বাংলাভাষা ও সাহিত্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উপাধি লাভ করে চিত্রা দেব মধ্যযুগের এক অনাবিষ্কৃত মহাভারতের ওপরে গবেষণা করে ডক্টরেট পেয়েছেন। কবিচন্দ্রের মহাভারত, বিষ্ণুপুরী রামায়ণ, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল ও ময়ূরভট্টের ধর্মমঙ্গল সম্পাদনা করেছেন একক ও যৌথভাবে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর নিরন্তর গবেষণার উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি রয়েছে বিদগ্ধ মহলে। মধ্যযুগীয় সাধারণ মানুষ ও পুঁথিপত্র সম্পর্কে লিখেছেন একটি প্রবন্ধ সংকলন ‘পুঁথিপত্রের আঙিনায় সমাজের আলপনা। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে লেখা তাঁর অপর উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’। অনুবাদ করেছেন প্রেমচন্দের হিন্দী উপন্যাস ‘গোদান’ ও ‘নির্মলা’। বাংলার নারী জাগরণের বিভিন্ন তথ্য সংকলনে ও বৃহত্তর গবেষণা করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রন্থাগার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রয়াণ : ১ অক্টোবর, ২০১৭।
নাম দেখেই ধারণা করা যায় রাজন্যদের প্রেমের গল্প। হ্যাঁ হ্যাঁ প্রেমের গল্প। ইতিহাসের পাতায় যেই গল্প বা নাম গুলো ঠাই পায় না। আমরা শুধু জানতে পারি রাজাদের নাম, তাঁদের বীরত্বের কথা কিন্তু জানতে পারি না তাদের মনের কথা। ক্ষমতা আর টিকে থাকার লড়াইয়ে তাদেরও যে কারোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সেই প্রেমের জন্য তাদেরকে দিতে হয় চরম মূল্য।
১৭ টা গল্প আছে। এই প্রেমিক রাজপুরুষদের সবাই কমবেশি জানি কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই রাজাদের মনের মানুষদের ঠাই হয়নি ইতিহাসের বইয়ের পাতায়। হাতে গোনা কয়েকজনের নাম ছাড়া প্রেমিকার যত অবদানই থাকুক তাদের পরিচয় শুধু রাজার রানী, বেগম আর পরসতার হিসাবেই রয়ে গেছে। কিন্তু তাও সময় তাদেরকে ভুলে যায়নি। কোন না কোনভাবে রেখে গেছে তাদের চিহ্ন সে হোক লোকগাঁথা, গানে, কবিতায় বা পাথর মাটিতে। জানিয়ে দিয়ে গেছে আমরাও ছিলাম ভালোবেসে।
মানুষ মরে যায় কিন্তু প্রেম বেঁচে থাকে। লোকের মুখে মুখে যুগের পর যুগ ধরে বেঁচে থাকে প্রেমিক যুগল। যারা একদা খুঁজে পেয়েছিলো নিজেদেরকে এই অনন্ত অম্বরের তলে। আর তাইতো বয়ে চলা শীতল বাতাস বা নদীর মৃদু ঢেউ এখনও শুনিয়ে যায় তাদের দীর্ঘশ্বাস।
ইচ্ছামত কল্পনা টল্পনা মিশিয়ে লেখা তথাকথিত ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনী; প্রায় সবক'টাই লাইলী-মজনুর মত ট্র্যাজিক। টাইমপাস হিসেবে পড়া যেতে পারে। তবে একেকজন রাজা-বাদশা তাদের ৩০০-৪০০ নারীর হারেমের মাঝে প্রেম জিনিসটা কই থেকে পেতেন, বা আদৌ ব্যাটাদের মনে প্রেম-ভালোবাসা কিছু ছিল কিনা সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। পুরুষতান্ত্রিকতার চূড়ান্ত আরকি!
আমার পড়া চিত্রা দেবের প্রথম বই। লেখিকার লেখনী যে অত্যন্ত সুন্দর সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। লেখিকার লেখনীর জাদুতে পুরানো দিনের শহরগুলি, চরিত্রগুলি এবং নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনীগুলি জীবন্ত হয়ে চোখে ভেসে ওঠে। বেশ ভালো লাগলো পড়ে।
যদি পবিত্র কলুষহীন সুচয়ন করা প্রেমের গল্পের আশা করে থাকেন তবে এই বই নিরাশ করবে।কিন্তু আমার মতো ইতিহাস ও ভূগোলে আগ্রহ থাকে তবে এই বইটি আপনারই জন্য।একদম প্রত্যেকটি গল্পই রাজা-শাহজাদার অস্থির জীবনে স্বস্তির নিঃশ্বাস হয়ে আসা রূপসী নর্তকী-গায়িকা যারা কূটনীতির বেড়াজালে বিয়ে করা পত্নীদের থেকে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিলো রাজাদের।সেইসব শারীরিক আকর্ষণসর্বস্ব রক্ষিতার প্রেম থেকেই বদলে গিয়েছে কত ইতিহাসের বাঁক,জন্ম নিয়েছে কত অমর স্থাপত্য। ১৭ টি রাজকীয় প্রেমকাহিনী বর্ণিত আছে বইতে।কম পড়তে চাইলে ৪,৫,৬,৯,১০,১১,১৩ পড়তে পারেন।
১.ইন্দ্রজিৎ সিংহ ও প্রবীণ রায়-উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখন্দের রাজা ইন্দ্র প্রথম দেখায় প্রেমে পড়েন কবিত্রী প্রবীণ রায়ের।কিন্তু প্রবীণ রায়ের কাব্যপ্রতিভার কথা শুনে তাকে হাসিল করার নেশা পেয়ে বসে সম্রাট আকবরের।অকুতোভয় ও প্রত্যুৎপন্নমতী প্রবীণ রায় সম্রাট আকবরের সামনে দাঁড়িয়ে এমন ভদ্র ভাষায় অপমান করে বসেন যে আকবর তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন।
২. সেলিম ও আনারকলি-এই কাহিনী আমাদের সবার জানা।পিতার হারেমখানার নর্তকীর প্রেমে পড়া সেলিমের গাঁথা নিয়ে রচিত হয়েছে হাজারো কবিতা চলচ্চিত্র।
৩.বাজ বাহাদুর ও রূপমতী-সারংপুরের জায়গিরদার বাজ বাহাদুর ও ধরমপুরেএ দুর্গাধিপতির কন্যা রূপমতীর ভালোবাসার ডোর ছিল সাতটি সুরে বাঁধা,দুইজনেই ছিলেন উচ্চ ঘরানার দুই সঙ্গীগজ্ঞের শিষ্য।কিন্তু এখানেও প্রভাবশালী পুরুষের গুণী নারীকে অধিকার করার নেশা বাদ সাধে,আকবরের দুধ-ভাই আধম খানের হাতে লাঞ্চিত হওয়ার আগেই আত্মহনন করেন রূপমতী।
৪.মুহম্মদ কুলি ও ভাগমতী-হায়দ্রাবাদের নাম তখনো হায়দ্রাবাদ হয়নি।সেখানকার শাহজাদা প্রেমে পড়লেন সামান্য এক গ্রাম্য বালিকা ভাগমতীর।এই ভাগমতীর গ্রামে যাওয়ার জন্যই তৈরি হয় "পুরানা পুল", পরে তাকে বেগম করার পর নগরের নাম রাখা হয় "ভাগনগর" ও বেগম ভাগমতীর উপাধি হয় "হায়দার মহল"। কিন্তু মুসলিম প্রজাদের চাপে নগরের হিন্দুয়ানি নাম বদলে করা হয় ভাগমতীর উপাধি অনুসারে "হায়দারাবাদ"।
৫.রাজকুমারী মুমল ও মহেন্দ্র-জয়সলমিরের লোদ্রবার (Lodurva) অতি বুদ্ধিমতী ও অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যা মুমল নিজের জন্য তৈরি করেন এক গোলকধামস্বরূপ হাভেলি যা এখন " মুমল কি মেড়ি" নামে পরিচিত।ঘোষণা দেন যে পুরুষ হাভেলির ধাঁধা পেরিয়ে তার শয়নকক্ষে পৌছাতে পারবে তাকেই সে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিবে।রাজ-রাজড়াদের ছাপিয়ে এই অসাধ্য সাধন করেন অমরকোটের এক সাধারণ গৃহস্থ মহেন্দ্র।
৬.আদিল শাহ ও রম্ভাবতী-কর্ণাটকের বিজাপুরের শাসক আদিল শাহ-এর নির্ঘুম রাত কাটে দুশ্চিন্তায়,পৃথিবীর বুকে কি এমন কীর্তি রেখে যাওয়া যায় যাতে হাজার বছর পরেও তাকে সবাই স্মরণ করবে?কাঞ্চনী রম্ভাবতী তার সকল স্বপ্নে উৎসাহ দেয়।বাপ-মার কবর "ইব্রাহিম রওজা" দেখে তার ইচ্ছে জাগে মৃত্যুর আগে সেও নিজের সমাধি তৈরি করে যাবেন।অনেক তো হলো "তাজ বাওরি","জেহান বেগম রওজা"," জুম্মা মসজিদ" তৈরি।এখন তাক লাগিয়ে দেয়া কিছু তৈরি করতে হবে।শুরু হলো সর্ববৃহৎ গম্বুজ স্থাপনা যা এখন "গোল গম্বুজ" নামে পরিচিত,পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রাচীন গম্বুজ (দ্বিতীয় অবস্থানে আছে রোমান প্যানথিয়ন)।গোল গম্বুজের প্রধান আকর্ষণ হল "whispering gallery".এই গোল গম্বুজের উদ্বোধনের দিন আদিলের ঠাট্টাকে ভুল বুঝে গ্যালারি থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন বোকা রম্ভাবতী,তারপর গোল গম্বুজেই বেগমের মর্যাদায় দাফন করা হয় তাকে।
৭.দারাশিকোহ ও রানাদিল-চরম গোড়া ও হিন্দুবিদ্বেষী সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ভাই দারাশিকোহ তার সুমধুর ব্যবহার ও পান্ডিত্যের জন্য ছিলেন প্রজাদের প্রিয়পাত্র,সাধারণ বেশে ঘুরে বেড়াতেন পথে পথে,সেখানেই পরিচয় পথের হিন্দু নটী রানাদিলের সাথে।রানাদিলও ভালোবেসেছিলেন দারাকে,তাই দারার মৃত্যুর পর অন্য সম্রাটের হারেমখানার ভোগবিলাসকে পায়ে ঠেলে রাজবিধবা হিসেবে স্বেচ্ছায় কারাগারজীবন বেছে নিলেন।
৮.ঔরঙ্গজেব ও হীরাবাঈ-হিন্দুবিদ্বষী গোঁড়া ইতিহাস মুছে দিতে চাওয়া এই সম্রাটের জীবনেও সংস্কারবিরুদ্ধ প্রেম এসেছিল তার খালুর হারেমের বাঈজি হীরাবাঈ এর হাত ধরে।নিজের হারেমের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বাঈজিকে খালুর কাছে হস্তান্তর করে খালুর থেকে হীরাবাঈকে চেয়ে নেন তিনি।মহীয়সী হীরাবাঈ যতদিন বেঁচে ছিলেন সম্রাটের লাগাম ছিলো তার হাতে,অন্যায় অবিচার ও ধর্মবিদ্বেষী কর্ম থেকে যতটুকু সম্ভব নিবৃত করতেন সম্রাটকে।
৯.বাজিরাও ও মাস্তানি-সিনেমার কল্যানে এই কাহিনীও সবার জানা।কোনোদিন পুনে যাওয়ার সুযোগ হলে ঘুরে আসবো "শনিবার ওয়ারা" দূর্গ ও তার ভেতরের "মাস্তানি মহল" যার প্রবেশপথের নাম বাজিরাও-মাস্তানির নাতির নামানুসারে "আলী দরওয়াজা"। এই মাস্তানি মহল তৈরির আগে যে মহলে মাস্তানি থাকতেন তা সংগ্রহ করেছেন কালকের নামক এক ব্যক্তি।
১০.মানসিংহ ও মৃগনয়না-গোয়ালিয়রের রাজা মানসিংহ শিকার করতে গিয়ে দেখা পান বুনো গুর্জরী নারী পাকা-শিকারি মৃগনয়নার।পরে তার গান শুনে মুগ্ধ হন।প্রচলিত আছে যে তানসেনকে বেগম হওয়ার পর আবিস্কার করেছিলেন শিল্পানুরাগী মৃগনয়না।তার জন্য মানসিংহ তৈরি করেন "গুজরী মহল" যা বর্তমানে গোয়ালিয়র দূর্গ।মৃগনয়নার পৃষ্ঠপোষকতায় গোয়ালিয়র স্থাপত্যে উন্নতি করতে থাকে।
১১.কৃষ্ণদেবরায় ও চিন্নাদেবী-কর্ণাটকের হাম্পির (তৎকালীন বিজয়নগর) শাহজাদা কৃষ্ণ ভালোবাসেন নর্তকী চিন্নাদেবীকে,রাজা হওয়ার পর চিন্নাকে বেগম করে তাকে উৎসর্গ করে বর্তমানের "হসপেট" নগরের পত্তন করেন,বিখ্যাত তিরুপতি মন্দিরে রাজা কৃষ্ণের মূর্তির পাশে দুই রানীর মূর্তি আছে,তাদের একজন হলেন চিন্নাদেবী।
১২.জাহান্দার শাহ ও লালকূয়র-ঔরঙ্গজেবের নাতি সম্রাট জাহান্দার শাহ প্রেমে পড়েন সর্বনাশা ক্ষমতালোভী বাজারু নর্তকী লালকূয়রের,সেই থেকে তার সর্বনাশের শুরু।লালকূয়রকে খুশি করতে পুরো রাজসভা ও সালতানাত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন তিনি।
১৩.বিষ্ণুবর্ধন ও শান্তলাদেবী-কর্ণাটকের হোয়সলের রাজা বিষ্ণুবর্ধন বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখা পান উচ্চবংশীয় রুচিশীল নৃত্যপটীয়সী শান্তলাদেবীর।তাকে স্ত্রী করার পর রাজ্যের শ্রী উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।শান্তলাদেবীর উৎসাহেই শুধু গড়ে উঠেনি বিখ্যাত হোয়সলেশ্বর মন্দির ও কাপ্পে চেন্নিগরায়া মন্দির ও একাধিক জৈন বস্তি,শান্তলাদেবী নিজের হাতেও মন্দিরগুলোর অনেক মূর্তি খোদাই করেছেন,শান্তলাদেবীর দেখিয়ে দেয়া নৃত্যের মুদ্রা অনুসরণ করে মন্দিরগুলোর গায়ের নর্তকী মূতির আকার দেয়া হয়েছে,সাক্ষাৎ লক্ষ্মী ও সরস্বতীর অবতার হিসেবে মান্য করতো তাকে দেশের লোক,সেই দেশে একই পরিবারের লোকরা নিজের ইচ্ছামতো ধর্ম বেছে নিতে পারতো।
১৪.জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ ও ফুলজান-পান্ডুয়ার সম্ভ্রান্ত আজিম খানের কন্যা তার বাড়ি "আজিম মঞ্জিল" ফেরার পথে অজ্ঞান অবস্থায় পান পান্ডুয়ার শাহজাদা যদু দত্তকে।সেখান থেকেই ভালোলাগা।কিন্তু জৌনপুরের সুলতান রাজা গণেশ দত্তকে হারিয়ে যখন প্রাণ ও দেশ ভিক্ষা দেয়ার বদলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলেন তখন গণেশ তার বদলে পুত্র যদুকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেন,তার নাম হয় জালালুদ্দিন।তবে এখন যদু আর ফুলজানের বিয়েতে কোন বাধা না থাকলেও যদু/জালালকে ব্রাহ্মণসমাজ যবন বলে বিতাড়িত করে।দেশরক্ষাকারী কোমলমতি জালাল হয়ে উঠেন ব্রাহ্মণ-হত্যাকারী দেবালয়নাশকারী রাজা।পশ্চিমবঙ্গের আদিনার "একলাখি" রওজায় একসাথে শায়িত আছেন জালাল,ফুলজান ও তাদের পুত্র আহমদ।
১৫.গদাধর সিংহ ও জয়মতী-আসামে তখন রাজার ছেলে রাজা হতোনা।কারো পিতা যদি কোনকালে একদিনের জন্যও সিংহাসনে বসে থাকে তার সমান দাবি থাকবে সিংহাসনের উপর।এজন্য একজন রাজা হওয়ার পর অন্য সব দাবিদারকে হত্যা করাই ছিলো নিয়ম।এমনই এই ক্ষণস্থায়ী রাজার পুত্র ছিলেন সুযোগ্য গদাগর সিংহ,কিন্তু জীবনে এক স্ত্রী জয়মতি ও সংসার ছাড��া কোনকিছুর উপরেই তার টান ছিলোনা।একদিন তার অস্তিত্ব জানতে পেরে রাজসৈন্য তাকে হত্যা করতে আসেন।আগেই খবর পেয়ে জয়মতী তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।গদাধরকে না পেয়ে জয়মতীকে ১৪ দিন মাটিতে পুতে রেখে এক ফোঁটাও জল পান করতে না গিয়ে মারা হয়,তবুও কেউ তার মুখ থেকে গদাধরের হদিস বের করতে পারেনি।স্ত্রীকে হারিয়ে ক্রোধে উন্মত্ত গদাধর পণ করলেন এই সিংহাসন তার চাই।২ বছরের মধ্যে সবাইকে হারিয��ে সিংহাসন হাসিল করে পুত্র রুদ্রসিংহের হাতে দিলেন শাসনভার।তার নামে আসামে আছে রুদ্রসিংহ পার্ক,পাশেই মায়ের জলতেষ্টাকে উৎসর্গ করে তার গড়া "জয়সাগর"।
১৬.সিরাজদ্দৌলা ও লুৎফউন্নিসা-পলাশীর সিরাজকে কে না চেনেন।তিনি পড়েছিলেন পরিচারিকা লুৎফউন্নিসার প্রেমে।সিরাজের মৃত্যুর পর রূপসী লুৎফাকে মীরন হারেমের অংশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন,তিনি জবাব দিয়েছিলেন " হাতির পিঠে চড়ার পর কেউ কি গাধার পিঠে চাপে?"
১৭.রণজিৎ সিংহ ও বিবি মোরান-অমৃতসরের রাজা রণজিৎ সিংহের পুত্রের বিয়েতে নাচতে আসা এক তরুণী রাজার নজর কাড়ে,ইনিই বিবি মোরান।হয়ে যান রণজিৎ সিংহের তৃতীয় রানি।কিন্তু মুসলমান বিয়ে করার কারণে রণজিৎ সভাসদদের বিরাগভাজন হন,তাকে বলা হয় স্বর্ণমন্দিরের তেতুলগাছের সাথে বেধে মোরানকে প্রহার করলে এই পাপস্খলন হবে।এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় মোরানের প্রাণ ভিক্ষা দেয়া হবে,তবে রাজাকে চিরদিনের মতো তার সাথে সম্পর্ক ছেদ করতে হবে।রাজার জীবন থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় বিবি মোরান।
চিত্রা দেবের রাজকীয় প্রেমকথা না পড়লে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা না জানা থেকে যেত। চিত্রা দেবের ইতিহাসের গভীর জ্ঞানের সঙ্গে তাঁর গল্প বলার সুনিপুণ দক্ষতায় বইটি অত্যন্ত সুখ পাঠ্য হয়ে উঠেছে। রাজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ১৭টি প্রনয় গাঁথা নিয়ে এই বই। লেখিকা ইতিহাসে এই কাহিনীগুলির প্রমান হিসাবে, এই কাহিনীগুলির সঙ্গে জড়িত যেসব স্মৃতি সৌধ আজও বর্তমান আছে সেগুলির ও উল্লেখ করেছেন।আবার যেখানে সেই বিগত সময়ের সেই প্রদেশের সামাজিক প্রথা না জানলে কাহিনীটির গুরুত্ব বোঝা যাবে না, সেখানে সেই সমাজ ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এতে কাহিনীগুলির সত্যতা প্রমানিত হয়েছে। এই বইএ ইতিহাসের সাল তারিখের কচকচি নয়, কালের অতলে প্রায় হারিয়ে যাওয়া রাজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত অপূর্ব প্রনয় ইতিহাস জীবন্ত হয় উঠেছে । রাজকীয় প্রেমকথা সকলের জন্যই সুখপাঠ্য।
চিত্রা দেবের লেখনী চমৎকার। রাজাবাদশাদের সহস্র হারেমকন্যার সাথে প্রেমকাহিনীতে রুচি আমার ছিল না কখনোই। তবে চিত্রা দেব যেভাবে এতগুলো টুকরো টুকরো করে জানা অজানা কাহিনীগুলোকে এক মলাটে আবদ্ধ করেছেন, কিছুটা কল্পনা মিশিয়েছেন, সাথে যোগ করেছেন ইতিহাস, একেবারে বুঁদ হয়ে ছিলাম।