বাঁধন-হারা : এক কাব্যিক বিদ্রোহের উপন্যাস
"আজ আমি নজরুল হয়ে উঠি। আজ আমি বাঁধনহারা হই।"
কাজী সাহেবের ‘বাঁধন-হারা’ কোনও সাধারণ উপন্যাস নয়—এ এক চিঠির অক্ষরে লেখা সাহসের সংগীত, প্রেমের মুক্তি-সংবাদ, আর বিদ্রোহের প্রারম্ভিকা। একে বলা যায়—একটি পূর্বাভাষ, যেখানে নজরুল তাঁর কাব্যের ভাষায় গদ্যকে রাঙিয়ে তুলেছেন, আর যেখানে পাঠকের মনে বারবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন—বন্ধন কি শুধু বাহ্যিক? না কি মনের মধ্যে সবচেয়ে গভীর শৃঙ্খল পোঁতা থাকে?
‘বাঁধন-হারা’ রচিত হয়েছে পত্রোপন্যাসের ছাঁদে, যা বাংলা সাহিত্যে তখনও অভিনব। পত্রের ভেতর দিয়ে চরিত্ররা একে অপরের হৃদয়ের নিকটবর্তী হয়, আবার কখনো পত্রের দীর্ঘশ্বাসে লুকিয়ে থাকে এক গভীর শূন্যতা।
এই আঙ্গিক নজরুলের কবিসত্তাকে আরও উন্মুক্ত করেছে। তাঁর কাব্যিকতা, অনুভবের ঘনত্ব, ভাষার তীব্রতা—সবই যেন পত্রের ছত্রে ছত্রে জ্বলজ্বলে।
চলুন একটু চরিত্রের জ্যোৎস্না ও আঁধারের সঙ্গে পরিচিত হয়:
নুরু—এক বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত যুবক, যে সেনাবাহিনীতে পালিয়ে যায়; দেশপ্রেম নয়, বরং বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তার চালিকা শক্তি। সে প্রেম চায়, দায়িত্ব নয়। তার মধ্য দিয়ে নজরুল যেন দেখাতে চান—সচরাচর ‘নায়ক’ ভাবার মতো পুরুষ সব সময় সত্যিকারের নায়ক হয় না।
মাহবুবা—নামেই যার ‘প্রিয়তা’, সে হয়ে ওঠে এক চিঠির পাতায় প্রতীক্ষার প্রতিমা। তার অভিমান, তার নিঃসঙ্গতা—সবই রক্তে লেখা।
সাহসিকা—এই উপন্যাসের হিডেন হিরো। নামেই তার পরিচয়: সাহস। চিরকুমারী এই চরিত্র নারীর অধিকার, প্রতিবাদ ও আত্মসম্মানকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। সাহসিকা যেন নজরুলের কল্পনার এক আধুনিক বেগম রোকেয়া, যার মুখে তিনি নিজস্ব বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর বসিয়েছেন।
‘বাঁধন-হারা’ শুধু প্রেমের উপন্যাস নয়—এ এক নারীর স্বাধীনচেতা আত্মার আহ্বান। সাহসিকার চরিত্রের মাধ্যমে নজরুল যা বলেন, তা শুধু সাহিত্যে নয়, সমাজেও এক বিপ্লব ঘটায়।
এক চিরকুমারী নারী নিজের ইচ্ছায়, নিজের যুক্তিতে বাঁচবে—এই ভাবনাই ছিল তৎকালীন সমাজে 'অশ্রাব্য'। নজরুল তা সাহিত্যে আনলেন, তাও কবির কলমে, একেবারে ঘ্রাণে-কুসুমে মেখে।
নজরুলের ভাষা এখানে নদীর মতো—একবার গীতধ্বনিতে মৃদু, আবার কখনো দুর্দান্ত স্রোতের মতো ব্যথাবেগে প্লাবিত। তিনি কবির মতো লিখেছেন গদ্য, কিন্তু সেই গদ্যের প্রতিটি বাক্যে যেন ঝরে পড়েছে ছন্দ, চিত্রকল্প, কল্পনার বিস্ময়।
“আমার হৃদয়টা আজ যেন শূন্য। ভালোবাসা যেমন হঠাৎ ভরে যায়, তেমনি হঠাৎ ফাঁকাও হয়ে যায়।”
— এমন বাক্য চোখে পড়লে, মনে হয়, নজরুল আসলে গদ্যে কবিতা লিখেছেন।
১৯২১ সাল—উপনিবেশিক শাসনের যুগ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা, নারী-পুরুষের সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞায়ন। এই সময়েই নজরুল লিখলেন ‘বাঁধন-হারা’।
এটি কোনও যুদ্ধজয়ের কাহিনি নয়, বরং আত্মযুদ্ধের দলিল। যেখানে মুক্তি শুধু বাহ্যিক নয়—ভেতরের শৃঙ্খল ভাঙার ডাকও বয়ে আনে।
এই উপন্যাসের শেষে পাঠক এক বিষণ্নতা নিয়ে ফেরে। কারণ ‘বাঁধন’টা যেন আমাদেরও—আমাদের মন, সমাজ, চিন্তা, ভালোবাসার ধারায়। আর নজরুল সেই বাঁধনটাকে চিঠি চিঠি ছিঁড়ে দিয়ে বলেন—ভালোবাসো, কিন্তু নিজের মতো করে। প্রতিবাদ করো, কিন্তু স্নেহের সুরে।
শেষে এটুকুই বলার থাকে যে ‘বাঁধন-হারা’ এক নবীন কণ্ঠস্বরের প্রথম আত্মপ্রকাশ—যা তখনও বিদ্রোহী কবি হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তার ভিত গড়ছে।
এই উপন্যাসে নজরুল একজন প্রেমিক, একজন দার্শনিক, একজন পুরুষতন্ত্র ভাঙা কবি, এবং সর্বোপরি একজন মুক্ত মানব হয়ে ওঠেন।
তাঁর এই প্রথম উপন্যাস পড়ে মনে হয়—"বিদ্রোহ শুরু হয় প্রেম থেকে। প্রেম যেখানে বাঁধনহীন, সেখানেই তো মুক্তি।"
গতকাল বিদ্রোহীর জন্মদিন গেল। আজ বইয়ের ধুলো ছাড়িয়ে আবার বলি— "বাঁধন-হারা পড়ুন । হৃদয়টাকে একটু খুলে দিন ।"