প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জেনারেলরা প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থেকেছেন। জেনারেল জিয়াউর রহমানের ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এর শুরু, আপাতত জেনারেল মইনের মাধ্যমে এর শেষ। এর মাঝে বা পরে বিএনপি জোট ও আওয়ামী লীগ জোট ক্ষমতায় এসেছে এবং বলা হয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু আসলে তা ছিল বন্দুকের ছায়ায় গণতন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির সব মৌল অর্জনকে বিনষ্ট করেছেন জেনারেলরা। কিন্তু কেন? জেনারেলরা তো ছিলেন বাঙালি এবং মুক্তিযুদ্ধের উপাধিপ্রাপ্ত। এই কেন-র কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন মুনতাসীর মামুন বর্তমান গ্রন্থে।
জেনারেলদের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ/প্রবন্ধ তার বইয়ের ভিত্তি। এসব লেখা বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশি জেনারেলরা নিজেদের মুক্ত করতে পারেন নি পাকিস্তানবাদ থেকে। বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝার জন্য গ্রন্থটি অপরিহার্য। উল্লেখ্য, এ ধরনের গ্রন্থ বাংলাদেশে এই প্রথম। এর আগে প্রকাশিত হয়েছে ড. মুনতাসীর মামুনের পাকিস্তানী জেনারেলদের মন ও রাজাকারের মন।
Muntassir Mamoon (Bangla: মুনতাসীর মামুন) is a Bangladeshi author, historian, scholar, translator and professor of University of Dhaka. He earned his M.A. and PhD degree from University of Dhaka. Literary works
Mamoon mainly worked on the historical city of Dhaka. He wrote several books about this city, took part in movements to protect Dhaka. Among his historical works on 1971 is his Sei Sob Pakistani, in which many interviews with leading Pakistanis was published. Most of them were the leading Pakistani characters during the liberation war of Bangladesh.
জন্ম এবং পরিবার মুনতাসীর মামুনের জন্ম ১৯৫১ সালের ২৪ মে ঢাকার ইসলামপুরে নানার বাড়িতে। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মিসবাহউদ্দিন এবং মায়ের নাম জাহানারা খান। পিতামাতার তিন পুত্রের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তিনি ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন। তার স্ত্রী ফাতেমা মামুন একজন ব্যাংকার। মুনতাসির মামুনের দুই ছেলে মিসবাহউদ্দিন মুনতাসীর ও নাবীল মুনতাসীর এবং কন্যা রয়া মুনতাসীর।
কর্মজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই দৈনিক বাংলা/বিচিত্রায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন মুনতাসীর মামুন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। এর পাশাপাশি ঢাকা শহরের অতীত ইতিহাস নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইন্সটিটিউটে' সন্মানিক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ১৯৯৯-২০০২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কৈশর থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত হয়ে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে বাংলা ভাষায় সেরা শিশু লেখক হিসেবে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পর অনুবাদ, চিত্র সমালোচনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচনা করেন অনেক বই। তাঁর লেখালেখি ও গবেষনার বিষয় উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর।
সাংগঠনিক কর্মকান্ড স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ডাকসুর প্রথম নির্বাচনে মুনতাসীর মামুন ছিলেন সম্পাদক। একই সময়ে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি। ডাকসুর মুখপত্র "ছাত্রবার্তা" প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদনায়। তিনি বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যথাক্রমে প্রথম যুগ্ম আহ্ববায়ক ও যুগ্ম সম্পাদক। তিনি জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং জাতীয় আর্কাইভসের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ঢাকার ইতিহাস চর্চার জ্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেন্টার ফর ঢাকা ষ্টাডিজ (ঢাকা চর্চা কেন্দ্র)। এ কেন্দ্র থেকে ঢাকা ওপর ধারাবাহিক ভাবে ১২টি গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বাংলা একাডেমীর একজন ফেলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিনেটের নির্বাচিত সদস্য হয়েছেন কয়েকবার। '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তিনি একজন প্রতিষ্ঠাতা ও সক্রিয় সদস্য। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ফাতেমা মামুন প্রতিষ্ঠা করেছেন মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা মামুন ট্রাস্ট। এ ট্রাস্ট গরিব শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের নিয়মিত সাহায্য করছে।
সাহিত্য কর্ম মুনতাসীর মামুনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২২০+। গল্প, কিশোর সাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষনা, চিত্র সমালোচনা, অনুবাদ সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই মুনতাসীর মামুনের বিচরণ থাকলেও ইতিহাসই তার প্রধান কর্মক্ষেত্র। ।
পুরস্কার বাংলা একাডেমী পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার, একুশে পদক, নূরুল কাদের ফাউন্ডেশন পুরস্কার, হাকিম হাবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কা, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, অলক্ত স্বর্ণপদক পুরস্কার, ডঃ হিলালী স্বর্ণপদক, প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৩), মার্কেন্টাইল ব্যাংক স্বর্ণপদক, এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অর্লিয়েন্স শহর তাঁকে 'অনারেবল ইন্টারন্যাশনাল অনারারী সিটিজেনশিপ' প্রদান করে।
৭০০+ পেজের এই বইটা লেখার জন্য ২টা জিনিস দরকার বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা আর সাহস। বাংলাদেশে বসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জেনারেলদের থেকে শুরু করে পুরো সেনাবাহিনীর অপকর্ম গুলা দেখানো আসলেই সাহসের বিষয়। (প্লিজ কেউ বলিয়েন না এইটা অল্প কিছু মানুষের কাজ!! আমাদের দেশে যে কোন অভিযোগ অস্বীকার করার এক মাত্র ভিত্তি হল এই অন্যায়ের রিপ্রেজন্টেটিভ পুরো সমাজ /বাহিনী না, শুধুমাত্র বিপথগামীরাই!!)
বইটা মূলত ৭১ পরর্বতী জেনারেলদের শাসন ব্যবস্থা আর তার তোড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া গনতন্ত্র এর করুন উপাখ্যান বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এর অন্যতম একটা কারন ছিল পাকিস্তানে গনতন্ত্র বলে কিছু কখনই ছিল না, এদের ডিফেন্স ট্রেনিং কিংবা পাক আর্মির কালচারের কারনে প্রতিটা অফিসার ছিল উচ্চাভিলাষী, কিভাবে এক সেনাপ্রধান অন্য সেনাপ্রধান কিংবা ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হটিয়ে ক্ষমতা দখল করবে সেটার এক কুৎসিত কদর্য রূপের সমাবেশ ছিল। ৭১ পরবর্তি বাংলাদেশ আর্মি সিনিয়র পোষ্টে যারা যায় তারা সবাই ছিল পাকিস্তানে ট্রেনিং প্রাপ্ত, মুক্তিযুদ্ধ তাদের সেই স্বভাব চেঞ্জ করে দিতে পারে নি। হিংসা প্রতিহিংসা ক্ষমতার যে লোভের ভূত সেই যে ঢুকেছে তার জের এখন ও চলছে।এর ফলাফলে আমরা ১/১১ ও দেখে ফেলেছি। আমি ডিফেন্সের কেউ না, এখন ডিফেন্স কিভাবে চলছে সেটাও জানা সম্ভব না, কিন্তু যদি জিয়া এরশাদ যে বীজ রেখে গেছেন তা যদি থাকে তাহলে বাংলাদেশ হয়ত সামনে কপালে দূর্গতি আছে। পাকিস্তান থেকে আরো একটা জিনিস বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এডোপ্ট করে বসে আছে সেটা হল বানিজ্য। এর পক্ষে বিপক্ষে প্রচুর আলোচনা সমালোচনা হয়ে গিয়েছে সামনে হয়ত আরো হবে। সেদিকে না গিয়ে বলি ব্যবসা বানিজ্যের যে ধারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা আর যাই হোক খুব একটা ভাল কিছু না।
সাধারণ ভাবে ৭১ এর পরের জিয়া কিংবা এরশাদের শাসন ব্যবস্থা নিয়ে বলা যেতে পারে,এই সময় টুকু যথেষ্টই সহজ- সরল গতিতে আগিয়েছে। আমার ক্ষমতা দরকার আমি কিছু আর্মির সিপাহী ছোটখাট অফিসার মেরে ক্ষমতা দখল করে ফেললাম এরপর কিছুদিন পর সেটাকে রাজনীতিগত দল গঠন করে হালাল করে নিলাম ৭৫ থেকে এরশাদের শেষ পর্যন্ত এইটাই ছিল সামরিক শাসন ব্যবস্থার চিত্র। কিন্তু দিন যত গিয়েছে সব কিছুই তত জটিল হয়ে গিয়েছে। ১২৭ পেজের পরে কমপ্লেক্সিসিটি এত বেশি ছিল যে তালগোল হারিয়ে ফেলেছি (এই পর্যায়ে মূলত ছিল জেনারেল মঈনের শাসন ব্যবস্থা)
যাই হোক মাস্ট রিড একটা বই। কিভাবে এক রাজাকারের পতাকাবাহী গাড়িতে উঠাত সামর্থ্য হল, কিভাবে স্বীকৃত সব রাজাকারের সুফি-সাধক হয়ে বসলেন। কিভাবে পাকিস্তানের ভূত এখন ও দেশের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মত উঠে বসে আছে অনেক কিছুই জানা যাবে। হয়ত কারো মতাদর্শ এর সাথে সাংগর্ষিক কিন্তু তিক্ত অনেক সত্যই উঠে এসেছে।
স্বাধীনতা এর দেশে প্রশিক্ষিত সেনা ক্যাপ্টেন যখন পাকিস্তানী মিলিটারি একাডেমিতে গিয়ে বলে বসেন পাকিস্তানের ভক্ত তখন বুঝতে হয় কাকুলের (পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমী) ভূত বাংলাদেশের ঘাড়ে আরো বহুদিন ধরেই থাকবে ৭৫ পরবর্তি সব সরকার হোক তা সেনাবাহিনী এর কিংবা কোন রাজনৈতিক দল, সবাই মূলত সেনাবাহিনীর অপেশাদারি ব্যবসা বানিজ্যের সাথে তাল দিতে গিয়েছে। ঠিক কেন দিয়েছে কি সার্থে দিয়েছে সেটাও জানা যাবে। পড়েন আর জানেন :) পড়ার কোন বিকল্প নাই।
এই বিশাল বইয়ের রিভিউ লিখতে বসলে আরেক বিশাল রচনা দাঁড়ায় যাবে। সেদিকে না গিয়ে বলি নিজেই পড়েন। পড়েন আর জানেন। জানার কোন বিকল্প নাই।
মুদ্রণ প্রমাদে ভর্তি। নিজের দলের লোকদের দোষত্রুটি হালকা করার একটা চেষ্টা খুব অবভিয়াস ছিল। তবে বইয়ের যে নাম সেটি সার্থক। এতদিন বিভিন্ন সেনা অফিসারদের লেখা বই পড়ে তাদের মনজগতের যে একটা অস্পষ্ট ছবি তৈরী হচ্ছিল, এই বইটি পড়ার মাধ্যমে তা পূর্ণতা পেল।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে বেশ সাহসী এবং তথ্যমূলক বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা। এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করার মত। কিন্তু পড়তে গেলে বুঝা যায় বেশ তাড়াহুড়া করে ছাপানো হয়েছে, প্রতি পাতায় পাতায় অসম্ভব রকম বানান ভুলের ছড়াছড়ি।