এ যে আদিগন্ত বিস্তৃত একটা বালিয়াড়ি। মাঝে মাঝে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা খেজুর গাছ। বালিয়াড়ির মাঝখানে একটা উঁচু ঢিপি আর তার ওপর সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত স্ট্রাকচারের মন্দিরটা। চারদিক শুনশান। কেউ কোথাও নেই। শুধু শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। এমন সময় আবার মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই বিশাল চেহারার সিংহটা। বাদামি কেশর কাঁধ ছাপিয়ে পিঠ ছুঁয়েছে। প্রকাণ্ড বলিষ্ঠ থাবা। এ দিক ও দিক তাকিয়ে অলস ভাবে একটা গর্জন করল সে আর তখনই কে যেন মৃদু শিস দিল মন্দিরের ভেতর থেকে। সেই শিস শুনে পোষা কুকুরের মতো সিংহটা পেছন ফিরে এগিয়ে গেল মন্দিরের দরজার কাছে। ভেতরটা অন্ধকার। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবু বোঝা গেল, একটা মানুষের অবয়ব এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। সিংহটা সেই ছায়ামূর্তিকে দেখে যেন ভারী আনন্দিত হল। মাথা ঘষতে শুরু করল তার পায়ে। অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক রমণীর সুডৌল হাত। বহুমূল্য রত্নরাজিতে খচিত অলঙ্কারে ভূষিত সেই হাত পরম স্নেহে স্পর্শ করল সিংহের কেশরদাম। যেন বিলি কেটে দিল তাতে। তার পর সিংহের গলায় পরিয়ে দিল রত্নখচিত এক কণ্ঠবন্ধনী।
বইটি শুরু হয়েছে ছোট্ট, অথচ মন ভালো করে দেওয়া দুটি গল্প দিয়ে। তারা হল~ ১. দৈবী; ২. ইদ্রিশঠাকুরের থান। এরপর এসেছে একটি অত্যন্ত গথিক, আদতে ঘোর মনস্তাত্ত্বিক বড়োগল্প। সেটি হল~ ৩. বউকালীবাড়ির বেত্তান্ত। বইয়ের এই অবধি— অর্থাৎ তার মোট আয়তনের এক-তৃতীয়াংশের কম অবধি পরিসরে আমরা প্রথম খণ্ডের লেখককে পেয়েছি। তারপরেই এসেছে বইয়ের একমাত্র উপন্যাস, যা আবার গোটা উপন্যাসের একটি অংশ মাত্র। সেটি হল~ ৪. মহাসিন্ধুর ও'পার থেকে। আর এই পর্যায়েই একটা বিরাট গোলমাল হয়ে গেছে। মনোজগতের মন্থনের পরিবর্তে আমরা পেয়েছি ভীষণরকম ছকবন্দি কিছু চরিত্র— যারা হঠাৎ নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, এমনকি সত্তাকে হারিয়ে হয়ে উঠেছে রঙ্গমঞ্চের কাঠপুতলি। ভয়ের বদলে দেখা দিয়েছে বীভৎসরসের আধিক্য— যা দিয়ে আখেরে কোনো লাভ হয় না। সর্বোপরি... সর্বোপরি প্রথম বইয়ে, এমনকি এই বইয়েরও একমাত্র বড়োগল্পে যে বুদ্ধিমত্তা বা ইনটেলিজেন্সকে লেখক সবচেয়ে বড়ো জাদু বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তা— এই উপন্যাসের চরিত্রদের আচরণ দেখে মনে হয়— যেন একেবারে বিলুপ্ত হয়। হতাশ হলাম। পাঠকদের, তার থেকেও বেশি করে প্রকাশকের দাবি মেনে লেখক নিশ্চয় আগামী দিনে এই উপন্যাসের পরবর্তী খণ্ড পেশ করবেন। দুগ্ধবতী গাভীকে দোহনের মতো করে সেই পরবর্তী খণ্ডেরা রেকারিং ডেসিমেলের মতো আসতে থাকলেও অবাক হব না। তার কারণ, "নিকষ ছায়া"-র লেখক আমাদের ত্যাগ করেছেন। যিনি তাঁর জায়গায় লিখছেন, তিনি 'তান্ত্রিক হরর' ধারার আরও অনেক প্রিটেন্ডারের একজন মাত্র।
ভাদুড়ি মশাইয়ের সঙ্গে প্রথম আলাপ মির্চি বাংলার হাত ধরে ,'পর্ণশবরীর শাপ' প্রথম শোনা গল্প। তারানাথ এর পর কোনোও তন্ত্র বিষয়ক লেখা এই প্রথম মনকে নাড়া দিয়েছিল। কৌতুহলবসত খুঁজতে শুরু করি আর কিছু ভাদুড়ি মশাইয়ের আছে কিনা ,তখন ই 'নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ১' কেনা । বড় ভালো লেগেছিল 'পর্ণশবরীর শাপ' আর 'নিকষছায়া'। 'অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ' ও বেশ খাসা ছিল,যদিও আগের দুটোই বেস্ট। 'নিকষছায়া' তো আমি জাস্ট শুরু করেছিলাম তারপর লেখকই আমাকে টানা চার পাঁচ ঘন্টা বসিয়ে রেখে শেষ করিয়েছেন তাঁর উপন্যাস টি। শুরু থেকে শেষ অবধি রহস্য, উত্তেজনা সব মিলিয়ে অপূর্ব কাহিনী। এর পর বছর দুয়েক কেটেছে , আবার 'নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ২' কিনলাম । এই বইতে দুটি ছোটো গল্প ,একটি বড়োগল্প ,ও একটি উপন্যাসের আদিপর্ব রয়েছে। প্রথমে দেখে খানিকটা নিরাশ ই হয়েছিলাম ,অন্তিম পর্বের জন্য আবার অপেক্ষা করে বসে থাকো।
যাইহোক গল্প তিনটি অসাধারণ।
'দৈবী' ছোট্ট একটি গল্প কিন্তু বেশ মনভালোকরা গল্প । 'সম্মার্জনী' অর্থ যে ঝাঁটা এই গল্পেই জানতে পারলাম, ভালো লাগলো নতুন কিছু জেনে।
'ইদ্রিশ ঠাকুরের থান' গল্পটি ছোটো হলেও আমাদের লোকদেবতাদের উৎপত্তি হওয়ার কিছুটা ধারণা দেয় ।
'বউকালিবাড়ির বেত্তান্ত' একটি বড় গল্প ,রহস্য আছে , গা শিরশিরে অলৌকিক পরিবেশ আছে। গ্রাম বাংলার অপূর্ব পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস,অলৌকিক কুসংস্কার রয়েছে। আবার শেষে রয়েছে মানব মনের অন্ধকার ,কুটিল দিক ,যা অশরীরী ভৌতিক আঁধারের থেকেও ভয়াল , বিপজ্জনক।
প্রথম দুটি ছোটো গল্প তো তারানাথ আর কিশোরীর কথা মনে করায়,কিন্তু এখানে পল্লব ভাদুড়ি মশাইকে বিশ্বাস করে। যাইহোক এই তিনটি গল্প সত্যিই খুব ভালো।
এর পরে "মহাসিন্ধুর ও'পার থেকে" উপন্যাসে এসে আগের লেখককে কিছু টা হারিয়েছি আমি। রহস্য, উত্তেজনা,তন্ত্র,সাধনা এসব তো আছেই । কিন্তু বেশিরভাগ জায়গায় আগে রগরগে হিংসে, ক্রুরতা, যৌনতা। আসুরিক মননের থকথকে অন্ধকারে যেন হারিয়ে গেছে 'নিকষছায়া' বা 'পর্ণশবরীর শাপ'-এর লেখক। প্রথম দিকে উপন্যাস বড্ড ধীর ,পরে শেষ দিকে হঠাৎ করে গতি বাড়িয়েছে । যদিও এত কিছু র পরেও কিছু জিনিস মন ভালো করে , ওদের প্রেম ,লোকনাথের গুরুভক্তি, প্রেসিডেন্সির সন্ধ্যা নামার বর্ণনা, ভাদুড়ি মশাইয়ের শিষ্যস্নেহ । আরেকটা জিনিস না বললে নয় তা হল মানব মনের গহীন কোটরে লুকিয়ে থাকা বাসনা ,কামনা সামান্য অনুকূল পরিস্থিতিতে ,সামান্য দূর্বলতায় যে নিজের মূল্যবোধ কতটা বিসর্জন দিতে পারে বা কতটা ভয়ানক কাজ করতে পারে তা অমিয়র মাধ্যমে লেখক বুঝিয়েছেন ।
যাইহোক এখন অপেক্ষা করে থাকা পরের পর্বের জন্য , শেষের দিকে কিছুটা জমেছে , লোকনাথ আসলে দুটো রহস্য সাজিয়েছে যার একটাই আবিষ্কার করতে পেরেছে পল্লব রা । দেখাই যাক কেমন হয় ।
বইটি দীপপ্রকাশনী থেকে প্রকাশিত, পেজ কোয়ালিটি ভালো, অক্ষর যথেষ্ট বড়ো ,কিছু জায়গায় ছাপার ভুল রয়েছে টুকিটাকি, আপাতভাবে প্রচ্ছদ ,চিত্র, প্রিন্টিং সবকিছুই সুন্দর । লেখক ও প্রকাশনা উভয়কে অসংখ্য ধন্যবাদ।
১.মহা সিন্ধুর ওপার থেকে:- এটি নিকষ ছায়া এর পরের অংশ।লোকনাথ এর সাথে যোগ দিয়েছে দুই যমজ ভাই তড়িৎ ও সারিত, অন্যদিকে শহরে শুরু হয়েছে অদ্ভুত শিশু মৃত্যু জার পিছনে হাত অবশ্যই লোকনাথের। তার উদ্দেশ্য সাধনা সম্পন্ন, সাথে তিতাসের থেকে প্রতিশোধ এর মাঝে যুক্ত হয় সাংবাদিক রোশনি, সারিতের হাতে আক্রান্ত হয়ে রোশনি। লোকনাথের ষড়যন্ত্রে নরকে প্রবেশ করে তিতাস.... ২. দৈবী:- ভাদুড়ী মশাই আর তার ভাই এর ছোটবেলার গল্পঃ যেখানে এক বুড়ি তার ভাই এর গুটি বসন্ত ঝাটা দিয়ে পেদিয়ে বিদায় করেন। ভাদুড়ী মশাই বুঝতে পারেননি তিনি ছিলেন স্বয়ং মা শীতলা। ৩. ইদ্রিসঠাকুরের থান:- এক ভগবান এর গল্পঃ যিনি নাকি সবার সামনে চার দিন বিনা থেমে তার জিনদের সাহায্য নিয়ে নিজের কবর খুরেছিলেন , সত্যি কি জীন ছিল নাকি নিজের মনের জোর নাকি পাগল। ৪. বউকালী বাড়ির বেত্তান্ত:- যোগ্যতার বিচারে ভাগ্নের থেকে নিজের ছেলের inferiority ঢাকার জন্য এক মায়ের ছলনা করে ভয়ে দেখানো ধরে ফেলেন ভাদুড়ী মশাই ।
This entire review has been hidden because of spoilers.