Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
কয়েকটি বিহ্বল গল্প শাহাদুজ্জামানে প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন। সংকলনের নিজস্ব রীতিতে এখানকার অধিকাংশ গল্পই যেমন অসাধারণ,আবার কয়েকটা মোটামুটি মানের গল্পও আছে। তবে শাহাদুজ্জামান প্রথমেই বলে নেন, গল্পটা কাদের জন্য, এক গল্পের ভেতরেই- 'পৃথিবীকে যার একদিন মায়াবী পারের দেশ বলে মনে হত, নিজেকে মনে হত ঝিলের মধ্যে জলঘাস, যিনি সেই জলজ চোখে চারদিকে তাকিয়েছেন ভয়ে, আগ্রহে, অনুরাগে, এ গল্পটি তার জন্য।' 'শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে অভিনব এক শিশু কোলে পুরাণকথার সেই একাকী বালিকা যেভাবে চরাচরে নৈ:সঙ্গ ব্যপ্ত করে গেয়ে ওঠে-নিদারুণ শ্যাম, তোমায় নিয়ে বনে আসিলাম। কোলের শিশুটি তার স্বামী, এই অভূতপূর্ব সত্য সেই বালিকা যেমন করে বয়ে বেড়ায় এক, দুই, তিন করে বারটি বছর, সেইমতো আশ্চর্য কঠিন কোন সত্য যিনি বহন করে বেড়ান নিরন্তর, এ গল্পটি তার জন্যও।' ছোটগল্প নিয়ে পাঠ অভিজ্ঞতা লেখার একটা বিপজ্জনক দিক আছে, যারা এখনো পড়েননি তাদের জন্য ব্যাপারটা স্পয়লার হয়ে যাওয়ার চান্স থাকে। কিন্তু এসব গল্পে বলবার মত তেমন কোন গল্পই নেই, যা আছে তা এক একটি ভাবনা বলাই বেশি যৌক্তিক, তাই আলোচনাতেও সেসব স্পয়লার হয়ে উঠে না। অগল্প নামক গল্পের কথাই ধরা যাক, সেখানে লেখক ভাবেন তিনি আঁকবেন এমন এক আশ্চর্য সংকটের চিত্র, যেখানে এক মুক্তিযোদ্ধা দল পাহাড়ের কানাগলিতে আটকে পড়ে, আর তাদের রক্ষা পাওয়ার একটিই উপায় থাকে, সেটা হল দলের সাথে থাকা একমাত্র গ্রেনেড দিয়ে কোন এক যোদ্ধার আত্মাহুতি। গল্পটা শেষ পর্যন্ত লেখকের গল্প লেখা নিয়েই থাকে, তিনি এই কল্পিত কিন্তু ভীষণ সত্যি পরিস্থিতির অনেকগুলো সীমানা টানেন-এবং সেসব নিয়ে টানা পোড়েনে ভোগেন। কিছু গল্পের চমক গল্পে নয়, নামে। ছোট গল্পের জন্য এ এক অপরিহার্য দক্ষতা, নামকরণকে সার্থক করতে যেন গল্পটা বলে যাওয়া। তেমন একটি গল্প ক্যালাইডোস্কোপ, শুধু গল্পটি পড়লে আমার কোন বোধ হত না, কিন্তু নামকরণের কারনে একটা প্রিয় গল্পে পরিণত হয়। মানুষের মানসিক পরিবর্তন অনেককিছুতেই ধরা পড়ে, চাল চলনে, কথা বার্তায়, এমনকি একেকজনের সাথে একেকরকম হয়ে পড়ে। সবাই যেন মাল্টিপল পার্সোনালিটিকে ভোগা রোগী। একই চরিত্রে অভিনয় করে শুধু মহামানবেরা বা পশুরা, বাকি আমরা আজীবন সহস্র চরিত্র আর রূপে বদলে যাই যাত্রাপালার কুশলীদের মত। ‘মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া’ গল্পটিও এমন এক পাল্টে যাবার গল্প। একই সাথে নামকরণটাও এখানে অসাধারণ। কয়েকটা গল্পকে আমার মনে হয়েছে শাহাদুজ্জামানের এনজিও ভিত্তিক স্বাস্থ্য প্রকল্পের কাজের অভিজ্ঞতার নির্জাস থেকে লেখা, সেসব প্রকল্পে নিশ্চয়ই তিনি পেয়েছিলেন হারুণের মত কাউকে, রফিকুল ইসলামের মত কাউকে, যাদের কথা তিনি লিখেছেন ‘হারুণের মঙ্গল হোক’ বা স্যুট টাই অথব নক্ষত্রের দোষ’ গল্পগুলিতে। আমাদের দেশে, মধ্যবিত্তরা নানা যাতনা সয়ে বেড়ায়, সর্ব্বোচ্চ পড়াশোনার ডিগ্রীটা নিয়েও ভাল কোন চাকরী জুটাতে পারে না, এমন কিছু যুবক শেষমেশ এনজিওতে চাকরী নেয়, স্বভাবতই তাদের স্বপ্নগুলো মাটিচাপা দিয়ে এসে তারা ছুটে বেড়ায় নানা প্রজেক্টের জন্য নানা প্রান্তিক কোণে। গল্পের হারুণকে যখন গ্রামের কোন বৃদ্ধ বলে, বাবা মেট্রিকটা ঠিকমতো পাশ করলে আমাদের মতো গরীবদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাকরী করা লাগতো না, তখন আমরা এইসব যুবকদের স্বপ্নগুলো একধরনের হৃদয়ে-ক্ষতে পরিণত হতে দেখি। কিংবা রফিকুল ইসলামের মত, যে কিনা কর্তার মন যোগাতে স্যুট টাই যোগাড়ের পরিকল্পনা করে, পড়তে পড়তে আমাদের পাঠকদের মাথা হেট হয়ে আসে। কিংবা ‘ক্ষত যত ক্ষতি তত’ গল্পে পোশাক শ্রমিক মমতাজের গল্প শুনি, যে কিনা আমাদের শহরে গুহার মত কোন কোণে থাকে, রোজ সকালে নুড়ি পাথরের মত গড়িয়ে পড়ে রাস্তায়, তারা আমাদের কাছে অদৃশ্য জনতা, তাদের নিয়ে করা এ গল্প খুব চমকপ্রদ কিছু না, গল্পের চেয়ে সংবাদপত্রেই এধরণের ঘটনা আমরা অহরহ দেখি। তারপরও তাদের নিয়ে লেখকের ভাবনা জরুরী, সে অবশ্যকর্তব্যের দায়েই শাহাদুজ্জামান তাদের আঁকেন। কতিপয় ভাবুক গল্পটি আমার একটি প্রিয় গল্প এ গল্পগ্রন্থের, শাহাদুজ্জামান যখন বলেন, ভাবলে মানুষকে সুন্দর দেখায়-তখন কথাটার অন্যরকম একটি সত্যে আমি মন্ত্রমুগ্ধ না হয়ে পারিনা। এ গল্পে অন্যদের ভাববার জন্য যখন গল্পকথক একটি গল্প ছোড়েন গল্পের ভেতরের কয়েকজন শ্রোতার উদ্দেশ্যে, তখন সে গল্পের চরিত্ররা গল্পটি বিশ্লেষণ করে। এ যেন মানুষের ভাবনা নিয়ে, বিচারবোধ নিয়ে এক খেলা। টুয়েলভ অ্যাঙ্গরি ম্যান মুভির মত তাদের বিশ্লেষণে আমাদের মনে হয় মানুষ যেকোন পক্ষেই থাকতে পারে নিজ নিজ যুক্তিতে নিজেকে কনভিন্স করে। সংকলনের যে দুটি গল্প আমার পছন্দ হয় নি, সেগুলো হল মৌলিক এবং কারা যেন বলছে। গল্পগুলি হয়তো ভালই, কিন্তু শাহাদুজ্জামানের প্রচলিত প্রজ্ঞা অনুপস্থিত মনে হয়েছে। শেষ করি সবচেয়ে ভাল লাগা গল্পটি দিয়ে, মারাত্মক নিরুপম আনন্দ আমার মতে এ গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ গল্প। তাতে কনিষ্ঠ একজন আলাপচারিতা চালায় তার জ্যেষ্ঠ কারো সাথে, যে উপদেশপ্রবণ। এই কনিষ্ঠ ও জ্যেষ্ঠ মিলে কয়েকটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের পর্যালোচনা করে, যাতে মিশে থাকে আশ্চর্য দর্শন। জ্যেষ্ঠ: তুমি কি তোমার যাত্রার গতিমুখ বিষয়ে সচেতন? কনিষ্ঠ: সচেতন জ্যেষ্ঠ: তোমার যাত্রা কোন অভিমুখে? কনিষ্ঠ: আমার যাত্রা উদরপূর্তি হইতে ক্ষুধায়। জ্যেষ্ঠ: অধিকন্তু? কনিষ্ঠ: আকণ্ঠ পান হইতে তৃষ্ণায়। জ্যেষ্ঠ: এবং? কনিষ্ঠ: প্রবল আনন্দ হইতে গভীর বেদনায়। জ্যেষ্ঠ: এই যাত্রায় উল্লেখ্য কী অর্জন হইতেছে? কনিষ্ঠ: আমার বন্ধন শিথিল হইতেছে। জ্যেষ্ঠ: কিসের বন্ধন? কনিষ্ঠ: যথা নৈতিকতার,যথা লজ্জার, যথা আশার...
যদিও পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো আমার মতে শাহাদুজ্জামানের সেরা ছোটগল্প, তারপরও কয়েকটি বিহ্বল গল্প এক অসাধারণ পাঠ অভিজ্ঞতা।
শাহাদুজ্জামানের পড়া প্রথম বই... আসলে ছোট গল্প আমাকে খুব টানে... কয়েক পৃষ্টার গল্পগুলোতে শিখার মত অনেক কিছুই থাকে
এই "কয়েকটি বিহ্বল গল্প" বইটা আমি কোথায় পড়ি নাই!! টিউশনে, বাসে, ক্লাসে, কোথায় পড়ি নাই গল্পগুলো!!
এই কয়েক পৃষ্টার গল্পগুলো আমাকে ভাবিয়েছে, লেখকের লুকিয়ে রাখা কথাগুলো বেশ ভাবিয়েছে... আর, কয়েক পৃষ্টার গল্পের লেখা এত অসাধারণ কিভাবে হতে পারে!! মাত্র ২-পৃষ্টার গল্প "কিছু শিরনামা"র কথাগুলো যে এত গভীর ছিল!! ৭২-পৃষ্টার এই বই অনেক কিছুই বলেছে, অনেক ভাবিয়েছে, লেখকের গভীরে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো অনেক কিছু শিখেয়েছে
প্রিয় গল্প সংকলন-এর তালিকায় থাকলো। 'বিসর্গতে দুঃখ' পড়ে যেমন বিহ্বল হয়েছিলাম তেমনি 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' পড়ে বিহ্বলের পাশাপাশি আরেকটু ভাবুক যেন হলাম।
মানুষ যখন ভাবে তখন তাকে সত্যিই খুব সুন্দর দেখায়। বাতিঘরে বই পড়তে আসা প্রতিটা মানুষকে আমার সুন্দর লাগে। কারণ তারা ভাবুক।
অপরের উপযোগী মুখমন্ডল রচনার প্রয়োজন আসলেই আমাদের মতো বই পড়ুয়াদের ফুরিয়েছে সেই কবেই। বরং আমরা এখন অপরের মুখমণ্ডল আমাদের উপোযোগী করব।
যাতে তারা সবাই বই পড়ে। সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরে মরণ পথে যাত্রা আনন্দময় করে। উন্নতির সাথে আনন্দের ভারসাম্য বজায় রেখে এই দুঃখী জীবন সুখী করে। জীবন সুখী না করতে পারলেও দুঃখটাকে যেন আলিঙ্গন করে সুখের চেয়ে অধিক।
৫ তারার সব বই পড়া হোক তাহলে। ৪ তারাও পড়তে হবে মাঝে মাঝে। তবে ৩ তারা! আর নয়, আর নয়।
একটা ছোটগল্প সংকলনের রিভিউ দেয়া বড্ড কষ্টের কাজ। স্বাভাবিকভাবেই একটা বেশ ভালোরকমের ছোটগল্পের বইয়েও অসাধারণ সব গল্পের সাথে সাথে কিছু নিতান্ত সাধারণ মানের গল্পও থাকে। এজন্য সামগ্রিকভাবে বইটিকে বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্যালাইডোস্কোপ, হারুণের মঙ্গল হোক, মিথ্যা তুমি দশ পিপড়া, কতিপয় ভাবুক,অগল্প এবং অবশ্যই জ্যোৎস্নালোকের গল্প(এই গল্পটাই আমার সবচে' ভালো লেগেছে).....শুধুমাত্র এই গল্পগুলো নিয়েই যদি সংকলনটি হতো, তবে পাঁচ তারা না দিয়ে উপায় ছিল না। কিন্তু ঐ যে মোটামুটি মানেরও কিছু গল্প রয়েছে। সেজন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিন তারকা।
প্রায় সকলেই শাহাদুজ্জামানের প্রথম দিককার গল্পগুলোকে সাম্প্রতিক কালের গল্পগুলোর তুলনায় অধিক মানসম্পন্ন মনে করেন, কিন্তু আমার 'মামলার সাক্ষী ময়না পাখি' বইটিকে সামগ্রিকভাবে এই গ্রন্থ থেকে ভালো লেগেছে। আমার ক্ষেত্রে উল্টোটাই কেনো হলো কে জানে!
শাহাদুজ্জামান অত্যন্ত শিক্ষিত, জ্ঞানী মানুষ। সাহিত্যের জন্য তার যে রেফারেন্স পুল, সেটা বিশাল। কিন্তু সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে লেখা গল্পগুলোকে লেকচার বানিয়ে ফেলার মতো ভুল তিনি কম করেন। লেখার ভঙ্গি যেমন সাবলীল, লেখার দৈর্ঘ্য তেমনই মাপা। ছোট গল্পকে তিনি ছোট গল্প হিসেবেই রাখেন। তিন-চার পাতায় সুন্দরভাবে নিজের পয়েন্ট বোঝাতে পারেন, রঙিন চরিত্র তৈরি করতে পারেন, একটা অনুভূতিকে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে পারেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তার লেখা সব গল্পের জন্যই প্রযোজ্য। তবে নির্দিষ্ট যে গল্পগুলো আমার বেশি ভালো লেগেছে, সেগুলো হচ্ছে:
ক্যালাইডোস্কোপ। এক ধনী পরিবারের ছোট্ট, তিন পাতার পোর্ট্রেট। কিন্তু এই তিন পাতায় পুরো পরিবারের সবগুলো চরিত্রকে আলাদা ব্যক্তিত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই ব্যক্তিত্বে জটিলতা বা শেইডিং যোগ করা হয়েছে, আলাদা মোটিভেশন দেওয়া হয়েছে, মনে রাখার মতো করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গল্পের শেষে চমৎকার ডার্ক হিউমার।
মৌলিক। শ্রেণিবিভেদ আর কীভাবে শ্রেণিদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়, আর ক্ষুধা এবং পরিস্থিতি কেমন করে সেই বিভেদের পর্দা ছিঁড়ে ফেলতে পারে তা নিয়ে দারুণ একটা গল্প।
কতিপয় ভাবুক। প্রায় মিথিকাল ধাঁচে লেখা এই গল্পে দেখানো হয়েছে যেকোনো ঘটনা বা মানুষ বিচারে কেমন করে মতামত বিক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে। কোনোকিছুর অর্থ যে অন্তর্নিহিত নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্কে সেই অর্থ তৈরি হয়, এমন একটা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এই সংক্ষিপ্ত গল্পে। রাশোমনের ছাপ লক্ষ করা যায়।
মারাত্মক নিরুপম আনন্দ। এই গল্প অনেকটা চিত্রনাট্যের মতো করে লেখা। আমার কাছে অস্তিত্ববাদী মনে হয়েছে, হয়তো অস্তিত্ববাদের লেন্স দিয়ে বিচার করেছি বলে। এখানে দেখানো হয়েছে একটা সফল বা অর্থপূর্ণ জীবনের মানচিত্র কেমন হতে পারে। জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে কী ধরা যেতে পারে। কিছু দিক থেকে গল্পটাকে ওয়েটিং ফর গডো-এর বিপরীত মনে হয়েছে, বা সেই নাটকের অ্যাবসার্ডিজম-এর বিপক্ষে তর্ক বলে মনে হয়েছে।
এবার আসি যা ভালো লাগেনি সেই প্রসঙ্গে:
সমসাময়িক বাংলাদেশি সাহিত্যিকদের অধিকাংশ নগরবাসী। যে কারণে নগরের প্রতি তাদের মজার এক ধরনের বিদ্বেষ কাজ করে। নস্টালজিয়ার বিষ তাদের ভাবনায় চুপিচুপি ঢুকে পড়ে। তাদের ধারণা শৈশবে বা ঘুরতে যেয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে যে গ্রাম দেখেছেন, সেটাই হচ্ছে বসবাসের আদর্শ জায়গা। গ্রামের মানুষ সরল। প্রকৃতি সৌম্য। গ্রামের জীবন কঠিন হলেও জটিল নয়।
এই সমস্যাগুলো শাহাদুজ্জামানের গল্পেও প্রকট। তার ধারণা প্রকৃতি মানে গাছপালা, নদীর মাছ, সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত। যা চোখে দেখা যায়, রোমান্টিক আমলের কবিরা যেটাকে প্রকৃতি বলে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। মানুষ এবং মানুষের সৃষ্টি হচ্ছে অপ্রাকৃতিক।
তার মতে গ্রামের মানুষের রীতিনীতি শহরের মানুষের বোধগম্য নয়, গ্রাম হচ্ছে নাগরিকদের জন্য ভিনগ্রহ। গ্রামবাসীকে ছড়া কেটে ধাঁধা বলতে শুনলে শহরের মানুষ ‘বিহ্বল’ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
এই বিষয়গুলো একদমই সত্য বলে মনে হয়নি। গল্পগুলোকে কিছুটা হালকা করে দিয়েছে। বাংলাদেশ এখনও সেই জায়গায় আসেনি যেখানে শহরের মানুষ জানবে না লোকসঙ্গীত বা লোকসংস্কৃতি কী। হয়তো সেই সংস্কৃতির খুঁটিনাটি জানবে না, কিন্তু গ্রামের নিজস্ব গান আর ছড়া আছে, পুরনো রিচুয়াল আছে-তা জানে না এমন মানুষ কোথায়? গ্রামের মানুষকে হিউম্যানাইজ করতে চেয়েছেন লেখক, কিন্তু তা করতে যেয়ে তাদের জীবনকে শেষমেষ নাগরিকের চোখ দিয়েই দেখিয়েছেন। গ্রামবাসী কি শহরবাসীর থেকে বেশি সরল? না। দুই পক্ষই মানুষ। গ্রাম্য মানুষকে সরল বলা তাদের জন্য এক ধরনের অপমান হিসেবেই মনে হয়। তারাও নাগরিকদের মতো ভুলভ্রান্তি করে, মিথ্যা বলে, ষড়যন্ত্র করে, আবার সত্যও বলে, ভালোবাসতে জানে। এই মিশ্রণটা দেখিনি শাহাদুজ্জামানের লেখায়।
এছাড়াও লেখকের নিজস্ব ভঙ্গি বা স্টাইল খুব ডিসটিংকটিভ নয়। তিনি লেখেন সুন্দর করে, কিন্তু লেখাকে আপন করেন না। নিজের কণ্ঠে না বলে যেন বাংলা সাহিত্যের ভাষায় কথা বলেন। উদাহরণ হিসেবে জহিরের কথা বলতে পারি: শহীদুল জহিরের কোনো গল্প চিনতে গল্পের মাথায় লেখকের নাম দেখা লাগে না। কিন্তু শাহাদুজ্জামানের ক্ষেত্রে তা বলা সম্ভব হচ্ছে না।
একটা বিষয় বলে রাখা ভালো: আমি আসলে শাহাদুজ্জামানের গল্পসমগ্র-১ পড়েছি, যেটার প্রথম অংশ ছিলো কয়েকটি বিহ্বল গল্প। এর পরের গল্পগুলোও পড়েছি রিভিউ লেখার আগে। কিন্তু ওপরে যেই ক্ষমতা আর দু্র্বলতাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো পেয়েছি প্রায় সব লেখাতেই।
তাও, শাহাদুজ্জামানের লেখায় দক্ষতার তুলনায় দুর্বলতা (অন্তত আমি যেগুলোকে দুর্বলতা বলছি) অত্যন্ত কম। অনেকগুলো গল্প ভালো লেগেছে। কিছু গল্প মনেও থাকবে বেশ কিছুদিন। তাকে আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্যিক বললে অবশ্যই ভুল হবে না। তার উপন্যাসগুলো এখনও পড়া হয়নি, ধরবো দ্রুতই আশা করি।
'ক্রাচের কর্নেল' শেষ করতে পারি নাই, তাই এই বইটা শুরু করা নিয়ে খানিকটা দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু আমার সমস্ত দ্বিধা ও সংশয় অমূলক...শাহাদুজ্জামানের পরিমিতি বোধ, ভাষা প্রয়োগে তার যথার্থতা ও নিপুণতা, সর্বোপরি প্রতিটি গল্পের পেছনে তার আইডিয়া ও ফিলোসফি সত্যিই প্রশংসনীয়। ব্রাভো!
কয়েকটি বিহ্বল গল্প পড়ে আক্ষরিক অর্থেই বিহ্বল হয়ে গেলাম। ছোট গল্পের দুনিয়ায় শাহাদুজ্জামান বরাবরই অনবদ্য। এই দুনিয়ায় তিনি শব্দ এবং প্লটের রাজা। এখানে পাঠকের মন,মস্তিষ্ক, ভাবনা নিয়ে খেলতে সিদ্ধহস্ত তিনি। যেমন, এই বইয়ের কিছু গল্প পড়ে যেমন ক্যায়াবাত,ক্যায়াবাত করেছি, কিছু গল্প পড়ে আবার বিহ্বলতা কাটিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারিনি। ছোট্ট একটা বই ভাবনার মোড়কে তৃপ্তি দিয়ে গেলো।
কিছু গল্প খুব ভালো লেগেছে, কিছু গল্প ভালোমন্দ মিশ্র অনুভূতি দিয়েছে। দু-একটা গল্প বিতৃষ্ণা জাগিয়েছে। শাহাদুজ্জামানের গদ্যগুলো কবিতার মতো। তাই গল্পের মধ্যে কোন গল্প না থাকলেও পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়। তবে গভীর ইতিবাচক চিন্তার খোরাক যোগানোর মত কিছু গল্প অবশ্যই এখানে আছে। একই কাহিনী বিভিন্ন সাইকোলোজিকাল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো শাহাদুজ্জামানের গল্পের খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটা বৈশিষ্ট্য, সেটা তাঁর গল্পের সৌন্দর্যের একটা রহস্যও বটে। কিছু গল্পে শাহাদুজ্জামান রাজনৈতিক ম্যাসেজ দিয়েছেন। কোন গল্প লেখার সময় তিনি হয়তো বেশ রেগে ছিলেন, খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন; সেসব গল্পগুলো কোন নির্দিষ্ট সময় বা কালের প্রতিনিধিত্ব করে। সব পাঠকের পক্ষে সেই আবেগ বা সময়ের সাথে চ্যানেলিং সম্ভব হবে না। আমার যেমন ইচ্ছা হয়নি সেই আবেগের সাথে যোগাযোগ করি। যদি আবার কখনো এই বই পড়তে ফিরে আসি, তাহলে এই গল্পগুলি আবার পড়া যেতে পারে: এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প, ডোডো পাখির জন্য নষ্টালজিয়া, হারুনের মঙ্গল হোক, মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া, কতিপয় ভাবুক।
বইয়ের শিরোনাম দেখে প্রেমে পড়ার অভ্যাস আমার পুরনো। 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' নামটা এত সুন্দর লেগেছে, প্রায়ই আমি এখানে ওখানে নামটা ব্যবহার করে বেড়াই। শাহাদুজ্জামানের গল্প কিংবা লেখনির বরাবরই ভক্ত আমি। তার অন্যতম প্রধান কারণ বলতে পারেন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় নির্বাচন আর পার্সপেক্টিভ। এই ধরণের লেখাগুলো পড়তে যে কি ভালো লাগে আমার। দেখেন, আমরা গল্প উপন্যাস পড়ি কারও গল্প শোনার জন্য৷ গল্পের ভিন্নতা কিন্তু শুধু কাহিনির বদৌলতেই হয়না, বিষয়, বিচারভঙ্গী আর পার্সপেক্টিভ কিন্তু বিশেষ একটা পরিবর্তন আনে। এই বইটাতে ১৪টি গল্প আছে। প্রত্যেকটাই ব্যতিক্রম। নামগুলোও এতো সুন্দর। নামগুলো বলি... এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প, অগল্প, ক্যালাইডোস্কোপ, মৌলিক, ডোডো পাখির জন্য নস্টালজিয়া, হারুনের মঙ্গল হোক, মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া, ক্ষত যত ক্ষতি তত, জোৎস্নালোকের সংবাদ, স্যুট টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ, কারা যেন বলছে, কতিপয় ভাবুক, কিছু শিরনামা, মারাত্মক নিরুপম আনন্দ। কি দারুণ নামগুলো! আমি বইটা বেশ সময় নিয়ে পড়েছি৷ একটা একটা করে গল্প পড়েছি যখন মন চেয়েছে। শাহাদুজ্জামান বর্তমান সমসাময়িক লেখকদের মাঝে অন্যতম সেরা গল্পকার এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। মুগ্ধ হই আমি ওনার গল্পগুলোতে। এই বইয়ের কয়েকটি গল্প যেমন মৌলিক, যেখানে এক রুচিশীল অহংকারী মানুষকে তিনি ক্ষুধার কাছে কিভাবে হার মানতে হয় দেখিয়েছেন। হারুনের মঙ্গল হোক গল্পে এক এনজিওতে কাজ পাওয়া ব্যক্তির চাকরি টিকিয়ে রাখার সংগ্রামটাকে নিদারুণভাবে দেখিয়েছেন। আবার মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া গল্পে এক সদ্য কমিশন প্রাপ্ত যুবকের তিন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠানো তিন ভিন্ন সত্ত্বার চিঠি একটা ধারালো চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাকে। এরকম সুচিন্তনীয় গল্পগুলো আসলেই আনন্দ দিয়েছে আমাকে।
লেখনী এবং গল্প উভয়ই সমান মুগ্ধ করেছে। পেয়েছি উদ্ধৃত করার মতো অসংখ্য বাক্য ও প্যাসেজ। প্রতিটি গল্পই উপভোগ করেছি, এমনকি "মৌলিক" গল্পটিও, তবে সবচেয়ে প্রিয় ছিল - * একটি কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প * অগল্প * ক্যালাইডোস্কোপ * ডোডো পাখির জন্য নষ্টালজিয়া * মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া * ক্ষত যত ক্ষতি যত * কতিপয় ভাবুক
শাহাদুজ্জামানের লেখা যখনই পড়ি, তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ভাষাশক্তি আর আঙ্গিক বৈচিত্র্যে মুগ্ধ না হয়ে পারিনা। 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' লেখকের প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি ১৪টি অভিনব ছোটগল্প বলেছেন। সবগুলোই ভালো লেগেছে; কোনোটা কম, কোনোটা বেশি।
"ইহাতে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য চিন্তার খোরাক রহিয়াছে।" এই কথাটা শাহাদুজ্জামান "ডোডো পাখির জন্য নস্টালজিয়া" গল্পে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে গোটা বইয়ের জন্যই কথাটা সমানভাবে প্রযোজ্য। গল্পের মাঝে পাঠককে ভাবনার জগতে ঘুরিয়ে আনার যে চমৎকার ক্ষমতা শাহাদুজ্জামানের আছে তাতে বরাবরই মুগ্ধ হয়েছি। সাহিত্য যাত্রায় তার প্রথম বই হিসেবে একে দুর্দান্তই বলা চলে।
বইয়ের প্রথম দুটি (এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প; অগল্প) আর শেষের দুটি (কিছু শিরনামা; মারাত্মক নিরূপম আনন্দ) ভিন্ন রীতির গল্প পড়ার জন্য অন্তত বইটির দিকে নজর দিতে হবে। মাঝখানের গল্পগুলো আমার অতো ভালো লাগে নি। ঐ গল্পগুলোতে ওরকম খাপছাড়া হুমায়ুনীয় বর্ণনাভঙ্গি না থাকলে আর গৎবাঁধা ফর্মুলায় না চললে ওগুলো ভালো হতে পারতো। বাংলাদেশে তখন হুমায়ুন আহমেদের প্রাইম টাইম চলছিলো বলেই হয়তো নবাগত লেখক তাঁর ইনফ্লুয়েন্স প্রতিহত করতে পারেন নি।
এটা যদি শাহাদুজ্জামান সাহেবের প্রথম প্রকাশিত ফিকশন সংকলন হয় আর তার মধ্যে যদি "এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প"কে তাঁর লেখা প্রথম ফিকশন ধরে নিই — তবে বলতে হয় জোরালো পোটেনশিয়াল দিয়ে তিনি লেখার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। "অগল্প" লেখাটি আমার পড়া এখনো পর্যন্ত সেরা বাংলাদেশি পোস্টমডার্নিস্ট গল্প। "কিছু শিরনামা" পুরোপুরি গদ্যে লেখা কবিতা, কবিতার মতোই বারবার পড়া যায়, অনুপ্রাণিত হওয়া যায়। নিজের পরিচয়, দর্শন, আকাঙ্ক্ষা, আর লেখক হিসেবে তাঁর যাত্রার নকশা তৈরি করেছেন তিনি বইয়ের শেষের লেখায়। কেবল এই চারটি লেখা নিয়ে সংকলন পাবলিশ হলে তা খুব যে খালি খালি লাগতো তা আমার মনে হয় না।
শাহাদুজ্জামানের সাথে পয়লা মোলাকাত হয়েছিল কয়েকটি বিহবল গল্প বইটিতে। আক্ষরিক অর্থেই গল্পগুলো পড়ে বিহবল হয়েছিলাম, বাঁধাগতের বাইরে একেবারেই আলাদা ঢঙ্গে লেখা, তারিয়ে তারিয়েই পড়েছিলাম। এরপর প্রথম মওকাতেই পড়ে ফেললাম তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ, পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ। এই বইটিতেও নিরীক্ষা নিয়ে লেখকের প্রয়াস লক্ষণীয়, প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে এই বইতে আমি আবিষ্কার করি নতুন একজন শাহাদুজ্জামানকে।
১৮৯৯ সংখ্যাটা শুনলে কবিতাপ্রেমীদের মাথায় ঝট করে একটা নামই আসার কথা। কাব্যপ্রিয় আমাকে বলা যাবেনা কোন অর্থেই, তাই শিরোনামের মাহাত্ম্য টের পেতে আমাকে কিছুদূর অবধি পড়ে যেতেই হল। ছোটগল্পের মানদন্ডেও গল্পের কলেবর একেবারেই পৃথুল নয়, শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এর মাঝেই জীবনানন্দের প্রতি উৎসারিত প্রগাঢ় অনুরাগ ঠাহর করতে বেগ পেতে হয়না বৈকি।
শুরুর গল্পটা পড়ে বইটা ছেড়ে ওঠা মুশকিল হয়ে পড়ে, এরপর তরতর করে বাকিগুলো পড়ে ফেলতে কসুর করিনা। তবে এর মাঝে একটি গল্পের কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়, আন্না কারেনিনার জনৈক পাঠিকা। এই গল্পের শুরু পুরনো বইয়ের দোকানে লেখকের আন্না কারেনিনা বইটি কেনার পরের এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। গল্পটাকে বলা যায় গল্পের মধ্যেই যেন আরেকটা গল্প, অনেকটা আমার দারুণ পছন্দের একটা ছবি দ্য ফল এর মত। আন্না কারেনিনা বইয়ের মার্জিনে একজন পাঠিকার কিছু মতামত, মতামত না বলে অবশ্য দর্শন বলাটাই যুৎসই। হাসান ভাই নামের একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে মমতার ছুঁড়ে দেওয়া কিছু আপাতসরল জিজ্ঞাসা লেখককে তাড়িত করে, বইটা পড়ার সময় লেখকের সামনে উন্মোচিত হয় একজন আনকোরা কিন্তু মনোযোগী পাঠিকার নতুন অলিন্দ। এইসব প্রশ্ন থেকে উপজাত হিসেবে বেরিয়ে আসে কিছু অমোঘ প্রশ্ন, মমতা-হাসানের সম্পর্কের একটা হালকা আঁচও পাওয়া যায় এতে। তাই গল্পে লেখকের পাঠক সত্ত্বার চেয়ে অনুসন্ধিৎসু সত্ত্বা প্রবল হয়ে ওঠে অনেকটা এভাবে-
এ ছাড়াও আরও কয়েকটি টুকরো মন্তব্যে লক্ষ করি নানা সামাজিক প্রসঙ্গে আমাদের এই পাঠিকার মনোযোগী পর্যবেক্ষণ।আন্না কারেনিনায় দেখা যাচ্ছে, সে সময় ধনাঢ্য রুশদের মধ্যে নিজের ভাষা ছেড়ে মাঝে মধ্যে ফরাসী বলার একটা ফ্যাশন ছিল। লেভিনের বন্ধুর স্ত্রী ডল্লি যখন তেমনি তার মেয়ের সঙ্গে ফাঁকে ফাঁকে ফরাসী বলছিল লেভিন তখন ভাবছিলেন- ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ফরাসী ভাষায় কেন কথা বলছেন উনি? কি অস্বাভাবিক আর কৃত্রিম। ছেলেমেয়েরাও টের পায় সেটা, এই ফরাসী শেখা আর স্বাভাবিকতা ভোলা। মমতা পাশে লিখেছেন- ঠিক যেমন আজকাল এদেশের বড়লোক পরিবারগুলোতে ইংরেজি বলা। ওদেরগুলোও মনে হয় কি অস্বাভাবিক আর কৃত্রিম।
এইভাবে একটি বইয়ের "মার্জিনে মন্তব্যে"র সূত্র ধরে লেখকের সামনে এক অনালোকিত জগতের দুয়ার খুলে যায়। এই ঠাস বুনোটের শহরে একজন অচিন পাঠিকার হারানো ঠিকুজির তিনি সন্ধান করে চলেন, আমরাও পড়ে ফেলি গল্পের মধ্যে আরেকটি গল্প।
তবে বইটির যে গল্পটা আমার চোখে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আদল নিয়েছে সেটা হল, ইব্রাহীম বক্সের সার্কাস। অন্যান্য গল্পের মত এটি স্বল্পবপু নয়, তবে গল্পের কিছুদূর এগিয়ে এটাও লেখকের ভুয়োদর্শনমূলক বলে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। গল্পের কাহিনি এক প্রত্যন্ত গ্রামে একজন তরুণ চিকিৎসকের কিছু অভিনব অভিজ্ঞতা নিয়ে। সদ্যপাশকৃত এই ডাক্তার বদলি হয়ে চলে আসেন এই দুর্গম জনপদে। এই পরিস্থিতিতে যেটা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক; গ্রামের কুসংস্কারপীড়িত মানুষের ভ্রান্ত ধারণা, রোগ বালাই নিয়ে তাদের উদ্ভট খেয়াল, আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞানতা এসবই ডাক্তারকে মোকাবেলা করতে হয়। এই পর্যন্ত গল্পটিকে আটপৌরে মনে করলে আসলে খুব বেশি দোষ ধরাও যায়না। কিন্তু এরপর প্রাত্যহিকতার আবডালে আরেকটি অতীন্দ্রিয় জগতের হদিস পান ডাক্তার, যেখানে বাস করে ইব্রাহিম বক্সের মত খামখেয়ালি, রহস্যময় একজন লোক, বকরি বুড়ির মত একজন আপাতপমূর্খ কিন্তু দুর্বোধ্য গ্রাম্য প্রবীণার। গ্রাম্য সংস্কারের আড়ালে ইব্রাহিম বক্সের কৌতূহলী মন আর বৈজ্ঞানিক সত্ত্বার ঠিকুজি ডাক্তারকে দ্বিধায় ফেলে দেয়, এতদিনের আধুনিক কলাকৌশলের সাথে এসব উন্মার্গিক অথচ সৃষ্টিশীল প্রজ্ঞার সন্ধান তাকে ফেলে দেয় ভয়ানক টানাপোড়েনে। এক লহমায় ইব্রাহিম বক্সের চিকিৎসা বিষয়ক মতবাদকে উড়িয়ে দিতে যেমন পারেননা, ঠিক তেমনি পারেননা নিজের যুক্তিবাদী সত্ত্বার সাথে টক্কর দিয়ে সবকিছু মেনে নিতে। অবশ্য নিয়তি অচিরেই তাকে এই সংকট থেকে মুক্তি দেয়, সেই গণ্ডগ্রামে ডাক্তারগিরির পাট চুকিয়ে অচিরেই তিনি ফিরে যান নিজের শেকড়ে। গল্পটা একদিক দিয়ে খানিকটা প্রথাগতই বটে, এখানেই তিনি নিরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছেন সবচেয়ে কম। চরিত্রগুলোকে স্বাভাবিক বিকাশের পথ দেখিয়েছেন, ঘটনাগুলোকে একসূত্রে গেঁথেছেন দক্ষ হাতে।
তবে অন্যগল্পগুলো নিয়ে কিছু না বললে অন্যায়ই হবে। শিং মাছ, লাল জেল এইসব গল্পে লেখক আসলে একটি থিমের ওপর কিছু ছোট ছোট চুটকি ফেঁদেছেন। গল্পটা ভীষণ রকম সুখপাঠ্য, এ ধরনের গল্প পড়ার আনন্দ অসামান্য, তবে এসব গল্প ভুলে যাওয়াটাও অনেকটা সহজ। অন্যদিকে পন্ডিত গল্পে লেখকের বিদ্রুপের তীর্যক সুর অনেকটাই স্পষ্ট, সখেদে তিনি অর্থগৃধু বুদ্ধিব্যবসায়ীদের অন্তসারশূন্যতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, বাস্তবের কর্কশ জমিনের সাথে সংশ্রবহীন তত্ত্বকথার ঝান্ডাধারীদের একহাত দেখে নেন। এসব গল্পে লেখক অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত, পাঠক হিসেবে এ ধরনের গল্পের প্রতিও আমার একটা বাড়তি পক্ষপাত আছে অবশ্য।
খুব স্থির একটি স্থির চিত্র গল্পটি আদপে স্রেফ একটা স্ন্যাপশট, যেখানে একটা খুব সংক্ষিপ্ত ঘটনার মাধ্যমে লেখক অনেকগুলো উপসংহার টেনেছেন। এখানে কাহিনি খোঁজাটা হবে অরণ্যে রোদন, তবে নিরীক্ষার ছাপ এই গল্পেও সুস্পষ্ট। উড্ডীন গল্পের ক্ষেত্রেও এই কথা অনেকটা খাটে, এই গল্পটা আমি ঠিক ধরতে পারিনি, মাঝেমাঝেই রাশটা ছুটে গিয়েছে বলে মনে হয়েছে। আয়নার ওপিঠ লাল একজন পঙ্গু মানুষের গল্প, অনেকটা ডাইভিং বেল অ্যান্ড দা বাটারফ্লাই ছবিটার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ঘরানার গল্পের একটা বিষাদমাখা সুর থাকে, সেটা আমাকে ছুঁয়ে যায় বৈকি। কিন্তু কতটা দাগ কেটেছে এ সওয়াল পুঁছলে সেটার উত্তর দিতে আমি খানিকটা ভাববই। চীনা অক্ষর অথবা লংমার্চের গল্পটিকে আমার কিছুটা কমজোরি মনে হয়েছে, ঠিক দানা বেঁধে উঠতে পারেনি ,কেন জানি মনে হয়েছে এটা হয়েছে "একটি হতে গিয়েও না হতে পারা " গল্প।
আরেকটি গল্পের কথা আলাদাভাবে বলব, নিজকলমোহনায় ক্লারা লিন্ডেন। একজন ভিনদেশী রমণী দোভাষীর সাহায্য নিয়ে গন্ডগ্রামে সন্তান প্রসবের ওপর গবেষণা করতে আসেন। অনেক চটকদার পিলে চমকানো তথ্যই তিনি জানতে পারেন, নিজের গবেষণার সাফল্যের কথা ভেবে তিনি উচ্ছ্বসিতও হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে এদেশীয় দোভাষীর কাছেও ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় দুর্বোধ্য এক প্রহেলিকার নাম, গ্রাম্য মিথের অভিনবত্ব তাকে চমকিত করে। প্রবীণ ধাত্রীর কাছে এর আবেদন আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। গল্পের শেষলাইনটি আসলে অনেক কথাই বলে দেয়-
নিজকলমোহনায় তখন দুপুর। ঢেঁকিঘরে হাওয়া, সেখানে শ্বেতাঙ্গ, বাদামি, শ্যামবর্ণ তিনজন নারীর মিথস্ক্রিয়া।
বইটিতে আমরা একজন শক্তিমান লেখকের দেখা পাই, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে যার নিবিড় পর্যবেক্ষণ রয়েছে, সমাজ- সংস্কার নিয়ে যার অভ্রভেদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে। লেখক নিরীক্ষার প্রশ্নে কোন আপস করেননি, হয়ত গল্প হিসেবে সবগুলো ঠিক উতরে যেতে পারেনি, কিন্তু প্রত্যেকটি গল্প আলাদাভাবে ভাবতে বাধ্য করবে, চিন্তার খোরাক জোগাবে এটুকু হলফ করে বলা যায়। তাই, একজন পাঠক হিসেবে পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ পড়�� লেখকের কাছ থেকে প্রত্যাশার পারদও অনেকখানি চড়ে যায়।
শাহাদুজ্জামানের প্রথম গল্পসংকলন। ব্যতিক্রমী এবং নিরীক্ষাধর্মী এই লেখকের ছোটগল্পগুলোকে ঠিক জনরায় ফেলা বেশ মুশকিল। এই গল্পগ্রন্থেও সেই প্রভাব খুব ভালোভাবেই রয়েছে।
বইয়ের প্রথম গল্প 'এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প'তে দেখা যায়, লেখক নিজেই বলে রাখছেন এ গল্পটি কাদের জন্য। ' পৃথিবীকে যার একদিন মায়াবী পারের দেশ বলে মনে হত, নিজেকে মনে হত ঝিলের মধ্যে জলঘাস, যিনি সেই জলজ চোখে চারদিকে তাকিয়েছেন ভয়ে, আগ্রহে, অনুরাগে, এ গল্পটি তার জন্য। ' গল্পটিতে প্রকৃত অর্থে 'গল্প' এর চেয়ে এর পেছনের চিন্তাবোধ বা ভাবনার বিষয়টিই প্রবল, যে জন্যেই হয়তো গল্পটি পরবর্তীতে বিভিন্ন কবিতানুষ্ঠানে কবিতা আকারে আবৃত্তিও হয়েছে। কথা বলা যেতে পারে 'অগল্প' নামের গল্পটি (?) নিয়ে। এতে দেখা যায় লেখক একটি গল্প লিখতে বসেছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প। কিন্তু একের পর এক গল্প মাথায় এসে ধরা দিলেও তার মূল সুরটা ছুটে যাচ্ছে বারবার, নিজের ভাবনার টানাপোড়েনের ফাঁদে পরে শেষপর্যন্ত নিজের সত্যি-কল্পনার এক মিশেলের জগতে ঘুরে এসে গল্প লেখার চেষ্টার ইতি টানেন। 'ক্যালাইডোস্কোপ' নামের খুব ছোট পরিসরের গল্পটায় দেখা যায় পাশাপাশি গোটা পাচেক চরিত্রের নিজস্ব ভাবনার জগৎ, যা হঠাৎ এক নাটকীয় পরিস্থিতিতে থমকে দাঁড়ায়। তখন খেয়াল হয়, পুরো গল্পের আসল উপলব্ধিটা রয়েছে গল্পের নামের ভেতরই। এরকম অত্যন্ত সার্থক ও চতুর নামকরণ দেখা যায় 'ক্ষত যত ক্ষতি তত' আর মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া' নামে গল্প দুটিতেও। 'মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া' গল্পটি একই ব্যাক্তির তিনটি ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ব্যক্তির কাছে লেখা চিঠির সংকলন, যা আদতে এক চতুর ও দারুণ সত্য উপলব্ধির পথ দেখায়, ক্যালাইডোস্কোপ এর মতই গল্পের শেষেই এর নামকরণের মাহাত্ম্য উদ্ভাসিত হয় পাঠকের কাছে। 'হারুনের মঙ্গল হোক' আর 'স্যুট টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ' গল্পদুটিতে খুব চেনা নিম্নমধ্যবিত্ত চরিত্রেরই দেখা পাওয়া যায়, যাদের জীবনের একেকটা ছোট ঘটনা আর সেই ঘটনার অনুভূতির মিশেলে গড়ে উঠেছে গল্পদুটি। গল্পগ্রন্থের আরেকটি প্রিয় লেখা হচ্ছে ' কয়েকজন ভাবুক'। লেখক পাঠকের সামনে কয়েকজন ব্যক্তির কাছে একটা গল্প বলে সে গল্প নিয়ে একটি সরল প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। সে কয়েকজন ব্যক্তি নিজের মতো উত্তর দিয়ে সে উত্তরের পক্ষে নিজের যুক্তিস্থাপন করেন, যা গল্পের পাঠককে নিজের মতামতের উপরই বিভ্রান্তিতে ফেলে দেবে। এরপরও ভাবুকদের ভাবনা চলতেই থাকে।
মোট চৌদ্দটি গল্প নিয়ে শাহাদুজ্জামানের এই গল্পগ্রন্থের গল্প (?) গুলি সত্যিই অন্যরকম, আমাদের প্রচলিত পড়ে আসা গল্পের চেয়ে অনেকটা আলাদা। আশা করি, আমার মতো অন্য পাঠকেরাও সেই ভিন্নতর গল্পগুলো পড়ে এক অন্যরকম বিহ্বলতার স্বাদ পাবেন।
বইটার গল্পগুলো পড়ে মনে হইসে, সার্থক নামকরণ প্রমাণ করে রচনা লিখে দি :) আসলেই, বিহ্বল হওয়ার মতই কয়েকটা গল্প ! একটার চাইতে আরেক টা সুন্দর। বিশেষ করে 'মিথ্যা তুমি দশ পিপঁড়া ' পড়ে চোখ হাল্কা লেভেলের ঝাপসা হইসিল অস্বীকার করতে পারব না :( কতিপয় ভাবুক গল্পটাও সুন্দর। মাত্র ৬৯ পৃষ্ঠার বইয়ে এত অনুভূতি কয়জন বাঁধতে পারে !
বইয়ের শুরুতে শাহাদুজ্জামান বলে দিসেন এই গল্পটা কাদের জন্যে! 'এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প ' শিরোনামে একটা লাইন ছিল -
"যে আমার নীরবতা বোঝে না, সে আমার ভাষাও বুঝবে না" উৎসর্গের এই ২টা লাইন পড়েই মনে হয়েছিলো এ বই আমাকে বিহ্বল না করে পারবে না...
এটা আমার পড়া শাহাদুজ্জামানের তিন নম্বর বই। "একজন কমলালেবু" দিয়ে শুরু, এরপর "মামলার সাক্ষী ময়না পাখি" আর তারপরে এই "কয়েকটি বিহ্বল গল্প"। যতই পড়ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি উনার লেখার প্রতি।
যেহেতু এই বইটা উনার একদম শুরুর দিকের প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন এজন্য ২-১টা গল্প মোটামুটি লেগেছে এছাড়া বাদবাকি সবগুলো এককথায় অসাধারণ।
প্রথম গল্প 'এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প' তে ই তো বলে দিয়েছেন বইটা আসলে কার জন্য- 'পৃথিবীকে যার একদিন মায়াবী পারের দেশ বলে মনে হত, নিজেকে মনে হত ঝিলের মধ্যে জলঘাস, যিনি সেই জলজ চোখে চারদিকে তাকিয়েছেন ভয়ে, আগ্রহে, অনুরাগে, এ গল্পটি তার জন্য।' যে গল্প কাউকে বলার নয়। শুধুই নিজের বুকের মাটিতে গোপন করে রেখে দেবার।
এরপর অগল্প, ক্যালাইডোস্কোপ, মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া, মৌলিক, ক্ষত যত ক্ষতি যত, কতিপয় ভাবুক প্রত্যেকটা অসাধারণ। এক একটা গল্প পড়ে শেষ করার পর কতক্ষণ বসে ভাবতে ইচ্ছে করে " এভাবেও বুঝি গল্প লেখা যায়!"
সৈয়দ শামসুল হক তার মার্জিনে মন্তব্য বইতে লিখেছেন, “কোনো কোনো সৃষ্টিশীল লেখার গভীর ভিতরে থাকে এক ধরণের বিস্ফোরক, যেন সে মাইন, শিল্পের ছন্দে প্রশ্ন, মাইনের মতোই সে চলার পথে ঘাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকে তারপর একদিন সে পথে পা রাখলেই বিস্ফোরণ ঘটে, শিল্পের আপাত সুকুমার ভেদ করে বেরিয়ে আসে তার আঘাতের হাত। সে আঘাত আমাদের নির্বিকল্পতার বুকে আঘাত হানে, দাঁড় করিয়ে দেয় কীর্তিনাশা সমূহের সম্মুখে।” কয়েকটি বিহ্বল গল্প— শাহাদুজ্জামানের এমনই একটি ছোটো গল্পের বই যার ছোটো ছোটো ১৪ টি গল্প, এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প/ অগল্প/ ক্যালাইডোস্কোপ/ মৌলিক/ ডোডো পাখির জন্য নষ্টালজিয়া/ হারুনের মঙ্গল হোক/ মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া/ ক্ষত যত ক্ষতি ��ত/ জ্যোৎস্নালোকের সংবাদ/ স্যুট টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ/ কারা যেন বলছে/ কতিপয় ভাবুক/ কিছু শিরনামা/ মারাত্বক নিরুপম আনন্দ। প্রতিটি গল্প আপনাকে ভিন্নতর স্বাদ দিবে, আপনাকে ভাবাবে, হতবাক করবে, আপনি বিহ্বল হয়ে পড়বেন৷ নামকরণের সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারবেন৷ ছোট্ট পরিসরে ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির থেকে কিন্তু নির্মোহ ভাবে বয়ান করে গেছেন প্রতিটা গল্প৷ গল্পের সূচনায় যেমন কোনো বল প্রয়োগ বা ধাক্কিয়ে গল্পকে এগিয়ে নেবার কোনো প্রবণতা নেই, শেষেও নেই কোনো ড্রামাটিং সমাপ্তি৷ তবুও ড্রামা থেকে যায়, ড্রামা ঘটে যায়৷ আমাদের সমাজে ঢুকে, পরিবেশ থেকেই তুলে এনেছেন সেইসব ঘটনা৷ আমাদের সমাজে নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ। বর্তমান কালের গল্পে সরাসরি সমাজ রাজনীতির না বলার যে প্রবণতা তা থেকে মুক্ত হয়ে শাহাদুজ্জামানের অন্তত নির্মোহ ও নিরপেক্ষ থেকে অবলীলায় প্রবেশ করেছেন সমাজ-রাজনীতির অতলে৷ তুলে এনেছেন মণি-মুক্তা। গল্প বর্ণনার আকর্ষণীয় ও অভিনব কৌশলে তুলে এনেছেন সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, কুসংস্কার, যৌনতা, মুক্তিযুদ্ধ, উপকথা। নির্মোহ ভঙ্গিতে বলে যাওয়া এ সব গল্প আপনাকে হতবাক করবে, আপনি বিহ্বল হয়ে পড়বেন৷ আপনি বিহ্বল হতে বাধ্য হবেন৷
খুবই ভালো লাগছে গল্গগুলো! লেখকের এর আগের কোন বই আমার পড়া হয় নাই! কিন্তু এই বইএর "মিথ্যা তুমি দশ পিপড়া", "ক্ষত যত ক্ষতি যত", "স্যুট টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ" ছোটগল্পগুলো আমার পছন্দের তালিকায় অনেক উপরের দিকেই থাকবে! তার লিখার আলাদা একটা স্টাইল আছে! তার গল্প বলার ভঙ্গিটাও অনেক সুন্দর! লেখকের আরো বই পড়ার জন্য হাত নিশপিশ করতেছে!
বইয়ের সবচেয়ে স্বার্থক দিক হচ্ছে এর নামকরণ— ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’। গল্পগুলো পড়তে পড়তে যে যাত্রা হয়, সে যাত্রার শেষে অপেক্ষা করে এক বিহ্বল অনুভূতি। শুধু শেষেই নয় বরং পুরো গল্প জুড়েই এরকম একটা অনুভূতি বজায় থাকে, এই অনুভূতি ঠিক থ্রিলার পড়ার ‘এরপর কি হলো, এরপর কি হবে’ এমন টুইস্ট নির্ভর অনুভূতি নয়, ‘এটা/এমনটা কেন হলো, কিভাবে হয়ে গেল’ ধরনের প্রশ্ন এসে বিহ্বল করে তোলে, একেকটা গল্প পড়ে দশমিনিট বিরতি নিই। সাহিত্য হওয়ার/ঘটার মূল উপাদানের একটা— ভাষার শক্তিশালী ব্যবহার, শাহাদুজ্জামান নিপুণতার সাথে তা করেছেন। একারণে বাক্যের পর বাক্যের মাঝের সমান্তরাল সাদা অংশে ভেসে ওঠে গল্পের বিস্তৃতি, যাত্রার মধ্যে আরেকটা যাত্রা হয়ে যায় অনায়াসে। ছোটগল্পের স্বাদ— পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়।
শাহাদুজ্জামানের ছোটগল্প লেখার ধরনটাই একটু অন্যরকম। পড়তে পড়তে মাথার ভেতর ইনস্ট্যান্ট ইমপেক্ট চলে আসে। বিহ্বল হতে হয়, একবারের জায়গায় আরেকবার পড়তে ইচ্ছে করে। সম্ভবত সার্থক গল্পের (গল্প সংকলন) এটা একটা বৈশিষ্ট্য। কেননা একটা লেখা পাঠককে একাধিকবার পড়তে আগ্রহী করার মতো ধার সব লেখকের কলমে থাকে না।
এছাড়াও গল্পের নামগুলো বেশ উদ্দীপনামূলক। তাই পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই গল্পের শেষে হয়তো বিশেষ কিছু একটা পাবো। কিন্তু দুই-তিনটা গল্পের ক্ষেত্রে সেরকম প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সেজন্যই এক তারা কম দিলাম। তবুও পছন্দের গল্প গ্রন্থের তালিকায় ঠাঁই পাবার মতোই বই এটি।
বইয়ের প্রতিটা গল্পের প্লট ভিন্ন; কিন্তু একটা সুতোয় বাঁধা- আর তা হলো চমৎকার প্লট নির্বাচন আর গল্পের কোনো না কোনো অংশে 'বিহ্বল' করে দেবার চেষ্টা। লেখক প্রায় ৭০ ভাগ ক্ষেত্রেই সফল বলা চলে। ছোট ছোট গল্পগুলো পড়তে যেয়ে কখনো বিহ্বল হয়েছি, কখনোওবা মুগ্ধ।
বিহ্বলতা কি? এটা কি কোনো সমীকরণ, কোনো নৈতিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ জীবের মতো ছটফট করে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়ানোর আকুতি জানায়? আর মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়ানোর এই নিষ্পাপ আকুতিই কি তাকে স্তব্ধ করিয়ে দেয় সারা জনমের জন্য?
শাহাদুজ্জামান তার 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' বইয়ের যে কাউকে বিহ্বল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন বলে বোধ করি।
উৎসর্গের, 'যে আমার নীরবতা বোঝে না/সে আমার ভাষাও বুঝবে না' থেকে শুরু করে শেষকটি লাইনের,
'জ্যেষ্ঠ : আমি আদেশ করিতেছি তুমি অগ্রসর হও। অগ্রসর হও সেই অবধি যে অবধি তুমি পারিবে কনিষ্ঠ : কিন্তু আপনার কাছে আমি আরও কঠিন আদেশ প্রত্যাশা করি, জ্যেষ্ঠ জ্যেষ্ঠ : তথাস্তু। তবে আমি তোমাকে আদেশ করিতেছি, তুমি আরও অগ্রসর হও সেই অবধি যে অবধি তুমি পারবে না।'
পর্যন্ত তিনি তার লেখনী আমাকে বিহ্বল করে রেখেছেন।
'একটি হাসপাতাল একজন নৃবিজ্ঞানী কয়েকটি ভাঙ্গা হাড়', 'একজন কমলালেবু' পড়ার পরে শাহাদুজ্জামান সম্পর্কে যে সুধারনা, ভরসার এক মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়েছে 'কয়েকটি বিহ্বল গল্প' দিয়ে তিনি সে ভিত্তির উপর সুবিশাল অট্টালিকা নির্মাণ শুরু করেছেন। আশা করছি অনাকাঙ্ক্ষিত কারনবশত এই নির্মাণ কর্মযজ্ঞ থেমে যাবে না।