খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ রয়েছে অনেকেরই। ‘যীশু’ বা ‘ঈসা’ নামটির ব্যুৎপত্তি কী? ঈসা (আঃ) বা যীশুর জন্ম, জীবন ও ধর্মপ্রচার নিয়ে ইহুদী, খ্রিস্টীয় ও ইসলামি সূত্রগুলোতে কী কী বলা রয়েছে? যীশু খ্রিস্টের জন্মস্থান হিসেবে বেথেলহেমের উল্লেখ কি ইসলামে আছে? বেথেলহেমের নক্ষত্র কী? যীশুর জন্মের সময় তৎকালীন রোমান রাজনৈতিক অবস্থা কী ছিল? মেরি ম্যাগডালিন কে ছিলেন? যীশুর কোনো পরিবার ছিল? ইহুদী ধর্মগুরুদের কী কী দুর্নীতি ফাঁস করে দিয়েছিলেন যীশু? পথের কাঁটা দূর করতে ইহুদীরা কীভাবে রোমানদেরকে রাজি করালো যীশুর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়ার ব্যাপারে? ভার্জিন মেরির ব্যাপারে তিন ধর্মের কোথায় কী বলা আছে? পবিত্র ভূমির বেথেলহেম, নাজারেথ, জেরুজালেম ছাড়িয়ে সুদূর সেই রোম নগরীতে কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো নতুন এ ধর্ম? প্রাথমিক খ্রিস্টানদের সাথে বর্তমান খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের পার্থক্য রয়েছে? ‘ট্রিনিটি’ বিশ্বাস এলো কবে ও কীভাবে? ৩২৫ সালের কাউন্সিল অফ নাইসিয়াই কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিল? বাইবেলের ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্ট বা গসপেলগুলো বাছাই হলো কীভাবে? হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর সময় আরবের সেই খ্রিস্টানরা কোন উপদলের ছিল? সেইন্ট পিটার আর সেইন্ট পল কীভাবে মারা যান? সেইন্ট পল খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কী কী অবদান রেখেছিলেন? সম্রাট কনস্ট্যান্টিন কী করেছিলেন? যে পৌত্তলিক রোমান সাম্রাজ্য নির্যাতন চালাতো খ্রিস্টানদের ওপর, তাদের রাজধর্ম হয়ে দাঁড়ালো খ্রিস্টধর্ম; কীভাবে? চার্চের যাত্রা কীভাবে শুরু? খ্রিস্টধর্মের প্রতীক কি শুরু থেকেই ক্রুশ? ইসলামের আবির্ভাবের পর কীভাবে পরাক্রমশালী খ্রিস্টান বাইজান্টিন সাম্রাজ্য কোণঠাসা হতে শুরু করলো? ইথিওপিয়ার নাজ্জাশী কে ছিলেন, আবিসিনিয়ার সেই খ্রিস্টানদের ব্যাপারে বাইজান্টিন ইতিহাস কী বলে? বাইজান্টিনদের পতন হয় কীভাবে? রোম আর কনস্ট্যান্টিনোপল আলাদা হলো কেন? গসপেল অফ বারনাবাস নিয়ে এত জিজ্ঞাসা ও কৌতূহল কেন? ক্রুসেড কেন হলো? ক্যাথলিক কী, প্রটেস্ট্যান্ট কী, ইস্টার্ন অর্থডক্স কী- খ্রিস্টানদের ভাগ-উপবিভাগগুলো কীভাবে হলো? কনস্ট্যান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া কীভাবে খ্রিস্টানদের হাতে এসেছিল? সেভেন স্লিপারস বা কুরআনের ‘আসহাবে কাহাফ’ ঐতিহাসিক কোন রোমান সম্রাটের সময়ে? কেন ইহুদীরা সেই কিংবদন্তী নিয়ে আগ্রহী ছিল? মূলধারার ইতিহাসে যীশুর ব্যাপারে কী কী জানা যায়? হোলি গ্রেইল মিথ কীভাবে এলো? যীশুর রক্তের জন্য যে ইহুদীদেরকে আজীবন দায়ী করে এসেছে খ্রিস্টানরা, তাদের সাথেই এখন কী করে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হলো কী করে? ইভানজেলিস্ট খ্রিস্টানরা কেন ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকে? খ্রিস্টীয় মিশনারি কর্মকাণ্ডের ইতিহাস কী? ‘শেষ সময়’ সম্পর্কে খ্রিস্টধর্মের ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে অন্যান্য ধর্মের ভবিষ্যদ্বাণী কি মিলে যায়?
এগুলো হাতে গোনা কয়েকটি প্রশ্ন মাত্র। প্রশ্নের কি আর শেষ আছে? এর উত্তর দিতে গিয়ে আমাকে শুরু করতে হয়েছে যীশু খ্রিস্ট বা ঈসা (আ)-এর জন্মেরও কয়েকশো বছর আগে থেকে। খ্রিস্টধর্মের আদি-অন্ত ইতিহাস আমার নিজের ভাষায় পাঠকদের জন্য সহজ করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এই ‘বেথেলহেমের নক্ষত্র: খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস’ বইয়ে। পাঠক আশা করি হতাশ হবেন না!
Born in Bangladesh, Abdullah Ibn Mahmud passed his childhood in Dubai, the UAE, the tourists' heaven. Returning to his home country, he passed his intermediate from Science department in 2011 from Notre Dame College, Dhaka. After that, he started his B.Sc. in the top-most engineering university of the country, BUET (Bangladesh University of Engineering & Technology) in Electrical & Electronic Engineering (EEE). After obtaining B.Sc., he went on to pursue MBA in 2017 and finished the degree from the highest academic institution in the business line, IBA of Dhaka University.
He started his writing career during his undergrad life and earned huge popularity through his historical writings published in the Bangla version of the popular analyst platform of South Asia, Roar Global. His writings on Roar Bangla have accumulated over 3.6 million readers in the last two years alone.
Abdullah loves to read and impart knowledge to those who like easy-reads. He is one of the pioneers of the country who popularized the reading of non-fiction or history-based contents. His favorite topics include- myths, theological history, tech, and he totally adores Dan Brown & J. K. Rowling, having grown up reading their fictions, but making a career of non-fiction, mostly. His published works now total up to 6, with quite a few in the pipeline, including approved translation works.
শৈশবের গোড়ার ছয়টি বছর কেটেছে আরব আমিরাতের দুবাইতে। ২০১১ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পাশ করে আন্ডারগ্র্যাড শুরু করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎকৌশল বিভাগে। ২০১৭ সালে বুয়েট থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-তে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
ভার্চুয়াল জগতে লেখালেখির সূচনা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঢোকার পর থেকে। বুয়েটে শেষ বর্ষে থাকাকালীন লেখা শুরু করেন রোর বাংলা প্ল্যাটফর্মে, যেখানে জনপ্রিয়তা পায় তার শতাধিক ফিচার, তার লেখাগুলো পঠিত হয় সাম্প্রতিক সময়েই প্রায় ৩৬ লক্ষ বার। ভালোবাসেন নতুন কিছু জানতে এবং জানাতে; প্রযুক্তি আর ফিকশন ছাড়াও পছন্দের বিষয়- বৈশ্বিক ইতিহাস, মিথ এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব।
প্রকাশিত নন্দিত বইগুলোর মাঝে আছে- ইহুদী জাতির ইতিহাস, অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে, এলিরিন, দ্য প্রফেট, সিক্রেট মিশনস, ইত্যাদি।
শুরুতে বলে নেই, বিশাল বইয়ের রিভিউটাও বেশ বড় আকারের হতে যাচ্ছে। তবে এটা যতটা না রিভিউ, তারচেয়ে বেশী আসলে বইটির সারসংক্ষেপ বলা যায়। বই যেভাবে লেখা হয়েছে সেভাবেই কোন অধ্যায়ে কি ধরণের কন্টেন্ট আছে আর সেগুলো আমার কেমন লেগেছে সেই অনুসারে সাজিয়েছি এই পাঠ প্রতিক্রিয়াটি। চাইলে ধৈর্য ধরে পুরো পোস্টটা পড়তে পারেন, কিংবা পারেন স্রেফ নিজের আগ্রহের অংশটুকু পড়তে। তাহলে শুরু করা যাক,
যীশু খ্রিস্টের সময়ে রোমান সম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি
খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসের শুরু করতে হয় যীশুর জন্ম থেকে। তবে সেই সাথে জানা প্রয়োজন যীশুর জন্মের সময় তৎকালীন জেরুজালেমের রাজনৈতিক পরিস্থিতিটাও। আর তাই বইয়ের শুরুটা হয়েছে যীশু খ্রিস্টের পরিচয়, যীশু এবং খ্রিস্ট নামের উৎপত্তি ও ব্যাখ্যা, এবং সে সময়কার জেরুজালেমে বাস করা ইহুদী ও রোমান সম্রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বর্ণনা দিয়ে। সে বর্ণনায় স্বল্প আকারে উঠে এসেছে রাজা হেরোদ, সেলুসিদ সম্রাজ্য, হাসমোনিয়ান সম্রাজ্য সহ অনেক কিছুই। যার বেশীরভাগ আমার লেখকের আগের বই ইহুদী জাতির ইতিহাসে পড়া ছিল। তবুও নতুন করে পড়তে ভালো লেগেছে। কারন লেখক পাঠককে সে সময়কার পরিস্থিতি বুঝানোর জন্য লিখলেও তা খুব অল্প কথাতেই শেষ করেছেন। এছাড়াও ছিল সেই তথাকথিত ফলস মেসায়া বা খ্রিস্ট দের কথাও। এই অধ্যায়টা বেশ মনযোগ দিয়ে পড়া প্রয়োজন, যীশুর ক্রুশবিদ্ধকরণের ব্যাপারে ভালোভাবে বুঝার জন্য।
যীশুর জন্ম ও বেড়ে উঠা
ধরণীতে এলেন ঈসা (আ:) তথা যীশু। বাইবেলের লুক এবং ম্যাথিউ শুধুমাত্র এই দুই গসপেলেই এসেছে যীশুর জন্ম গাঁথা। তবে দুই গসপেলের বর্ণনায় রয়েছে বেশকিছু মৌলিক পার্থক্য। যে কারনে যীশুর জন্ম সময়কার ঘটনা নিয়ে আজও রয়ে গিয়েছে অনেক প্রশ্ন। যীশু যেহেতু ইসলাম ধর্মেরও একজন নবী। তাই এক্ষেত্রে ইসলামিক (কোরআনের আয়াত এবং তাফসির অনুসারে) রেফারেন্সও এনেছেন লেখক। সবটা পড়ে আমার মনে হলো ইসলামিক বর্ণনার সাথে লুকের গসপেলের কিছুটা সাজুয্য রয়েছে। এই অংশে রয়েছে বিখ্যাত সেই তিন জ্ঞানী ব্যক্তি তথা ম্যাজাইদের কথা, যারা যীশুর জন্মের সাথে সাথে এক নক্ষত্রের দেখানো পথ ধরে যীশুর সাথে এসে দেখা করে তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। বেথেলহেমের নক্ষত্রের কিছু এক্সপ্লেনেশনও রয়েছে এখানে। এছাড়া ক্রিস্টমাস কীভাবে শুরু হলো সে বৃত্তান্ত আর সান্তা ক্লসের ইতিহাসও এখানেই জানতে পারবেন পাঠক। ইহুদী বিশ্বাসমতেও যীশুর কথা উঠে এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। 'ইবনুল্লাহ' তথা আল্লাহর পুত্র কথাটা হিব্রু বাইবেলে আলংকারিক হিসাবে ব্যবহৃত হলেও, পরবর্তীতে ভাষান্তরের কারনে সেটাই হয়ে যায় আক্ষরিক। আর এ কারনে অতি স্বাভাবিকভাবেই ইহুদী মতে যীশু আসলে একজন ভন্ড, খলনায়ক। কারন তারা মনে করে মাবুদ তথা আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। এই পর্বটা এক কথায় দারুণ লেগেছে। আগে শোনা তত্ত্বগুলোই লেখক বিভিন্নভাবে অনেক রেফারেন্স সহকারে বিশদ বর্ণনাসহ ব্যাখ্যা করেছেন। এক কথায় দূর্দান্ত।
তবে একটা ব্যাপার অবাক লাগলো আমার। এমন একজন মানুষ যে কি না জন্মের পর পরই কথা বলেছে বলে কোরআন এবং বাইবেলে উল্লেখ আছে। তার শৈশব কৈশোর সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্যই নেই!! নাই বাইবেলে, না ইহুদী সমাজে, এমনকি নেই পবিত্র কোরআনেও। ১০-২০ বছরের মাঝের সময়টায় যীশু যেন গায়েব!! এটা খুবই অদ্ভুত আসলে!
বাইবেলের বিস্তারিত
বাইবেল, গসপেল, ওল্ড টেস্টামেন্ট - নিউ টেস্টামেন্টের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এরপর। একদম শর্টকাটে বললে খ্রিস্টধর্ম আবির্ভাবের পূর্বে ইহুদীদের প্রাচীন পুস্তিকা (জেনেসিস, এক্সোডাস প্রমুখ) সংকলনকে বলা হয় ওল্ড টেস্টামেন্ট আর এর পরের গসপেল তথা সুসমাচার এবং অন্যান্য চিঠির সংকলনকে বলা হয় নিউ টেস্টামেন্ট। আর এই দুই টেস্টামেন্টের সংকলনই হলো বাইবেল। তবে ব্যাপারটা এতোটাও সাদামাটা নয়, এখানে আরো কিছু বিষয় জানার রয়েছে। যা জানা যাবে বইটা পড়লে।
নিউ টেস্টামেন্টের ৪টি গসপেল নিয়ে সাজানো হয়েছে বইয়ের এরপরের বেশ বড় একটা অংশ। গসপেল অফ লুক, জন, ম্যাথিউ ও মার্ক যে আদতে তারা নিজেরা লিখেনই নাই সেটা জেনে অবাক হয়েছি। গসপেলগুলো আলাদা আলাদা পড়তে হলেও, লেখক এখানে দারুণ কাজ করেছেন সবগুলো গসপেলকে টাইমলাইনের ক্রমানুসারে একের পর এক সাজিয়ে। গসপেলগুলো থেকে সে সময়কার যীশুর অলৌকিক কর্মকান্ড, ঈশ্বরের বানীর প্রচার এবং ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়। তবে অবশ্যই খ্রিস্টধর্মের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। একজন মুসলিম হিসেবে গসপেলগুলো পড়ে আমার যীশুকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ চরিত্র মনে হয়েছে। অন্তত নবীদের ব্যাপারে আমার যতটুকু পড়াশুনা তার সাথে যীশুর মিল খুব একটা পাই না। উনাকে আমি আমাদের নবী হিসেবে পড়েছি বলেই হয়তো এমনটা মনে হয়েছে। এছাড়া গসপেলগুলো পড়তেও ভীষণ ক্লান্তিকর মনে হয়েছে। প্রায় সিমিলার ঘটনাই উঠে এসেছে বারংবার। ভাষার ব্যবহারও একইরকম। জানি এটা উপন্যাস নয়, তবুও...
উপরের প্যারায় আমার কোনো মন্তব্যে খ্রিস্টধর্মের কারো মনে আঘাত লাগলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
এরপর যীশুকে ইসলাম ধর্ম অনুসারে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। কোরআনের আয়াত ও তাফসির অনুসারে ঈসা (আঃ) এর বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়াও আরো কিছু রেফারেন্স এনেছেন লেখক। যাতে করে দুই ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে যীশু তথা ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে একটা পরিপূর্ণ ধারণা পেয়ে যাবেন পাঠক। ঈসা (আঃ) আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। খোদ বাইবেলের কিছু ভার্সকে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন ইসলামী স্কলাররা। পড়তে দারুণ লেগেছে এই অংশটুকু। কিছু তত্ত্ব লেখক উল্লেখ করেছেন আবার নিজেই তা খন্ডনও করেছেন। কি পরিমান ঘাটাঘাটি আর পড়াশুনা করে লেখক বইটি লিখেছেন তার একটা ধারণা পেয়ে যাবেন পাঠক এখানে।
গসপেল অফ বারনাবাস!
গসপেল অফ বারনাবাস সম্পর্কে আমার জানাই ছিল না। আর তাই সেটা সম্পর্কে শুনে এবং পড়তে গিয়ে ভীষণ অবাক হয়েছি। একটা গসপেল আছে যার লেখক দাবী করছেন তিনি নিজেই ছিলেন যীশুর সেই ১২ শিষ্যের একজন। সেই গসপেল আবার অনেকটাই মিলে যায় ইসলামী বিশ্বাসের সাথে! এই গসপেল অনুসারে যীশুর কর্মকান্ড এবং ক্রুশবিদ্ধকরণের ব্যাপার স্যাপার গুলো প্রায় পুরোটাই ইসলামে আমরা যা জেনেছি তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই গসপেলের যীশুকে অতোটা ঔদ্ধত্যপূর্ণও মনে হয় না। বেশ আগ্রহোদ্দীপক লাগলেও, গসপেলটা পড়ার সময়েই মনে হচ্ছিল কিছু একটা গন্ডগোল আছে!! এবং লেখক পরবর্তীতে যুক্তি সহকারেই প্রমাণ করেছেন যে গসপেলটা আসলেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। সেইসব যুক্তি অনুসারে বুঝা যায় যে গসপেলটা লিখা হয়েছিল ১৩০০- ১৩৫০ সালের মধ্যে।
আর এখানে এসেই আমার মনে একটা প্রশ্ন তৈরী হয়, ১৬০০ সালের দিকে খুঁজে পাওয়া গসপেলটা না হয় জাল গসপেল। কিন্তু সেক্ষেত্রে এই গসপেলটা ৩৮২, ৪৬৫ এবং ৪৯৬ সালে মোট ৩ বার কেন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল? তখন তো এমনকি ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবও ঘটেনি। এছাড়া ১৯০৭ সালেই বা কেন এর ইংরেজি অনুবাদের ভার্সনটি রহস্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়? ১৬০০ সালের দিকে খুঁজে পাওয়া ভার্সনটার সাথে এর আরামায়িক ভাষায় লিখিত আদি এবং হারিয়ে যাওয়া ভার্সনটার কী কী তফাৎ ছিল তা সম্ভবত আর কোনোদিনই জানা হবে না। সেই গসপেলটা খুঁজে পেলে হয়তো অনেক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেত, কিংবা শুরু থেকে ��েই গসপেলটাকে টিকে থাকতে দিলে হয়তো আজ খ্রিস্টধর্মের কিছু বিশ্বাসও অনেকটাই বদলে যেত (একান্তই ব্যক্তিগত ধারণা)।
যীশুর পর খ্রিস্টধর্মের প্রচার প্রসার
যীশুর প্রস্থানের পর খ্রিস্টধর্মের বিস্তার কীভাবে হয়েছিল, কখন থেকে ইহুদী থেকে আলাদা হয়ে 'খ্রিস্টান' নাম দেয়া হলো, কি কারনে ইহুদীদের বাইরের লোকদের কাছেও যীশুর বানী পৌছে দেয়ার ধারা শুরু হলো, সেইন্ট পল এবং সেইন্ট পিটার কেন জেরুজালেম থেকে রোমে এসেছিলেন? এ সকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে এই অধ্যায়ে। একইসাথে সম্রাট নিরোর শাসনামল আর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও উঠে এসেছে বেশ কিছু আলোচনা। রোমের সেই বিখ্যাত আগুনের সাথে খ্রিস্টধর্মের যোগাযোগর ব্যাপারটাও এসেছে এখানে। সেইন্ট পল এবং সেইন্ট পিটারের ধর্মপ্রচার, তাদের মৃত্যু আর সেই মৃত্যু থেকে চার্চ নির্মানের প্রক্রিয়া অনেক কিছুই জানা যাবে এই পর্বে। সেইন্ট পলের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে আজকের খ্রিস্টান সমাজ তৈরীর পিছনে। কারন তিনিই প্রথম জেন্টাইল তথা অ-ইহুদীদের মাঝে যীশুর বানী প্রচার করা শুরু করেন। অথচ তিনি কিন্তু যীশুর সাহাবীদের কেউ ছিলেন না! এমনকি যীশু যেই সেইন্ট পিটারকে উনার ধর্ম প্রচারের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন, সেই পিটারের সাথেও পলের কিছু ব্যাপারে মতপার্থক্য ছিল। পলের সাথে বাহাস হয়েছিল বারনাবাসেরও!পুরুষের খৎনা করার মত যীশুর কিছু নির্দেশনাও ধর্ম প্রচারের স্বার্থে বদলে দিয়েছিলেন পল! মোটকথা প্রাথমিক খ্রিস্টান এবং তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে বাইবেল, ঐতিহাসিক রেফারেন্স আর বিভিন্ন তত্ত্বের সাহায্যে একটা পরিপূর্ণ ধারণা দিয়েছেন লেখক এই অধ্যায়ে।
খ্রিস্টধর্মের নীরব উত্থান
রোমের ঘটনা তো জানলাম। কিন্তু জেরুজালেম চার্চের কী হলো? সেটা জানতে গিয়ে ফিরে যেতে হলো ইহুদীদের সাথে রোমান সম্রাজ্যের যুদ্ধের সময়ে। ইতিহাসে ৩ বার ইহুদীরা রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে বলে জানা যায়। এই যুদ্ধগুলো ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল তৎকালীন গুটিকয়েক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপরেও। বিস্তৃত এই ইতিহাসের কিছু অংশ আগে পড়া ছিল, তবুও নতুন করে পড়তে ভালোই লেগেছে। এই ইতিহাসের পাশাপাশি প্যালেস্টাইনের নামকরণের ইতিহাস, খ্রিস্টানদের কাউন্সিল গঠনের কারন, ক্রুশ প্রতীক ব্যবহারের শুরু, রোমান সম্রাট কর্তৃক খ্রিস্টানদের প্রতি নিপীড়নের ইতিহাস এবং খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন উপবিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় এখানে। তবে আমার কাছে এই পর্বের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার বলে মনে হয়েছে আসহাবে কাহাফ সম্পর্কে খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের ব্যাপারে জানতে পেরে। আমি ভেবেছিলাম ৭ জন মানুষের গুহায় গিয়ে কয়েকশ বছর ঘুমিয়ে থাকার ব্যাপারটা শুধু ইসলামেই আছে।
হারানো পান্ডুলিপি, যীশুকে নিয়ে তৈরী হওয়া মিথ
আগের অধ্যায়ে প্রচুর ইতিহাস পড়তে গিয়ে পাঠকের ব্রেইনে চাপ বেশী পড়ে যেতে পারে, এমন ভাবনা থেকেই হয়তো লেখক সেখান থেকে সড়ে গিয়ে পাঠকদের নিয়ে এসেছেন হারানো পান্ডুলিপি তথা অ্যাপোক্রাইফা এবং যীশুর ব্যাপারে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন কিংবদন্তির ইতিহাসে। নস্টিক মতবাদ হতে শুরু করে মূলধারার বাইবেলে স্থান না পাওয়া অনেকগুলো গসপেলের চুম্বক অংশ নিয়ে দারুণ একটা অধ্যায় সাজিয়েছেন লেখক। বিভিন্ন বইতে টুকটাক পড়ে আসা অনেকগুলো ব্যাপার ক্লিয়ার হয়েছে এগুলো পড়ার পর। আর যীশুর পরিবার নিয়ে কিংবা যীশু ভারতবর্ষে এসেছিলেন এমনসব কিংবদন্তি নিয়ে ছোট দুটো অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনাও করা হয়েছে এরপর। সত্যি বলতে কি ইতিহাস কিংবা খ্রিস্টধর্মের কোথাও যীশুর পরিবার নিয়ে তেমন কিছুই লিখা না থাকার ব্যাপারটা জেনে আমিও একটু অবাকই হয়েছি। আর যীশু ভারতবর্ষে এসেছেন এই দাবীটা আসলে আমার কেন যেন কখনোই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। পাঠকদের জন্য দারুণ কিছু চমক রয়েছে ছোট ছোট এই অধ্যায়গুলোতে।
রেলিক!!
যীশুর রেলিক নিয়ে কিংবদন্তি কিংবা কামড়াকামড়ি কোনোটারই অভাব নেই। শ্রাউড অফ তুরিন, হোলি গ্রেইল, ভেইল অফ ভেরোনিকা, হোলি ল্যান্স, ট্রু ক্রস এগুলো নিয়ে আগে টুকটাক ফিকশনে পড়া হলেও, পরিপূর্ণ জানা হলো এই অধ্যায়ের মাধ্যমে। তবে জানা ছিল না যীশুর শিষ্য জনের যীশুর পুনরাগমনের আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার কিংবদন্তির ব্যাপারে। এরচেয়েও অবাক হয়েছি এমন একটা কিংবদন্তি ইসলামেও আছে জেনে। এই অধ্যায়ের শেষাংশে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের কাছে আমাদের সকল নবীদের ছবি থাকার কিংবদন্তিটা অবশ্য পড়া হয়েছিল লেখকেরই অন্য বইতে। সব মিলিয়ে কন্সপিরেসি লাভারদের জন্য চমৎকার অধ্যায় এটা।
সম্রাট কনস্ট্যানটাইন ও খ্রিস্টধর্মের উত্থান
অবশেষে ইহুদীদের কর্তৃক অত্যাচার ও রোমান সম্রাজ্য দ্বারা নিগৃহের শিকার হওয়া খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের সুসময় এলো সম্রাট কনস্ট্যানটাইনের হাত ধরে। তার পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রিস্টধর্ম ছড়িয়ে পড়লো গোটা রোমান সম্রাজ্য জুড়ে। নিজে মৃত্যুর আগ মুহুর্তে ব্যাপ্টাইজড হলেও, পুরো জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছেন খ্রিস্টধর্মের উন্নায়নে। তার হাত ধরেই কাউন্সিল অফ নাইসিয়ার জন্ম। খ্রিস্টানদের ধর্ম পালন নিয়ে বিভিন্ন মতানৈক্য থাকায় সবাইকে নিয়ে একটা কাউন্সিল ডাকেন সম্রাট কনস্ট্যানটাইন। এ সময়ে সবচেয়ে বড় তর্কের বিষয় ছিল মূলত ট্রিনিটির পিতা ও পুত্র নিয়ে। আরিয়ানিজমের মতে পুত্র ঈশ্বর (যীশু), পিতা ঈশ্বরের (GOD/ আল্লাহ) সমতুল্য হতে পারে না। প্রাথমিক খ্রিস্টানদের মধ্যে এমন বড় ব্যাপার ছাড়াও ছোট ছোট অনেক বিষয় নিয়েও ব্যাপক মতানৈক্য দেখা যায়। এসবের সমাধান হিসাবেই অবশেষে ট্রিনিটি মতবাদ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মমত। মজার ব্যাপার হলো মূল বাইবেলের কোথাও কিন্তু এই ট্রিনিটি (পিতা+পুত্র+পবিত্র আত্মা) বিশ্বাসের উল্লেখ নেই। এরপর অধ্যায় জুড়ে আমরা আরো কিছু খ্রিস্টিয় উপদলের ব্যাপারে জানতে পারি। কীভাবে এক ট্রিনিটি বিশ্বাসের বিভিন্ন মতবাদের কারনে তাদের মাঝে এত ভেদাভেদ হলো এই ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন লেখক।
তবে এই অধ্যায়টা নিয়ে আমার বিরাট একটা আক্ষেপ আছে। সম্রাট কনস্ট্যানটাইন কেন খ্রিস্টধর্মের প্রতি এত উদার হয়েছিলেন তার কিন্তু দারুণ একটা ইতিহাস আছে। অন্তত এই বইয়ের লেখকেরই বন্ধু গালিব বিন মোহাম্মদ ভাইয়ের এক বই থেকে আমি তেমনটাই জেনেছিলাম। সম্রাটের নিজের মায়ের খ্রিস্টান হওয়ার কারনে ছোটবেলা থেকেই খ্রিস্টধর্মের প্রতি সদয় মনোভাব ধারণ করা, ম্যাক্সিশিয়াসের যুদ্ধ করে কীভাবে তিনি সম্রাট হলেন, সেই যুদ্ধে অল্পকিছু সেনা নিয়েও বীর বিক্রমে ঝাপিয়ে পড়ার পিছনে যে তার গায়েবি এক আদেশ বা স্বপ্ন জড়িয়ে আছে তার কিছুই লেখক এখানে উল্লেখ করেননি। গায়েবি আদেশের কারনে ঢাল, তলোয়ার, ঘোড়াতে ক্রুশের চিহ্ন এঁকে দিয়েছিলেন কনস্ট্যানটাইন। আর তাই যুদ্ধে জিতে খ্রিস্টধর্মকে দিয়েছিলেন স্বীকৃতি। এই ব্যাপারটা ঐতিহাসিকভাবে যদি সত্য নাও হয়, তবুও একটা তত্ত্ব বা উপকথা তো বটেই! লেখক যেহেতু পুরো বইটাতে এমন অসংখ্য অপ্রমাণিত তত্ত্ব এনেছেন আবার খন্ডন করেছেন, কিংবা মিথ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন; তেমনিভাবে কনস্ট্যান্টাইনের এই ব্যাপারটাও অবশ্যই উল্লেখ করা উচিত ছিল বলে মনে করি। সম্রাট নিরোকে নিয়ে লেখক যতগুলো শব্দ খরচ করেছেন, খ্রিস্টধর্মের দিকপাল বদলে দেয়া এই সম্রাটকে নিয়ে তিনি ততটা আলোচনা করেননি। এই পুরো বইটার মাঝে এটাই আমার সবচেয়ে বড় একটা আক্ষেপ।
ইসলামের আবির্ভাব ও খ্রিস্টধর্ম
পৃথিবীতে জন্ম নিলেন শত বছরের মাঝে সবচেয়ে সেরা পুরুষ, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। ���র উনার হাত ধরে আবির্ভাব হলো নতুন এক ধর্মবিশ্বাসের। ইসলাম ধর্ম। ইসলাম ধর্মের উত্থানের শুরুর দিকে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহৃদয় ছিল মুসলমানেরা। তাদের বিজয়ে নিজেরা খুশী হত। লড়াইটা যে ছিল প্যাগানদের বিরুদ্ধে! কিন্তু ধীরে ধীরে লড়াইয়ের রূপ পাল্টাতে থাকে। আব্রাহা যে কাবা শরীফ ধ্বংস করতে গিয়েছিল সেই ইতিহাস আমি সীরাত থেকেই জেনেছি। কিন্তু এর সাথে রোমান সম্রাজ্যের যোগসাজশটা জানলাম এই বই পড়ে। বিরাট একটা শূন্যস্থান পূরণ হলো বলে মনে হয়েছে আমার। খুবই ভালো লেগেছে। এই অংশটায় মূলত বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের ব্যাপারে অনেক কিছু জানা হয়ে গেছে আমার।
মুসলিমদের জেরুজালেম জয় করার অংশ আনতে হলে আরবের তৎকালীন পরিস্থিতির ব্যাপারে জানা দরকার ছিল। সে কারনে সম্ভবত লেখক এরপরের কিছু সময় ধরে এখানে টানা ইসলামের ইতিহাস বলে গিয়েছেন। যেগুলো সবটাই আমার জানা ছিল। আবারও পড়তে খারাপ না লাগলেও, ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে এখানের কিছু অংশ চাইলে কমানো যেত। কারন খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসের ব্যাপারে পড়তে গিয়ে এতোখানি ইসলামের ইতিহাস পড়া নিউট্রাল পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে কারো কারো কাছে।
তবে এরপর পরেই লেখক অবশ্য রোমান সম্রাজ্য এবং পুরো পৃথিবীতে খ্রিস্টধর্মের বিস্তার নিয়ে আবারও পাঠকদের জানানো শুরু করেন। এবার সেগুলো স্বল্প সময়ের মধ্যেই জানিয়ে দেন তিনি।
ক্রুসেড
নব্য এক ধর্মের শক্তিশালী আবির্ভাব আর বিস্তার চার্চগুলোকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। আর তাই শুরু হয় ক্রুসেড। বিশেষ করে পবিত্র ভূমি কেন্দ্রিক ক্রুসেডগুলো হয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। যদিও নিজেদের অন্য উপদলের বিরুদ্ধেও ক্রুসেড করেছিল তৎকালীন চার্চ ও বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য। আর সেই ক্রুসেডের ঘটনাগুলো নিয়েই সাজানো এই অধ্যায়। সংক্ষেপে বেশ ভালোভাবেই ক্রুসেডের সময়গুলোকে তুলে এনেছেন লেখক এখানে। ক্রুসেডের সূত্রে মহৎ হৃদয়ের সুলতান সালাহউদ্দিনের ব্যাপারেও অল্পবিস্তর জানা হয়ে যাবে এখানে। অটোমান সম্রাজ্যের উত্থান, তাদের সাথে যুদ্ধ এসবও এসেছে স্বল্পাকারে। আবারও পড়তে হয়েছে ইনকুইজিশনের ব্যাপারে। শুধু খ্রিস্টধর্মেরই নয় ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলার এই নৃশংসতা গোটা মানব ইতিহাসেরই একটা কালো অধ্যায়। ইতিহাসে আর কখনো একটা নির্দিষ্ট সময়কাল জুড়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে এমন অত্যাচার আর এত মানুষকে খুন করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এরই সূত্রে এপ্রিল ফুল নিয়ে মুসলিমদের মাঝে যে ভুল বুঝাবুঝিটা আছে সেটাও খোলাসা করেছেন লেখক। তুরস্কের বিখ্যাত আয়া সোফিয়ার (Hagia Sophia) ইতিহাসটাও মোটামুটি জানা যাবে এখানে। পৃথিবীর শেষ সময় তথা কেয়ামতের ভবিষ্যৎবানীর সাথে যে এই আয়া সোফিয়া জড়িত সেটা জেনে নিজেও বেশ অবাকই হয়েছি।
অতঃপর বর্তমানকাল
মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় পেছনে ফেলে বর্তমান সময়ে খ্রিস্টধর্মের প্রচলন, তাদের বিভিন্ন ধারা উপধারা, বিভিন্ন উৎসবের সূচনার ইতিহাস এসব নিয়েই এই অধ্যায়। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান, জেসুইটদের উত্থান, পিউরিটান এমন বিভিন্ন বিষয়ে হালকা করে আলোচনা করে গিয়েছেন লেখক এখানে। বিজ্ঞানের প্রতি চার্চের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ইতিহাসও এসেছে অল্প করে। এরপর এই উপমহাদেশ ও বাংলায় কীভাবে খ্রিস্টধর্ম এলো সেদিকটায়ও আলোকপাত করেছেন লেখক। এরই সাথে শেষ হয় খ্রিস্টধর্মের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ইতিহাস।
উপসংহার
খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন শব্দ যেমন ফাদার, ব্রাদার, সি, বিশপ, ব্যাপ্টিজম, পোপ অ্যান্টিপোপ এমন কিছু ব্যাপার নিয়ে এক দুই প্যারায় শেষে সুন্দর করে পাঠককে জানিয়েছেন লেখক। ঈশ্বরপুত্র কীভাবে আলংকরিক থেকে আক্ষরিক হলো একটা তত্ব অনুসারে সেটাও উল্লেখ করেছেন। জানিয়েছেন অরিজিনাল সিন তথা আদম হাওয়ার বেহেশত থেকে বিতারণের ঘটনা নিয়ে খ্রিস্টধর্ম কী ভাবে সেটাও।
যীশুর প্রত্যাবর্তন নিয়ে জানাতে গিয়ে এসেছে কেয়ামত তথা শেষ সময়ের বিভিন্ন ভবিষ্যৎবানীর কথা। তবে এই অংশটা লেখক সাজিয়েছেন ইহুদী বিশ্বাস ও ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী শেষ সময়ের বিভিন্ন তফাৎ নিয়ে। খ্রিস্টধর্মের Armageddon এর সাথে ইসলামের কেয়ামতের কিছু সাদৃশ্য থাকলেও, আমার জানামতে আরো কিছু ডিটেইলসের উল্লেখ রয়েছে বাইবেলে। যেমন কেয়ামত আসার পূর্বে নির্দিষ্ট সময় পর পর পৃথিবীতে চারটা ভীষণ বিপদ নিয়ে চারজন ঘোড়সওয়ারী তথা Four Horsemen এর নেমে আসা। আমার জানামতে Apocalypse নিয়ে আরো কিছু ধারণাও কিন্তু রয়েছে খ্রিস্টানদের মাঝে। কিন্তু লেখক সেগুলো নিয়ে বইয়ে কোনো আলোচনাই করলেন না!! যেহেতু আমরা খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস পড়ছি, তাই শেষ সময় নিয়ে তাদের বিশ্বাসটুকুই তো আমাদের জানা উচিত। তা সেটা কোনো তত্ত্ব বা উপকথাই হোক না কেন। তবে আমার ভুলও হতে পারে, এমনও হতে পারে এগুলা শুধুমাত্র ফিকশন। লেখক সেটা ক্লিয়ার করলে উপকৃত হব।
বিশাল রিভিউর শেষ প্রান্তে চলে এলাম। বইটিতে আরো অনেক অনেক তথ্য রয়েছে। সবকিছু আসলে একটা ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা সম্ভব না। শুধু এতটুকু বলি খ্রিস্টধর্ম নিয়ে এমন কোনো প্রশ্ন বাকী থাকবে না, যার উত্তর এই বইটিতে নেই। বাকী থাকল লেখকের লিখনশৈলী নিয়ে আলাপ। বরাবরের মতোই একদম সহজে বুঝে নেয়ার মত করে দারুণ সাবলীলতার সাথে পুরো বইটা লিখেছেন লেখক। আর যে লেভেলের রিসার্চ করেছেন এই বইটা লেখার জন্য তা বুঝার পর আসলে মন থেকে কৃতজ্ঞতাবোধ চলে আসে। কিছু কিছু স্থাপনা বা নামের ক্ষেত্রে লেখকের উচ্চারণভঙ্গি ভিন্ন থাকার ব্যাপারটা ছাড়া আর কিছু নিয়েই আক্ষেপ করা যাবে না।
ব্যক্তিগত রেটিং: ১০/১০ ( এ ধরণের ইনফরমেটিভ বইয়ের আসলে রেটিং হয় না। আমি নিজের দিক থেকে বলতে পারি, যতটুকু জানার আগ্রহ ছিল, তারচেয়ে কয়েকগুন বেশীই জানতে পেরেছি বইটা থেকে। তাই আমি পরিপূর্ণভাবে সন্তুষ্ট, তৃপ্ত। লেখকের কাছে ইতিহাসের এমন আরো অনেক বিষয়ে বিশদ জানার আগ্রহ প্রকাশ করে গেলাম)
প্রোডাকশন: লম্বা রিভিউ হয়ে গিয়েছে। তবুও কিছু কথা উল্লেখ করি। বইটির প্রোডাকশন বেশ ভালো হয়েছে। প্রচ্ছদটা অত্যন্ত চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। বানান ভুলও বেশ কম। লেখক সম্ভবত কাউকে দিয়ে সম্পদনা করিয়েছিলেন; দুটো জায়গায় সেই সম্পাদকের ফুটনোট রয়ে গিয়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিক বিভিন্ন ছবি আর সময়কাল অনুসারে দেয়া ম্যাপগুলোও ভীষণ কাজে দিয়েছে। সব মিলিয়ে এমন একটা বই যে ধরণের যত্ন প্রাপ্য তার পুরোটাই দেয়া হয়েছে বইটিতে। দামটাও কন্টেন্ট অনুসারে সহনীয়। প্রকাশনী তাই আন্তরিক ধন্যবাদ।
বিশ্বের জনসংখ্যার মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হিসেবে করলে দেখা যায়, ∆ খ্রিস্টধর্ম - ২৩৮ কোটি ∆ ইসলাম - ১৯১ কোটি ∆ সনাতন/ হিন্দু - ১১৬ কোটি ∆ বৌদ্ধ - ৫০.৭ কোটি ∆ ই হু দী - ১.৫৭ কোটি
হিসাবটা ২০২২ অনুযায়ী। বিশ্বের এখন পর্যন্ত সর্বাধিক ধর্মীয় অনুসারী খ্রিস্টান। খৃষ্টীয় মতে যীশু খ্রিষ্টের প্রবর্তিত ধর্মবিশ্বাস। ভাবতে খুব অবাক লাগে না, যে যীশু খ্রিস্ট বা ঈসা (আ) মাত্র তিন বছরের মতো সময় স্রষ্টার বাণী প্রচার করেছেন অথচ তার অনুসারীরাই আজ বিশ্বে সর্বাধিক!
বেথেলহেমের নক্ষত্র যিনি তাঁর জন্ম বা তাঁর ইতিহাস কী? যীশু খ্রিস্ট কে? বা ইসলামের হযরত ঈসা (আ) কে? আব্রাহামিক রিলিজিয়ন বা সেমেটিক ধর্মগুলোর মতে যীশু খ্রিস্ট বা ঈসা (আ) কে নিয়ে আছে নানা মতভেদ। এই মতভেদের কারণেই এক ধর্ম তাকে ভণ্ড মসীহ বলে, এক ধর্ম তাকে ঈশ্বরের পুত্র বা ইবনুল্লাহ (মনে মনে নাউজুবিল্লাহ বলেন মুসলিমরা) বলে আর আরেক ধর্ম তাঁকে প্রতিশ্রুত মসীহ আল্লাহর একজন নবী হিসেবেই মানে। ই হু দী ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মের এই হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে যে পরিবর্তন তার সেকেন্ড ধাপ হিসেবে বলতে পারি যীশু খ্রিস্টের আগমনে এবং এর পরবর্তী সময়ে সেন্ট পল এবং পিটারের মাধ্যমে খ্রিস্টান ধর্মের আবির্ভাব। প্রশ্ন থেকে যায় নবী ঈসা (আ) কী আসলেই নতু�� কোনো ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন নাকি ব্যাখ্যার কারণে আজকের এই খ্রিস্টধর্মের আবির্ভাব? উত্তর জানতে ডুব দিতে হবে সেই আদিকালে।
যীশু খ্রিস্ট কে?
কুমারী মাতা মরিয়মের পুত্র যাকে আমরা ঈসা (আ) নামে বলি তিনিই যীশু হিসেবে পরিচিত। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা যাকে Son of God বলে থাকেন। আজ থেকে আরো হাজার দুয়েক বছর আগের কথা। বেথেলহেম কিংবা নাসারত গ্রামে জন্ম হয় প্রতিশ্রুত সেই মসীহের। এর মাঝেই ই হু দী ধর্ম এবং রোমানদের তৎপরতায় অনেকেই পরপারে গেছেন নিজেকে মসীহ দাবি করে। কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি তাদের কাছেই কাঠমিস্ত্রি হিসেবে আছেন সেই "Promised Prophet"। যার ভাগ্য অবশেষে ক্রুশবিদ্ধ হলেও আছে তিন সেমেটিক ধর্মের তিন বিশ্বাস। জানার খাতিরে জানা যায় এর সবটাই।
যীশুর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা নিয়ে ইতিহাস কী বলে?
তিনজন জ্ঞানী ব্যক্তির কথা আমরা জানি। যীশুর জন্মের পর যারা উপহার নিয়ে গেছিলেন। এবং আলামত দেখে বলেছিলেন তিনিই প্রতিশ্রুত সেই মসীহ। তবে যীশুর জন্ম নিয়ে আছে নানা মতভেদ। এটা তো মোটামুটি সবারই জানা আদতে ক্রিসমাস বলতে যে ২৫ শে ডিসেম্বরকে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় সেটা আদতে যীশুর জন্ম তারিখ নয়। তবে? পর্যালোচনা করে জানা যায় যীশুর জন্ম জুন থেকে সেপ্টেম্বরের কোনো এক সময়ে। আবার আমরা যে ইংরেজি সাল ব্যবহার করি সেটা যীশুর জন্মের হিসাবে হলেও খ্রিস্টের জন্মসাল যখন থেকে গণনা করে হয় তাঁর জন্ম এর তিন বা চার বছর আগেই! যীশুর জন্মের সময়ের এবং মাতা মেরির ইতিহাস নিয়ে অনেক কিছু আছে। অনেকে মেরিকে কুমারী মানতে চান না। ভাবেন রোমান কোনো এক যোদ্ধার সন্তান বহন করেছে মেরি আবার কেউ বলেন জোসেফ তথা ইউসুফের সাথে বিয়ের পর যীশুর জন্ম। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রমাণাদি মতে এটাই সত্যি তিনি কুমারী মাতার গর্ভে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ। সে জন্যেই দেখা যায় খ্রিস্ট ধর্মে তাঁকে ঈশ্বরের পুত্র বলা হয় (আবার মনে মনে নাউজুবিল্লাহ)। যাই হোক খ্রিস্ট ধর্মের ইতিহাস তথা বেথেলহেমের নক্ষত্র নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আসে হাজার বছরের ইতিহাস, মিথ আর বিশ্বাস অবিশ্বাসের মেলা। ছোটকালের যীশু কেমন ছিলেন এ নিয়ে বলা যায় ইতিহাসের পাতা অন্ধকার। যীশুর ১০-২০ বা তারও বেশি সময়ের ইতিহাস জানা যায় না। এর থেকেই আসে অনেক রেলিক। যীশুর জন্মের সময়ের কি অসাধারণ কিছু হয়েছিল নাকি একজন সাধারণ মায়ের মত কুমারী মেরীরও প্রসব বেদনা হয়েছিল? বিশ্বাস এবং ইতিহাসের মিশেলে এক ধর্ম বলছে তিনি কোনো প্রসব বেদনা উপলব্ধি করেননি। আবার এক ধর্ম বলছে প্রচণ্ড প্রসব বেদনা হয়েছিল। এভাবেই যীশুর জন্ম এবং হিডেন ইয়ার্স গুলোতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন। ভবিষ্যদ্বাণী মতে পরবর্তী মসীহ দাউদ (আ)-এর বংশ থেকে আসবেন। তবে যীশু কি সেই বংশের ছিলেন? যেহেতু তাঁর জন্ম হয়েছিল কুমারী মাতার ঔরসে সে হিসেবে বংশ পরম্পরা হিসেব হবে কি করে?
এখানেই আসে ই হু দী বিশ্বাসে যীশু খ্রিস্ট কে?
মুসা (আ) এর দেখানো সেই বনী ই স রা ই ল গোত্র ততদিনে তাদের বিশ্বাস নিয়ে চলছে। অপেক্ষা করছে তাদের প্রতিশ্রুত মসীহের। যখন তারা যীশুর উত্থানের কথা জানলেন তারা মানতে চাইলেন না যীশুকে সেই মসীহ হিসেবে। কারণ কী? খুবই সহজ, তাদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যীশুর সাথে তারা মিল পায়নি। কুমারীর গর্ভে জন্ম এবং এই জাতীয় কথাকে তারা এক কথায় ❛ভোগাস❜ বলে তুড়ি মে রে উড়িয়ে দিলেন। সময়ের পরিক্রমায় যীশু যখন তাদের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেন এবং তাদের ঘৃণ্য প্রতারক বলেন তখন তাদের আঁতে ঘা লেগে যায়। উঠে পড়ে লাগেন ইমাম ও রোমানদের মাধ্যমে যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করেন। এতে করে যীশু যে ভণ্ড মসীহ তাদের এই বিশ্বাস পাকাপোক্ত হয়। কারণ একজন নবী বা প্রতিশ্রুত মসীহের শক্তি এতই ঠুনকো কিনা ক্রুশে মৃ ত্যু বরণ করবেন! এ থেকে বলা যায় ই হু দী বিশ্বাসে যীশুকে অস্বীকার করা হয়। তাঁকে একজন ভণ্ড এবং জাদুবিদ্যায় পারদর্শী হিসেবেই দেখা হয়। যে কি না নানা রকম অলৌকিক কাজ করেছেন। ভাবতে অবাক লাগে না, যে ই হু দী দে র চক্রান্তে খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বর প্রাণ দিলেন সেই ই হু দী দের সাথেই এখন কত্ত দহরম মহরম সম্পর্ক খ্রিস্টানদের। অথচ একসময় এদের মধ্যেই বিরাজমান ছিল দা-কুমড়া সম্পর্ক। পুরো খ্রিস্টান বিশ্ব আজ বলতে গেলে ঐ দেড় কোটি লোকের কথায় নাচছে। বলে রাখা ভালো এই মিল মহব্বতের মূলটা বর্তমানে আর এর অধিকাংশই এক কাউন্সিলে যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার ঘটনাকে আদি পাপমুক্ত করে দেয়া এবং রাজনৈতিক। বলা হয় একসময় রোমানদের মধ্যে এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের কাছে ই হু দী দের অপছন্দ করা হতো। যদিও যীশু জন্মসুত্রে একজন ইহুদী এবং তাঁর প্রচারিত বাণীর সাথে ই হু দী ধর্মের তেমন একটা অমিল ছিল না। যীশু আল্লাহর দেয়া কালাম এবং তার রূহে নাযিল হওয়া ইঞ্জিলের বানী প্রচার করতেন। তবুও সেসময়ের ক্ষমতালোভী কিছু ইমামের কারণে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন তিনি। এরপরই ঝামেলা বেঁধে যায়। আর তাঁকে থামাতেই ই হু দী দের চক্রান্ত। এরপর যীশুর ঊর্ধারোহনের পর তাঁর অনুসারীরা যখন খ্রিষ্টের বানী প্রচার করলো দেখা গেলো পৌত্তলিকদের রোষের শিকার হচ্ছেন। তখনই শুরু হয় বিভাজন। বেশিরভাগই ভাবতো তারা ই হু দীদের আরেক উপদল। তাদের বিশ্বাস পরিবর্তন করতেই তখন থেকে এই নাসারা বা খ্রিস্টান ধর্মের উৎপত্তি।
আচ্ছা প্রশ্ন আসে না ইঞ্জিল বা বাইবেল কি এক? গসপেল কী জিনিস? অনেক মতেই বলে থাকেন বর্তমানের বাইবেল ইঞ্জিলের বিকৃত ভার্সন। তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় এদের মাঝে বিস্তর ফারাক। বাইবেলের ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্ট এবং বিভিন্ন গসপেল এসেছে ম্যাথিউ, লুক, জন এদের থেকে। আবার কিংবদন্তি এবং ইতিহাসের প্রমাণাদি দিয়ে দেখা যায় বাইবেলের লেখক আদতে এরা কেউই নন! তবে কারা? ইতিহাসের হারানো কিছু তথ্যে কি তবে বাইবেলের লেখকও ঠাঁই পেলেন? কুরআন যেমন সরাসরি আল্লাহর বাণী তেমন কিন্তু বাইবেল নয়। এখানে কী আছে সেটা বাইবেল পাঠ করলেই বুঝে আসবে। বাইবেলের বিভিন্ন ভাগ যেমন আছে তেমনি আছে একই বাইবেলের ভিন্ন রূপের নানা মতভেদ। আছে সময়ের হেরফের। যেমন, যে ঘটনা ম্যাথিউয়ের বিবরণে আগে আছে সেটা লুক বা জনের ক্ষেত্রে ভিন্ন আবার কিছু ঘটনার পার্থক্য বিশাল। প্রশ্ন আসে ঈসা (আ) কি তরিকাবন্দী হয়েছিলেন জন দ্য ব্যাপটিস্টের কাছে? জর্ডান নদীর তীরের সেই হোলি ওয়াটারের ঘটনা আদৌ ঘটেছিল?
বাইবেলের বিভিন্ন টেস্টামেন্ট এবং গসপেলের ঘটনা তো বিভিন্নভাবে জানা যায়। শুনেছেন কখনো ইসলামী গসপেলের কথা?
ইসলামে আবার গসপেল কোত্থেকে আসে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে। তবে এখানেই মজা। ❛গসপেল অফ বারনাবাস❜ এর কথা শুনেছেন? অনেকেই এটাকে ইসলামী গসপেল বলে। কারণ, ম্যাথিউ, লুক বা জনের গসপেল যেখানে বলছে ঈসা বা যীশু খ্রিস্ট ইবনুল্লাহ (বলেন নাউজুবিল্লাহ) সেখানে বারনাবাস বলেন যীশু আল্লাহর প্রেরিত সেই প্রতিশ্রুত মসীহ। তবে সন্দেহ থেকেই যায় এই গসপেলের সত্যতা নিয়ে। সেটা জানতে ইতিহাসের নানা অলি গলিতে ঘুরতে হবে।
ইঞ্জিলের ঈসা - গসপেলের যীশু কিংবা ইসলামের যীশু - হযরত ঈসা (আ) একই ব্যক্তি?
উত্তরটা পানির মতো সোজা। হ্যাঁ। তবে যীশুকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তার ধরন দুই ধর্মের বিস্তর ফারাক তৈরি করতে যথেষ্ঠ। বাইবেলে যেখানে বলা হচ্ছে, স্বয়ং যীশু নিজেকে ইবনুল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র এবং আল্লাহকে নিজের পিতা (নাউজুবিল্লাহ) বলে সম্বোধন করছেন সেখানে কুরআন এবং ইসলামী বিশ্বাসে এর উপস্থিতি নেই। দুই ধর্মই তাঁকে প্রতিশ্রুত মসীহ হিসেবে মানলেও ইসলাম ধর্মে আমরা যীশুকে আল্লাহর একজন নবী যার উপর ইঞ্জিল নাযিল হয়েছে বলে মানি। ���াঁকে ধর্মীয় প্রভু হিসেবে মানি না। এদিকে আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) কে খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাসে শেষ নবী হিসেবে মানা হয় না। তাদের মতে ঈসাই শেষ, তিনি কেয়ামতের আগে আবার আসবেন। এরমাঝে আর কোনো নবী নেই, প্রয়োজন নেই।
ই হু দী ইমামদের আঁতে ঘা লাগতেই যখন যীশুকে পথের কাঁনটা হিসেবে দেখলেন তখনই বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে তাকে আটক এবং ক্রুশবিদ্ধ করার ঘটনা ঘটে। এখানেও আছে নানা মতবাদ। ই হু দী এবং খ্রিস্ট বিশ্বাসে সেই কাঠের ক্রুশে যীশু মা রা গেছেন। খ্রিস্ট বিশ্বাস, মা রা যাওয়ার তিনদিন পর তিনি বেঁচে উঠেন সাহাবীদের দেখা দেন এবং আকাশে চলে যান। নির্দিষ্ট সময় পর তিনি আবার আসবেন। তবে মুসলিম বিশ্বাসে তিনি কখনো ক্রুশবিদ্ধ হনই নি! এর আগেই আল্লাহ্ তাঁকে ঊর্ধাকাশে নিয়ে যান। তবে আজ থেকে সেই দুই হাজার বছর পূর্বে রোমের সেনাদের দ্বারা আরো দুজন চোরের মাঝে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন কে?
যীশু তো চলে গেলেন। এরপর কী করে হলো এই ধর্মের বিস্তার?
যীশু আবার ফিরে আসবেন বলে গেছেন। এই অপেক্ষায় আজও আছে খ্রিস্টান ধর্মের লোকেরা। সে সময়ের লোকেরা যীশুর আবার ফিরে আসা কতদিনের হবে জানতেন না। জানিনা আমরাও। তবে তারা হয়তো ভাবেনি তারা তাঁর আগমন দেখে যেতে পারবেন না। তবে যীশু বলে গেছিলেন, ❛তখন তোমরা সবাই থাকবে না, তবে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ থাকবে।❜! যীশুর ঊর্ধারোহনের দুই হাজার বছর পেরিয়ে গেছে তবে কী করে দুই হাজার বছর আগের কেউ সামনের তাঁর আগমনের সময় থাকবেন? সবথেকে অল্প সময়ে প্রচার করা এই বিশ্বাস প্রথমে নানা সমস্যা, নির্যাতনের মুখে পড়ে ধীরে ধীরে বিস্তারলাভ করতে থেকে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য সেইন্ট পল যিনি আগে সল নামে পরিচিত ছিলেন তিনি খ্রিস্টান বিশ্বাসের বিরোধী ছিলেন। বহু বিশ্বাসীদের তিনি হ ত্যা করিয়েছেন আর একসময় তিনিই কি না খ্রিস্টানদের সেরা প্রচারক হয়ে গেলেন! ইতিহাস বড়োই অদ্ভুত জিনিস। তার থেকেও অদ্ভুত উপরের ঐ স্রষ্টার খেলা বুঝা।
আমাদের এই গুডবাই পিটার গুডবাই পলের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্মের বিস্তার এবং আধিপত্য ছড়াতে থাকে। শুরু হয় চার্চের যাত্রা এরপর ধীরে ধীরে ক্যাথলিক, অর্থোডক্স চার্চের আবির্ভাব। সাথে ই হু দী দের সাথে চরম দ্বৈরথ তো চলছিলই। এরমাঝে ৭০ দশকে যখন দুই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে কোন্দলে সেকেন্ড টেম্পল অফ সলোমন ধ্বং স হয় তখন শুরু হয় আরেক ইতিহাসের, আরেক অপেক্ষার। ই হু দী দের অপেক্ষা আসবেন সেই প্রতিশ্রুত মসীহ যে বর্তমানে আল আকসার স্থানে তৃতীয় টেম্পল প্রতিষ্ঠা করবেন। এর জন্য প্রয়োজন সেই নিখুঁত লাল গরু! কালের বিবর্তনে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, পড়ে যায় মাটি চাপা। তেমনি একসময় আবিষ্কৃত হয় কিছু নথি। ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া যায় কিছু কোডেক্স। যাতে লেখা ছিল ❛গসপেল অফ থমাস❜ সহ আরো অনেক হারিয়ে বা বিলুপ্ত হওয়া পাণ্ডুলিপি। এগুলো নিয়ে শুরু হয় আবার গবেষণা। জানা যায় অজানা অনেক তথ্য।
আচ্ছা মেরি মাগদালিন কিংবা হলি গ্রেইলের নাম তো শুনেছেন? শুনেছেন যীশুর পরিবারের কথা?
একটা প্রশ্ন এসেই যায়, তৎকালে যেখানে ই হু দী দে র অবিবাহিত থাকার কথা না সেখানে যীশু কি অবিবাহিত না বিবাহিত ছিলেন? বিবাহিত হলে কে তাঁর স্ত্রী? স্বভাবতই আমরা থ্রিলার লাভাররা ইতিহাসের পাতায় না হোক ড্যান ব্রাউনের ❛দ্য দা ভিঞ্চি কোড❜ উপন্যাসের মাধ্যমে এই হলি গ্রেইল, মেরি মাগদালিনের সম্পর্কে জানি। আসলেই কি ছিল এমন কিছু? যদিও ড্যান ব্রাউন সেখানে জোর দিয়ে এর সত্যতা সম্পর্কে বলেছেন। কিন্তু ইতিহাস আর সত্যের কোন্দলে দেখা যায় ফিকশন ইজ ফিকশন। অর্থাৎ সানগ্রিল বলেন আর ব্লাড লাইন বলেন সেগুলো আসলে...?
যীশু কি ভারতে এসেছিলেন?
যীশুর শৈশব কৈশোরের কথা কুরআনে নেই। বলা যায় কুরআন এ নিয়ে নীরব। জানা যায় না বাইবেল থেকেও। তবে তাফসীর সহ কিংবদন্তি বলে যীশু তার সেই ❛হিডেন ইয়ার্সে❜ এসেছিলেন এই ভূখণ্ডে। আবার কেউ বলে ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরের ঘটনা। কিন্তু সত্যি কী? জানার উপায় একমাত্র সময় ভ্রমণ!
যীশুর রেলিক/কিংবদন্তী?
ইতিহাসের অজানা অধ্যায় মানেই এর সাথে নানা মুনির নানা মত। যীশুকে নিয়ে চালু আছে নানা মিথ। যেমন ❛শ্রাউড অফ তুরিন❜ যেখানে নাকি যীশুর তথা যে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল তার মুখের ছাপ আছে! ❛ট্রু ক্রশ❜ নিয়েও আছে নানা মিথ। এছাড়াও আছে ❛সেইন্ট ভেরোনিকা❜, ❛ভিয়া ডোলোরোসা❜, ❛হলি গ্রেইল❜, ❛হলি ল্যান্স❜, ❛ক্রাউন অফ থ্রন্স❜ ইত্যাদি।
যে রোমানরা একসময় যীশুকে ক্রুশে তুলে দিয়েছিল সময়ের আবর্তনে সেই রোমান সাম্রাজ্যের রাজধর্মই হয়েছিল খ্রিস্টধর্ম- কী তাজ্জব ব্যাপার!
বিভিন্ন কাউন্সিল, উত্থান, নির্যাতন সব পেরিয়ে খ্রিস্টধর্ম ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। এগিয়ে যায় মুসা (আ) এর বনী ইসরাঈলের থেকেও। চলতে থাকে দ্বৈরথ। আসে নানা রাজা। একসময় রোমান সাম্রাজ্যে থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যায় এই ধর্ম। ছড়ানোর সাথে মতবাদের বিভেদ হয় আসে ক্যাথলিক, অর্থোডক্স, প্রোটেস্ট্যান্ট সহ নানা ভাগ। এরমাঝেই পেরিয়ে যায় ৫৫০ বছরেরও অধিক সময়। এগিয়ে আসে খ্রিস্টাব্দ ৫৭০ সাল! জন্ম নেন আল্লাহর প্রেরিত শেষ নবী এবং রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স)। এখানে শুরু হয় নতুন এক ধর্ম ❛ইসলাম❜। তবে করে মূল কথা আল্লাহকেই বিশ্বাস। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস। স্বয়ং নবীজী (স) বলেছেন, ❛আমার আর ঈসার মাঝে আর কোনো নবীর আগমন ঘটেনি।❜
এখানেই ভাগ হয়ে যায় খ্রিস্টীয় বিশ্বাস। তারা নবীজী (স) কে নবী বলে মানতে নারাজ। অথচ যীশু তার ভবিষ্যদ্বাণীতেই নবীজীর (স) সম্পর্কে বলে গেছিলেন। মক্কার কুরাইশ বংশে জন্ম নেয়ার পর ৪০ বছরে নবুওয়তপ্রাপ্ত হওয়ার পর মহানবী (স) ইসলাম প্রচার এবং পূর্বের নবীদের নিয়ে কথা বললেন তখন এবং মূর্তিপূজা সহ নানা অনিয়মের কথা বললেন তখনই ঝামেলা বেঁধে গেলো। এর থেকেই নানা যু দ্ধ হয়। আর ইতিহাসের ক্রু সে ডের কথা জানে না এমন কেউ নেই।
ক্রু সে ড থেকে অটোম্যানের সেই বিস্তার এবং ইসলাম ধর্মের রাজত্ব সে এক বিশাল ইতিহাস। এরমধ্যে কত প্রাণ, কত র ক্ত ঝড়েছে হিসেব নেই। যুদ্ধগুলো যতটা ধর্মীয় ঠিক ততটাই কি রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল বা ক্ষমতার লোভে ছিল না?
ক্রু সে ড পেরিয়ে এসে বর্তমানকাল। যেখানে তিন ধর্ম প্রায় এক কিন্তু তাও ভিন্ন বিশ্বাসের পথে চলেছে। এমন এক সময় আসবে যখন আব্রাহামিক দুই ধর্মের অনুসারী সংখ্যা প্রায় সমান হয়ে যাবে। তখনই কি আগমন ঘটবে ঈসা কিংবা যীশুর?
অবাক করা ব্যাপার আজ যে পবিত্র ভূমিতে ফি লি স্তি নী রা প্রাণ দিচ্ছে সেই ভূমিতেই জন্মেছিলেন বেথেলহেমের নক্ষত্র যীশু খ্রিস্ট। আর সেখানে সংঘটিত নির্যাতনের সমর্থনে তারই অনুসারীরা আছে! শেষ জমানার হিসেব আসতে আর কতদিন বাকি?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
এতক্ষণ এই বিশাল হাবিজাবি লেখা পড়ে কী ভাবছেন? খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস লিখতে বসে গেলাম নাকি! এমন ভাবার কারণ নেই। এমন প্রতিভা, জ্ঞান কোনোটাই আমার নেই। এতক্ষণ আলোচনা করছিলাম আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ এর লেখা ❝বেথেলহেমের নক্ষত্র: খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস❞ বইটি নিয়ে। প্রায় ২৮ টি অধ্যায়ে লেখক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন আব্রাহামিক আরেক ধর্মের ইতিহাসের আদ্যোপান্ত নিয়ে। ৬৮০ পৃষ্ঠায় আমার মনে হয়না ইতিহাস, মিথ, কিংবদন্তী, কন্সপোরেসি থিওরি এবং ধর্ম গ্রন্থের উল্লেখ করে এর থেকে বিস্তারিত এবং সহজবোধ্য করে বোঝানো সম্ভব। প্রায় তিনমাসের চেষ্টায় আমি বইটি পড়ে শেষ করেছি। এমন নয় বইটি স্লো বার্ন, বোরিং। ইতিহাসের অলিগলিতে এমন রোলার কোস্টার রাইড দিতে গেলে উল্টে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সমূহ। তাই সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে, মাঝে গ্যাপ দিয়ে আমি বইটা উপভোগ করেছি। বুঝার চেষ্টা করেছি এবং বিভিন্ন মতবাদের ফারাকগুলো কোথায় সেগুলো লেখার সাথে আমার জানার সাথে মিলিয়ে নিয়ে বইটি বেশ উপভোগ করে পড়েছি। তবে পড়তে গিয়ে যে মাথা আউলে যায়নি এটা বলবোই না!
বিশাল বইটি সময়ের বিভিন্ন ধাপ, যীশুর পূর্বের ঘটনা, যীশুর পরিচয়, জন্ম এবং রোমান, ই হু দী এবং তৎকালীন সময়ে যীশুর অবস্থান সবকিছু নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেখানে যেটুক প্রয়োজন সেটুক বর্ণনা এবং রেফারেন্সের ব্যবহার করেছেন। লেখককে বিশাল ধন্যবাদ দিতেই হয় হাজারটা বই, বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস্য গুগল সার্চ করে মাথা খারাপ করা বদলে এত প্রাঞ্জল ভাষায় বইটি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে পেশ করার জন্য। শুরুর দিকে কিছুটা একঘেয়ে লাগলেও বইয়ের দারুণ গতি লেগেছে যীশুর ঊর্ধারহনের পর থেকে। বিভিন্ন মতবাদ, থিওরি, যীশুর সম্পর্কে বিভিন্ন ধার��া এবং কিংবদন্তীর সাহায্যে যীশুর বর্ণনা গুলো আমি গোগ্রাসে গিলেছি। আর পড়তে গিয়ে বেশ অবাক হয়েছি। একই ধর্মের ভিন্ন মতবাদ কী করে আসে। মানুষের বলার ভঙ্গিমা, সুবিধার্থে একভাবে বলা অনেকসময় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিবরণের ভিন্নতা কী করে সম্পূর্ণ নতুন এক মতবাদের সৃষ্টি করে ভাগ তৈরি করে তা সত্যিই অবাক করার মতো। বইতে লেখক ইস্টার সানডে, ব্ল্যাক ফ্রাইডে, থ্যাঙ্কস গিভিং, গুড ফ্রাইডে, বড়দিন উদযাপনসহ নানা প্রচলিত ব্যাপারগুলোর গোড়ার ব্যাপার যেভাবে বিস্তারিত এবং বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে দেখিয়েছেন তাতে জানা অজানা অনেক ব্যাপারে অল্প ধারনা। থাকলে সেটা বেড়েছে আমার। বিশেষ করে ড্যান ব্রাউনের ❛ল্যাংডন সিরিজ❜ এর সত্যতা এবং এর ব্যাপারে যে তথ্য দিয়েছেন আমি পূর্বে জানতাম না সেটা। লেখকের কাছে আবেদন এটা নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখুন। আমি বিস্তারিত জানতে চাই। আচ্ছা আপনি এপ্রিল ফুল সম্পর্কে জানেন? জানেন আমরা যে ইতিহাস জানি এর পিছে তার পুরোটাই বানোয়াট! এই অংশটুকু পড়ে আমি যারপরনাই অবাক হয়েছি। আমার জ্ঞান এটা নিয়ে প্রচলিত সেই করুণ কাহিনিই পযর্ন্তই ছিল। এছাড়াও ইঞ্জিল এবং বাইবেলের ভিন্নতা নিয়েও লেখকের ব্যাখ্যা আমার বেশ লেগেছে। পাক রূহের ওপর নাযিল হওয়া সেই কিতাব কোথায়? কন্সপিরেসি থিওরি বলে অনেক কিছুই। আসল সত্য কী? লেখকের ব্যাখ্যা থেকেই মনে একটা প্রশ্ন এসেছিল। যার উত্তর আছে সুরা আল ইমরানের এই আয়াতে, ❛And He (Allah) will teach him [‘Isa (Jesus)] the Book and Al-Hikmah (and) the Tawrat (Torah) and the Injil (Gospel).❜
বইয়ের সবথেকে কঠিন এবং সহ্য করতে কষ্ট হওয়া অধ্যায়গুলো ছিল বাইবেল এবং গসপেলের চুম্বকাংশগুলো। মূল গ্রিক, আরামায়িক বা যে ভাষার থেকে ইংরেজির এবং বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে সেগুলো লেখক যথেষ্ঠ সহজ চলিত ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছেন। তবুও পড়তে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এছাড়াও মুসলিমদের জন্য বাইবেল, গসপেলের যে অংশগুলো পড়তে গেলে সমস্যা মনে হবার কথা, বিশ্বাসের বিরোধী হওয়ার কথা সেগুলো লেখক আন্ডারলাইন করে দিয়েছেন যেন চাইলে সেটা উহ্য রেখে পড়া যায়। এখানেই আমার সমস্যা হয়েছে সবথেকে বেশি। এসব জায়গায় আমি মনে মনে ❛নাউজুবিল্লাহ❜ পড়তে পড়তে পড়েছি। তবে এরপর থেকে ইতিহাস, বিভিন্ন নগরের ইতিহাস, পূর্বনাম, বর্তমান নাম এবং সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের ইতিহাস গুলো জাস্ট দারুণ লেগেছে। কিছু জানতাম কিছু নতুন জেনেছি যেগুলো আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানকে আরো একটু বাড়তে সহায়তা করেছে। লেখক শুধু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ ঘটনা দিয়েই শেষ করেননি। এনেছেন এরপরের ইতিহাস, ধর্মের বিস্তার, নানা যু দ্ধ এমনকি এতে এসেছে আদিকালের সেই ভয়াবহ ❛উইচ হা ন্ট❜ এরমতো বিষয়ও। এসেছে প্রাক ইসলাম যুগ। নবী (স) এর আগমন এবং ইসলামের প্রচার। ইয়ারমুকের যু দ্ধ থেকে ক্রু সে ড এবং বর্তমানের চলা দ্বৈরথ সবকিছু এই বইতে স্থান পেয়েছে। এছাড়াও বইতে বিজাতীয় বিদেশী ভাষার প্রয়োগ ছিল যার মধ্যে হিব্রুর ব্যবহার ছিল অধিক। ভাষা জানা না থাকায় পড়তে গিয়ে অন্ধের মতো লেগেছে। তবে বইয়ের শেষে লেখক সহায়ক হিসেবে হিব্রু পঠনের জন্য তাদের অক্ষর থেকে শব্দ এবং বাক্যের ধারনাসূচক একটি অধ্যায়ের অবতারণা করেছেন। এছাড়াও পাঠকের বিভিন্ন প্রশ্ন উত্তরের অধ্যায় ছিল। বিভিন্ন ছবি, ম্যাপের সাহায্যে তৎকালীন সময়ের একটা চিত্র ফুটানোর এবং পাঠকের কাছে পাঠের সাথে ভিজুয়ালাইজ করার প্রয়াস ছিল। আমার মনে হয় বাইবেল বা সেমেটিক এই ধর্মের আদ্যোপান্ত সম্পর্কে ধারনা চাইলে এই বইটি সহায়ক হতে পারে। কোনো বইই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। এই বইটিতে তথ্যগত ভুল থাকতে পারে। বিশ্বাসের বিভেদ থাকতে পারে। তবে আমার স্বল্পজ্ঞানে আমি তেমন কিছু দেখিনি। বা পড়ার তালে চোখে নাও পড়তে পারে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটির প্রচ্ছদ নজরকাড়া না হলেও বেশ ভালো। মোটা বই অনুযায়ী রাউন্ড বাইন্ডিং ঠিক ছিল। তবুও কিতাবের সাইজ এই বই পড়তে বেশ কষ্ট হয়েছে।
ইতিহাসের অলিগলি পেরিয়ে বানান ভুল দেখার তাল ছিল না। তবে কিছু জিনিস এডিট করা যায়। যেমন, প্রুফ রিডারের কিছু মন্তব্য ( ব্রাকেটে) রয়ে গেছে। সেগুলো ঠিক করা যায়। কোথাও বাক্য শেষ হওয়ার আগেই দাড়ি দিয়ে দিয়েছেন। তবে একটু অপ্রয়োজনীয় ভুল আছে সূচিপত্রে। সেখানে অধ্যায়ের নামের সাথে শেষের দিকে বিশেষ করে পৃষ্ঠা নাম্বার মিলেনি। যেমন, হিব্রু পঠন ৬৫২ পৃষ্ঠায় আছে দেখা থাকলে আদতে আছে ৬৬৩ পৃষ্ঠায়।
আমার রিভিউ বিশাল হয়েছে। কেউ পড়বে না তাও জানি। তবে এত বড় বইয়ের জন্য রিভিউ করার সাহস করেছি আর কী থেকে কী লিখেছি আমার ভুলত্রুটি মার্জনার দৃষ্টিতে দেখবেন। দীর্ঘ এক যাত্রা শেষ। যেতে যেতে এটাই ভাবছি,
আব্রাহামিক রিলিজিয়নের মূল কথা এক হলেও ব্যাপারটা হলো, same same but different! আগের ❛ই হু দী জাতির ইতিহাস❜ এবং এখন এই বই পড়ে মাথায় একটাই কথা বাজছে, ❛Moses (A) was Muslim, but his followers divided into Je wi sh, Nasara. ISA (A) was Muslim, but his followers divided into Catholic, Orthodox. Muhammad (s) (PBUH) was Muslim, but his followers divided into Shia, Sunni.❜
আমরা আল্লাহ্ এবং তার নবীর দেয়া বিধান থেকে সরতে সরতে কোন কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি? এর শেষ হতে ফোরাতের কতটুকু পানি শুকাবে?