আমলাবেলা' কোনো আমলার জীবনকাহিনী নয়। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে জেল-জুলুম খাটা এক তরুণ তার রাজনৈতিক স্বপ্ন, বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা, সৃজনশীল কাজের চর্চা আর শ্রমঘন জীবনের স্বাভাবিক ভাবনা ও কর্ম ছেড়ে হয়ে গেল সিভিল সার্ভেন্ট। যার বাংলা অর্থ সুশীল সেবক। পেশাগত জীবনে হতে চেয়েছিল সাংবাদিক। অল্প বয়সে যুক্তও হয়েছিল সাংবাদিকতায়। কিন্তু পরিবার, সুহৃদ, স্বজন, এমনকি সাংবাদিকতায় তার সিনিয়র সহকর্মীদের চাপে স্বপ্নের পেশা ছেড়ে যোগ দিল সিভিল সার্ভিসে। প্রশাসন ক্যাডারে। পঁয়ত্রিশ বছরের আমলা জীবনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যুক্ত হলো বহুবিধ কাজের সাথে। পেশার ভেতরে ও বাইরে দেখলো অনেক কিছু। ভালো-মন্দ নানা ঘটনা, শতরকম মানুষ। তার দেখা কিছু ঘটনা ও চরিত্র গল্পের মতো করে তুলে ধরা হয়েছে 'আমলাবেলা'য়।
আমলাদের স্মৃতিকথার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। তারা বেশির ভাগ সময় নিজের ক্যাডারের দোষত্রুটি দেখতে পান না। বরং কীর্তির বয়ান লিখতে ও নিজেকে জনদরদির পাশাপাশি তুলসি পাতার মতো ধোয়া প্রমাণ করতে চান। এখানেই ১৯৮৬ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া হারুন রশীদ ব্যতিক্রমী। তিনি নাকউঁচু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিচিত্র কীর্তি গল্পের মতো লিখেছেন। পড়তে ভালো লাগে। এ-ও স্পষ্ট হয়, কেন এদেশে আমলাতন্ত্রের সংস্কার ফরজ হয়ে গেছে। এত বেশি শ্রেষ্ঠত্বের গরিমা ব্রিটিশ আমলের সাদা চামড়ার সাহেবরাও অনুভব করতেন কিনা, সন্দেহ।
আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব নিয়ে হারুন রশীদ লিখেছেন। প্রশাসন বনাম পুলিশ ক্যাডারের মধ্যে এক ধরনের শীতল লড়াই চলে তা হয়তো বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না। অথচ শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দুই ক্যাডারদের মধ্যে বেশ বড়ো ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব রয়েছে।
হারুন রশীদ চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে বিটিভির মহাপরিচালক ছিলেন। রাষ্ট্রায়ত্ত এই চ্যানেলটিতে যে পর্যায়ের দুর্নীতি ও তদবির চলে তা হারুন রশীদের লেখা না পড়লে বিশ্বাস করতে পারতাম না। অনেকটাই খোলামেলাভাবে বিটিভির সংকট ও তার কারণ নিয়ে লিখেছেন হারুন রশীদ।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী সেবকের বদলে প্রভুর ভূমিকায় কীভাবে অবতীর্ণ হয়, তার কিছু দৃষ্টান্ত হারুন রশীদের লেখায় পাই। আবার, সদিচ্ছা থাকলে আমলাদের পক্ষে জনকল্যাণমুখী অনেক কিছুই করা সম্ভব। ২০২৪ সালের বইমেলায় সূচীপত্র বইটি প্রকাশ করেছে। সুন্দর স্মৃতিকথা। ২৩২ পাতার বইখানা বেশ তরতরিয়ে পড়া যায়।
গতানুগতিক স্মৃতিচারণ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক আত্ম সমালোচনা রয়েছে। কয়েকটি অধ্যায়ের প্রথমে আংশিক কিছু বলে অন্যান্য বিষয়ে দূরদূরান্তের আলাপ করে পরে প্রাথমিক বিষয়ে ফিরে এসেছেন। পাঠক ধরে রাখার এই কৌশল বিরক্তিকর ধরা পড়েছে।
প্রাথমিক অধ্যায়গুলোতে প্রশাসন সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ স্বরূপ তুলে ধরতে পেরেছেন। চাকরি জীবনের প্রাথমিক অভিজ্ঞতাগুলো বর্তমানের প্রশাসনের অফিসারদের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ প্রযোজ্য। তবে সমালোচনা অনেক বেশি ও বিস্তারিত হলেও সে তুলনায় সফলতার গুটিকয়েক অভিজ্ঞতা গুলো বিস্তারিত আসেনি।
লেখক বাংলাদেশের সৌদি দূতাবাসে কাজের অভিজ্ঞতা বিশেষ করে শ্রমিকদের কষ্ট পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। বিটিভির মান কেন এতটা খারাপ বাংলাদেশ টেলিভিশনের ডিজি হিসেবে অভিজ্ঞতা আত্মপক্ষ সমর্থন মনে হয়েছে। বর্তমানে নাগরিকগণ বিটিভির সমালোচনা কম করে থাকেন, কারণ বিটিভি বা বাংলাদেশ বেতার তথা সরকারি গণমাধ্যম ইন্টারনেটের সুবাদে দর্শক শ্রোতাদের আড়ালে চলে গিয়েছে। প্রয়োজনীয়তা ও কমে গিয়েছে, কিন্তু লেখক তারপরেও অনলাইন অপেক্ষা গ্রহণযোগ্যতা বেশি বিবেচনায় টেলিভিশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে চেয়েছেন। কস্ট বেনিফিট বিশ্লেষণ করলে নিরপেক্ষভাবে বর্তমানে সরকারি গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
অভিজ্ঞতা গুলো এলোমেলো ভাবে লিখেছেন যা লেখক স্বীকার করেছেন। সার্বিকভাবে সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা ভিত্তিক বই হিসেবে খারাপ নয়। তবে প্রশাসনের চাকুরী সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে খারাপ লাগবেনা।
এই ধরণের বই প্রথম পড়েছিলাম, মাহবুব তালুকদারের আমলার আমলনামা। যদিও দুটি বইই ক্যাডার সার্ভিসের পেশাগত জীবনের স্মৃতিচারণ, তবে সেটার এবং হারুন রশীদের আমলাবেলার মূল পার্থক্য হলো স্মৃতিচারণের ধরণে। যেখানে মাহবুব সাহেব বেশিরভাগ সময়েই আলোচনা করেছেন কর্মজীবনের সময়কালীন দায়িত্ব পালন ইত্যাদি নিয়ে, সেখানে হারুন সাহেব বেশিরভাগ আলোচনাই করেছেন ক্যাডার সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ সংঘাত(বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে, বেশিরভাগই গুরুতর ঘটনা হলেও এত ফানি, হো হো করে না হেসে পারিনি!), ইগো ক্ল্যাশ, আন্তঃক্যাডার এর রেষারেষি ইত্যাদি নিয়ে। মূলত বইটা অফিস পলিটিক্স নিয়ে লেখা আরকী। তবে বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে হয়েছে- মরুর দেশে পাঁচ বছর অধ্যায়টি।
বইটা পড়েছি বইটই অ্যাপে। এই নিয়ে চারটা বই পড়লাম এই অ্যাপে। ইন্টারফেস ভালো, সবকিছুই ঠিক আছে তবুও পড়ে আরাম পাইনি একদমই। চোখ ব্যাথা করা, ঘোলা দেখা, স্পেসিং এ ঝামেলা হওয়া এগুলোর সাথে সবচেয়ে বড় ঝামেলা হচ্ছে, কাগুজে বইয়ের যে ইন হ্যান্ড ফিল সেটা কখনো এই রকম অ্যাপ বা ইবুক রিডার-ফিডার দিয়ে আসলে রিপ্লেস করা সম্ভব না। এগুলো ঠ্যাকা দিয়ে কোনরকমে কাজ চালাতে পারে, কাগজের বইকে রিপ্লেস কখনোই করতে পারবে না।