুঁকি নিয়েছেন। চরিত্রদের নামকরণ ছাড়াই একটা গল্প কিভাবে এগিয়ে যায় এবং পরিণতি পায়, এই গল্পটা তার চমৎকার একটা উদাহরণ।
এরপর একে একে আছে আরও চারটি গল্প। গল্পগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল। আফিন্দী সাহেব অল্প কথায় অনেক কিছু বলেন। বাক্যগুলো মনের মধ্যে চাপ তৈরি করতে থাকে, এবং একসময় সেই চাপটা দূরে কোথায় মিলিয়ে যায়, পাঠক হিসেবে এই অনুভূতিটা আনন্দের।
আগেই বলেছি আমি সিলেটে যাইনি, কিন্তু গল্পে গল্পে আম্বরখানা জিন্দাবাজার শাহী ঈদগাহ, মীরবক্সটুলা, চন্দনটুলা, চৌহাট্টা পয়েন্ট, মদিনা মার্কেট সব চিনে ফেলেছি এরকম বোধ হচ্ছে। আবার একই সাথে লেখক যে তার বৃটিশ আবহাওয়াটাও ধীরে ধীরে রপ্ত করে নিচ্ছেন তার চিহ্ন একটি গল্পে বেশ অনুভূত হয়েছে।
এই সংকলনটি ইবুক হিসেবে লেখক প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। এটাও একটা বড় ব্যাপার। আমাদের প্রকাশনা জগতে ছোট গল্প প্রকাশ করার ঝুঁকি নেয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশকরা হয়তো লেখকদের প্রোফাইল দেখেন, তাঁর সামাজিক মাধ্যমের অনুসারিদের হিসাব করেন। নতুনদের নিয়ে কাজ করার মানসিকতা হয়তো অনেকেরই থাকে না। আফিন্দী’র এই ইবুক প্রকাশ নতুন একটা বার্তাই দেয়। লেখক লিখে সেটা ফেলে রাখবেন না। প্রকাশ করবেনই। সেটা তখন পাঠকের। আমি আশা করি, সময় এবং পাঠকের প্রতিক্রিয়াই বলে দেবে শাহ্রিয়ার তকী আফিন্দী লেখালেখিতে দীর্ঘস্থায়ী একটা স্থান দখল করে নেবেন।
আমাদের ছোট গল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। আফিন্দী'র ছোট গল্পে যাত্রাটা মসৃণ হোক, আরও অনেক ছোট গল্প তাঁর কলম থেকে একে একে প্রকাশ হতে থাকুক এই কামনা করি।"
যাত্রাপথে ঘুম ভেঙে গেলে সবসময়ই আমি হাতের কাছে এক ধরনের গল্পের সন্ধান করি। যাতে আবার ও ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহুর্তটা আরো গাঢ় ভাবে অনুভব করতে পারি। 'সন্দুক্ক-অ' তে যে কয়টা গল্প আছে, সব গল্পগুলোই ঠিক এমন কায়দার; আমার সন্ধান করা গল্পের মত।
গল্পকে বাস্তব অথচ মেকি নয়-ঠিক এমন ধাঁচে ফেলানো খুব একটা সহজ নয়। আমাদের আশেপাশে কোথাও যেন এমন ঘটনা ঘটেছে-এমন একটা আবহ সৃষ্টি করতে পারলে সেই গল্পকারের যাত্রা শুভ হওয়ার সম্ভবনাই বেশি।
'জুতা', 'গৌরা', 'উলুতুলু নোয়াগাঁও টু আস্টন-আন্ডার-লাইন', শিরোনামের গল্পগুলো ভালোলেগেছে। আর বইয়ের নামকরণের পেছনের গল্পটা মজার। নামটাও মজার না? সন্দুক্ক-অ।
প্রথম বই হিসেবে বইটা বেশ ভালোই ছিলো।পড়তে পড়তে সিলেট ভ্রমনও হয়ে গেলো।সিলেটি ভাষা বুঝলে আরো ভালো হতো।৫টা ছোটগল্প নিজ নিজ জায়গা থেকে সুন্দর। লেখক বার্সা ফ্যান জেনে আরো খুশি হয়ে গেলাম। কিছু টাইপিং মিস্টেক ছিলো।এগুলো পরবর্তীতে খেয়াল রাখলে ভালো হবে।
..."আদৌ মানুষ কি প্রিয় হয়? নাকি বিকেল কিংবা গোধূলির মতো সময়টা প্রিয় হয়? বসন্তের বাতাস জানালা দিয়ে ডাকাতের মতো ঢুকে গলার ছুরি বসিয়ে মনে করিয়ে দেয় সেইসব বিকেল কিংবা গোধূলিতে যে মানুষগুলো প্রস্থান করেছিলো তাদের কথা, ঘটনাগুলোর কথা। প্রিয়জন আসলে কে? সময় নাকি মানুষ?"... - পিপড়ে, সন্দুক্ক-অ
প্রতিটি কঙ্ক্রিটে মোড়ানো শহরের মাঝে বিচরন করে কিছু মানুষ। এই একদল মানুষের হৃদয়ে, মস্তিষ্কে, রন্দ্রে রন্ধ্রে চলে অপার্থিব চিন্তনশৈল্পির লীলাখেলা। এই শিল্প তাহার জীবনে খুবই অদ্ভুত প্রভাব ফেলে, প্রভাব ফেলে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতায়। এছাড়া স্মৃতি রোমন্থন করে এই চিন্তন শিল্প পরিনত হয় এক অদ্ভুত সুদর্শন কোনো অনুভুতিকে যা মানুষ হৃদয়ে ধরে রেখে চলে যায় আজীবন। কিছু মানুষ এই অনুভুতিকে কাগজে কলমের আকিবুকিতে লিখে, আর নাম দেয়,"গল্প"। এই স্মৃতির টুকরো গুলো, অনুভূতির অংশগুলো কিংবা কল্পনার বাস্তবতার ভেজালে তৈরি কোনো পন্য হোক না কেন, এই গল্পগুলো হয়ে উঠে তার উজ্জ্বল নিদর্শন, যার অবক্ষয় বা বিকৃতি হয় না। বিনাশ হয় না। শুধুমাত্র লেখনি ই পারে, এই মানুষের রন্ধ্রের খবর কে অবিনশ্বর করে বইয়ের পাতায় তুলে রাখতে।
শাহরিয়ার ত্বকী আফিন্দী ভাইয়ের প্রথম বই সন্দুক্ক-অ যখন প্রিন্টের সিদ্ধান্ত নেই তখন ব্যস্ততায় বই পড়ার সময় ছিলোনা, খুব তাড়ার সাথে সেই কাজ শেষ করি। আজকে, এই এক বসায় বইটি শেষ করলাম। আসলে কিছু কথা না বললেই নয়। আফিন্দী ভাইয়ের লেখক স্বত্তা র সাথে আমি কমবেশি পরিচিত। গল্পগুলো আমার কাছে তার প্রতিচ্ছবির মত ধরা দিলো। গল্পগুলো যেমন খুব সাধারন, একই সাথে প্রতিটি গল্পের মাঝে কিছু অসাধারন এলিমেন্ট তিনি দান করেছেন যা প্রতিটি গল্প একটা চমৎকার স্বকীয়তা ধারন করেছে। প্রতিটি গল্পের চিন্তাধারা ইউনিক।
বইটতে সব মিলিয়ে ৬ টি গল্প রয়েছে। প্রথম গল্প "জুতা" দৃষ্টপটে বাঙালি উপকারী চরিত্রের পেছনকার এক চিরায়ত স্বার্থপর রূপ তুলে ধরেন যা খুবই রোজকার চিত্র। গল্পটিতে বিশেষত্ব মূলত মুচি চরিত্র, যে গল্পের প্রধান আকর্ষণ। গৌরা গল্পটি যেনো হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেলো, সমাজে অসামঞ্জস্য একটি অভিশাপ হতে পারে সেটি ফুটে উঠে। বর্ননায় গল্পটা ইউনিক লেগেছে, তবে এখানে অন্যান্য গল্পের তুলনায় কিছু এলিমেন্ট মিসিং মনে হয়েছে, যেনো কি জানি নেই গল্পে। রিক্সা গল্পের প্লটিং সবথেকে ইউনিক এবং এর লেখনি ধরন ও চরিত্রায়ন বেশি ভালো লেগেছে। গল্পের শুরুর চিত্রপট আর শেষের চিত্রপটের যে বিশাল ফারাক সেটাই এই গল্পকে পছন্দনীয় করে তুলেছে। পিপড়ে গল্পটিও অনেক ইউনিক মনে হয়েছে আমার কাছে তবে এই গল্পটিতেও যেনো কিছু মিসিং পিস ছিলো যা থাকলে গল্পটি পরিপূর্ণ হয়ে যেতো৷ উলুতুলু নোয়াগাও টু আস্টন আন্ডারলাইন গল্পটি পড়ে সবথেকে বেশি মজা লেগেছে, কেননা গল্পের প্যারালালিজম এত চমৎকার ভাবে তুলে উঠেছে। আর সবশেষে তারাবিবি গল্পটির বর্ননায় আর লেখনিতে ছিলো অনন্য। বেশ সাধারন গল্পকে অসাধারন ভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি। এই গল্পটির লেখনি দিয়েই পাঠকের মন জয় সম্ভব বলে আমি মনে করি।
শ্রীহট্ট থেকে বর্তমানে ইউকে অধিবাসী আফিন্দী ভাই নিজের সিলেটের গল্প লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। নবীন লেখক হিসেবে ভুল ত্রুটি থাকাটা স্বাভাবিক, যা ছিলো ও বটে। কিছু গল্পে চরিত্রায়ন, কিছু বাড়তি লেখন, কিছু প্লটিং বৃদ্ধি করার প্রয়োজন। এই সীমাবদ্ধতা কে ছাপিয়ে এগিয়ে যাবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সন্দুক্ক-অ কে এক্সপ্লোর করুন, নতুন কিছু সামান্য হলেও পাবেন।
এইযে ভীষণ অস্থিরতায় ঘেরা জীবনে যখন বই পড়তে বসি আর সেই বই অস্থিরতা দূর করার জন্য উঠে-পরে লাগে তখন নিজেকে অনেক সুখী মানুষ মনে হয়।সন্দুক্ক-অ একটানা পড়ার পর এখন নিজেকে সুখী মানুষদের দলে ফেলতে ইচ্ছে করছে একটু।এর আগেও সন্দুক্ক-অ পড়া হয়েছে।এবারের পড়া ধরলে দুই এক্কে ২ হয়।সন্দুক্ক-অ প্রথমে খুললেই "জুতা" গল্পটা চোখে পড়ে।"জুতা"গল্পটা পড়তে পড়তে সেদিনের ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা মনে এলো।ওইদিন সখীর সাথে ঝালমুড়ি খাওয়ার সময় একটা বাচ্চা ছেলে এসে বলল,"আপা কিছু খাওয়ান"। তাই বাচ্চাকেও আমাদের ঝালমুড়ি খাওয়ার সঙ্গী করে নিলাম।গন্তব্য ফেরার সময় আরেকজন মেয়ে বাচ্চা এসে বলল আপা ১০ টা টাকা দেন।হাতে আমার ২০ টাকা।বললাম ১০ টাকা নেই রে আপা।বাচ্চা আমাকে হাসি দিয়ে বলল,"আপা ভাংতি দিতেছি।"আমি বললাম,"জো হুকুম"।টাকা ভাঙ্গতি করার জন্য হাতে দিতেই সেই বাচ্চা টাকা নিয়ে পাখির মত উড়ে কইযে চলে গেল!এতক্ষণ এই বাচ্চার মাথায় টাকা নিয়ে উড়াল দেয়ার বুদ্ধি চলছিল সেটা বুঝতে কত সেকেন্ড সময় লাগল তার হিসেব নেই।আচ্ছা"জুতা"গল্পের মুচিরও কি ফারাজ আর বিদ্যুৎ কে দেখার পর থেকেই রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে ওদের মন জয় করার চিন্তা মাথায় ঘুরছিল?কে জানে?ঘুরতেও পারে।বিদ্যুৎ আর ফারাজেও বুঝতে পারেনি মুচির অন্তরের কথা যেমনটা আমিও বুঝতে পারিনি।সে যাই হোক।"জুতা"থেকে সরে এসে পড়লাম "গৌরা"।"গৌরা আমাকে দারুণ অবাক করেছে আসলেও।পড়া পর মনে মনে বলে উঠলাম," এই যাহ!এটা কি হলো?" খর্বায়কার আর হাড্ডিসারের মেসের বাবুর্চি সাহেবের মত আমার হোস্টেলের বাবুর্চি যে না সেটা মনে হওয়াতে একটু কষ্ট হয়েছে বইকি।অবাক কাটতে না কাটতেই "রিক্সা"করে আবিরের সাথে সাথে আমিও ঘুরে এলাম সিলেট শহরে।ফরিদ আর আবিরের সাথে সাথে আমিও কাজী নজরুল অডোটেরিয়ামের মুক্তমঞ্চ থেকে ভেসে আসা গান শুনল���ম।
"সামনে দাঁড়াও একবার দেখি নয়ন ভরিয়া
ভালোবাসি তবে কেনো যাও না শান্ত করিয়া"
রিক্সা ঘোরা শেষে আতিকের মত আমিও ভাবলাম মানুষ বোধহয় আসলেই "পিপড়ে"।জীবনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টায় মানুষ কখন পিপড়ে হয়ে যায় তা হয়ত মানুষেরই জানা নেই।ভাগ্যিস আতিক কুসুম গরম পানিতে তার হাত ডুবানোর আগে "মানুষ পিপড়ে?পিপড়ে মানুষ" এই চিন্তা করে গিয়েছিল।এই চিন্তা বাদ দিয়ে ভাবলাম "উলুতুলু নোয়াগাও টু আস্টন-আন্ডার-লাইন" যাওয়া যাক।কিন্তু এ কি করে সম্ভব?সিলেট থেকে ম্যানচেষ্টার?সেটা লেখক সম্ভব করেছে,আমি কিছু জানিনা।চোখের নিমিষে সিলেট থেকে ম্যানচেষ্টার যে যাওয়া সম্ভব সেটা এখনো আমাকে বিস্মিত করে।আর সেটা নিয়ে ভাবতে গেলে ধ্রুবর মত আমারও কপালের ডানদিকের রগ ব্যাথায় ফুলে উঠে,ঘাম হয়।এই ব্যাথা বা ঘাম কমানোর জন্য দেয়ার জন্য শুনতে গেলাম "তারাবিবির" বাঁশির সুর।তারাবিবির বাঁশির সুরে আংশিক মন ভরলেও যে হাসি দেখে রাফায়েলের দিন-রাত থেমে গিয়েছিল সেই হাসি দেখার ইচ্ছে জাগে।সেদিন ওভার ব্রিজ পার হতে গিয়ে একজন লোক কে দেখলাম বাঁশি বাজাতে।আহা সে কি সুর!সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবলাম আচ্ছা তারাবিবি কি এখনো রাফায়েলের দেয়া সেই বাঁশিতে সুর তোলে?বা রাফায়েল যেই চিঠি তারাবিবিকে দিয়েছিল সেই চিঠিকে মাঝেমধ্য নেড়েচেড়ে দেখে?এইসব প্রশ্নের উত্তর হয়ত স্বয়ং রাফায়েলও দিতে পারবে না।তাই আমিও এসব প্রশ্ন আর মনে রাখব না।কিছু জিনিস অজানাই ভালো।এইযে তারাবিবির বাঁশির সুর শুনতে শুনতে যে "সন্দুক্ক-অ" শেষ হলো তাই বা মন্দ কি?
"সন্দুক্ক- অ" লেখকের প্রথম বই। "সন্দুক্ক অ"- এর আরেকটা ভালো দিক হলো লেখকের আঞ্চলিকতার টানের ছাপ বইয়ের সুন্দর দাগ কেটেছে।নিজের অঞ্চলের,আঞ্চলিক ভাষার সৌন্দর্য এত সুন্দর করে তুলে ধরেছেন যা বই পড়া আরও সুখপাঠ্য করে দিয়েছে।তবে গল্পের চরিত্রের নাম উলট-পালট হয়ে গেলে আমার সুখপাঠ্য বেঘাত ঘটে।এছাড়া " সন্দুক্ক-অ" এর সাথে সময় ভালো কেটেছে। লেখক বইয়ের শেষে বলে দিয়েছেন যে ভুলত্রুটি থাকার পরও বা চমৎকার না হওয়ার পরও হয়ত তেলে ভাজা মচমচে রুটির মত বইয়ের গল্প গুলো কেউ খেয়ে ফেলবে।আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলা যায়।
"সন্দুক্ক-অ" শাহরিয়ার তকী আফিন্দীর প্রথম গল্পগ্রন্থ। বইয়ে মোট ছয়টা গল্প আছে। গল্পগুলোর নাম জুতা, গৌরা, রিক্সা, পিঁপড়ে, উলুতুলু নোয়াগাঁও টু আস্টন-আন্ডার-লাইন এবং তারাবিবি। ছয়টা গল্পের প্রত্যেকটাই স্বতন্ত্র, একটার সাথে আরেকটার বিষয়, কাহিনী বা গাঁথুনিতে বিশেষ মিল নেই।
গল্পগুলোতে আফিন্দী ব্যক্তিগত ও সামাজিক টানাপোড়েন, প্রেম আর খেয়াল নিয়ে কাজ করেছেন। মানুষ মাত্রই কায়দা করে বেঁচে থাকার যে চেষ্টা, আফিন্দীর দুয়েকটা চরিত্র সে পথেরও পথিক। দুয়েকজন আবার ভীষণ খেয়ালী, বেপরোয়া। চরিত্রের ভেতর দিয়ে হিউম্যান সাইকোলজির এই এক্সপ্লোরেশনটা উপভোগ করেছি। তার ন্যারেটিভের একটা আলাদা ধরন চোখে পড়েছে। নতুন লেখক হিসেবে এই ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার। গল্পের সেটিং নিয়েও লেখককে বেশ সচেতন মনে হয়েছে। কাহিনীর মেদহীন বর্ণনায় তার গল্পগুলোতে ফুটে উঠেছে সিলেট শহরের একটা চিত্র এবং সেটা বেশ স্পষ্ট, কখনো সিলেট না গেলেও পড়ার সময় ঘটনার চারপাশটা সহজেই ভেবে নিতে পারছিলাম।
ব্যক্তিগতভাবে রিক্সা, উলুতুলু নোয়াগাঁও টু আস্টন-আন্ডার-লাইন গল্প দুইটা বিশেষ ভালো লেগেছে। এর একটা কারণ সম্ভবত ম্যাজিক রিয়েলিজমের ছোঁয়া। বাকি গল্পগুলো পড়েও আরাম পেয়েছি। একটা গল্পে নাটকীয় ভাব আনার আরোপিত একটা চেষ্টা ছিল বলে মনে হচ্ছিল পড়ার সময়। তবে সেটা গল্পের তেমন ক্ষতি করেনি। এক বসায় পড়ে ফেলার জন্য 'সন্দুক্ক অ' একটা ভালো বই হতে পারে।
এসবের বাইরে বইয়ের নামকরণের গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। আর বইটার অনলাইন সংস্করণ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন লেখক, তার এই প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই।
বইয়ের গল্পগুলোর আলাদা করে রেটিং দিলে তার গড় দাঁড়ায় ৩.৫। গুড রিডসে সে সুযোগ নেই, তাই ৪ টা স্টার।
বই এর নাম টায় কেমন অদ্ভূত! বোঝা মুশকিল এর ভেতরে কি গল্প থাকতে পারে। তবে এতটুকু জানতাম সিলেট নিয়ে কিছু লেখা আছে হয়তো। তাই কৌতুহল নিয়ে পড়া শুরু করে দিলাম.......
লেখকের মা যখন তাকে স্বরবর্ণের সংযুক্ত-অ পড়ান তখন লেখক পড়েন সন্দুক্ক-অ... আর এতে আছে ছয়টি গল্প জুতা, গৌরা, রিক্সা, পিঁপড়ে, উলুতুলু নোয়াগাঁও টু আস্টন-আন্ডার-লাইন!, তারাবিবি
"জুতা" গল্পে ফুটে উঠেছে মেসে থাকা দুই বন্ধুর কথোপকথন। এখানে সহজ, সরল জীবনের কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর পরের গল্পে একটা লেখা তে কোনো চরিত্রের নাম উল্লেখ না করে কত সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা যায় তাই লেখক নৈপুণ্যের সাথে করেছেন। রিক্সা গল্পের লেখক ইংল্যান্ড ছেড়ে এসে রিক্সা চালানো থেকে শুরু করে সকল কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন বলা আছে। এরপর ধ্রুব নামের একটা ছেলে লন্ডন এ বাস এ বসে যাচ্ছে আর ভাবে সুনামগঞ্জ থেকে সিলেটে যাওয়ার যেই "মুড়ির টিন " নামক বাসের প্রচলন ছিল তার স্মৃতি রোমন্থন করছে। এভাবে লেখনী শক্তি দিয়ে লেখক প্রতিটি গল্প খুব গুছিয়ে লিখেছেন; এক মুহূর্তের জন্য ও পাঠক কে হারাতে দেন নি।
আমার একবার সিলেট যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। যখন মির্জা জঙ্গল রোড, জিন্দাবাজার, সুরমা নদী, আম্বারখানা, চৌহাট্টা, ক্রীন ব্রীজ, সিলেটি পান, চা বাগান, হয়রত শাহজালাল (রঃ).. এইসবের কথা লেখা তে পড়ছিলাম মনে হচ্ছিল চোখের সামনে স্মৃতি গুলো ভেসে উঠেছে। এখানে না বললেই নয় যে সিলেট আধ্যান্তিক এলাকা এবং লন্ডন এর সাথে এর অবিচ্ছেদ্য অংশ এই দুটি দিকও লেখক সুনিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মনে হচ্ছিল আমি আরেকবার ভ্রমন করছি। সাধ জাগছে আরেকবার যাওয়ার!
"সন্দুক্ক-অ" শাহরিয়ার তকী আফিন্দি'র লেখা প্রথম বই। বইটি ছোট গল্প সংকলন এবং এটি ইবুক আকারে গুগল ড্রাইভে যে কেউ পড়তে পারবেন বিনামূল্যে।
বেশ ইন্টারেস্টিং ছয়টি গল্প আছে এর মধ্যে। গল্পগুলো এদের নামের মতই ইন্টারেস্টিং। প্রতিটি গল্পেই লেখক একটি করে চমক রেখেছেন। ৬ টির মধ্যে "গৌরা" ও "পিপড়া" এই দুটো একটু বিভিন্ন রকমের।
তবে যদি বলি যে সবচেয়ে অসাধারণ লেগেছে কোন গল্পটি তবে আমি বলবো "তারাবিবি"।গল্পটা বেশ মিষ্টি একটা প্রেমের গল্প সেই সাথে কিছুটা উত্তেজনা পূর্ণ। আবার এই গল্পের শেষেও রয়েছে এক দারুণ চমক, একটি অডিও ক্লিপ। এই অডিও ক্লিপটি বেশ ভালো লেগেছে এবং মূলত এটার জন্যই ভালোলাগাটা এক অন্য মাত্রায় চলে গেছে।
সব মিলিয়ে আমার মনে হয় বইটি পড়তে পাঠকদের বেশ ভালো লাগবে। বিশেষত যারা সাবলীল ভাষার বই পছন্দ করেন তাদের কাছে। এছাড়াও যারা শুরুর দিকের পাঠক অর্থাৎ যারা বইয়ের জগতে নতুন অথবা যারা নতুন নতুন বই পড়ছি অথবা আমরা যারা নতুন নতুন লেখকদের সম্পর্কে জানতে চাই নতুন লেখকদের লেখার ধরন বা বই সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে তারাও চাইলে পড়তে পারেন বইটি। আফিন্দি ভাইয়ের কাছে আমার এবং দরবার ���াসীর একটাই দাবি- বইটির হার্ডকপি।
ছোটগল্প সর্ম্পকে আমার জ্ঞান নিয়ে আমি নিজেই সন্ধিহান। তারপরও বুকস্টাগ্রাম কমিউনিটি থেকে কুড়িয়ে আনা প্রবাসী বাঙালির এই সেলফ পাবলিশড গল্পসমগ্র টাকে আমি আমার ব্যক্তিগত পার্সপেক্টিভ থেকে মাস্টারপিস তকমা দিয়ে ছাড়লাম।
আমি সবে ভার্সিটি লাইফে এ পা দেয়া মানুষ। তাই গল্প গুলো লেখকের যতটা নাই আপন, নিজের কাছেও পর মনে হয়নি। গল্পগুলোর জীবন তৃষ্ণা আর নস্টালজিয়া খুব প্রকট ভাবে মুখে এসে লাগে। নিজের রিডিং এক্সপেরিয়েন্স টা আরো মনে রাখার মতো ছিল কারণ আমি একটা একটা গল্প এক এক দফায় গিয়ে পড়েছি। বিশেষ করে শেষ গল্পের এর আগের দুইটা গল্প যখন আমি পড়ছি তখন আমি ফ্যামিলি সুদ্দো সিলেট ট্যুরে। তাই রাতের বেলা যখন বন্দর বাজার থেকে হেঁটে জিন্দাবাজার, আম্বরখানা ঘুরে ফিরে পানসি তে সাতকরা খেতে ঢুকছি তখন আমার মস্তিস্ক অবচেতন ভাবেই গল্পে পড়া সেই অলিগলি খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেই মুচি বা আম্বরখানার সেই অদ্ভুত মেস হয়তো আরেকটু হলেই চোখে পড়তো!
তারাবিবি গল্পটাকে শেষে রাখার জন্য লেখক কে বিশেষ ক্রেডিট দেবো (যা নিতান্তই সাবজেক্টিভ)। এইরকম আনরিকুইটেড লাভ এর গল্প আমার বড্ড মনে ধরে। আফটারটেস্টটা লম্বা সময় পর্যন্ত থাকে।
ফালতু বই, টাইম ওয়েস্ট পুরাডাই। চোদনা লেখক প্রথমেই কইয়া দিছিলো আজাইরা না থাকলে বই না পড়তে। আজাইরা হইয়া পড়ছি আর কি পরিমাণে বিরক্ত হইছি এইবেলা বুঝেন। এক স্টার দিলাম খালি রাইটারের অনেস্টির লাইগ্যা।
'সন্দুক্ক-অ' এই অদ্ভুত নামের বইটি সম্পর্কে জানতে পারি আমাদের বুকস্টাগ্রামারদের চ্যাট গ্রুপ থেকে। লেখক আফিন্দী ভাইয়ের সাথে এই গ্রুপের মাধ্যমেই পরিচয়। যে কেউ ভাইয়ার ইন্সটা আইডিতে গেলেই দেখবেন উনি কী চমৎকার বইয়ের ছবি তুলেন সাথে বুক রিভিউ, লেখালেখি, টাইপোগ্রাফি সবক্ষেত্রেই সে ঈর্শনীয়। বইটা নিয়ে কিছু লেখার আগে এই বইটা নিয়ে আমাদের গল্পটা শেয়ার করি। একদিন সন্ধ্যাবেলা সবাই গ্রুপে আড্ডা দিচ্ছি এমন সময় আফিন্দী ভাই আমাদের জানায় যে তার বই আসবে কিছুদিন পরে কিন্তু এটা নিয়ে আমরা যেন আগেই কোন পোস্ট বা স্টোরি না দেই। তবে এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের মধ্যে দুইটা ব্যাপার দেখা যায় এক ভাইয়ার গল্পগুলো বই আকারে আসবে তার আনন্দ কারণ তার পোস্ট পড়েই আমরা মোটামুটি আন্দাজ করতে পারি ওনার গল্পগুলো কত ভালো হতে পারে। আর দুই হলো ভাইয়ার বই বের হওয়ার পরে সেটার প্রচার। সেক্ষেত্রে এটা নিয়ে দরবার-ই-পুস্তক গ্রুপে চলতে থাকে নানা জল্পনা-কল্পনা।
আমরা অনেক ছোট পরিসরেই যে যার মতো করে বইটা নিয়ে স্টোরি বা মানুষকে জানিয়েছি। কিন্তু এরপর মানুষের মাঝে বইটা পড়ার আগ্রহ এবং কোন প্রকাশনী থেকে বইটা বের না হলেও ব্যাক্তি উদ্যোগে বই ছাপানোর কিছুদিনের মধ্যেই সব কপি বিক্রি হওয়ার ব্যাপারটা সত্যি অসাধারণ ছিল।
এবার বইয়ের গল্পগুলো নিয়ে বলি বইটিতে মোট ৬টা গল্প আছে। "জুতা", " রিক্সা" ও "তারাবিবি" গল্পগুলো আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। "জুতা" গল্পের লাস্ট টুইস্টটা অসাধারণ ছিল। "গৌরা" গল্পটি পড়তে যেয়ে বেশ অবাক হয়েছি কারণ গল্পের চরিত্রদের কোন নাম নেই। প্রধান চরিত্রদের কোন নির্দিষ্ট নাম না দিয়েও লেখক বেশ গুছিয়ে গল্পটি বলে গেছেন। "রিক্সা" ও "পিঁপড়ে" গল্প দুটি নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। আগেই বলেছি দুইটা গল্পই আমার বেশ ভালো লেগেছে। "উলুতুলু নোয়াগাঁও টু আস্টন-আন্ডার-লাইন" গল্পের প্যারালালিজম বিষয়টি বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল। "তারাবিবি" গল্পটি একটা সুন্দর ছিমছাম প্রেমের গল্প। গল্পের শেষে তারাবিবিকে দেয়া পত্রের একটা কিউআর কোড আছে। আর সেটা স্ক্যান করে আমি যা শুনলাম সেটা একদমই অপ্রত্যাশিত ছিলো। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাগুলো হয়তো এমনই হওয়া উচিত। গল্পগুলো খুবই সাধারণ তবে লেখক যে কম শব্দ খরচ করেও আপনাকে ঘোরে ফেলতে পারেন তা গল্পগুলো পড়লেই টের পাবেন।
আমাদের আশেপাশে হাজার হাজার মানুষ। এক একজনের জীবনের গল্প এক এক রকম। তেমনি জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ বা উপলব্ধির সুযোগ হয়তো খুব কম মানুষেরই হয়। গল্পকার যেন আমাদের সেই সব অপরিচিত মানুষদের গল্পই শোনালেন। প্রত্যেকটি গল্পের বিস্তৃতি খুবই সংক্ষিপ্ত, গল্প এই শুরু তো এই শেষ। আবার গল্পগুলো পড়তে যেয়ে আপনি সিলেটের নানা জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করবেন এমনও হতে পারে হঠাৎ সিলেটের আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, চন্দনটুলা, শাহী ঈদগাহ, চৌহাট্টা পয়েন্ট, মীরবক্সটুলা, মদিনা মার্কেট থেকে আপনি লন্ডনের কোন এক শহরে চলে এসেছেন। আমি যদিও অনেক ছোটকালে সিলেটে একবার গিয়েছি এবং সিলেট নিয়ে তেমন কোন স্মৃতি নেই তবুও গল্পগুলো পড়ার সময় মনে হচ্ছিল সিলেট শহরের অলিগলি যেন চোখের সামনেই ভাসছে। নিঃসন্দেহে যারা দীর্ঘদিন সিলেটে থেকেছেন বা থাকেন তারা আরও বেশি রিলেট করতে পারবেন।
বইয়ের গল্প শুরু হওয়ার আগে "মুখবন্ধ" অংশটুকু পড়ে দেখতে পারেন। বইটা পুরো পড়ে ফেলার জন্য অতটুকু লেখাই যথেষ্ট। আমার মনে আছে বইটা প্রথম ই-বুক হিসেবে পাবলিশড হওয়ার পর আমি নিজে না পড়ে বইটা একজনকে পড়তে বলেছিলাম! মাঝে মাঝে এরকম ব্যাতিক্রম দুই একটা গল্প পড়া তো ভালো, কী বলেন?