❛𝚃𝚒𝚖𝚎 𝚒𝚜 𝚊𝚗 𝚒𝚕𝚕𝚞𝚜𝚒𝚘𝚗.❜
সময় অবাক করা ব্যাপার। সময় নিয়ে ভাবতে গেলে কতশত চিন্তা, তত্ত্ব যে এসে যাবে তার ইয়াত্তা নেই। আমাদের জীবন সময়ের জালে আবদ্ধ। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সময় আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সময় নিয়ে চলছে কত পরীক্ষা, বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সময়ের রহস্যের কূলকিনারা করতে কত কিছু আবিষ্কার হচ্ছে। তবুও সময় এক রহস্য এক মরীচিকার মতো বহমান আছে।
আচ্ছা, সময় ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারবেন?
জীবন থেকে কয় সেকেন্ড, কয় মিনিট অতিবাহিত হচ্ছে সেটা যদি আর না জানা যায় তবে? অথবা সময় নিয়ে কাটাছেঁড়া করাই যদি নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়, জীবন কেমন হবে? সময়কে ঘিরেই তো চলছে সব। সময় নিয়ে কথা বন্ধ মানে তো জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নত স্তরে যাওয়া বন্ধ, গবেষণা, আবিষ্কার সব বন্ধ!
সমতল ভূমিতে এমন আইন-ই করা হয়েছিল। সময়কে তারা গণনা, পরীক্ষা, গবেষণার থেকে বাদ দিয়েছিল। সময় নিয়ে কথা বলাও পাপ সেখানে। সময় নিরূপণ যন্ত্র ঘড়িকে ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে তারা। যার কাছেই ঘড়ি পাওয়া যাবে সে সহ সব ধ্বংস করে দিচ্ছে চিতা নামক বাহিনী। সময় গবেষক, পদার্থবিদ্যার গবেষক, ঘড়ি নির্মাতাদের সমূলে উৎপাটন করার এক নির্মম চেতনা নিয়ে কাজ করছিল জেনেরালের নেতৃত্বে চলা চিতা বাহিনী। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে সকল ঘড়ি, সময় নিয়ে করা যেকোনো গবেষণা নষ্টের পাশাপাশি শত শত মানুষকে হ ত্যা করেছে চিতা বাহিনী। তাদের উদ্দেশ্য মুক্ত চিন্তার পথ রুদ্ধ করে দেয়া। সমতলে থাকবে না কোনো সময়, ঘড়ি, বুদ্ধিজীবী। তাদের সাহায্য করছে আপন ভূমির কিছু বিশ্বাসঘা তক চর, যারা দ্বিতীয় বাহিনী নামে পরিচিত। সময় না থাকলে সেখানে কোনো উন্নতি ঘটবে না, সভ্যতা পিছিয়ে পড়বে কিন্তু চিতাদের তা-ই সই।
একদল যেখানে অন্যায়-অত্যাচার শুরু করে সেখানে তাদের রুখতে চেতনা সম্পন্ন দলের উদ্ভব হয়। সমতলের সেই দলের নাম পার্টিজান। কঠিন পরিস্থিতি এবং অপেক্ষাকৃত কম শক্তি নিয়ে তারা লড়ছে।
সমতল ভূমির গবেষক বা বিজ্ঞানীদের বলা হতো যান্ত্রিক। অতীতে যান্ত্রিকেরা তিলে তিলে তৈরি করেছিল সুন্দর এক লোকালয়। কিন্তু কালের আবর্তে সেইসব যান্ত্রিকেরা বিলীন হয়ে গেছে। তবু দূরদর্শী তারা আগেই হয়তো আঁচ করেছিলেন সমতল ভূমির বর্তমান এই সভ্যতা সংকট সম্পর্কে। তাই বাতলে দিয়ে গিয়েছেন মুক্তির পথ। সেই পথের রহস্য এবং সমাধানের পথে সূত্র হলো ❝দিতার ঘড়ি❞।
উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট ত সময় নিয়ে এই বিবাদের সমাধানে ভ্রমণ করে। যার একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে অনেককিছু। একটি সিদ্ধান্তে তৈরি হতে পারে অনেকগুলো সম্ভাবনা। যার ফলাফলও ভিন্ন। একেক সম্ভাবনায় সমতলের ভাগ্য বদলে গেছে নিদারুণভাবে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
সময় সত্যিই অদ্ভুত একটা বিষয়। সময় নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট হয় আবার সময় নিয়ে ভেবেই কত নতুন দিক রচিত হয়েছে। কত নতুন সমীকরণের আবির্ভাব হয়েছে।
সময় এবং ঘড়িকে পুঁজি করে এমন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি আমি খুব কম পড়েছি। ❝দিতার ঘড়ি❞ দীপেন ভট্টাচার্যের লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। সময়, পদার্থবিদ্যা, বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়কে নিয়ে গোটা উপন্যাস সাজিয়েছেন তিনি। ঘড়ি এবং ঘড়ির প্রকৌশল নিয়ে যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা ছিল মুগ্ধ করার মতো।
সমতল ভূমি অতীত বা ভবিষ্যতের কোন এক সময়ের ঘটনা। যেখানে সময় নিয়ে তৈরি হয় বিচিত্র এক সংকট। সে সংকটের থেকে পরিত্রাণ পেতে কীভাবে যান্ত্রিকদের দেখানো পথের অনুসরণ করে সম্ভাব্য ফলাফল আসে সেটা নিয়েই পুরো উপন্যাস।
লেখকের মুগ্ধ করার মতো বর্ণনাশৈলী, ভাষার ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বর্ণনাগুলো খুব সুন্দর ছিল। গদ্যধারার বাইরে গিয়ে কিছুটা ছন্দ বা নান্দনিক ভঙ্গিতে পুরো উপন্যাস রচনা করেছেন তিনি। ভাষার কাঠিন্য কিছুটা মনে হলেও লেখকের বর্ণনার ধরনে সেটা খুব একটা বিরক্তির কারণ হয়নি।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স, টানেলিং নিয়ে লেখক যেসব বর্ণনা দিয়েছেন সেসব বুঝতে অবশ্যই বিজ্ঞানের এই বিষয়গুলোতে আপনার ধারনা থাকতে হবে। নাহয় বুঝতে এবং উপন্যাসের গভীরতা অনুধাবন করতে কিছুটা কিংবা বেশ ভালই বেগ পেতে হবে। সবকিছু মনে হয় মাথার উপর দিয়ে যাবে। তবে বুঝে গেলে আপনার মনে হয় আপনি বইয়ের বর্ণনা পড়ছেন না শুধু, দেখছেনও!
সময়, সমান্তরাল অবস্থান এবং বিভিন্ন সম্ভাব্যতা এ বিষয়গুলো নিয়ে পড়তে, জানতে আমি খুব উপভোগ করি। বাংলা ভাষায় এই বিষয় নিয়ে এত দারুণ উপন্যাস আছে এতদিন অজানা ছিল এটাই যেন আমার বিশাল অজ্ঞতা মনে হচ্ছে।
লেখকের প্রতিটা বর্ণনা, অধ্যায়ের পরিবর্তন এবং চরিত্রদের ব্যাক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে। ২২৪ পৃষ্ঠার অন্য কোনো বই হয়তো এক বা দুইদিন সময় শেষ করে ফেলি। তবে এই বইটা আমি একসাথে বেশি অধ্যায় পড়ার চেষ্টাই করিনি। সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে পড়েছি। প্রতিটা ঘটনা, টার্ন গুলো মনে রেখে সামনে এগিয়েছি। বিশেষ করে ঘড়িনির্মাতা অসিতোপল যখন কোয়ান্টাম টানেলিং এর বিশদ বর্ণনা দিচ্ছিলেন তখন যেন আমি চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছিলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গিয়েছি।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ক্ষেত্রে দেখা যায় কঠিনসব নাম, তত্ত্ব থাকে। মুন্সিয়ানা লেখক এই জায়গায় দেখিয়েছেন। মাথা আউলে দেয়া তত্ত্বের মাঝেও লেখক দারুণ সুন্দর বাংলার ব্যবহার করেছেন। পুরো উপন্যাসে ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ হাতে গোনা ছিল। বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি পড়ছি এই অনুভূতিটাই সবসময় ছিল। মনে হচ্ছিল বাংলাদেশেরই কোন এক সময়ের কথা বলছেন লেখক।
যদিও শুরুতে তিনি বলেছেন এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের কাছে চিতা বাহিনীর এই যু দ্ধ ওই পরিচিত ঠেকবে। আসলেই তাই। চিতা বাহিনী, তাদের চর বিশ্বাসঘাতকেরা, পার্টিজান বাহিনী এগুলো রূপক অর্থে স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের অতীতের এক ঘটনা। বুদ্ধিজীবী নিধন, বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ দিয়ে সূচনা সবই কিন্তু পরিচিত ঘটনা!
বিভিন্ন প্রান্তের বর্ণনা এবং ঘটনা পড়তে গিয়ে যেন খেই না হারিয়ে যায় তাই উপন্যাসের শুরুতে চরিত্রদের নাম এবং কাজ, পরিচয় আলাদাভাবে দিয়েছেন। যা উপন্যাসে নিজেকে আটকে নিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
উপন্যাসের শুরু, মধ্যভাগ যত না উপভোগ্য ছিল তার পুরোটা ছাড়িয়ে গেছে শেষের দিকের ঘটনাগুলো। সমাপ্তি বা সম্ভাবনাগুলো লেখক এত সূক্ষ্মভাবে টেনেছেন যাতে পরিতৃপ্তি আসবেই। একরাশ মুগ্ধতা, বিষণ্ণতায় ছেঁয়ে যাবে আপনার মন।
চরিত্র:
উপন্যাসের চরিত্রগুলো নিয়ে আলাদা করে না বললে অবিচার করা হবে।
প্রথমেই আসা যাক নামে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি সাথে বাংলা একেবারে খাঁটি বাংলা নামের চরিত্রের মেলবন্ধন কেমন লাগে?
আদ্রিকা, মৃত্তিকা, মৈনাক, প্রান্তিক, আরাত্রিক, সমুদ্র, দিতা, মালিকা, শেফালিকা নামগুলো শুনলেই কেমন আপন আপন অনুভূতি হয়।
অসিতোপল, ত, দিতা, উপন্যাসের মূল ভিত্তি হলেও মৃত্তিকা, আদ্রিকা, মৈনাক কিংবা দুষ্টু বাহিনীর কর্নিক চরিত্র প্রত্যেকেই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাজ, উপস্থাপন এবং বৈশিষ্ট্য লেখক সুন্দরভাবে দিয়েছেন। এবং প্রতিটি চরিত্র নিজ অবস্থানে সেরা ছিল। আমার কাছে প্রট��গনিস্ট থেকেও অসিতোপল চরিত্রটা মনে ধরেছে বেশি। সমাপ্তিতে তার বিভিন্ন সম্ভাবনার যে উল্লেখ ছিল তার সাথে আমি নিজেও অন্যান্য আরো সমাপ্তি ভেবেছি। লেখকের সমান্তরাল তত্ত্বই হয়তো নিজের মতো ভাবতে প্রবোধ দিয়েছে।
প্রচ্ছদ, সম্পাদনা:
খুবই সাধারণ কিন্তু চোখে ভালো লাগার মতো প্রচ্ছদ বইটির। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
বইয়ের সম্পাদনা খুব ভালো হয়েছে। শেষের দিকে কিছু শব্দের ক্ষেত্রে একটু সমস্যা হয়ে গেছিল তবে সেটা সহনীয়।
দ্যু প্রকাশনের বইটির বাঁধাই, পৃষ্ঠার মান ছিল সেরা।
দীপেন ভট্টাচার্যের লেখা প্রথম পড়লাম এবং বলাই বাহুল্য সাই-ফাই জনরায় আমার প্রিয় লেখক হিসেবে তিনি স্থান করে নিয়েছেন। আমি কখনোই বইয়ের রেটিং করিনা। বিষয়টাকে আমার ক্ষমতার বাইরের কঠিন কিছু মনে হয়। অথবা নির্দিষ্ট রেটিংয়ে বইকে বেঁধে ফেলাটাকে সমীচীন মনে হয় না। তবে এই বইটার জন্য নিয়মের বাইরে আসাই যায়। পাঁচ এ একশ দিয়ে দিলাম একে!
ভাবুন তো, আসলেই সময় নিয়ে বাঁধা আসলো, বন্ধ করে দেয়া হলো সময় নিয়ে সকল কথা, ভেঙে ফেলা হলো সকল ঘড়ি বা বর্তমানের সাথে মেলালে মোবাইল, কম্পিউটার তথা প্রযুক্তির দারুণ এইসব আবিষ্কারের ব্যাবহার রুখে দেয়া হলো! কেমন হবে!
❛𝘛𝘪𝘮𝘦, 𝘵𝘩𝘦𝘺 𝘸𝘪𝘭𝘭 𝘮𝘦𝘴𝘴 𝘺𝘰𝘶 𝘸𝘪𝘵𝘩 𝘦𝘷𝘦𝘳𝘺 𝘶𝘯𝘪𝘷𝘦𝘳𝘴𝘦!❜