ভার্সিটির কোন এক সেশনালে খুব খাটাখাটনি করে একবার ল্যাব রিপোর্ট লিখেছিলাম। অনেকগুলো বই ঘেঁটে কয়েক পাতার মৌলিক (মানে পুরনো রিপোর্ট থেকে কপি/পেস্ট না) ইন্ট্রোডাকশন, সাথে ডিসকাশনে ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং কথাবার্তা সেঁটে দিয়ে মনে হয়েছিল সেইই রিপোর্ট হয়েছে, এতে ১০ এ ৮ নিশ্চিত পাওয়া উচিৎ। কিন্তু রিপোর্ট পাবার পর দেখলাম লেকচারার ম্যাডাম আমাকে শূন্য দিয়েছেন! এটি নাকি ফর্মাল/ইনফর্মাল রিপোর্টের একটি জগাখিচুড়ি হয়েছে। বইটি পড়ে আমার সেই ঘটনাটা মনে পড়ে গেল- এটি একটি না-উপন্যাস, না-প্রবন্ধ! সবমিলিয়ে একটি হতবিচ্ছিরি জগাখিচুড়ি!
কিন্তু তাতে বইটির উপযোগিতা বিন্দুমাত্র কমে যায় না। সায়েন্টিফিক কম্যুনিটিতে একটা প্রচলিত নর্ম আছে- নিজের এক্সপেরিমেন্ট যদি এমন কিছু নির্দেশ করে যে সেটা বর্তমান গ্রহণযোগ্য মতামতের (consensus) সাথে যায় না, তাহলে সরাসরি সেটাকে প্রকাশ না করে subtle ভাবে উল্লেখ করা হয় (আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ জানা নেই)। লেখনী দেখে মনে হয়েছে লেখক বেশ কিছু মতবাদ সমাজের ভিতরে ইনফিলট্রেট করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মতবাদগুলোর গভীরতা এতো বেশি যে সেগুলো আসলে ৩৫০ পৃষ্ঠায় ধরে না। সব একসাথে মিলাতে গিয়েই জগাখিচুড়ি হয়েছে। পাশাপাশি অনেক সময়ই মনে হয়েছে মতবাদগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশি সমাজে কতটুকু হবে সেটা নিয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান, তাই হয়তো একটা উপন্যাসের চিত্রপট এঁকেছেন। সাথে বিস্তারিতভাবে বাঙ্গালি মুসলিম সমাজের পতনের কারণগুলো কতটুকু সমসাময়িক আর কতটুকু ঐতিহাসিক তা পর্যালোচনা করেছেন। একইসাথে জানের ভয় থাকাও অমূলক নয়, এবং যদি আসলেই তা সত্য হয় তবে ব্যাপারটি আয়রনিক্যালি লেখকের মতবাদগুলোকেই (বইটির উপসংহার এক্ষেত্রে ধর্তব্য) সমর্থন করে।
এই বইটি কাদের ভালো লাগবে না?
- অবশ্যই মওদুদী সমর্থকদের। এত বছর পরেও লেখককে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে যে কোন হৈচৈ আগে দেখিনি এটা ভেবে অবাক হয়েছি।
- ধার্মিক গোঁড়া; যারা ধর্মকে কেবল কিছু রিচুয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছেন
- নাস্তিক; যাঁদের কাছে ধর্ম ব্যাপারটিই বালখিল্যপনা। সময় নষ্ট মনে হতে পারে বইটি পড়লে।
সবকিছু বাদ দিলে আমার কাছে মনে হয়েছে বইটি প্রচণ্ডভাবে আন্ডাররেটেড! এটি নিয়ে আরো পড়াশোনা/আলোচনা হওয়া উচিৎ- সেটা বইয়ের শিল্পগুণ বিচারের জন্যে নয় বরং লেখক যেই মেসেজগুলো দিতে চেয়েছেন সেগুলোর জন্যে।
রিচুয়ালিস্টিক একটি সমাজ যখন ধর্মকে আঁকড়ে ধরে রেখে কোন আত্নসমালোচনা শুনতে চায় না, তখন সমাজের পচন অনিবার্য। বইটি খোলামনে পড়লে এই উপলব্ধি না আসার কোন কারণ নেই। বাংলাদেশি সমাজে ধর���ম জীবনের প্রতিক্ষেত্রে সবচাইতে উচ্চারিত শব্দ হলেও নৈতিকতার অবক্ষয় কেন হচ্ছে সেটার বিস্তারিত কারণ অনুসন্ধান আছে এই বইতে। ধর্মকে কেবল রিচুয়ালের জালে বন্দী করে কেন এবং কিভাবে অন্যায়কে সাধারণ বানিয়ে ফেলা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে - এটার চমৎকার বিশ্লেষণ এখানে আছে; এবং আমার কাছে মনে হয়েছে বিশ্লেষণগুলো খুবই যৌক্তিক।
ধর্ম নিয়ে ফ্যানাটিক সমাজে যারা সবচাইতে প্রভাবশালী হতে পারতেন মানুষের জীবনকে ন্যায়ের পথে রেগুলেট করতে (মসজিদের ইমাম), তাঁরা কেন ব্যর্থ হচ্ছেন সেটা একটি চরিত্রের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়- “আমাদের মত ইমামদের দিকে শিক্ষিত মানুষজন ঘুরেই তাকাবে না। কথা শোনা তো দূরের কথা। আমাদের কাছ থেকে মানুষ কি জানতে চায়? জানতে চায় নামাযে দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ের মাঝে কতখানি ফাঁক থাকা উচিৎ? সোবহানাল্লাহ পড়ার সময় তসবিহ ব্যবহার করা ভালো না হাতের আঙ্গুলে গোণা ভালো? কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রসাব করা জায়েজ?...... শিক্ষিত মানুষের আমাদের দরকার পড়ে কখন? যখন তাদের কেউ মারা যায় তখন ভাড়া করে কোরান খতম করানোর জন্যে, বিয়ের আসরে দোয়া পড়ানোর জন্যে, বছরে এক-আধবার বাড়িতে মিলাদ পড়ানোর জন্য।… সেই মানুষরা আমাদের কাছে ইসলামের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা শুনতে চাইবে এটা আপনি কিভাবে আশা করেন?”
তবে বইয়ের সবচাইতে কন্ট্রোভার্সিয়াল পার্ট হতে পারে দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে ইউসুফ (তথা লেখকের) বক্তব্য এবং উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উৎপত্তির পিছনে হিন্দুদের মোটামুটিভাবে সরাসরিই দায়ী সাব্যস্ত করা। দ্বিজাতি তত্ত্বের সূত্রপাত মুসলিম সমাজ থেকেই হয়েছে এতকাল শুনে/পড়ে এসেছি, কিন্তু এখানে লেখকের বক্তব্য পুরোপুরি ভিন্ন প্রতীয়মান। তিনি বিভিন্ন রেফারেন্স টেনেছেন, ঘটনা বর্ণনা করেছেন- আমি নিশ্চিত নই এগুলো ঐতিহাসিকদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য (আরো ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে)। তবে এসব বক্তব্যগুলোই এই বইয়ের প্রাণ যেগুলো দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে। সবচাইতে বিরক্তিকর পার্ট এক বিদেশিনীর প্রবেশ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা নিয়ে বয়ান। খামাখা বইয়ের গভীরতা এতে কমেছে, আর সস্তা রোমাঞ্চ মনে হয়েছে।
যারা ধর্ম-দেশ-সমাজ নিয়ে চিন্তা করেন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।