আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলে অদ্ভুত সব ঘটনা। কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আর কিছুর যায় না। আমরা কেন যেন অসংজ্ঞায়িত ঘটনাগুলো নিয়েই বেশি মাথা ঘামাই। প্রকৃতি হয়তো চায় না কিছু রহস্যের সমাধান হোক। এই বইতে তেমন কিছু অপার্থিব আর অতিপ্রাকৃত গল্পই তুলে ধরা হয়েছে…
আমাদের চারপাশের অদ্ভুত আর সংজ্ঞাহীন ২৯ টা গল্প নিয়ে সাজানো এই উইয়ার্ড টেল সংকলন। প্রত্যেকটা গল্পই দারুণ সুখপাঠ্য। হররের অনেকগুলো সাবজনরাতে লেখক বিচরণ করেছেন সাচ্ছন্দ্যে। কিছু গল্প আছে যেগুলো পড়লে কিছুটা বিদেশী গল্পের ছায়া পাওয়া যায় তবুও সেগুলোকে লেখক আমাদের চেনা পরিবেশের সাথে মিলিয়েই উপস্থাপন করেছেন। তাই প্রত্যেকটা গল্পই দারুণ উপভোগ করেছি।
অসংজ্ঞায়িত-২ জন্য অবশ্যই মুখিয়ে থাকব। ওটা অবশ্যই চাই। আর হ্যাঁ, প্রচ্ছদটা সত্যিই মারাত্মক রকমের সুন্দর। বেনজিনের প্রোডাকশনটাও।
রিডার্স ব্লক বা অল্প সময়ে কোনো বই পড়তে চাইলে ছোটগল্প সংকলন বেশ ভালো একটা অপশন। মূলত রিডার্স ব্লক কাটাতেই বইটা হাতে নিয়েছিলাম। অলমোস্ট ১০দিন ধরে অল্প অল্প করে পড়ে শেষ করলাম। বইয়ে হরর জনরার কয়েকটা সাব-জনরা; লাভক্রাফটিয়ান, আরবান লিজেন্ড, ক্রিপিপাস্তাস, অতিপ্রাকৃত নিয়ে ২৯টা ছোটগল্প রয়েছে। অধিকাংশ গল্পই লাভক্রাফটিয়ান হরর। লাভক্রাফটিয়ান হরর প্রচলিত ভুতপ্রেত থিওরি থেকে আলাদা। অজানা ভয়কে কেন্দ্র করে লেখক অনেকগুলো গল্প বলেছেন।
ছোটগল্পের আলাদা আলাদা রিভিউ দেওয়া বড়োই কঠিন তারউপর যদি ২৫৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ২৯ টা গল্প হয়। কয়েক পৃষ্ঠার এক একটা গল্প। কিছু গল্পে রহস্যের সমাধান হয়েছে, কিছু ওপেন এন্ডিং আবার কিছু গল্পে রহস্য রহস্যই থেকে গেছে। ঈশ্বরের দেখা পাওয়া বা সৃষ্টি রহস্য জানার পরে ব্যক্তির আত্মহত্যা বা মস্তিষ্ক বিকৃতি হওয়া নিয়ে বেশ কয়েকটা গল্প আছে। কনসেপ্ট একই কিন্তু কাহিনী আলাদা।
"বৃত্ত", "এ গল্পটি মৌলিক নয়", "পিশাচ", "ছয় মিনিট", "ইসাদোরা", "ট্রু ইটার", "ছায়া-কায়া", "পালনকর্তা", "বৃক্ষোভ", "ভ্রান্তি", "মোহ", "রক্ষক", "শিষ" গল্পগুলো বেশি ভালো লেগেছে। "প্রভাব" গল্পটা অনেক বেশি ভালো লেগেছে, টুইস্টের মধ্যে টুইস্ট। "মায়া" গল্পের সারমর্ম হলো পৃথিবীতে বারবার যুদ্ধই লাগে মানুষের লোভ ও নিজস্ব মতবাদের জন্য। যুদ্ধ বন্ধ করতে মেয়েটির বাবা যা করেছে একসময় পৃথিবীতে সম্ভবত তাই হবে। বারবার যুদ্ধ যাদের কারণে হয় তারা পৃথিবীতে না থাকলেই পৃথিবী শান্ত থাকবে। "অসংজ্ঞায়িত" গল্পটা একগুচ্ছ পিচ্চি গল্প মিলে একটা ছোট গল্প। "অ্যাপোক্যালিপ্স" ও "আঁধার আর ঈশ্বর" গল্প দুটো ভূমিপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত "অদ্ভুত আঁধার এক" গল্পসংকলনে আগেই পড়েছি। "পহেলা বৈশাখ" গল্পটাও আগে কোনো সংকলনে পড়েছি বলে মনে হচ্ছে কিন্তু কোন বইয়ে মনে পড়ছে না। একই গল্প একাধিক গল্পসংকলনে দেওয়াটা ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ না। একই গল্প ভিন্ন ভিন্ন বই থেকে বারবার পড়তে ভালো লাগে না। বানান ভুল খুবই অল্প কয়েকটা পেয়েছি। বইয়ের প্রোডাকশন ভালোই হয়েছে। প্রচ্ছদটা অনেক বেশিই সুন্দর। "অসংজ্ঞায়িত-১"- এর সাথে সময়টা তো ভালোই থাকলো। সিরিজের পরবর্তী বইগুলোর অপেক্ষায় থাকলাম।
❛সত্যি-মিথ্যা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে একটা সূক্ষ্ম স্থান থাকে। যেখানে হয়তো কোনো সূত্র, ব্যাখ্যা, সংজ্ঞা খাটে না। প্রচলিত অর্থে সেগুলোকে কোনো নাম দেয়া যায় না। তাই ব্যাপারগুলো হয়ে যায় বর্ণনার অতীত কিংবা ❛অসংজ্ঞায়িত!❜❜
বিশাল এই মহাবিশ্ব অসীম রহস্যের আঁধার। কিছু রহস্যের কিনার সম্ভব হলেও প্রকৃতি মাতা আপন রহস্যকে লুক্কায়িত রাখতেই বেশি পছন্দ করেন। তাই ঘটনার ব্যাখ্যা নেই, এমন কিছু দেখলেও কাউকে বিশ্বাস করানো যায় না। নিজে অভিজ্ঞতা না নিলে সব কিছুকেই হয়তো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় ফেলে দেয়া যায়।
একজন আছে ব্রেনের অপারেশনের পর থেকেই সবার মাথায় লাল, হলুদ ❛বৃত্ত❜ দেখতে পায়। লাল মানে খেল খতম, হলুদের মানে চলবে। আবার আরেকজন বই সংগ্রাহক আছে যে কি না এমন সব লেখকের বই সংগ্রহ করে যারা কিছুদিনের মধ্যেই ধরণী ত্যাগ করে। সেই অদ্ভুত ব্যক্তি নাকি সকলের ঘাড়ে লাল কিংবা সবুজ ❛পিশাচ❜ দেখতে পায়! এই মহাবিশ্বে আছে নাকি ❛একক সত্তা❜ (one entity)। পাড়াগাঁয়ে এমন অদ্ভুত এক ছবি দেখতে পায় তিনজন। অদ্ভুত হলেও সত্য তারা এমন এক ফকিরের কথা জানতে পারে যে কি না এমন একক সত্তার কথা বলেছিল। অদ্ভুত সেই ছবি দেখে নাবিলা, ফাহাদ বা উপমার কী হয়েছিল? একই গল্প স্থান, কাল, পাত্র পরিবর্তন করে বলে কত ভিউ যে কামানো যায় সেটা আজকের যুগের মানুষ ভালোই বুঝে। আসিফ যে গল্পটি বলল ❛এ গল্পটি মৌলিক নয়❜ সে তো বোঝাই গেল। কিন্তু এরপর যে অভিজ্ঞতা হলো সেটা মৌলিক না হলেও অদ্ভুত বটে। ক্লিনিক্যাল ডে থ শুরুর ❛ছয় মিনিট❜ পর্যন্ত মানব দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জীবিত থাকে। এই নিয়ে অতীতের এক থিওরির পরীক্ষা করতে চান ডা. ফাইরুজ। সাবজেক্টের শরীরে তাই পরীক্ষা শুরুর পর এমন ঘটনা ঘটলো যা ভুগিয়েছে অনেককে। এরপর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। আজও ভয়ের কারণ পরিত্যক্ত ঐ হাসপাতাল আর এলাকা। ❛লেট নাইট অফিস❜ করতে গিয়ে তিনজন কলিগ তাদের জীবনের ভৌতিক অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করলেন। কার অভিজ্ঞতা বেশি ভয়ের? পুরোনো কোনো বই বা ডায়েরি সবসময় কেমন একটা রহস্য ঘিরে থাকে। হাতে লেখা বহু আগের কোনো ডায়েরি পেলে সেখানে কী আছে জানতে তর সয় না। তবে কিছু জিনিস না পড়াই ভালো, না জানাই ভালো। সেগুলোর সম্মুখীন হলে জীবনটাই কেমন মূল্যহীন লাগে। তখন ❛সমাধি❜ হয়ে যেতে হয়। ❛ইসাদোরা❜ কে হারিয়ে ফেলেছে সে। দেখা হয় না আর। কিন্তু একটা সময় কেউ বিশ্বাসই করত না এই নামে কেউ তার সঙ্গী ছিল। অবশ্যই কখনোই কেউ বিশ্বাস করেনি। ❛ওগো সুবর্ণা, জানো কি তুমি, জানো কি?❜ জিঙ্গেল বলে সাংবাদিক সুবর্ণাকে ডাকলেন বিখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর ফারহান আরিফ। ব্যাখ্যাহীন কেসকে ব্যাখ্যার সীমায় এনে সমাধান করেছেন তিনি। এরপরেই পরিচিতি মেলে তার। তবে তিনিও অবিশ্বাস করেন না অতিপ্রাকৃতের সত্তা।
বাইরের খাবার খেতে পারেনা সে। একটু খেলেই হরহর করে বমি করে ভাসিয়ে দেয়। কী এক জ্বালা! ❛ট্রু ইটার❜ কি এমন হয়? মেহার থেকে পালক নেয়া ছোটো বিড়ালের বাচ্চাটাকে হারিয়ে ফেলেছে সে। আবার আরেকটা বাচ্চা যেন পাওয়া যায় তাই দেখা করতে আসা। জীবনে অনেক ঘটনা থাকে যাকে ❛অসংজ্ঞায়িত❜ ই রাখতে হয়। ব্যাখ্যা খুঁজতে যাওয়ার মানে নেই। একই মানুষ কি কখনো একই সময়ে দুটো ভিন্ন স্থানে থাকতে পারে? ইয়োর লিপস, মাই লিপস ❛অ্যাপক্যালিপ্স❜! ফারহান ডিবি অফিসার। সকালে হাঁটতে গিয়ে সন্ধান পেলো এক মৃ তদেহের। জানা গেল ভিকটিম নিজেই নাকি নিজের দুই চোখ কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে আত্মহ ত্যা করেছেন। কোলের ওপর অজ্ঞান পড়ে থাকা তার কন্যা এই তথ্য জানিয়েছে। কিন্তু কী এমন দেখে সে এই কাজ করলো? ঈশ্বরকে আমরা যেমন ভাবি তিনি হয়তো তেমন নন। হতে পারে সে মহান নয়, আমরা তার ভুলের ফল কিংবা আমরা তার হেলার সৃষ্টি। তাকে দেখতে পাওয়া সাধারণ কারো কাজ নয়। শ’ কিংবা হাজার বছরে একজন পায় দেখা। জয়াও কি সে একজন? ❛আঁধার আর ঈশ্বর❜ কোন দিকে মোড় নিবে জয়ার জীবন? মাইন হাসান দেশসেরা ইলেট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারদের একজন। তুখোড় মেধাবী। সাথে তুখোড় এক খু নি। ছেচল্লিশ জন মানুষের প্রাণের হরণকারী সে। কথাবার্তা অদ্ভুত। ঐ ❛আকাশ❜ এ নাকি দেখা দিবেন ঈশ্বর। আর তার রূপ? সবাই নিতে পারে না, পারে না নিতে! এমন এক দেশ আছে যার বর্ণনা করা সম্ভব না। গল্পের প্লট খুঁজতে গিয়ে লেখক শফি এমন এক চিত্র আঁকলেন যার অর্থ তিনি বুঝতে পারলেন না। এ কি কোনো ❛ওয়ান্ডারল্যান্ড❜? এমন চিত্র কেউ দেখলে সে সুস্থ থাকতে পারে না। ❛ছায়া-কায়া❜ তে ভরা এই বিশ্বে কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। শোনা যায় সবথেকে বেশি অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত ঘটনার শিকার নাকি হয় পিৎজা ডেলিভারি বয়রা। কেন? তারও আছে ব্যাখ্যা। ঝড়ের রাতে সুকান্ত গেছে নিরিবিলি এক বাড়িতে পিৎজা ডেলিভারি করতে। সামনে বসে থাকা লোকটা অদ্ভুত। ঘরজুড়ে ম্যানিকুইন দিয়ে ভর্তি। কেমন ছমছমে পরিবেশ। ওসমানী সাহেব বলছেন অতিপ্রাকৃত গল্প। আচ্ছা কখনো কাউকে সারপ্রাইজ করতে গিয়ে নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেছেন? ❛নাত্তু❜ কে দেখলে নাকি সেখানে বিপদ নেমে আসে। এর পিছের ইতিহাস বড়ো ভয়ানক। অদিতি এসবে বিশ্বাস করে না। তবুও আজ রাতটা তাকে একা থাকতে হবে। ❛পহেলা বৈশাখ❜ মানেই পান্তা ইলিশ আর বাঙালিয়ানা। কিন্তু মুনের জীবনের বৈশাখ বদলে গেছে আরো আগেই। জীবন কেন বদলে যায়? এ জগতের ❛পালনকর্তা❜ কে? ধর্মগুলো ব্যাখ্যা করে একেকভাবে। কিন্তু সে আদতে কেমন? ভবিষ্যতের পৃথিবী তো উন্নত। তারা বিশ্বাস করেনা অনেক কিছুই। তাইতো ২০২০ সালের মহামারী যখন দশ বছর ব্যাপী চলল তখন ডা. রায়হানের বানানো প্রতিষেধক দিয়ে পৃথিবী নতুন করে বাঁচতে শিখল। কিন্তু কেউ জানেনা এর পিছের কঠিন সত্য। এমন কি হয় আমাদের জীবনে ❛প্রভাব❜ আছে কোনো না কোনো সত্তার। সে সত্তা যদি হয় ব্যাখ্যার বাইরের কেউ তখন? নিহিলা বলে তার উপর ভ্যাম্পায়ারের প্রভাব আছে। এও কি বিশ্বাস করা যায়? তার স্বামী ফারহান ভীতু প্রকৃতির। কাকতাড়ুয়া ভয় পায়। এটাও কি প্রভাব? সমুদ্রের ছোট্ট এই দ্বীপে এসে অদ্ভুত দর্শন এক মূর্তি পায় রুহিন। নিয়ে আসে ❛বাতিঘর❜ এ। এখানেই থাকছে সে। সাথে এক বিদেশী লোক। তার থেকে এই মূর্তি সম্পর্কে অবিশ্বাস্য কথা শুনে সে। কিন্তু এসব আদৌ বিশ্বাস করার মতো? কিন্তু যে দৃশ্য সে দেখলো সেটার কী ব্যাখ্যা? বিক্ষোভের কথা তো শুনেছি। তবে শুনেছেন কি ❛বৃক্ষোভ❜ এর কথা? বিজ্ঞান আশীর্বাদ আর অভিশাপ দুই-ই বয়ে আনে। কেন যেন মনে হয় ভবিষ্যতের পৃথিবী বিজ্ঞানের আশীর্বাদ থেকে অভিশাপকেই বরণ করে নিবে। এর ফলেই তো গাছেরাও এমন বিধ্বংসী হয়ে উঠলো। মানুষের সম্পর্কে ❛ভ্রান্তি❜ আসতেই পারে। বাইরে থেকে দেখে ভেতরের ব্যাপার বোঝা যায়না। নিহিলার হয়েছে সেই দশা। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা কে? অতিপ্রাকৃত সত্তা না সিরিয়াল কি লার? ❛মায়া❜ কঠিন জিনিস। একে ছাড়ানো যায় না। অল্প কোনো কিছুর মায়া ছাড়ানো গেলেও যেতে পারে। তাই বলে আপন গ্রহের মায়া ত্যাগ সম্ভব? ছেলেটা কেমন যেন। নিয়েলা লক্ষ্য করছে। আজ ছেলেটা নিজেই কথা বলা শুরু করলো। বাইরে থেকে নিচতলার এই ঘরটা অল্প দেখা যায়। এমন অদ্ভুত ঘর কারো হয়? আবার কেমন গল্প বলছে ভয় দেখানো। কিন্তু কথায় কেমন একটা ❛মোহ❜ কাজ করছে। মোহতে কে পড়লো? সে ❛রক্ষক❜। প্রভু তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। কত গ্রহ থেকে প্রাণী আসলো তাকে কিছুই করতে পারল না। কিন্তু এবার কেন এমন হলো? কিসের জন্য সে গলে যাচ্ছে? মানুষের মাথায় কি আসলেই এত বুদ্ধি? ❛শিস❜ এর শব্দ যদি কাছে বা দূরে থেকে শোনা যায় তবে চিন্তার ব্যাপার। মেক্সিকোর এক কিংবদন্তী আছে এল সিলবন নিয়ে। কিন্তু এসব কি সত্যি? তবুও পুষ্পিতা ভয় পায়। যেই আসুক না কেন ❛দরজা খুলবে না❜। প্রেমিকাকে এটাই বললো গ্যাব্রিয়েল। তার মতো দেখতে কেউ হলেও যেন না খোলা হয় দরজা। কিন্তু কেন? গ্যাব্রিয়েল কোথায়? ❛লেখকের মৃ ত্যু❜ হলো ২৯ টা ছোটো গল্প লিখে। কিন্তু কেন সে এই পথ বেছে নিলো? অসংজ্ঞায়িতই থেকে যাবে!
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝অসংজ্ঞায়িত-১❞ লুৎফুল কায়সারের লেখা অতিপ্রাকৃত, হরর গল্পের সংকলন। ২৯ টি ছোটো গল্প নিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। ব্যাখ্যা নেই, কোনো সংজ্ঞায় বোঝানো যায়না তাই নিয়েই এই অসংজ্ঞায়িত ঘটনাগুলো রচিত। লেখকের ভাষায় ❛উইয়ার্ড টেলস সংকলন❜। অতিপ্রাকৃত, ভৌতিক কিংবা আদতেই সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা আছে না-কি এমন ঘটনা আমাদের কাছে ভয় ভূতুড়ে বলেই মনে হয়। এসব নিয়ে গল্প পড়তে, শুনতে ভালোই লাগে। একটা গল্প সংকলনে ২৯ টা গল্প থাকা ভালোমন্দ কি না সেটা মুখ্য নয়। ছোটো ছোটো আকারে গল্প যদি গল্পের মতো হয় পড়তে অত্যুক্তি হয়না। কিন্তু একটা গল্প সংকলনে অর্ধেকের কম গল্প যদি মনঃপুত হয় আর বাকি গুলো চাঁন্দেও জানে না , সূর্যেও জানে না ধরনের হয় তাহলে ভালোমন্দের ব্যাপারটা আসে।
২৫৬ পৃষ্ঠার এই সংকলন পড়তে আমি খুব বিরক্ত হয়েছি। হরর সংকলন কিংবা ব্যাখ্যাতীত সংকলন বললেও সলিড আকারে সেটা নয়। লাভক্রাফটিয়ান হরর জাতীয় গল্প ছিল। যেখানে সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর মূলত আমর প্রচলিত অর্থে যেমন দেখি তেমন নয় ভিন্ন। এই একই থিমে অনেকগুলো গল্প ছিল। ভিন্নতা নেই। ঐ একই আমরা ঈশ্বরকে যেমন ভাবি, তিনি তেমন নয়। তাকে মহান ভাবলেও সে তা নয়। ঈশ্বরকে দেখলে মানুষ বাঁচে না, কয়জন সিলেক্টেড লোকে এই দৃশ্য নিতে পারে। আকাশে দেখা দেয়, অসংখ্য চোখ তার আর শুড়। এই একই বাদ্য ছিল বেশ কয়েকটা গল্পে। গল্প ভিন্নতা নেই। ❛সমাধি❜, ❛আকাশ❜, ❛আঁধার আর ঈশ্বর❜, ❛ওয়ান্ডারল্যান্ড❜, ❛বাতিঘর❜ এই একই কনসেপ্টে লেখা। কয়েকটা আদতে হরর হলেও সেগুলোকে সাইফাই হিসেবেই বলা শ্রেয়। এগুলো কেন হরর গল্প হিসেবে টাইটেল পেলো বুঝলাম না। ❛রক্ষক❜, ❛বৃক্ষোভ❜, ❛মায়া❜ এই গল্পগুলোকে সাইফাই ব্যতীত অন্য কিছু বলা যায়না। ডিস্টোপিয়ান গল্প বললেও মানা যায় তাই বলে হরর? এগুলো কোন এঙ্গেল থেকে ব্যাখ্যাহীন বা অসংজ্ঞায়িত? মেক্সিকান কিংবদন্তী নিয়ে লেখা ❛শিস❜ গল্পটা ভালো আগাচ্ছিল। হুট করেই শেষে খেই হারিয়ে ফেললো। ❛ছয় মিনিট❜ গল্পের প্লটটা খারাপ না। কিন্তু গল্পটা ভালো লাগেনি। এখানেও আমি হরর ব্যাপার পাইনি। ❛বৃত্ত❜, ❛পিশাচ❜ এই দুইটা গল্প লাউ আর কদু। একই প্লট, একই কাহিনি শুধু দেখার পার্থক্য এই যা। ভালো লাগেনি তেমন। ❛বৃত্ত❜ গল্পে একবার বলা হয়েছে যে হলুদ মানে জীবিত আর লাল মানে কেল্লা ফতে। আবার পরের পৃষ্ঠাতেই লেখা হলো সবুজ মানে জীবিত। ❛ট্রু ইটার❜ গল্পটা কোনোভাবেই ভৌতিক নয়। কাল্ট রিলেটেড মানা যায়। এখানে ভয়ের ছিটেফোঁটাও নাইক্কা। ❛এ গল্পটি মৌলিক নয়❜ আসলেই মৌলিক না। ❛ইসাদোরা❜ গল্পটা ভোগাস লেগেছে। সস্তা ভৌতিক কিংবা অতিপ্রাকৃত হিসেবে ধরা যায়। ❛লেট নাইট অফিস❜ এটাকে হরর মনে হয়নি। একেবারেই খাস্তা গল্প লেগেছে। সুবর্ণাকে নিয়ে গল্পটাও মোটামুটি। সেখানে ইনভেস্টিগরের একটা খু নের সমাধান করতে যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এটা আমার কাছে জুতসই কোনো ব্যাখ্যা মনে হয়নি।
হরর গল্পে ১৮+ থাকবে এটা আমার কাছে অস্বাভাবিক না। যদিও গল্পে আমার এসব ভালো লাগে না। কিন্তু দুটো গল্প বিকৃত মানসিকতার কাহিনি না আনলে গল্প হতো না এমন তো না। খারাপ লাগা বেশি হলেও কয়েকটা গল্প আমার দারুণ লেগেছে। প্লট, এক্সিকিউশন, সমাপ্তি সবই সুন্দর ছিল। ❛অ্যাপক্যালিপ্স❜, ❛ছায়া-কায়া❜, ❛মোহ❜, ❛পালনকর্তা❜ এই গল্পগুলো ভালো লেগেছে। টুইস্ট ছিল, ভৌতিক আবহ কিংবা অতিপ্রাকৃত একটা ব্যাপার অনুভূত হয়েছে। ❛অসংজ্ঞায়িত❜ গল্পটাও ভালো ছিল। শুরুটা ভালো লাগেনি। শেষের টুইস্ট ভালো ছিল। সবথেকে বেকার লেগেছে শেষ গল্প। ❛লেখকের মৃ ত্যু❜ গল্পটা হুদাই লেখার জন্য লেখা মনে হয়েছে। লেখকের অনুবাদ পড়েছি কিছু। বেশ সাবলীল লেখার ধরন। সেই সাবলীলতা লক্ষ্য করা গেছে উনার গল্পেও। কাহিনি ভালো না হলেও লেখার কৌশলে সেগুলো পড়ে যেতে পেরেছি। একই কাহিনি, একই জাতীয় বর্ণনা না হলে হয়তো বইটা পড়ার অভিজ্ঞতা আরো ভালো হতো। গল্প সংকলনে একই নামের বহুল ব্যবহার আমার ভালো লাগে ���া। দেশে তো নামের অভাব নেই। একই নাম ব্যবহার না করলেও হয়। একই কথা ভৌতিক আবহ তৈরিতে। এদেশের অলিগলিতে ভূতের অনেক উপাদান আছে তাও ভৌতিক আবহ তৈরিতে একই বর্ণনা বা কাছাকাছি বর্ণনা একঘেঁয়ে মনে হয়েছে। বিদেশি ছায়াতেও কিছু গল্প আছে সেগুলো বর্ণনা বেশ ভালো ছিল। একটা ব্যাপার আমার নিজের কাছে ভালো লাগেনি। ফুটনোট বলতে আমরা জানি কোনো অজানা বিষয়ের তথ্য দেয়া। গল্পে উল্লিখিত কারমিল্লা, ড্রাকুলা, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড বইয়ের উল্লেখ করে সেটাকে ফুটনোটে লিখে দেয়া এর অনুবাদ অমুক প্রকাশনী তমুক অনুবাদক করছে এই বিষয়টা আমার খুবই ফা লতু লেগেছে। পুরো সংকলনকে মোটাদাগে ভৌতিক বলা যায় না। মিক্স গল্প সংকলন হিসেবে উতরে দেয়া যায়।
আমাদের দৃষ্টির আড়ালে আবডালে কিংবা কখনো কখনো আমাদের দৃষ্টিসম্মুখেই এমন অনেককিছু ঘটে, যাকে চাইলেই সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এসব অসংজ্ঞায়িত ঘটনাগুলো আমাদের জীবনের গতিপথ একদম কমিয়ে দেয়। বলতে গেলে, একপ্রকার থেমেই যায়। তখন জীবনে সামনে এগিয়ে চলা শুধু কঠিনই হয় না বরং অসম্ভবই হয়ে পড়ে। এমন সব কল্পিত অসংজ্ঞায়িত অনেকগুলো গল্প নিয়েই সাজানো হয়েছে “অসংজ্ঞায়িত-১”।
এই বইটি মূলত হরর গল্পের সংকলন। সচরাচর হরর বলতে আমরা যা বুঝি, অদৃশ্যমান কোনো কিছুর উপস্থিতি, এই বইটি তেমন না। এখানে হরর জনরার বেশ কয়েকটি সাব জনরা নিয়ে কাজ করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে সাব জনরা, তা হলো লাভক্র্যাফটিয়ান বা কসমিক হরর। এই জনরার সাথে আমি এই বইয়ের মাধ্যমেই পরিচিত। সাধারণত এই জনরায় এমন অস্তিত্ব বা ঈশ্বর সত্ত্বাকে দেখানো হয় যাদের কাছে এই মনুষ্যজাতি পিঁপড়ের মতো। সেই সত্ত্বা এই মনুষ্যজাতিকে স্বপ্নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার ঘুম ভেঙে গেলে তিনি মুহূর্তের মধ্যে আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারেন। সহজভাবে বলতে গেলে, আমরা যেমন পিঁপড়াকে কোনোকিছুই মনে করি না, চাইলেই পা দিয়ে পিষে ফেলতে পারি, তেমনই সেই সত্ত্বার কাছে আমরা পিঁপড়ের মতো। তিনি চাইলেই মুহূর্তে আমাদের পিষে ফেলতে পারেন। এই সত্ত্বা বা ঈশ্বরের কাছে আমাদের অসহায়ত্বই হলো এই জনরার মূল উপজীব্য।
আমি এই বই পড়ার মাঝখানেই এই জনরা নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করেছি এবং যা বুঝেছি তার সারসংক্ষেপই উপরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যদিও আমার ধারণায় ভুল থাকতে পারে। যারা এই জনরার সাথে পূর্বপরিচিত, তাদের এসব বিষয় বলাই বাহুল্য। যাইহোক, এই সাব জনরা ছাড়াও আরো কিছু গল্প রয়েছে যেগুলো ক্রিপিপাস্তা, স্যাটায়ার টাইপ লেখা। এছাড়াও সুপারন্যাচারাল হরর গল্পও রয়েছে।
একটা সংকলনে ২৯টি গল্প বিশাল সংখ্যা। আমার মনে হয়, সংখ্যাটা আরো কমানো উচিত ছিল। একই কনসেপ্টের একাধিক গল্প কিংবা ছোট ছোট কিছু গল্প ছিল, যেগুলো বাদ দেওয়া যেত। বিশেষ করে শুরুর দিকের কিছু গল্প ভালো লাগেনি। সে ব্যাপারেই আসছি। এতগুলো গল্প ধরে ধরে লেখা বেশ কষ্টসাধ্য। তবুও আমি চেষ্টা করছি সংক্ষেপে তুলে ধরার। • “বৃত্ত” গল্পটিতে আতিকা নামের একজনের মস্তিষ্কের অপারেশনের পর একটা সুপারন্যাচারাল পাওয়ার সে লাভ করে। এই গল্পটি ছিল ওপেন এন্ডিংয়ের। একই কনসেপ্টের আরেকটা গল্প সামনে এসেছিল— “পিশাচ।” দুটো গল্পের কনসেপ্ট একই হলেও “পিশাচ” গল্পটার প্লট তূলনামূলক অনেক ভালো ছিল।
এখানে একটা কথা বলি। ছোটগল্পে একজন লেখককে অনেকগুলো জিনিস উৎরাইতে হয়। আকর্ষণীয় স্টার্টিং, কম শব্দে বা বাক্যে কার্যকর উপমা ব্যবহার, চরিত্রায়ন, প্লট ইত্যাদি ইত্যাদি। তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় লেখকরা এসব জিনিস উৎরাইতে পারে না। যার কারণে পাঠক সমাজে ছোটগল্পের ডিমান্ড তূলনামূলক কম। এই বইয়ে উপরোক্ত বিষয়গুলোর ব্যবহার নিয়েও শেষে বলার চেষ্টা করব।
“একক সত্তা” গল্পের প্লট এবং স্টার্টিং ভালো ছিল। এই গল্পে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। “এই গল্পটি মৌলিক নয়”— এই গল্পের মতো গল্প ফেসবুকেই অনেক পাওয়া যায়। যারা হরর পড়ে তাদের কাছে এটা নিতান্তই বাচ্চার গল্প। “ছয় মিনিট” গল্পের স্টার্টিং ভালো। কিন্তু প্লট ভালো লাগেনি।
“লেট নাইট অফিস” গল্পে তিনজন নিজেদের ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বলে। কিন্তু সেগুলো শুনে আদৌ ভয় লাগার কথা কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। “সমাধি” গল্পটার প্লট আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে। স্টার্টিংও ভালো। আমার মতে পারফেক্ট একটা গল্প।
“ইসাদোরা” ছোট্ট একটা গল্প। লাস্টের টুইস্টটা ভালো ছিল। এই গল্পের দ্বিতীয় পৃষ্ঠার এক জায়গায় ইসাদোরার পরিবর্তে "ইসাবেলা" লেখা হয়েছে। “ওগো সুবর্ণা, জানো কি তুমি, জানো কি?” গল্পটির প্লট আর স্টার্টিং দুটোই ভালো ছিল কিন্তু ফারহানার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে প্রথমে যে ব্যাপারগুলোকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছিল, সেগুলো আমার কাছে অমূলক মনে হয়েছে। আর সামনে কী ঘটতে চলেছে, তাও খানিক অনুমেয়।
“ট্রু ইটার” গল্পটি বিকৃত মস্তিষ্কের একজন মানুষের গল্প। গল্পটাতে অনেককিছুই বেশ অনুমান করা যায়। “অসংজ্ঞায়িত” গল্পটিতে একজন নিজের বেশ কিছু ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে। এই গল্পটি ওপেন এন্ডিংয়ের ছিল। ভালো লাগেনি এটা।
“অ্যাপোক্যালিপ্স” গল্পটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। বিশেষ করে এই গল্পে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টা উল্লেখযোগ্য। অন্য সব গল্পের থেকে এই গল্পটি বেশি ভালো ছিল। স্টার্টিং, প্লট, চরিত্রায়ন, বর্ণনা... সবমিলিয়ে অসাধারণ। শুনেছি এই গল্প নাকি আগে একটা সংকলনে বেরিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে এটা আমি পছন্দ করি না। তবে গল্পটি এখানে পড়ে ভালো লেগেছে।
“আঁধার আর ঈশ্বর” গল্পটির শুরুতেই ঈশ্বরকে নিয়ে খানিক বর্ণনা করা হয়েছে। ধার্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ব্যাপারটা স্রস্টাকে বিকৃত করার মতো দেখায়। তবে আমি সেটাকে জাস্ট গল্পের জনরা অনুযায়ী প্রয়োজন বলেই ধরে নিয়েছি। এই গল্পে বেশ কিছু এডাল্ট সিন আছে। এগুলোর মধ্যে হার্ড এডাল্ট অল্পকিছু আছে, সেগুলো অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। গল্পটা এমনিতেই ভালো।
এছাড়াও ভালো লাগার তালিকায় আছে “ওয়ান্ডারল্যান, ছায়া কায়া, পহেলা বৈশাখ।” এই গল্পগুলোর প্লট ভালো লেগেছে। ছায়া কায়া গল্পের টুইস্টগুলোও দারুণ। স্যাটায়ারধর্মী দুয়েকটি গল্প আছে। সেগুলোও ভালো লেগেছে। কসমিক হরর বা লাভক্র্যাফটিয়ান জনরা যেসব গল্পে এসেছে, সেগুলো নতুনদের কাছে, আই মিন যারা এই জনরার সাথে পরিচিত নয় তাদের এক ধাঁচের মনে হবে। কারণ জনরাটাই এমন। যেমন: গল্পের চরিত্রগুলো এমন কিছু দেখছে যার কারণে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে কিংবা বেঁচে থাকার ইচ্ছে হারিয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করে বসছে। আবার, আকাশে একটা অস্তিত্বের আবির্ভাব হচ্ছে, সেখানে অসংখ্য চোখ আর সেগুলো থেকে বের হয়ে এসেছে অসংখ্য শুঁড়। এরকমই পরিণতি আছে অনেকগুলো গল্পে। যেগ��লোর এন্ডিং বা কনসেপ্ট একই ধরনের মনে হবে।
শেষে “ভ্রান্তি” গল্পটার টুইস্ট পড়ার পর আমি হাসতে হাসতে শেষ। কারণ প্রথম থেকে এই গল্পে ভয়ের অনুভূতি জাগলেও শেষে এসে তার মূলই পাল্টে যায়। এরপর “মায়া, রক্ষক, শিস” এই গল্পগুলোও বেশ উপভোগ করেছি এবং এগুলোর শেষের টুইস্টগুলো ছিল অসাধারণ। আর সবশেষে “লেখকের মৃত্যু” গল্পটা বইয়ের শেষ গল্প হিসেবে বেশ, কিন্তু গল্পটার বিশেষত্ব...., হয়তো আমার সীমিত জ্ঞানের কারণেই এর বিশেষত্বটা ধরতে পারিনি।
সবগুলো গল্প আলাদা আলাদা করে লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু সময় বা ধৈর্য্য কোনোটাই আমার সহায় হয়নি। যাইহোক, ছোটগল্পের বেশ কিছু বিষয়ের কথা পূর্বে বলেছিলাম। শুরুতেই আসে হলো আকর্ষণীয় স্টার্টিং, যা পাঠক এবং গল্পের মাঝে সংযোগ স্থাপন করবে। আর বলাই বাহুল্য যে ছোটগল্পে শুরুতেই এটা করতে হবে কারণ এর ব্যপ্তি একদমই কম। এই জায়গায় লেখক উৎরিয়ে গিয়েছেন। অন্তত আমার যে গল্পগুলো মনে আসছে, সেগুলোতে লেখক ভালোই করেছেন।
আমি আগেই বলেছি, ২৯ একটা বিশাল সংখ্যা। একটা সংকলনে এতগুলো গল্প শোভা পায় না, আমার মতে। হরর জনরার বাইরে গিয়ে যদি সামাজিক, থ্রিলার, রোমান্টিক কিংবা অন্য কোনো জনরার গল্প মিলিয়ে হলে সেটা আলাদা কথা ছিল। তাই সব গল্প খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করাও দুষ্কর।
এবার আসব গল্পের ফ্লো নিয়ে। প্রায় প্রত্যেকটা গল্পের ফ্লো ছিল মারাত্মক গতিশীল। দুয়েকটি গল্প যে ব্যতিক্রম, তার একটা উদাহরণ হলো “পিশাচ” গল্পটা। কনসেপ্ট অনুযায়ী প্রতিটা গল্পের ফ্লো ভালোই ছিল। এছাড়া বর্ণনার দিক থেকেও ভালো বলতেই হয়। তবে বেশ কিছু জায়গায় হার্ড এডাল্ট সিনগুলো কমানো যেত বলে মনে হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে “অ্যাপোক্যালিপ্স” আমার কাছে সবথেকে সুন্দর লেগেছে।
তবে একটা জিনিস, বেশিরভাগ গল্পগুলোই অনুমেয় ছিল। আগামীতে কী ঘটতে চলেছে এটা আমি প্রথমাংশের প্রায় সবগুলো গল্পতেই অনুমান করতে পেরেছি। যেহেতু গল্পগুলো একই ধাঁচের ছিল। • প্রচ্ছদ দেখলেই অনুমান করা যায় যে ভেতরে কসমিক হররের উপস্থিতি রয়েছে। কনটেন্টের সাথে প্রচ্ছদ পারফেক্ট ম্যাচিং করেছে। বইটা হাতে নিলেই প্রোডাকশন সম্বন্ধে ধারণা পেয়ে যাবেন। এককথায়, চমৎকার ছিল।
বানানে বেশ অনেক ভ্রান্তি চোখে পড়েছে। সংখ্যাটা আমার মতে বেশ বড়ই। সম্পাদনার ক্ষেত্রে আরো একটু নজরদারি চালানো উচিত ছিল।
সবশেষে সবচেয়ে বড় যে অবজেকশনটা, আবারও বলছি। একটা সংকলনে ২৯টা গল্প বড় সংখ্যা, যেখানে সবগুলো গল্প একই জনরার। তাই আগামীতে এটার পরবর্তী কিস্তি আসলে সংখ্যাটা অবশ্যই কমানোর পরামর্শ থাকবে।
পরিশেষে, কিছু কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভালো। মানব মস্তিষ্কে সবকিছু ধারণ করতে গেলে তা অকেজো হয়ে পড়বে। সুতরাং যতটুকু জানা দরকার, তাই জানুন। নচেৎ পরিণাম খারাপ কিছু হবে।
বই : অসংজ্ঞায়িত-১ (উইয়ার্ড টেলস সংকলন) লেখক : লুৎফুল কায়সার পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৫৬ প্রকাশনী : বেনজিন মুদ্রিত মূল্য : ৪৬৪৳ প্রথম প্রকাশ : মে, ২০২৪ প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী
অসংজ্ঞায়িত! আমাদের চারপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা প্রচলিত সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করা যায় না। হয়তো মনের কল্পনা ভেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পরিবেশ, প্রকৃতিতে কিছু তো একটা হয়; যা বর্ণনাতীত। এই সব ঘটনা যাদের সাথে ঘটে, তাদের কথাও কেউ বিশ্বাস করে না। হেসে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারপরও সেইসব ঘটনার সত্য ভিত্তি হয়তো থাকে, কিংবা থাকে না। বিজ্ঞানের এই যুগে ভূত, প্রেত, অতিপ্রাকৃত বিষয় কে-ই বা বিশ্বাস করে! তাই বলে কি সব মিথ্যে হয়ে যায়?
বইটির প্রচ্ছদে বলা হয়েছে, বইটি “উইয়ার্ড টেলস সংকলন”। এমন কিছু গল্পের সংকলন, যা আপনাকে বিভ্রান্ত করবে। স্বাভাবিক এই সময়ে অস্বাভাবিকতা ঘিরে ধরে। যা বিশ্বাস করা যায় না, আবার অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছে হয় না। প্রাকৃতিক নয়, এমন কিছু ঘটনা বা গল্পের এক সংকলন বইটি।
বলছিলাম লুৎফুল কায়সারের লেখা “অসংজ্ঞায়িত-১” বইটির কথা। যেখানে ঊনত্রিশটি অতিপ্রাকৃত গল্পের এক মিশেল ঘটেছে। যা ভাবাবে, শিহরিত করবে, আবার কিছুটা বিরক্তির ভাব এনে দিবে। এতগুলো গল্পের সংকলনের রিভিউ লেখা আমার কাছে বরাবর কঠিন লাগে। সবগুলো গল্প নিয়ে আলোচনা করলে যেমন স্পয়লার হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, তেমনি রিভিউও বিশাল আকৃতি ধারণ করবে। তাই এবার কোনো গল্প নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলব না। নাম উল্লেখ না করে গল্পের থিম আলোচনা করব। হয়তো দুয়েকটা গল্প নিয়ে আলোচনা হতেও পারে।
লুৎফুল কায়সারের এই বইটি নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। যেখানে ঊনত্রিশটি গল্প জড়ো হয়েছে, সেখানে সবগুলো গল্পই যে ভালো হবে এমন না। কিছু গল্প বেশ ভালো লেগেছে। কিছু গল্প একদমই মনমতো হয়নি। ধরা যেতে পারে বিলো এভারেজ। কিছু গল্প আবার এভারেজ। সব মিলিয়ে মোটের উপর খারাপ লাগেনি। আবার খুব যে ভালো লেগেছে এমনও মনে হয়।
যদি বইটির সেরা গল্প বলতে হয়, তাহলে নির্দ্ধিধায় বলা যায় “অ্যাপোক্যালিন্স” গল্পটার কথা। গল্পটির বিস্তৃতি অন্য যেকোনো গল্পের চেয়ে বিশাল। ফলে গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখকের গল্প বলার ধরন, উপস্থাপনা, ধারাবাহিকতা সব ভালো ছিল। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ হয়েছে “ছায়া-কায়া” গল্পটা। সাদামাটা গল্প। খুব যে আড়ম্বর ছিল, এমন না। তারপরও দারুণ লেগেছে। যেখানে এক দারুণ ভৌতিক আবহ তৈরি করেছিলেন লেখক। একজনকে ভয় দেখাতে গিয়ে নিজেই এক ভৌতিক হবে জড়িয়ে যাওয়ার এই গল্পটা বেশ উপভোগ্য।
“পালনকর্তা” গল্পটিও বেশ ভালো লেগেছে। ভৌতিক আবহের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ছোঁয়া আছে গল্পটিতে। “ছায়া-কায়া” গল্পটির মতো “মোহ” সাদামাটা, কিন্তু বেশ উপভোগ্য একটা গল্প। ভালো লেগেছে। বিশেষ করে ভয়ের এক ধরনের শিহরণ উপস্থিত ছিল। যা গল্পটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। “অসংজ্ঞায়িত” নামের একটা গল্প ছিল। গল্প না বলে টুকরো টুকরো কিছু ঘটনা বলা যেতে পারে। যা ব্যাখ্যার অতীত। কিন্তু গল্পটার শেষটা বেশ মনে ধরেছে। একটু ব্যতিক্রম, কিন্তু এভাবে উপস্থাপন করা লেখকের কৃতিত্ব।
ঊনত্রিশটি গল্পের সংকলন! বইয়ের আকারে মাত্রাতিরিক্ত? আমার তা মনে হয় না। একটি গল্প সংকলনে ঊনত্রিশ বা তারও বেশি গল্প থাকতেই পারে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। যদি একাধিক গল্পের রেশ একই ধরার হয়, থিম-প্লট যদি মিলে যায়; তাহলে পড়ার সময় এক ধরনের একঘেঁয়েমি কাজ করে। এই বইটির ক্ষেত্রে সেই বিষয়টি বেশ প্রকট ছিল। একাধিক গল্প একই থিমে সামনে আসছিল। গল্প ভিন্ন হলেও কিছু কিছু ঘটনা মিলে যাচ্ছিল, ফলে ঠিক উপভোগ করা যাচ্ছিল না পুরোপুরি। মাঝেমাঝে মনে হচ্ছিল, যে ভয়ের আবহ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে তা অনেকটাই জোরপূর্বক। ফলে বিরক্ত লাগছিল বেশি।
বইয়ের গল্পগুলোকে আমি তিনভাগে ভাগ করি। প্রথম অংশে রাজশাহীর কিছু গল্প স্থান পেয়েছে। লেখক যেহেতু রাজশাহীর মানুষ, সেহেতু রাজশাহীর অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ লেখকের লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় অংশে লেখক ঈশ্বর নিয়ে বেশ কয়েকটা গল্প লিখেছেন। আমি জানি, গল্পের সাথে লেখকের মতবাদ মেলানো ঠিক না। কিন্তু তারপরও কিছু প্রশ্ন থাকে। লেখক এসব গল্পে দেখিয়েছেন, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলেও সব শক্তি তার নেই। তিনি পাথর সৃষ্টি করতে পারেন না, পারলেও বিশাল পাথর তোলার শক্তি তার নেই। বিষয়টা এমন না। যিনি সর্বশক্তিমান, তিনি নিজের শক্তি প্রদর্শন করেন না। যারা নিজের শক্তি জাহির করে, তাদের ওই নির্দিষ্ট ক্ষমতা ছাড়া কিছু নেই।
আর তৃতীয় অংশে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির সাথে অতিপ্রাকৃত বিষয় মিলেছে। পুরো বইটা যে আমার সূত্র মেনে চলেছে, বিষয়টা এমনও না। তবে বইটি পড়লে বোঝা যাবে, একই ধারার গল্প পাশাপাশি এসেছে। এইটা যদি শাফল করে আগে-পরে উপস্থাপন করা যেত, একঘেঁয়েমিতা কম হতো।
আগেই বলেছি, একই থিম বা একই ঘটনা একাধিক গল্পে এসেছে। যেমন, বইত��� অতিপ্রাকৃত প্রাণী হিসেবে লেখক বারবার দেখানোর চেষ্টা করছেন অনেকগুলো চোখ আছে বা বিশাল এক চোখ আছে। আবার সেই প্রাণী থেকে অনেকগুলো শুড় বেরিয়ে আসছে। একাধিক গল্পে একই ধরনের প্রাণী দেখতে দেখতে মনে হয়েছে লেখকের কল্পনাশক্তির সীমাবদ্ধতা এখানেই।। ফলে ভিন্ন কোনো প্রাণীর অবয়ব তার ভাবনাতে বিস্তার লাভ করেনি।
আবার কিছু দৃশ্য ছিল— ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা বা ঘটনা। যা দেখলে মানুষ সহ্য করতে পারে না। ভয়ের এক অদ্ভুত শিহরন খেলে যায়। এরপর মানুষ পাগল হয়ে যায়, নয়তো আত্মহ ত্যা করে। অনেকগুলো গল্পেই এমন ঘটনা ছিল। ফলে একই ধরনের ঘটনা পড়তে পড়তে একটু বেশি প্রেডিক্টেবল হয়ে গিয়েছিল গল্পগুলো। এখানেও লেখকের কল্পনাশক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করে।
আবার একটা গল্পে দেখা যায়, এক মেয়ে যার মাথায় লাল বৃত্ত দেখে, সে-ই মারা যায়। এই গল্পটা ভালো লেগেছিল। কিন্তু পরবর্তী আরেকটি গল্পে দেখা যায়, এক ছেলে যেই লেখকের মাথায় লাল পিশাচ দেখে সেই লেখক মারা যায়। দুইটি ভিন্ন গল্প হলেও থিম একই। ফলে একঘেঁয়েমিতা চলে আসা অস্বাভাবিক নয়। গল্প ভালো হলেও অবচেতন মনের মিল খুঁজে পাওয়ার কারণে অতটা ভালো লাগেনি।
দুইটা গল্পে ১৮+ ঘটনা ছিল। যা আমার ভালো লাগেনি। এখন বলতে পারেন, ভালো না লাগার কী আছে? এগুলো তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সামান্য ১৮+ দেখে ছি ছি করা দেশের জনসংখ্যা বেশি— ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো আপনার বলতেই পারেন। কিন্তু এখানে আমার সমস্যা আছে। একজন পালক পিতা তার মেয়ের সাথেই প্রতি রাতে সহবাস করছে, এটা কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না। একজন মানসিক ডাক্তার তার রোগীর উপর যৌনতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না। এগুলো উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা ছাড়া কিছুই না। আর বইয়ে এসব আমার পছন্দ নয়। একজনকে শাস্তি দিতে কেন যৌনতা আনতে হবে? তাও এত বিকৃতভাবে? একটা দারুন গল্প এভাবেই নষ্ট হয়।
লেখকের গল্প বলার ধরন ভালো লেগেছে। কিছু গল্প গতিশীল ছিল, কিছুটা আবার ধীরস্থির। একজন লেখকের জানা উচিত কখন গল্পের গতির লাগাম ছাড়তে হয়, কখন ধরতে হয়। লুৎফুল কায়সার সেই কাজটা ভালোভাবেই করেছেন। ভাষাশৈলী বেশ সাবলীল। পড়তে আরাম লাগে। যখন দরকার তখন সংলাপের উপর জোর দিয়েছেন, আবার বর্ণনার প্রয়োজন, তখন বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে পড়ার স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়নি।
একটা জিনিষ ভালো লেগেছে, লেখক এসব অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জুড়ে দিয়েছেন। যেখানে মেক্সিকোর কিংবদন্তি ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডুবে যাওয়া জাহাজের বর্ণনা ছিল। কিছু ভৌতিক সত্য ঘটনাকে তুলে এনেছেন গল্পের আকারে। বিদেশের ঘটনাগুলো দেশীয় আদল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। লেখকের এই দক্ষতার তারিফ করতেই হয়।
লেখক কিছু গল্পে বর্তমান সময়ের যে সমস্যা তাও তুলে ধরেছেন। পৃথিবী দিনে দিনে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। ফলে কী হবে, কীভাবে মানুষ বেঁচে থাকবে— তার উপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি স্থান পেয়েছে বইটিতে। করোনাকালীন সময়ে এর পরবর্তী বেঁচে থাকার যে প্রয়াস, মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে ফেলা! এর উপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার মিশেল দিয়ে যে গল্পটা ছিল, সেটাও ভালো লেগেছে।
কিছু চরিত্রের নাম লেখক একাধিক গল্পে ব্যবহার করেছেন, এতে একটু গোলমাল লাগছিল। ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করা যেত। বাংলা নামের এত আকাল তো পড়েনি। তাহলে একই নাম একাধিক গল্পে ব্যবহার করা কেন?
▪️বানান, সম্পাদনা, অন্যান্য :
বইটির সম্পাদনা করা হয়েছে কি না আমি জানি না। বেনজিন প্রকাশন সম্পাদনার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় না বলেই জানি। তাহলে এই বইটার সম্পাদনার এমন অভাব কেন? যা বেশ চোখে লেগেছে। বানান ভুলের ছড়াছড়ি। কোথাও শব্দ মিসিং হয়ে গিয়েছে। যেন বইটি প্রকাশ করতে বড্ড তাড়া ছিল। এই দিকটা নজর দেওয়া প্রকাশনীর প্রয়োজন ছিল।
এছাড়া প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ। বইটির নামানুসারে প্রচ্ছদ বেশ ইউনিক হয়েছে। দেখতে ভালো লাগে।
▪️পরিশেষে, অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর সত্যতা কতটুকু? আমরা এর কাছ শুনি, সে তার কাছে শুনে, ও কার কাছে শুনে? এভাবেই মুখে মুখে ঘুরেফিরে গল্পগুলো ভয়ের আকার ধারণ করে। যেগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। হয়তো সত্যের সাথে মিথ্যের মিশেল হয়। তারপরও যা রটে, তা কিছুটা হলেও ঘটে।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ মোট ২৯টি ভীতিকর গল্পের সমন্বয়ে লেখা বই 'অসংজ্ঞায়িত - ১।' ছোট বেলায় 'একের ভিতর অনেক' টাইপের গাইড বইগুলোতে একটি ক্লাসের সব বইয়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া থাকতো। এই বইটিও ঠিক তেমনই। লেখক বইটিতে হরর জনরার বেশ অনেকগুলো সাব-জনরা নিয়ে কাজ করেছেন। তার মধ্যে ক্রিপিপাস্তাস, লাভক্র্যাফটিয়ান, কসমিক হরর, আরবান লিজেন্ডস ও অতিপ্রাকৃত হরর অন্যতম। বইটি আমাদের গতানুগতিক হরর থেকে একটু অন্য ধাঁচে লেখা। লেখক মূলত ফোকাস দিয়েছেন লাভক্র্যাফটিয়ান হরর টোনের দিকে। হরর বলতে আমরা বুঝি ভীতিকর কিছু। ভূতের বিবরণ পড়েই আপনার ভয় পেতে হবে এমনটাও নয়। ঠিক লাভক্র্যাফটিয়ান হররে সরাসরি কোন ভূত-প্রেতের উপস্থিতি নেই তবুও গল্পটা কেমন করে যেন ভয়ের।
বইয়ের একটা গল্প আরেকটার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও ইউনিক। এবং প্রতিটা গল্পের সাথে লেখক এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, যা পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। বইয়ের সবগুলো গল্পই আকর্ষণীয় ও আগ্রহ জাগানিয়া। সে অনুযায়ী এক্সিকিউশনও বেশ দুর্দান্ত। সেই সাথে লেখক দারুণসব হরর এলিমেন্ট, রহস্য ও ছোটখাটো টুইষ্টের মাধ্যমে এক অসাধারণ কম্বিনেশন যোগ করেছেন।
লুৎফুল কায়সার ভাইয়ের গল্প বলার স্টাইল বরাবরের মতোই দারুণ। চেনা-পরিচিত উপাদানগুলোকে তিনি অচেনা মোড়কে ঢেকে দিতে পারেন। সংলাপ ও গল্পের চরিত্রগুলোকেও দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি৷
সবশেষে, আমার মতো যাদের কসমিক হরর কিংবা লাভক্র্যাফটিয়ান হরর পছন্দ তাদের জন্য বইটি মাস্ট রিড।
"আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ঘটে চলে অদ্ভুত সব ঘটনা। কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আর কিছুর যায় না।"
শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর বিকাল ৩:০৯।
শেষ করলাম লুৎফুল কায়সার ভাইয়ের লেখা বই 'অসংজ্ঞায়িত-১'। অসংজ্ঞায়িত! অর্থাৎ, যার সংজ্ঞা দেয়া সম্ভব না। বইটির প্রচ্ছদেও বলা হয়েছে, "উইয়ার্ড টেলস সংকলন"। অর্থাৎ, এমন কিছু গল্প যা আপনার কাছে অদ্ভুত মনে হবে।
লুৎফুল কায়সার ভাইয়ের এই 'অসংজ্ঞায়িত' বই সাজানো হয়েছে ২৯ টা গল্প দিয়ে। গল্প পড়তে আমার দারুণ লাগে। অন্যদিকে, হরর হচ্ছে আমার সবচাইতে পছন্দের জনরাগুলার একটা। তাই এই দুটোর মিশেলে যখন বই, তখন অবশ্যই পছন্দ হতে বাধ্য। এই বইটা নিয়ে আমার মধ্যে জল্পনা কল্পনাও ছিলো ব্যাপক। খুব এক্সাইটেড হয়েই পড়া শুরু করেছিলাম। তবে, সত্যি বলতে একটু আশাহতই হতে হয়েছে।
বইটার ব্যাপারে বলতে গেলে বলবো, বইটা নিয়ে আসলে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কিছু গল্প ভালো লেগেছে, কিছু গল্প এভারেজ লেগেছে, আবার কিছু গল্প একদমই ভালো লাগেনি। আমার মতে, ছোটগল্প মানেই হচ্ছে, এর একটা রেশ আপনার ভেতরে থেকে যাবে। হাতে গোনা কয়েকটা গল্পে এরকমটা মনে হয়েছে। বাকিগুলা বিলো এভারেজই বলা যায়। এমন অনেক গল্প এই বইয়ে আছে যেগুলা শুরু থেকেই দুর্দান্ত লাগলেও শেষটায় হতাশ হতে হয়েছে। তাই, বইটা পুরোপুরি উ��ভোগ করতে পারিনি। তবে, লুৎফুল কায়সার ভাইয়ের গল্প বলার ধরনটা বেশ লেগেছে। একদম অনবদ্য।
সবমিলিয়ে, আমার কাছে এভারেজ লেগেছে। একবার পড়ার জন্যে ঠিক আছে। পড়ে দেখতে পারেন।
অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প নিয়ে এই মৌলিক গল্প সংকলন বেশ ভালো ছিল। একেকটা গল্পের টেস্ট একেকরকম। যদিও কিছু কিছু গল্প এভারেজ লেগেছে। কিন্তু বেশিরভাগ গল্পই দারুণ ছিল।
লেখকের দোষ না, আমি এই সাব-জনরের বই পছন্দ করি না। অনেকসময় যেমন কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা করা হয়, তেমনি লাভক্রফটিয়ান বইতেও জোর করে ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়।
কনসেপ্ট ভালো, তবে জোরপূর্বক ভৌতিক অনুভূতি আনার চেষ্টা। লেখার ধরন ভালো, ছোটগল্প হিসেবে প্রত্যেকটাই কেমন যেন মাঝ রাস্তায় তাড়াহুড়ায় শেষ করা হয়। আশা করি সামনের বইগুলা ভালো হবে।