আঠারাে শ’ ছাপ্পান্ন । লখনউ থেকে সদলবলে কলকাতায় এসে নামলেন অযােধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ । ইংরেজের চক্রান্তে তিনি রাজ্যহারা । ওরা তাঁকে নির্বাসিত করেছে কলকাতায়। নবাবের নতুন ঠিকানা কলকাতার মেটিয়াবুরুজ। আঠারাে শ’ সাতান্ন । মহাবিদ্রোহ। লখনউয়ে দাউ দাউ আগুন। মেটিয়াবুরুজ থেকে ওয়াজিদ আলি শাহকে আটক করা হল ফোর্ট উইলিয়ামে। ওয়াজিদ আলি শাহ ইতিহাসে এক বিয়ােগান্ত নাটকের দুঃখী নায়ক। কিন্তু চক্রান্ত, বিশ্বাসঘাতকতা, চরিত্রহননের নিপুণ চেষ্টা, কোনও কিছুই হত্যা করতে পারেনি ওয়াজিদ আলি শাহর সম্রান্ত, গর্বিত এবং সংবেদনশীল উদার চরিত্রকে, তাঁর শিল্পী মনকে। সুতরাং দেখতে দেখতে মেটিয়াবুরুজ পরিণত দ্বিতীয় লখনউ-এ। সেই ইমারতের পর ইমারত, সেই ইমামবাড়া মসজিদ, সেই বাগবাগিচা, সেই চিড়িয়াখানা। লখনউর মতােই গায়ক গায়িকা, নর্তক নর্তকী, কবি এবং চিত্রশিল্পীর ভিড় মেটিয়াবুরুজে কথক ঠুমরি গজল। সেই নুপূর নিক্কণ, সেই সুরেলা কাব্য। ভাগীরথী তীরে সেদিন মৃদুমন্দ বইছে। গােমতী তীরের সুরভিত হাওয়া। উনিশ শতকের কলকাতার সেই বিবর্ণ এবং বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়কেই এ বইয়ের পাতায় আশ্চর্য নৈপুণ্যের সঙ্গে ফিরিয়ে এনেছেন লেখক । তাঁর কলমের গুণে সম্পূর্ণত তথ্য নির্ভর ঐতিহাসিক আখ্যান যেন পরিণত রুদ্ধশ্বাস উপন্যাসে। শুধু ওয়াজিদ আলি শাহ নন, তাঁর সঙ্গে সহসা আবার প্রাণ ফিরে পেল সেদিনের লখনউ, কলকাতা এবং মেটিয়াবুরুজ । শুধু দরবারি বিলাস নয়, ইংরেজদের বিরুদ্ধে জনতার ক্রোধের আগুনেও উজ্জল এখানে ধূসর অতীত। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছেন অগ্নিপ্রতিমা বেগম হজরত মহল। সেই অতীত আরও মুখর হয়ে উঠেছে গণেশ পাইনের জাদুকরি তুলির স্পর্শে। কলম আর তুলির এমন নিবিড় সম্পর্ক কদাচিৎ ঘটে ।
শ্রীপান্থের জন্ম ১৯৩২ সালে, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে | লেখাপড়া ময়মনসিংহ এবং কলকাতায় | শ্রীপান্থ তরুণ বয়স থেকেই পেশায় সাংবাদিক | আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত | সাংবাদিকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণামূলক রচনাদি লিখে যাচ্ছেন তিনি | তাঁর চর্চার বিষয় সামাজিক ইতিহাস | বিশেষত কলকাতার সমাজ ও সংকৃতি | তিনি সতীদাহ,দেবদাসী,ঠগী,হারেম-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনিই কলকাতার পটভূমিতে লিখেছেন একাধিক রচনা | তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আজব নগরী, শ্রীপান্থেরকলকতা, যখন ছাপাখানা এল, এলোকেশী মোহন্ত সম্বাদ, কেয়াবাৎ মেয়ে, মেটিয়াবুরুজের নবাব, দায় ইত্যাদি | বটতলা তাঁর সর্বশেষ বই | কলকাতার শিল্পী সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর বেশি কিছু প্রবন্ধ ইংরেজিতেও প্রকাশিত হয়েছে | বাংলা মুলুকে প্রথম ধাতব হরফে ছাপা বই হালেদের 'আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ'-এর দীর্ঘ ভূমিকা তার মধ্যে অন্যতম | পঞ্চাশের মন্বন্তরের দিনগুলোতে বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক কবিদের মধ্যে নব সৃষ্টির যে অভুতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে তা নিয়ে লেখা তাঁর 'দায়'বইটির ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশিত হতে চলেছে |
ইংরেজদের শঠতা, ভণ্ডামি আর চাতুরী দেখে যদি তাদের দিকে ঘৃণা আর বিবমিষা জাগে, তবে সে সময়কার দেশি রাজা আর নবাবদের দেখে জাগে ক্ষোভমিশ্রিত করুণা। লক্ষ্ণৌয়ের নবাবরাও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। অলস, অকর্মণ্য, ইংরেজকে ঘুষ দিয়ে নিজেদের বিলাসিতা আর লাম্পট্য বজায় রাখতে গিয়ে কয়েক পুরুষ পরে আস্ত রাজ্যটাই বিনা প্রতিরোধে ইংরেজের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে এরা। এর সাথে ছিল উপমহাদেশের অন্যান্য রাজ্যের মতই বেঈমানির কাহিনী, যদিও অন্য রাজ্যের তুলনায় অযোধ্যায় সেটা কম। এমনকি ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহের সময়েও এসব শাসকের অনেকেই ইংরেজের পক্ষেই ছিল। বস্তুত ইংরেজরা উপমহাদেশের শাসক আর সামন্তশ্রেণীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার বীজকেই কাজে লাগিয়েছে। এতে পশ্চিমাদের শঠতা আর ঔপনিবেশিক অপরাধ কমে না ঠিকই, কিন্তু দু'শো বছরের পরাধীনতা আমাদের প্রাপ্য পুরস্কারই ছিল কিনা, সেই প্রশ্নও নিজেদের করাটা আসেই। শ্রীপান্থের লেখনী প্রাঞ্জল, আমার মত অনৈতিহাসিকদের জন্যই, তবে তাতে ইতিহাসের সত্যতা থাকে পুরোপুরিই। এই বইটাও তার ব্যতিক্রম নয়। মূল লক্ষ্য ওয়াজিদ আলী শাহ হলেও, চারপাশের ঘটনা প্রবাহ এত সুন্দরভাবে এসেছে যে, পাঠক নিজের মত ইতিহাস খুঁজে নিতে পারে। সিদ্ধান্তও তার নিজেরই। ওয়াজিদ আলী ভাগ্যাহত শিল্পী, নাকি বিলাসী অপদার্থ নবাব, সে সিদ্ধান্তও পাঠকের।
শ্রীপান্থের লেখা মানেই সাবলীল গদ্যে সচিত্র ইতিহাসের পাতায় পরিভ্রমণ। এই বইতে আমরা অযোধ্যার শেষ মুসলমান নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের জীবনের শেষ দিনগুলোর একটি পূর্ণ বিবরণ পাই। অযোধ্যা, রামায়ণের পর এই অঞ্চলের উন্নতির নিদর্শন মোগল আমলে। জ্ঞানের প্রসার, উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা, রুচিশীল স্থাপত্য ও চারুকলার অনন্য সব নিদর্শন গড়ে উঠতে থাকে মোগল সাম্রাজ্যের সুবা হিসেবে পরিচালিত হবার সময়। মির্জা গালিবের মতে "পূবের বাগদাদ"। সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের আর দশটা সভ্য নগরীর মতোই এর বিনাশের প্রধান কুশীলব ইংরেজরা। অভূত সম্পত্তি দখল করার অভিপ্রায়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি, ও ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের দ্বারা নবাব পদবীকে হাতের পুতুল বানানোর বিবরণ আমরা এই বইতে দেখতে পাই। "ঠগী"র প্রবাদ পুরুষ হেনরি স্লিম্যানকে আমরা এখানে ভিলেন রূপেই দেখতে পাবো। বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছালে নবাবকে পরিবার সহ নির্বাসিত করা হয় মেটিয়াবুরুজে। নবাব মাতা ও পুত্র মহারানীর দরবারে বিচার নিয়ে গেলে নানা অজুহাতে নিরাশ করা হয় তাদের, এদিকে বন্দী করা হয় ওয়াজিদ আলী কে। সীমিত পেনশন ও মাসোয়ারার বিনিময়ে ঘৃণ্য চুক্তিতে জোরপূর্বক কিনে নেয়া হয় সমৃদ্ধ অযোধ্যা ও লখনৌ নগরী। এদিকে আমরা দেখব মেটিয়াবুরুজের সাময়িক সমৃদ্ধি, যাকে লখনৌ এর মতো করে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শেষ নবাব, এবং নবাবের মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর পরেই কতটা নির্মমভাবে সব মিলিয়ে যায় কালের গহ্বরে। একজন হৃতসর্বস্ব নবাব, তাঁর কাব্য প্রতিভা, প্রেম, প্রজাবাৎসল্য, এবং গোধুলিবেলার অস্তমিত সূর্যের প্রয়াণ নিয়েই আবর্তিত এই বই।
অযোধ্যার শেষ রাজা ওয়াজিদ আলী শাহ! ইংরেজদের চক্রান্তের শিকার হয়ে রাজ্যহারা তিনি। তাকে নির্বাসিত করা হলো। লক্ষ্মৌও ছেড়ে পাড়ি জমালেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। নবাব হিসেবে ওয়াজিদ আলী শাহ ছিলেন এককথায় অসাধারণ। সেই নম্র, বিনীত দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে কলকাতার অদূরে গড়ে তুললেন দ্বিতীয় লক্ষ্মৌও। ভাবছেন কিভাবে সম্ভব? ইংরেজদের রোষানলে পড়েও কিভাবে পারলেন তিনি? ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া এই নবাব অসাধ্যকে সাধন করলেন যেনো! গুণে, সংস্কৃতিতে মেটিয়াবুরুজ লক্ষ্মৌওকেও হার মানায়। আর ওয়াজিদ আলী শাহ? তিনি বেঁচে আছেন শহরের সর্বত্র।ভেলভেটের জুতোয়,সেতার,কাব্য,ইমামবাড়া,কাইজারবাগ, বুলবুলের লড়াই,পায়রা বিলাস,পান,তামাক, ধর্মতত্ত্ব, সমাজতন্ত্র,প্রেম, প্রীতি সবকিছুতে
কোথায় কাশ্মীরি উল আর কোথায় বগলের চুল। কোথায় শাহী কেতাদুরস্ত লখ্নৌ আর কোথায় কলকাতার একপ্রান্তে মেটিয়াবুরুজ। দুই জায়গার মধ্যে যোগসূত্র একজনই,তিনি নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ। বেনিয়া ইংরেজের নিষ্ঠুর চক্রান্তে কীভাবে হারানো গদি পুরুদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা ও ক্রমে মেটিয়াবুরুজকে লখনৌ এর ক্ষুদ্র সংস্করণ বানালেন তিনি তারই গল্প রয়েছে এতে। সঙ্গে নবাবের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন বর্ণনা যা এই কাহিনীকে আরও পোক্ত করেছে। লেখক সম্পর্কে কিছু বলার মত ধৃষ্টতা আমার নেই, 'ঠগী'-র পর তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ পড়লাম, প্রচুর পড়াশোনা করে তবেই এই লেখা লিখতে পেরেছেন তিনি। চিত্রকর গণেশ পাইনের ছবিগুলিও বইটিকে নয়নাভিরাম করেছে। এককথায় অসাধারণ লাগল।
'বাদশাহী আংটি' কিংবা 'শকুন্তলার কণ্ঠহার' পড়ার সময়ই লখনৌ নিয়ে একটা বিচিত্র অনুভূতি কাজ করতো। ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়কে একেবারে চোখের সামনে দেখার অনুভূতি ওই শহরে গেলে পাওয়া যায়। দুইপাশে শহর, মাঝদিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, ভীষণ রোমাঞ্চিত করতো। ওয়াজিদ আলি শাহ এর কথা বেশ গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছে বাদশাহী আংটি বইয়ে৷ আছে তাঁর 'যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী' গানের কথা, যে গানের সুরে আছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কত কাল রবে বল ভারত হে গান। এই প্রতিটা স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছিল শ্রীপান্থের এই বইটি পড়ার সময়। কারণ, ওই বিষয়গুলোই আরো বিস্তৃত এবং তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে এসেছে বইটিতে। ইতিহাস নিয়ে লেখা শ্রীপান্থের এই নন-ফিকশনগুলো পড়ার সময় এমন এক অপূর্ব অনুভূতি হয় যে ভাষায় বোঝানো সম্ভব না। এত সহজ ভাষায়, ছোট ছোট লাইনে বর্ণিত হয় ঘটনাবলি যে আগ্রহ ধরে রাখা যেমন সহজ হয় তেমনি তথ্যগুলো মনে রেখাপাত করার পর্যাপ্ত সময় পায়। কোথায় সেই লখনৌ আর কোথায় এই কলকাতার মেটিয়াবুরুজ। আভিজাত্য, ঐতিহ্য আর নবাবিয়ানায় দুটো সমকক্ষ কখনোই না। এদিকে স্বাধীনতা হারিয়ে নবাবরাও তো ইংরেজদের কুক্ষিগত। তবুও সংস্কৃতি, সংগীত চর্চা, নিজস্বতা বেশ কিছুটা বজায় রাখতে পেরেছিলেন তাঁরা আর পেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। সাধারণভাবে হয়তো এতোটা পেতেন না, বন্দী হওয়াতেই আপন ভাবা নবাবদের প্রতি সাধারণ মানুষ হয়ে পড়লো আরো অনুরক্ত৷ ইংরেজরা স্বভাবতই সাধারণ মানুষদের সাথে মিশে উঠতে পারেনি। ওয়াজিদ আলি শাহ ছিলেন প্রেমিক পুরুষ, প্রেমে পড়তেন, গান বাঁধতেন, বিয়ে করতেন, টাকাও ছড়াতেন ইচ্ছেমতো। অন্তত সামর্থ্য যতদিন ছিলো। এই বেগমদর মধ্যে আবার কেউ কেউ আপন ব্যক্তিত্বে ছিলেন ভাস্বর। হজরত মহল তেমনই একজন। আরো নানা কাহিনী, ইতিহাসের সমন্বয়ে নাতিদীর্ঘ বইটি ছিল ভীষণরকম উপভোগ্য। এরই সাথে গণেশ পাইনের আঁকা ছবিগু��ো যুক্ত হয়ে বইয়ের জৌলুশ বাড়িয়ে দিয়েছে হাজারগুণ। শ্রীপান্থের বাকি কটা বইও দেখছি শীঘ্রই পড়ে ফেলতে হবে। এই বইটাও সুযোগ করে সংগ্রহে না রাখলেও চলছে না আর।
ঠগী দিয়ে শুরু, তারপর পড়ি হারেম। ঠগী পড়তে গিয়েই বুঝতে পারি লেখক হিসেবে শ্রীপান্থ অসাধারণ। ইতিহাসকে গল্পের মত করে উপস্থাপন করার ক্ষমতা তার বইগুলোকে সুখপাঠ্যে পরিণত করে। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের "সেই সময়" পড়ার সময় নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-এর কলকাতা আগমনের কাহিনীর অংশবিশেষ জানতে পারি। সেই ঘটনারই বিস্তারিত আলোচনা আছে এই বইতে। এই বইয়ের যে বিশেষ দিকটি ভালো লেগেছে তা হলো লেখকের সত্য মিথ্যা নির্ণয় করে পাঠককে নবাব এবং তার সাম্রাজ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়ার ধরনটা।
নিঃসন্দেহে পড়ার এবং সংগ্রহে রাখার মত একটা বই।
(গনেশ পাইনের আঁকা ছবি গুলো সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে পারলাম না। প্রথমত আমি ছবির সমঝদার না, দ্বিতীয়ত স্কেচ দেখে কিছু বলাটাও একজন নবীশের জন্য কঠিন।)
সুলতান-ই-আলম ওয়াজিদ আলি শা বাদশা ওরফে ওয়াজিদ আলি শা।অযোধ্যার শেষ নবাব।মহাবিদ্রোহকে ঘিরে ইংরেজদের চক্রান্তে রাজ্যহারা হয়ে প্রিয় শহর লক্ষ্ণৌ যা সেই মুহূর্তে ধ্বংস প্রায়,সেটি ছেড়ে যাত্রা করছেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে।সময় তখন ১৮৫৬সাল। আরব্য উপন্যাস পড়তে পড়তে যে ছবিগুলো কল্পনায় ফুটে ওঠে,সেগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে একমাত্র এই লক্ষ্ণৌ শহরেই-লিখেছিলেন বিদেশিনী এমা রবার্টস।মহাবিদ্রোহের রিপোর্ট লিখতে আসা লন্ডনের পত্রিকা "দি টাইমস" এর প্রতিবেদক উইলিয়াম রাসেল জ্বলন্ত লক্ষ্ণৌ দেখেই বলেছিলেন এর সাথে রোম,অ্যাথেন্স,কন্সটান্টিনোপল কোনো শহরের তুলনা চলে না।আধুনিক লক্ষ্ণৌ এর সূচনা হয় মূলত নবাব আসফঊদ্দৌলার হাত ধরে।অঢেল টাকা তিনি ব্যয় করেছেন নগর সজ্জায়।প্রায় প্রত্যেক নবাবই এই শহরকে নতুন নতুন প্রাসাদ,মহল,ইমামবাড়া,রাস্তা,গম্বুজ,মিনার,সৌধ,নদীর ওপর ব্রীজ এসব উপহার দিয়ে গেছেন।স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের শহরকে বলতো "আখতার নগর" বা স্বর্গীয় শহর।লক্ষ্ণৌ ভারতের ব্যবিলন। লক্ষ্ণৌ থেকে বিতাড়িত হলেও ওয়াজিদ আলি শা-এর রুচি বা শৈল্পিক বোধ চলে গিয়েছিলো না। ভাগীরথীর তীরে কলকাতাকে তিনি সাজাতে লাগলেন তার প্রিয় শহর লক্ষ্ণৌ এর আদলে।ইমারতের পর ইমারত,চিড়িয়াখানা,বাগ-বাগিচা গড়ে উঠতে লাগলো।মেটিয়াবুরুজে আসতে শুরু করলো গায়ক,কবি,নর্তকী,চিত্রশিল্পী।গোমতী তীরের মতো ভাগীরথীর তীরেও চলতে লাগলো গজল,কত্থক,ঠুমরী। বইটিতে পুরোনো রাজ্যের ঐশ্বর্যের বর্ণনা,ইংরেজদের দখলদারি,বিশ্বাসঘাতকতা, নবাবের কলকাতায় এসে নতুন জীবন ধারার কথা এসব এত প্রাণবন্ত ভাবে সাজানো যে বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।সুখপাঠ্য একটি বই।
অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ তাঁর সদলবল নিয়ে কলকাতা আসেন ১৮৫৬ সালে। ইংরেজদের চক্রান্তে তিনি রাজ্যহারা। ইংরেজ সরকার তাঁকে নির্বাসিত করেছে কলকাতায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লাতে নবাবকে আটকে রাখা হয় দীর্ঘদিন। তারপর নবাবের নতুন ঠিকানা হয় কলকাতার মেটিয়াবুরুজ। ওয়াজিদ আলি শাহ ইতিহাসের এক বিয়োগান্ত সময়ের দুঃখী নায়ক। কিন্তু চক্রান্ত, বিশ্বাসঘাতকতা, চরিত্রহননের নিপুণ চেষ্টা, কোনও কিছুই হত্যা করতে পারেনি ওয়াজিদ আলি শাহর সম্ভ্রান্ত, গর্বিত এবং সংবেদনশীল উদার চরিত্র, তাঁর শিল্পী মনকে। সুতরাং দেখতে দেখতে মেটিয়াবুরুজ পরিণত হল দ্বিতীয় লখনউ - এ। সেই ইমারতের পর ইমারত, সেই চিড়িয়াখানা।লখনউর মতোই গায়ক গায়িক, নর্তক নর্তকী, কবি এবং চিত্রশিল্পীর ভিড় মেটিয়াবুরুজে। উনিশ শতকের কলকাতার সেই বিবর্ণ এবং বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়কেই এ বইয়ের পাতায় আশ্চর্য নৈপুণ্যের সঙ্গে ফিরিয়ে এনেছেন লেখক। শুধু ওয়াজিদ আলি নন, তাঁর সঙ্গে সহসা আবার প্রাণ ফিরে পেল সেদিনের লখনউ, কলকাতা এবং মেটিয়াবুরুজ। সঙ্গে বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী গণেশ পাইনের আঁকা অনেক ছবি।
লক্ষ্ণৌ তথা অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ এর জীবনচরিত। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে রাজা নির্বাসিত হন কলকাতায়। কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে পরাজিত নবাব গড়ে তোলেন দ্বিতীয় লক্ষ্ণৌ। প্রাসাদ, চিড়িয়াখানা , নর্তকী, গায়ক, বারবনিতা, কবুতর-মোরগ লড়াই, সুরাপান তথা বিলাসের সকল রকম উপকরণ মজুদ ছিল মেটিয়াবুরুজে। লেখক নবাবের জীবন তো শুধু নয়, সেই সময়ের অযোধ্যার সাংস্কৃতিক, সামাজিক ঐশ্বর্যকে চিত্রিত করেছেন। লক্ষ্ণৌয়ের প্রতিটি মানুষ যেন কবি। প্রতিটি সড়ক ছিল চাকচিক্যময় বাজারে ছিল নকশাদার পরিচ্ছদ, বর্তমানের ট্রেন্ডি চিকনকারি ও লক্ষ্ণৌয়ের আবিষ্কার। লক্ষ্ণৌ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সকল কবি, গায়কের স্বর্গ। বিখ্যাত কবি গালিব লক্ষ্ণৌকে বলেছিলেন পূর্বের বাগদাদ। লক্ষ্ণৌর নবাবরা ছিলেন দোষে-গুণে, বিলাসিতায়, জনপ্রিয়তায় অনন্য। একসময়কার সেই জৌলুসময় লক্ষ্ণৌ হারিয়েছে কালের গর্ভে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে লক্ষ্ণৌর রুচিশীল কীর্তিনামা। শ্রীপান্থের রচনার গুণ এমন, ননফিকশন একটুও ননফিকশন মনে হয়না। মনে হচ্ছিল যেন পাড়ার কোন বয়্যজেষ্ঠ অতীতের গল্প শুনিয়ে চলেছেন!
"এ তো ঘর নয়, বিরহের অনন্ত সাগর। তরুণ এখানে বৃদ্ধ হয়ে যায়।" নবাব ওয়াজেদ আলীর ফোর্ট উইলিয়ামে কষ্টকর দিনগুলো সম্পর্কে এমনই বলা হয়েছে। ইংরেজদের চক্রান্তে রাজ্যহারা নবাবের স্থান হয় ফোর্ট উইলিয়াম। মহাবিদ্রোহের পর ছাড়া পেয়ে নবাব আশ্রয় নেন মেটিয়াবুরুজে।যে স্বপ্নের লখনৌ তার অধরা থেকে গেছে,সেই স্বপ্নকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে তোলেন মেটিয়াবুরুজকে।এটি হয়ে উঠে দ্বিতীয় লখনৌ - শিল্পমনা ব্যক্তিবর্গদের আমোদের স্থান ও আশ্রয়স্থল। নবাবের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় একসময়ের জনপ্রিয় মেটিয়াবুরুজের জৌলুস।
নবাবের চরিত্রে যেমন ফুটে উঠেছে রোমান্টিকতা, শিল্পমনা অভিব্যক্তি তেমনি একজন দুর্বল ,নারী লোলুপ, অপব্যয়ী ,বিলাসপ্রিয় চিত্রও উঁকি দিয়ে গেছে। ইংরেজদের শোষণ, নবাব মাতার সাহসী ভূমিকা, উত্তরাধিকার সমস্যা, ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নবাবের ভূমিকা আলোচনার পাশাপাশি লেখক তুলে ধরেছেন বাবরি মসজিদের সেই ধূসর অতীত।
সর্বোপরি গণেশ পাইনের আঁকা লেখকের লেখাকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে।