শিল্প অবিনাশী। এই মৃত্যুঞ্জয়ী বার্তার প্রতিধ্বনি রয়েছে শাহরোখ মেসকুব লিখিত The Ant's Gift: A Study of the Shahnameh বইয়ের ছত্রে ছত্রে।
লেখক বলছেন, "A society’s collective memory is, unconsciously, its history, a history that exists but is unaware of its own existence as history, and studying it is like researching and coming to know a man’s unconscious soul, and as a result changing what was unconscious into something conscious by uncovering what was hidden. Digging into and coming to know a collective memory is also a process of awakening sleeping layers of the past, and bringing their richness into historical consciousness..."
মনে পড়ে আচার্য্য অমলেশ ত্রিপাঠীর উক্তি, "আসলে মানুষ একই সঙ্গে মুক্ত ও বন্দী। ন্দী, কারণ, ইচ্ছাশক্তিকে নিরঙ্কুশভাবে সে প্রয়োগ করতে পারে না। মুক্ত, কারণ তাকে এগোতেই হবে—পথে হোক বা বিপথে হোক।
অতীতের শেকল এক হাতে সে খুলছে, পর মুহূর্তে জড়িয়ে পড়ছে আর এক শেকলে। ইতিহাস যেমন তাকে তৈরী করছে, সেও তেমনি তৈরী করছে ইতিহাস। রং কৌশলের পরিবর্তন, জনসংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের বিপ্লব, প্রকৃতির ভারসাম্যের বিনাশ বারবার জট বাড়াবে জীবনের।
কখনও ডাইনে কখনও বামে ছন্দ বাজবে কালের মন্দিরায়। তারই সঙ্গে তাল মেলাবার চেষ্টাই ইতিহাস। তালভঙ্গ হয়নি, তাও নয়। তবু তা শাশ্বত নয়। বারে বারে মানুষকে বিশ্বের অধিকার ফিরে পেতে হয়।"
এই বইয়ের লেখক বলছেন, "If we imagine tradition as a mountain whose crags have risen up from the heart of the land and whose summit reaches to the heavens, Ferdowsi is in the heavens standing astride the mountain, on a rocky ridge. He shows the observer standing next to him the vast and varied view of the cultural regions before them; this resembles the moment when we stand on the top of Mount Damavand, like the sun shining over the world, and see beneath our feet to the south and north the dry plain of the Dasht-e Kavir and the green Caspian Sea. Ferdowsi is the highest mountain and Hafez—who developed to its utmost the art of lyric poetry—is the most beautiful garden in our world..."
মহাকবি ফেরদৌসী ও তাঁর শাহনামার গল্প বলেছে এই বই।
মহাকবি ফেরদৌসী আসলে শাহনামায় তাঁর ছদ্মনাম গ্রহণ করেছেন। প্রকৃত নাম মোহম্মদ আবুল কাসিম অথবা মোহাম্মদ আবুল কাসিম হুসেন বিন আলী তুসি। তাঁর এই ছদ্মনাম গ্রহণের বিষয়ে দুটি প্রচলিত কাহিনী আছে। প্রথম কাহিনী হলো কবির জন্মস্থান খোরাসান প্রদেশের তুস নগরের পাশে রজানে একটি বিখ্যাত পুষ্প-উদ্যান ছিল যার নাম ফেরদৌসী। তিনি ওই বাগানের নাম গ্রহণ করেন।
দ্বিতীয় কাহিনী হলো, তিনি এসেছেন গজনিতে, গজনির সুলতান মাহমুদের সঙ্গে তাঁর দেখা। কবি মাহমুদকে স্তুতি করে বললেন
শিশু মাতৃস্তন্য পান করে রসনাপ্রসূন
হয়ে প্রথম যে শব্দটি মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে
সেটি হলো- মা-হ-মু-দ।
আমিও সেইরকম সুলতানকে সালাম জানিয়ে বলছি- মাহমুদ।
কবির এই প্রশংসাসূচক বাক্যে সুলতান বিগলিত হলেন বলাই বাহুল্য। তিনি পূর্ব হতেই কবির কাব্যের সঙ্গে যথেষ্ঠ পরিচিত ছিলেন। তিনি দু'হাত ধরে কবিকে বরণ করে
নিয়ে বললেন: আর ফেরদৌসী তু দরবারে না রা ফিদৌস ফারদী।
“ওগো ফেরদৌসী
আজ আমার দরবার সত্যিই স্বর্গ হয়ে উঠলো।”
এই ঘটনার পরই মোহাম্মদ আবুল কাসিম চিরকালের জন্য মহাকবি ফেরদৌসী নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। একহাজার বছর ধরে সারা পৃথিবীর কোটি ���োটি মানুষ তাঁকে এই নামেই ডেকে এসেছে।
ফেরদৌসীর বাবা ছিলেন তুসনগরের রাজার বাগানের মালী। সম্ভ্রান্ত চাষী পরিবারের ছেলে হিসেবে জন্মে ফেরদৌসীর বাল্যকাল কেটেছে স্বচ্ছল পরিবেশে। বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে চলা রূকনাবাদ নদীর ধারে বসে বালক কবি শুনেছেন পাখির কলতান।
যে কোনও কারণে তাঁর পরিবারের ওপর শাসনকর্তা হঠাৎ কুপিত হলেন। জীবন ও অর্থ দুটোর ওপরই তীব্র সংকট দেখা দিল। ফেরদৌসীর তখন তরুণ বয়স। গৃহত্যাগী হলেন। নানা শহরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন স্থিতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য। শেষপর্যন্ত এসে উপনীত হলেন আফগানিস্তানের ক্ষুদ্ররাজ্য গজনিতে।
এ-সময় গজনির সুলতান হয়ে বসেছেন মাহমুদ। তিনি যুদ্ধবাজ মানুষ ছিলেন। একাধারে কাব্য ও শিল্পকলায় মাহমুদের ছিল তীব্র অনুরাগ। তার দরবারে তখন রাজ কবি ছিলেন আনসারী।
একদিন বাগানে কবি ফেরদৌসীর সঙ্গে রাজকবির দেখা হলো। সে সময় কবির মলিন বেশ, অবস্থাও রীতিমত 'দুস্থ'। কবি আনসারীর অপর দুই কবি বন্ধু ছিলেন সঙ্গেই - তাঁরা হলেন কবি ফারুকী ও কবি অসজাদী।
রাজকবি আনসারী তো পাত্তাই দিলেন না ফেরদৌসীকে। ফেরদৌসী বললেন তিনিও একটু আধটু পদ্য লেখেন। তখন ওঁরা বললেন বেশ তোমাকে আমরা গ্রহণ করব, কিন্তু তার আগে একটা প্রতিযোগিতা হবে। এই প্রতিযোগিতায় যদি তুমি জেতো তা'হলেই যথার্থ কবি হিসেবে তোমায় স্বীকৃতি দেব।
ফেরদৌসী সম্মত হলে আনসারী বললেন- আমরা পর পর তিনজন তিনটি লাইন বলবো মিলিয়ে তোমাকে তার সঙ্গে ভাবগত মিল রেখে চতুর্থ লাইনটি বলতে হবে এবং অবশ্যই মিল থাকতে হবে। ফারসি ভাষায় অন্তে 'শন' দিয়ে শব্দ পাওয়া খুব কঠিন।
তবু, তাঁরা ফেরদৌসীকে নাকাল করতে তিনজন পরপর 'শন' দিয়ে পংক্তি রচনা করলেন।
আনসারী – তু আরে যে মাহ না বাসাদ রওশান
অসজাদী – মানান্দে রাখত ওলনা বুয়াদ দর গুলশান ফারুকী - মেজগানাত হামী গোষার কুনাদ আয জওশান
কবি ফেরদৌসী সঙ্গে-সঙ্গে মিলিয়ে বললেন – মানান্দ সিনানে গেও দরজঙ্গে পুশান।
তোমার মুখের মতো চাঁদও নয় সুন্দর তত সুন্দর নয়
বুঝি বাগানের গোলাপ যত।
চাহনি তোমার শরীর ছিন্ন করে
বুঝি পুশনের যুদ্ধে গে ওই বর্ণা ছোঁড়ে।
কবিতা যুদ্ধে বিজয়ী দীন হীন মলিন বেশের কবি ফেরদৌসীকে তাঁরা মেনে নিলেন বন্ধু হিসেবে।
এরপর সুলতানের সঙ্গে পরিচয় এবং সুলতান মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বলেন ইরানের রাজকাহিনী ও বীরত্বগাথা লিখতে। এরজন্য তাঁকে দেওয়া হলো রাজবংশের তথ্য ও চিত্রসমৃদ্ধ একটি আবাসগৃহ। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক নিঃস্ব কবির কাছে এ-অতি দুর্লভ সম্মান।
এই বইয়ের সারবস্তু সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লেখক বলছেন, "THE ANT’S GIFT is an inquiry into a few of the concepts essential to the Shahnameh, divided into five chapters: Time, Creation, History, Sovereignty, and Speech.
Time is first and last, it is the bringer and bearer away of things and the hidden thread which links these chapters together. In some mythologies time existed even before Creation, and in others it is the first thing to be created.
History is the story of man’s past in time.
Sovereignty is the management of the wheel of time in the world, according to the way of heaven.
And finally Speech is the means by which the poet is able to escape from the destructive trap of time, the way in which he dies without dying. Why is it that Ferdowsi says that after death “I shall not die, since I am alive”?"
ফেরদৌসীর শাহনামায় লুকিয়ে আছে চার হাজার বছরের ইরানের কথা কিংবদন্তী, লোক বিশ্বাস এবং ইতিহাস। এই অমর মহাকাব্যে ঊনচল্লিশজন রাজা, শতাধিক বীর এবং সহস্রাধিক মানব-মানবীর কথা বিবৃত হয়েছে। ফেরদৌসী প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ইতিহাসের পরিচিত কাল অবধি প্রায় চার হাজার বছরের ইরান, তুরানের বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য পরিচয় এখানে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
অরণ্য থেকে আগত ইরানের রাজবংশ কেয়ানি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট কায়ুমুরসের রাজত্ব কাল থেকে সম্রাট কায়কোবাদের পুত্র সম্রাট কায়কাউসের রাজত্বকাল অবধি সুবিশাল কাহিনীর সামান্য অংশই শাহনামা'র এই গ্রন্থে পরিবেশিত হয়েছে। এতে আছে ইরানের মহাবীর রুস্তমের বীর্যবত্তার সামগ্রিক পরিচয়।
সম্রাট কায়কাউসের পুত্র সিয়াউস তৎপুত্র কারখসরু থেকে পরবর্তী চার/সাড়ে চারশো বছরের কাহিনী এই 'শাহনামা'য় নেই। ইরানি বীরবৃন্দ নুরীমান, সাম, জাল রুস্তম, কারেন, কোবাদ, কুশওয়াদ, গুস্তাহাম, গোদরেজ, তুস, ফরহাদ, বাহরাম, মিলাদ প্রভৃতির কথা যেমন জানতে পারি, তেমনি ইরানের চিরশত্রু তুরানের বীরবৃন্দ আগ্রিস, অফ্রাসিয়ার, পিশঙ্গ, সোহরাব, হুমানদের কথাও জেনে নিই।
এই 'শাহনামা'য় নারী চরিত্র সমুহের ভেতর আফ্রিদ, আরজু, আরনওয়াজ, তহমিনা, ফারানক, মাহআজাদা, মাহআফরিদ, রুদাবা, প্রভৃতির স্নেহ, প্রেম, অনুরাগ, ছলনা, ঈর্ষার কথা সুন্দর ভাবে পরিবেশিত হয়েছে। এই মহৎ কাব্যে সম্রাটবৃন্দ, বীরবৃন্দ ছাড়াও এসেছে বিশিষ্ট মানুষ, প্রাণী ছাড়াও দৈত্য-দানব, বিভিন্ন স্থান ও নদীর পরিচয়। বাস্তবের পাশাপাশি অবাস্তব, স্বর্গের পাশাপাশি নরক, লৌকিকের পাশাপাশি অলৌকিক জগত 'শাহনামা'য় ফুটে উঠেছে।
এই বইয়ের লেখক বলছেন, "The work of a poet like Ferdowsi is the creation of a new manifestation, a new perspective and aesthetic, the discovery of what is undiscovered; not, for example, the repetitive versification of a royal chronicle, forgotten myths, stories mixed up with legends, and bits of history.
In one way his work is the “discovery” of inward, unconscious meanings within the history of mankind and the world, and in another it is the reflection of these meanings in language that is a mirror of untarnished beauty.
And this role of the poet cannot be achieved solely with the help of “conscious” knowledge; if it could be, scholars would be poets. It is rather the poet’s “unconscious” that leads this work to its auspicious end..."
ফেরদৌসী তাঁর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এই মহাকাব্য লিখতে শুরু করেন এবং ষাটহাজার শ্লোকে এই কাব্য গাথা যখন শেষ করেন তখন তিনি পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধ। কেউ- কেউ বলে সত্তর বছর বয়স হয়েছিল।
শাহনামার কাব্যের বিষয়, সৌন্দর্য্য ও রসে মুগ্ধ হয়ে মাহমুদ বলেছিলেন, যেদিন এই অমর কাব্য শেষ হবে তিনি প্রতি চরণের জন্য কবিকে পারিশ্রমিক হিসাবে দেবেন এক-একটি স্বর্ণমুদ্রা। কিন্তু সুলতান যখন স্বর্ণমুদ্রার পরিবর্তে তাঁকে ষাটহাজার রৌপ্যমুদ্রা দিলেন, কবি হতবাক হলেন। অপমানে জর্জরিত হয়ে একটি মুদ্রাও গ্রহণ করলেন না, বিলিয়ে দিলেন সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক বা অর্জিত মুদ্রাগুলি সাধারণ মানুষের ভেতর।
এই কথা জানাজানি হয়ে যেতে অনেকেই তাঁর বিপদের কথা আঁচ করতে শুরু করে তাঁকে অবিলম্বে গজনি ত্যাগ করে চলে যেতে বলে অন্য কোথাও, কারণ মাহমুদ মনে করতে পারেন কবি ইচ্ছে করে তাঁকে অসম্মান করেছেন। ফলে তিনি ৩৫ বছর আগে যেমন দীন ভিখারী, নিঃস্ব হয়ে গজনিতে প্রবেশ করেছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই একাকী নিঃস্ব ও সামান্য হয়েই ত্যাগ করলেন সুলতানের রাজ্য।
কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন মহাকাব্য শাহনামা। সুলতানের দিরহামের চেয়ে অনেক মূল্যবান তাঁর এই শাহনামা। গজনি অতিক্রম করে বৃদ্ধ কবি পৌঁছলেন কুহেস্তান। এখানকার নৃপতি তাঁকে প্রভূত সম্মান জানালেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মহাকাব্য আগুনে পুড়িয়ে দেবেন। এ কথা শোনার পর কবিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিরস্ত করলেন কুহেস্তানের নৃপতি। বেঁচে গেল মহাকাব্য শাহনামা।
তিনি আবার যাত্রা শুরু করলেন, গিয়ে পৌঁছুলেন অবশেষে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে। বাগদাদের সুলতান তাঁকে নির্ভয়ে এই রাজ্যে বসবাসের অনুমতি দিলে কিছুদিন বাগদাদে থাকলেন। এই শহরে বসে তিনি আঠারো হাজার চরণ বিশিষ্ট আরেকটি গাথা কাব্য রচনা করেন 'ইউসুফ-জুলেখা'। সে গাথার মূল পান্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছে।
এরপর মৃত্যু আসন্ন মনে করে তিনি ফিরে গেলেন নিজের জন্মভূমি তুস নগরীতে। এবং এই তুস নগরীর প্রান্তসীমায় যে রজান গ্রাম সেই গ্রামে পৌঁছে তিনি মারা গেলেন। তখন তাঁর বয়স প্রায় আশি বছর। ১০২০ খ্রিষ্টাব্দ।
এক রক্ষণশীল মৌলবী ফেরদৌসীকে কিছুতেই কবর দিতে দেবেন না রজানের মাটিতে। কারণ তিনি মোতাজেলা ও রাফেজি পন্থী শিয়া মুসলমান। কিন্তু সেদিন রাতে মৌলবী সাহেব স্বপ্নে দেখলেন মহাকবি ফেরদৌসী পৌঁছে গেছেন স্বর্গে। মৌলবী তাঁকে প্রশ্ন করলেন—এই স্বর্গে রাফেজি (বিধর্মী) হয়ে আপনি কি ভাবে এলেন ?
— কেন শাহন���মা লিখে। শাহনামায় যেতাম আমি ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ বলিনি, তেমন ধর্মে ধর্মে বিরোধও করিনি। স্রষ্টার অদ্বিতীয় সত্তা আমি হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করি। ওপরে নিচে সব জায়গায়ই তিনি। তিনি আমার উপাস্য। তাঁর ভালবাসা লাভ করে আমি এসেছি চিরসুন্দর এই ফেরদৌসে-ফিরদৌসী হয়ে।
মৌলবীর ঘুম ভেঙে গেল। নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি রজানে চিরনিদ্রায় রত কবির কবর খুঁড়তে আর আপত্তি করেন নি।
শুয়ে আছেন প্রায় ১০০০ বছর রজানের গোরস্থানে কবি ফেরদৌসী। সে কবর আজ তীর্থভূমি। হাজার হাজার মানুষ প্রায় প্রতিদিন এই সমাধিক্ষেত্রে গিয়ে তাঁর কবর ছুঁয়ে আসে। কবির আত্মার সদ্গতি ও শান্তি কামনা করে।
কবির মরদেহ শায়িত হবার কিছুদিন পর যুদ্ধবাজ উন্মাদ সুলতান মাহমুদ ভারত লুণ্ঠন করে ফিরে এসেছেন। একদিন তাঁর উজির বা মন্ত্রীর মুখে একটি চমৎকার শাহেরী শুনলেন। তিনি জিগ্যেস করলেন—এমন সুন্দর শাহেরী কে লিখেছেন? মন্ত্রী বললেন— ফেরদৌসী। যে কবি বুক ভরা বেদনা নিয়ে আমাদের গজনি ছেড়ে বাগদাদ চলে গেছেন।
সুলতান কয়েক বছর গজনি ছেড়ে হিন্দুস্থানে মৃত্যুলীলা সংঘটিত করতে ব্যস্ত থেকেছেন। এ সব তাঁর জানার কথা নয়। তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ দূত পাঠালেন বাগদাদে কবিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। দূত ফিরে এলো। মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গে ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দূত সহ কয়েকজন অনুচরবৃন্দকে তুস নগরীতে পাঠালেন। কথিত আছে ফেরদৌসীর মরদেহ যখন নগরীর একটি দ্বার দিয়ে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছে অন্য দ্বার দিয়ে ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে প্রবেশ করছে সুলতানের অনুচরবৃন্দ।
কবির কন্যাকে মাহমুদের অনুচরেরা সেই উপটৌকন উপহার দিতে চাইলেন কবির কণ্যা সেই দান গ্রহণে অস্বীকার করেছিলেন। শোনা যায়, কবির কণ্যা বলেছিলেন—শাহনামার স্রষ্টা অনেক মহৎ অনেক বড়ো, সুলতানের এই সামান্য অর্থের তাঁর আর প্রয়োজন নেই। যেদিন প্রয়োজন ছিল সেদিন দিতে কুষ্ঠিত হয়েছিলেন কেন? যে অর্থ তাঁর বাবার কোন কাজে লাগেনি, সেই অথ তিনি স্পর্শ করেও দেখতে চান না।
ইতিহাসে নিন্দিত হয়ে রয়ে গিয়েছেন মাহমুদ। চিরনন্দিত হয়ে রয়ে গিয়েছে শাহনামা।
এই বইয়ের লেখক লিখছেন, "The aim of this endeavor is more that we see today—in this time and place in which we find ourselves—what can be gathered from the Shahnameh. The Ant’s Gift is mainly an attempt to use the advantages of what is now known in order to find the “unknowns” of that time, and to look into the poet’s unconscious, in the belief that this viewpoint will allow us to see the existence of the poem and the poet in a fresh light. The discussion is concerned with what we as modern-day readers can understand from the work of a poet from the past. In addition to the scientific researches of scholars of history and literature in order to understand the poem and its poet and his conscious knowledge, how can we salvage the testimony of his heart and his inner vision, “that which cannot be discovered”? How can his unconscious be our consciousness.."
তিনি শেষ করছেন এই বলে, "Until now the Shahnameh has been considered and studied mainly as a literary, historical, and national masterpiece, and also as a treasury of wisdom and prudent advice.
Perhaps it is now time that, along with the success of these numerous and very valuable achievements, the Shahnameh should be considered in the way that Ferdowsi himself thought of “history,” or for example in the way that Sohravardi considered the theory of sovereignty, or Hedayat considered Khayyam, and in his “Kafka’s Message” our own times.
Instructive examples of this kind (especially in the way Western scholars have reflected on their own literature) are not rare. But to think in this way requires bravery, not in the sense of fearlessness, of being negligent or ignorant of fear, but in the sense of conquering fear, of experiencing it and then emerging from its grip..."
এই ২০২২ সালে এসেও আমরা মানবিক শক্তির প্রতি অসীম-মমতা, মানব-মানবীর হৃদয়বৃত্তির ওপর বিপুল ভালবাসা, অখন্ড জীবন দর্শন ও নৈতিক বিশ্বাসের ওপর শ্রদ্ধাশীল এক মহাকবির কাব্য পাঠ করে পরিতৃপ্ত হই। গ্রীসের যেমন ইলিয়াড ও ওডেসী, এই সনাতন ভূমির যেমন রামায়ণ ও মহাভারত, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে তেমনিই 'শাহনামা' এক মহত্তম মহাকাব্য।
সেই শাহনামা ও তার অমর স্রষ্টা কবির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানিয়ে লেখা এই বই।
পড়তে পারেন। ভালো লাগবে।