জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
আমি যে বইগুলো পড়ি তার প্রায় বই গুডরিডসে থাকেনা। তাই গুডরিডস আগেরমতো ব্যবহার করা হয়না। নিজের কাছে নোট করে রাখি, এরপর সময় পেলে গুডরিডসে বইটা খুঁজে মার্ক করি। যেমন এই মাসে ১২টা বই পড়েছি কিন্তু গুডরিডসে পেয়েছি ৪টা। আজকে যেহেতু আমার ছুটির দিন তাই গুডরিডসে বইগুলো মার্ক করতে গিয়ে মুসলমানমঙ্গলের রিভিউগুলো পড়লাম৷ বইটা গতকাল রাতেই পড়ে শেষ করেছিলাম। এরপর আমি এই লেখাটা লিখতে বাধ্য হয়েছি। মুসলমানমঙ্গলে মূলত যে বিষয়গুলো ফোকাস করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে সুফিজম, ওহাবী মতবাদ, ইসলামের তৎকালীন ও বর্তমান, ইসলামি রাষ্ট্র ও রাজনীতিসহ বেশকিছু অপব্যাখ্যার সঠিক ব্যাখ্যা। এগুলো ছাড়াও আরো বেশকিছু জিনিস ছিলো। এই বইটি লিখতে গিয়ে মোট ৬৭টি বই থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে, যা বইয়ের শেষে নোট করা আছে। বইটির লেখার ধরণ বুঝতে চাইলে বুঝানোর জন্য সহজে যেটা বলতে পারি সেটা হচ্ছে শুরুটা অনেকটাই প্যারাডক্সিকাল সাজিদের মতো। এটা ভাবার কারণ নেই যে জাকির তালুকদার আরিফ আজাদ গোষ্ঠী থেকে কপি করেছেন, মুসলমানমঙ্গল বইটি লেখাই হয়েছে ২০১০ সালে। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা বুঝেছি সেটা হচ্ছে এই অলস বাঙালির কাছে বইটা তুলে ধরতে লেখক চেয়েছিলেন একঘেয়ে না করে উপন্যাসের মতো করে লিখতে। কিন্তু লেখকের মূল উদ্দেশ্য ছিল তথ্যগুলো আমাদের কাছে পৌঁছানো। আপনি যখন পড়বেন সেটা মাথায় রেখেই পড়বেন৷ গুডরিডসে কয়েকজনের রিভিউ ছিলো ইউসুফ (যদিও একজন রিভিউদাতা মূল চরিত্রের নামটি সঠিকভাবে লিখতে পারেননি। এবার ভাবুন কী পড়ে উনি রিভিউ দিয়েছেন!) এতো জ্ঞানী কেন? সে কী সবজান্তা? সে কীভাবে সব হাদিস আর কুরআনের আয়াত মনে রেখেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আগে যেটা বলেছিলাম, আমাদের কাছে তথ্য পৌঁছানো মূল উদ্দেশ্য ছিল। বইটির শেষের দিকে গিয়ে জাকির তালুকদারের একটি গল্পও পড়ে ফেলতে পারবেন। যেটি মুসলমানমঙ্গলে ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু আমি ছোট থেকেই সুফিজম ফলো করে আসছি তাই আমার কাছে বইটা একরকম লেগেছে, আপনি যদি অন্য ইজম ফলো করেন তাহলে আপনার কাছে আরেকরকম লাগবে এবং প্রশ্নও তৈরি হতে পারে। আপনি যদি নাস্তিক হয়ে থাকেন তাহলে বইটা পড়া আপনার কাছে সময় নষ্ট করাই হবে। তারপরেও চাইলে পড়ে নিতে পারেন।
জাকির তালুকদার যদি বইটা স্রেফ নন-ফিকশন আকারে লিখতেন তাহলে বোধহয় ভালো হতো। যেভাবে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, বাঙালি মুসলমানের মন।
কিছুটা ফিকশন আর বেশ খানিকটা নন-ফিকশনের এই জগাখিচুড়ি কম্বিনেশন আমার ঠিক মন:পূত হয় নাই। প্রধান চরিত্র ইউনুসকেও ভালো লাগে নাই অতটা। সে কিছুই করে না, খালি আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। সবাই তার সঙ্গ লাভের জন্যও লালায়িত থাকে। গড়গড় করে সাল-তারিখ সহ যেভাবে সবকিছু বর্ণনা করতে থাকে ইউসুফ তাতে তাকে জলজ্যান্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বললেও বোধহয় কম হয়ে যায়। সে জানে না এমন কিছুই নাই। বইটা শেষও হয়ে যায় আচমকা।
এ তো গেল নেগেটিভ দিক। পজিটিভ দিক বলতে গেলে বলতে হয়, বইটা পড়ে নিজেকে অনেক জ্ঞানী জ্ঞানী মনে হচ্ছে। এ ধরণের বই লিখতে গেলে প্রচুর খাটাখাটনি করা লাগে। জাকির তালুকদারও পরিশ্রমের কমতি করেন নাই। এন্ডিংটা যথেষ্ট পরিমাণে রিয়ালিস্টিক, যদিও খুব আকস্মিক ভাবে শেষ হয় সব।
বাঙালী মুসলমানদের বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সে চ্যালেঞ্জ বেশীরভাগ সময়েই নিজের সাথে চ্যালেঞ্জ। নানা ভাবেই তার ধর্ম বিশ্বাস আর আচরিত ধর্ম নিয়ে তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। একদিকে বাঙালী, অন্যদিকে মুসলমান পরিচয় নিয়ে বিপাকে পড়া আমাদের শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানের জন্য খুবই পরিচিত একটা বিষয়। কিন্তু সেখান থেকে উত্তরণের উপায় আমরা জানি না। যদি বা কেউ চিন্তা করে কিছুটা বের করতে পারি, প্রকাশ করা কঠিন। এই সমস্যা মূলত শিক্ষিত সচেতন শ্রেণীতে বেশি। কেননা তারা যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে চায়।
ইউসুফ তেমনই একজন ছেলে যে নানা ভাবে ইসলামের প্রচলিত আচরিত বিধান আর সত্যি ইসলাম কী বলে সে বিষয়ে ভাবতে থাকে। সে শুধু ভাবেই না, সে বিষয়ে কাজও করে। লেখক জাকির তালুকদার পুরো বইয়ে ইউসুফকে কেন্দ্রে রেখে বাঙালী মুসলমানের আচরিত ইসলামের পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। আরবে যে ধর্মের পূর্ণতা সেখান থেকে তিনি ভারতবর্ষে ইসলামের স্বরূপ এমনকি পৃথিবী জুড়ে ইসলাম এবং ইসলাম কেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়েও এই বইয়ে আলোচনা করেছেন।
ফিকশনের আশ্রয় নিয়ে জাকির তালুকদার মূলত একটি নন ফিকশন লিখেছেন। এই কৌশলটি প্রয়োজন ছিল, কেননা এতে পাঠকের কাছে পৌঁছনো সহজ। অনেকের অবশ্য এতো তথ্যের 'কচকচানি' বিরক্ত লাগতে পারে কিন্তু অবস্থা বোঝানোর জন্য এটি করা হয়েছে। লেখক একদিকে যেমন 'আচরিত ইসলাম' এর অনেক ভুল তুলে ধরেছেন, তেমনি সেখান থেকে উত্তরণের পথেরও সন্ধান দিয়েছেন। তবে সে সন্ধান জাকির তালুকদার দেননি বরং ইউসুফ ও তার বন্ধুদের আলোচনার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন।
মুসলমানমঙ্গল বইয়ে যেসব বিষয় আলোচনা করেছেন তা স্পর্শকাতর। আমি জানি না এ বইটি প্রকাশের পর তাকে কোন বিরুপ পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়েছে কিনা। তবে হওয়া উচিৎ না। কেননা এ বইয়ে কোথাও ইসলামের অবমাননা নেই, এমনকি নেই অন্য ধর্মের প্রতি কোন কটাক্ষ। বরং আমাদের দেশে যে 'ইসলাম বিপন্ন' রব তুলে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা হয়, লেখক আমাদের সে সম্পর্কে সচেতন করার প্রয়াস করেছেন। তবে কথা হলো এমন একটা বই লিখতে লেখককে যতটা পরিশ্রম করতে হয় তার কিয়দংশ পাঠককেও করতে হয়। তথ্যের সত্যতা খোঁজা সম্ভব না হলেও বক্তব্যের গভীরতা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। নইলে ভুল বোঝার সম্ভাবনা প্রবল।
সাহিত্যে না হলেও সমাজের প্রয়োজনে 'মুসলমানমঙ্গল' একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অনেকেই হয়ত এ বইকে একপেষে বলবেন, সেকথা বলার জন্য হলেও বইটি জরুরী। কেননা জাকির তালুকদারের এই বই নিয়ে আলোচনা করলে আরও এমন বিষয় উঠে আসতে বাধ্য এবং তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
বা���লা প্রাচীন সাহিত্যে বাংলা মঙ্গল কাব্য ধারার বেশ কিছু সাহিত্যের সাথে আমরা পরিচিত। সেখানে কোন নির্দিষ্ট একজন দেবদেবীর স্তুতি বা বন্দনা করে রাজসভার সভাকবিরা রচনা করতেন।
লেখক জাকির তালুকদার এর " মুসলমান মঙ্গল " তেমন কোন মঙ্গল কাব্য নয়। তবে এখানে মুসলমান জাতির অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে লেখা।
ধর্মীয় বিধানকে সামনে রেখে অনেক সময় আমাদের দেশের অনেক এলাকাতে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন কিছু ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তাঁরা মানবিকতার উর্ধে গিয়ে সে সব বিধি বিধান পালনে রীতিমত বাধ্য করে থাকেন। মৌলিক চাহিদা গুলোর গুরুত্ব এই বিধি বিধানের কাছে তুচ্ছ।
তাছাড়া বর্তমানে এমন এক শ্রেনীর ইসলামি আলেম দেখা যায় যারা কোন হাদিসকে কোরানের সঙ্গে না মিলিয়ে সত্য বলে মেনে নিতে রাজি নয়। নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটে সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। সেই সময়ের ঘটনা আর এই সময়ের ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা যে এক নয় এটা বোঝানো মুশকিল।
লেখক তলস্তয় বলেছেন, ধর্মের তিনটি দিক রয়েছে। একটা হচ্ছে প্রাণবস্তু। এখানে পৃথিবীর সব ধর্ম এক। সেখানে বলা হয়েছে- মিথ্যা কথা বলা অন্যায়, অন্যকে শোষণ করা অন্যায়, ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া এবং মন্দ কাজে বাধা দেওয়া উচিত -- এইসব হলো চিরন্তন মূল্যবোধ।
দ্বিতীয় হচ্ছে ধর্মের দার্শনিক দিক। এইখানেই এসে ভেদাভেদ টা শুরু হয়েছে। ইসলাম বলছে আল্লাহ এক এবং হজরত মুহম্মদ (সাঃ) তাঁর রাসুল, খ্রিস্টান বলছে ঈশ্বর সর্বশক্তিমান কিন্তু তার পুত্র যীশু মানবজাতির মুক্তিদাতা, হিন্দু বলছে ঈশ্বর এক কিন্তু তার জাগতিক প্রকাশ তেত্রিশ কোটি রূপ ধরে। আর সবারই বাইরের দিকে আছে যার যার ধর্মের প্রথা। এইখানে এসেই মানুষে মানুষে ধর্মে ধর্মে একেবারে আকাশ পাতাল ফারাক। আর সাধারণ মানুষ এই প্রথাকেই ধর্ম বলে মানে আর পুরুত-মোল্লা-পাদ্রী ধর্মের এই রীতিপ্রথা নিয়ে বাহাসে লিপ্ত হয়। চিরকালই ধর্মের মর্মবস্তু বোঝার ক্ষমতা থাকে অল্প কিছু মানুষের।
লেখক ধর্মের প্রতিটি অন্ধকার আচ্ছন্ন স্থানে হাত দিয়েছেন এবং প্রতিটি সমস্যা ব্যখ্যা তিনি তুলে ধরেছেন যা আমরা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত দেখে থাকি। আমাদের আছে অপরিসীম অজ্ঞতা তবে আমরা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে চাই না। ধর্মের নামে প্রতারিত হই প্রতিনিয়ত। সারাজীবন চলি আমরা ভুল মানুষের নেতৃত্বে। তাছাড়া আত্মসম্মানের অভাব তো রয়েছেই। এই সকল বেদনা আমাদের, যা লেখক উপলব্ধি করেন। ভিতরে ভিতরে দগ্ধ হন আমাদের মুসলমান আর বাঙালি এই দুই পরিচয়ে। এই বইটা মূলত লেখকের সেই কষ্টেরই ভাগাভাগি করা মাত্র।
লেখক জাকির তালুকদার এর লেখা আমি প্রথম পড়লাম। বইটা কেমন এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারন বইটার শুরুতে আমার জানা সহজ কিছু বিষয় থাকলে আস্তে আস্তে অজানা ও কঠিন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমার নিজের ধর্মের ব্যপারেই জানি খুবই কম সেখানে অন্য ধর্মের ব্যপারে কোন জানাশোনা একেবারেই না থাকলে তা নিয়ে কিছু বলাও ঠিক না।
তবে কিছু ব্যপার বিশ্লেষণ ও ব্যখ্যা বেশ ভালো লেগেছে। লেখকের ভাবনার জায়গা থেকে তিনি সমস্যা গুলো খুজে তা সমধানও দেখিয়েছেন। ভালো লেগেছে বিশ্লেষণ গুলো। এই বইটার রিভিউ খুজছি কিন্তু একটাও রিভিউ পেলাম না এটা খারাপ লাগলো। এই বইটা র আলোচনা হওয়া দরকার ছিলো।
মুসলমানদের কুসংস্কার দিয়ে শুরু করা হলেও শুরুতে লেখক নিজেই ছিলেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ইউসুফ নামের প্রধান চরিত্রের মাধ্যমে ইসলাম ও বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক অবস্থা তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক।
শেষ দিকে ভালো করলেও প্রথম দিকের শুরুটাই ছিলো একদম বাজে৷ সাহাবিদের সম্পর্কে যা তথ্য দেয়া হয়েছে পুরোটাই এক পাক্ষিক শিয়া মতবাদের উপর নির্ভর করে৷
উপন্যাসের চেয়ে ননফিকশন তথ্যই বেশি দেয়া হয়েছে বইটিতে। শেষ দিকে লেখকের মতামত শুরুর দিকের চেয়ে কিছুটা বিপরীতই মনে হয়েছে। দেশ ভাগ থেকে সুরু করে বর্তমান ইহুদি খ্রিস্টান সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা কিছুটা ভালো ছিলো।
একদম শেষের কিছু ঘটনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সত্য ছিলো৷ বর্তমান মুসলমানদের আরো সচেতন হওয়া জরুরি। তবে অবশ্যই সত্য ইতিহাস জেনে৷
ভার্সিটির কোন এক সেশনালে খুব খাটাখাটনি করে একবার ল্যাব রিপোর্ট লিখেছিলাম। অনেকগুলো বই ঘেঁটে কয়েক পাতার মৌলিক (মানে পুরনো রিপোর্ট থেকে কপি/পেস্ট না) ইন্ট্রোডাকশন, সাথে ডিসকাশনে ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং কথাবার্তা সেঁটে দিয়ে মনে হয়েছিল সেইই রিপোর্ট হয়েছে, এতে ১০ এ ৮ নিশ্চিত পাওয়া উচিৎ। কিন্তু রিপোর্ট পাবার পর দেখলাম লেকচারার ম্যাডাম আমাকে শূন্য দিয়েছেন! এটি নাকি ফর্মাল/ইনফর্মাল রিপোর্টের একটি জগাখিচুড়ি হয়েছে। বইটি পড়ে আমার সেই ঘটনাটা মনে পড়ে গেল- এটি একটি না-উপন্যাস, না-প্রবন্ধ! সবমিলিয়ে একটি হতবিচ্ছিরি জগাখিচুড়ি!
কিন্তু তাতে বইটির উপযোগিতা বিন্দুমাত্র কমে যায় না। সায়েন্টিফিক কম্যুনিটিতে একটা প্রচলিত নর্ম আছে- নিজের এক্সপেরিমেন্ট যদি এমন কিছু নির্দেশ করে যে সেটা বর্তমান গ্রহণযোগ্য মতামতের (consensus) সাথে যায় না, তাহলে সরাসরি সেটাকে প্রকাশ না করে subtle ভাবে উল্লেখ করা হয় (আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ জানা নেই)। লেখনী দেখে মনে হয়েছে লেখক বেশ কিছু মতবাদ সমাজের ভিতরে ইনফিলট্রেট করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মতবাদগুলোর গভীরতা এতো বেশি যে সেগুলো আসলে ৩৫০ পৃষ্ঠায় ধরে না। সব একসাথে মিলাতে গিয়েই জগাখিচুড়ি হয়েছে। পাশাপাশি অনেক সময়ই মনে হয়েছে মতবাদগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশি সমাজে কতটুকু হবে সেটা নিয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান, তাই হয়তো একটা উপন্যাসের চিত্রপট এঁকেছেন। সাথে বিস্তারিতভাবে বাঙ্গালি মুসলিম সমাজের পতনের কারণগুলো কতটুকু সমসাময়িক আর কতটুকু ঐতিহাসিক তা পর্যালোচনা করেছেন। একইসাথে জানের ভয় থাকাও অমূলক নয়, এবং যদি আসলেই তা সত্য হয় তবে ব্যাপারটি আয়রনিক্যালি লেখকের মতবাদগুলোকেই (বইটির উপসংহার এক্ষেত্রে ধর্তব্য) সমর্থন করে।
এই বইটি কাদের ভালো লাগবে না? - অবশ্যই মওদুদী সমর্থকদের। এত বছর পরেও লেখককে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে যে কোন হৈচৈ আগে দেখিনি এটা ভেবে অবাক হয়েছি। - ধার্মিক গোঁড়া; যারা ধর্মকে কেবল কিছু রিচুয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছেন - নাস্তিক; যাঁদের কাছে ধর্ম ব্যাপারটিই বালখিল্যপনা। সময় নষ্ট মনে হতে পারে বইটি পড়লে।
সবকিছু বাদ দিলে আমার কাছে মনে হয়েছে বইটি প্রচণ্ডভাবে আন্ডাররেটেড! এটি নিয়ে আরো পড়াশোনা/আলোচনা হওয়া উচিৎ- সেটা বইয়ের শিল্পগুণ বিচারের জন্যে নয় বরং লেখক যেই মেসেজগুলো দিতে চেয়েছেন সেগুলোর জন্যে।
রিচুয়ালিস্টিক একটি সমাজ যখন ধর্মকে আঁকড়ে ধরে রেখে কোন আত্নসমালোচনা শুনতে চায় না, তখন সমাজের পচন অনিবার্য। বইটি খোলামনে পড়লে এই উপলব্ধি না আসার কোন কারণ নেই। বাংলাদেশি সমাজে ধর্ম জীবনের প্রতিক্ষেত্রে সবচাইতে উচ্চারিত শব্দ হলেও নৈতিকতার অবক্ষয় কেন হচ্ছে সেটার বিস্তারিত কারণ অনুসন্ধান আছে এই বইতে। ধর্মকে কেবল রিচুয়ালের জালে বন্দী করে কেন এবং কিভাবে অন্যায়কে সাধারণ বানিয়ে ফেলা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে - এটার চমৎকার বিশ্লেষণ এখানে আছে; এবং আমার কাছে মনে হয়েছে বিশ্লেষণগুলো খুবই যৌক্তিক।
ধর্ম নিয়ে ফ্যানাটিক সমাজে যারা সবচাইতে প্রভাবশালী হতে পারতেন মানুষের জীবনকে ন্যায়ের পথে রেগুলেট করতে (মসজিদের ইমাম), তাঁরা কেন ব্যর্থ হচ্ছেন সেটা একটি চরিত্রের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়- “আমাদের মত ইমামদের দিকে শিক্ষিত মানুষজন ঘুরেই তাকাবে না। কথা শোনা তো দূরের কথা। আমাদের কাছ থেকে মানুষ কি জানতে চায়? জানতে চায় নামাযে দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ের মাঝে কতখানি ফাঁক থাকা উচিৎ? সোবহানাল্লাহ পড়ার সময় তসবিহ ব্যবহার করা ভালো না হাতের আঙ্গুলে গোণা ভালো? কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রসাব করা জায়েজ?...... শিক্ষিত মানুষের আমাদের দরকার পড়ে কখন? যখন তাদের কেউ মারা যায় তখন ভাড়া করে কোরান খতম করানোর জন্যে, বিয়ের আসরে দোয়া পড়ানোর জন্যে, বছরে এক-আধবার বাড়িতে মিলাদ পড়ানোর জন্য।… সেই মানুষরা আমাদের কাছে ইসলামের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা শুনতে চাইবে এটা আপনি কিভাবে আশা করেন?”
তবে বইয়ের সবচাইতে কন্ট্রোভার্সিয়াল পার্ট হতে পারে দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে ইউসুফ (তথা লেখকের) বক্তব্য এবং উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উৎপত্তির পিছনে হিন্দুদের মোটামুটিভাবে সরাসরিই দায়ী সাব্যস্ত করা। দ্বিজাতি তত্ত্বের সূত্রপাত মুসলিম সমাজ থেকেই হয়েছে এতকাল শুনে/পড়ে এসেছি, কিন্তু এখানে লেখকের বক্তব্য পুরোপুরি ভিন্ন প্রতীয়মান। তিনি বিভিন্ন রেফারেন্স টেনেছেন, ঘটনা বর্ণনা করেছেন- আমি নিশ্চিত নই এগুলো ঐতিহাসিকদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য (আরো ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে)। তবে এসব বক্তব্যগুলোই এই বইয়ের প্রাণ যেগুলো দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে। সবচাইতে বিরক্তিকর পার্ট এক বিদেশিনীর প্রবেশ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা নিয়ে বয়ান। খামাখা বইয়ের গভীরতা এতে কমেছে, আর সস্তা রোমাঞ্চ মনে হয়েছে।
যারা ধর্ম-দেশ-সমাজ নিয়ে চিন্তা করেন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
লেখকের বাক্তিগত মতামত এবং বিশ্বাস establish করার যুক্তিহিন চেষ্টা। মাঝে একটা গল্প ঢুকিয়ে দেয়া (গল্পটা কিন্তু দারুন। মনেই হয়না এক লেখকের লিখা)। অহেতুক দীর্ঘ করা হয়েছে।
I enjoyed his short stories, some are really good. Unfortunately I am equally frastrated with his novels.
আমি এ বইয়ের ১০০ পাতা অবধি পড়তে পেরেছি, আর পড়ার ইচ্ছে নেই এত মারামারি, মিথ্যাচার, পারস্পরিক ঈর্ষা, দন্দ্ব, হত্যা আর লোভ এর ব্যাখ্যান। আমার পক্ষে এই বইয়ের সত্য মিথ্যা বিচার করা সম্ভব নয়, তাই কোন আলাপ আলোচনায় ও যাব না। আমি শুধু এটাই বুঝেছি যে প্রকৃতি মানুষ কে যে স্বাভাবিক বোধ-নির্ভর ধর্ম দিয়েছে তার চেয়ে মহান অন্য কোন ধর্ম হতে পারে না।