দুটি সংক্ষিপ্ত উপন্যাস আছে এই বইয়ে। তারা হল~ ১. নজরবন্দি: একটি সত্য ঘটনার কাল্পনিক পটভূমি-নির্মাণ ও আশাবাদী, বিবেকতাড়িত অথচ কাল্পনিক পরিণতি— এটিই এই আখ্যানের উপজীব্য। ছকবন্দি চরিত্রায়ন সত্বেও এই লেখাটি ক্ষুরধার এবং অত্যন্ত গতিশীল। শেষ অবধি ছুটিয়ে, একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়ে তবেই ছুটি নেয় এটি। ২. সমান্তরাল: এই কাহিনিটি এক তীব্র মধ্যবিত্ত ফ্যান্টাসি— যেখানে দুই নিঃসঙ্গ সামাজিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে একে অপরের জন্য পাগল হয়, কিন্তু শেষ 'রা'-র আগেই পা ছেড়ে দিয়ে গুপ্তধনটি হারিয়ে ফেলে। চরম একঘেয়ে প্লট এবং তেমনই ফ্ল্যাট চরিত্রচিত্রণ। বইটির প্রচ্ছদ অদ্ভুত সুন্দর, বর্ণশুদ্ধি প্রশংসনীয় এবং মুদ্রণ দর্শনীয়। অলমিতি।
রাজা ভট্টাচার্যের দুই ভুবন এমন একটি বই, যা শেষ হওয়ার অনেক পরেও পাঠকের মনোজগতে ঝিম ধরা সুরের মতো বাজতে থাকে। এটি যেন এক ঝাপসা আয়না—যেখানে পাঠক নিজের দুটি বিপরীত ছায়াকে খুঁজে ফেরে: একদিকে প্রেমের ব্যাকুলতা, অন্যদিকে প্রতিবাদের স্তব্ধতা।
দুটি গল্প—‘নজরবন্দি’ ও ‘সমান্তরাল’—বাহ্যত ভিন্ন কাঠামোয় নির্মিত হলেও, তাদের অন্তর্লীন বয়নভঙ্গি এক অভিন্ন মানবিক সুরের সঙ্গে যুক্ত। ‘নজরবন্দি’-তে আমরা দেখি প্রেম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মিশ্রিত অভিজ্ঞতা; আর ‘সমান্তরাল’ যেন এক নীরব বিদ্রোহ—অসীমের পাড়ে দাঁড়িয়ে নির্ভরতার সংকট এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সন্ধান।
এই দুই গল্পে রাজা ভট্টাচার্য কেবল গল্প বলেন না, আমাদের টেনে নিয়ে যান সেই বৃত্তের কেন্দ্রে, যেখানে প্রেম নিঃশব্দে লড়াই করে প্রাত্যহিক বাস্তবতার সঙ্গে, আর প্রতিবাদ নিজস্ব ভাষা খোঁজে সংলাপের বাইরে।
নজরবন্দি পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন সেই সামাজিক সহানুভূতির অভাব, যেটা আমাদের নগরসভ্যতার এক নিঃশব্দ ক্যান্সার। এখানে মৃত্যু কোনো নাটকীয় সমাপ্তি নয়—এ এক আত্মা-ছিন্ন আত্মজিজ্ঞাসা।
Elie Wiesel-এর Night–এর সঙ্গে তুলনা করাটা শুধু শৈলীর কারণে নয়, বরং মানবিক ঋণের দায়বোধের কারণে। Night–এ ছোট্ট এলি যখন প্রথমবারের মতো নাৎসি অত্যাচারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানুষের মুখ দেখে, তখন তার ঈশ্বরে বিশ্বাস ভেঙে যায়। সে ভাবে, "Never shall I forget that night, the first night in camp, which has turned my life into one long night..."। নজরবন্দি–তে, যদিও কোনো কনসেনট্রেশন ক্যাম্প নেই, তবু আশেপাশের মানুষদের 'নীরবতা' যেন শহুরে জীবনের ‘concentration of cruelty’-র রূপ। মানুষ মরছে, চোখের সামনে, আর বাকিরা—আমরা—নজরবন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
আরও তুলনীয় হয়ে ওঠে Albert Camus-এর The Fall–এর সঙ্গে। সেই উপন্যাসে ক্লামেন্স যখন এক মেয়েকে নদীতে ঝাঁপ দিতে দেখে কিন্তু বাঁচাতে এগোয় না—তার পরবর্তী জীবনের যাবতীয় অস্তিত্ববাদী আত্মসমালোচনার উৎস হয়ে দাঁড়ায় সেই মুহূর্ত। নজরবন্দি-র প্রোটাগনিস্টও যেন তার নিজের ভেতরের ক্লামেন্স—সে 'করেনি', এবং সেই অনাচারই তাকে চিরতরে বন্দি করে রাখে নিজের বিবেকে।
Wiesel বলেছিলেন, "To remain silent and indifferent is the greatest sin of all"—এই বাক্য কেবল Holocaust-এর প্রেক্ষিতে নয়, বরং সমস্ত নাগরিক দুর্যোগের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নজরবন্দি আমাদের শেখায়, silence is never neutral—it is almost always complicit.
তুলনায়, Primo Levi-এর If This Is a Man বইটিও স্মরণীয়, যেখানে লেখক জানান, কীভাবে ভয়, গ্লানি, এবং আত্মরক্ষা একেকজনকে অন্যের দুঃখ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আমরা যারা ‘নজরবন্দি’, তারা আদতে Levi-র ভাষায় ‘grey zone’-এর বাসিন্দা—অপরাধী নয়, নির্দোষও নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নজরবন্দি কেবল একটা গল্প নয়—এ এক দর্শন। একটি জরুরি অভিজ্ঞতা, যেখানে সাহিত্যের কাজ হয়ে ওঠে আমাদের আত্মপ্রতিফলনের আয়না হয়ে দাঁড়ানো, এবং জিজ্ঞেস করা: “তুই কি সেই মেয়ে নস?”… যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়—তাহলে পাঠক হিসেবে আমাদের রেহাই নেই।
আরও গভীরে গেলে, “নজরবন্দি”-র কাঠামোয় আলবেয়ার কামুর The Fall-এর ছায়া শুধু নয়, একরকম শৈল্পিক আদানপ্রদান লক্ষ করা যায়—যেখানে স্বীকারোক্তি আত্মরেহাই নয়, বরং আত্মপরীক্ষার এক বিপজ্জনক পিচ্ছিল পথ। কামুর Jean-Baptiste Clamence, একজন সময়ের দর্শক, নিজের ‘নৈঃশব্দ্য’-এর দায় বুঝতে শুরু করে সেই রাতে যখন সীন নদীতে ডুবে যাওয়া এক মেয়েকে সে সাহায্য করেনি। আর ভট্টাচার্যের শিল্পী চরিত্রটি—সে এক অনুরণন, কিন্তু বাঙালি প্রেক্ষাপটে, নাগরিক বুদ্বুদে। তার চারপাশের বধির সমাজ তাকে দেখে, শোনে না। সে বলে—“আমি কিছু করিনি।” কিন্তু তার কণ্ঠে অনুরণিত হয়—“এই না করাটাই কি শেষপর্যন্ত অপরাধ নয়?”
এই জায়গায় এসে The Fall, Night, এবং নজরবন্দি—তিনটি গ্রন্থই এক অদ্ভুত নৈতিক সমান্তরাল রচনা করে। Wiesel-এর Holocaust-পরবর্তী আত্মস্মৃতি, Clamence-এর বোহেমিয়ান গ্লানির বয়ান, আর ভট্টাচার্যের চরিত্রের নৈঃশব্দ্য—তিনটিই এক প্রশ্ন তোলে: যখন তুমি কিছু করতে পারো, অথচ করো না—তখন কি তুমি নিজের চোখে মানুষ থাকতে পারো?
আবার, একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরে, নজরবন্দি যেন প্রতিধ্বনি করে Franz Kafka-র The Trial-এর নির্জন বিচারের ধারণাকে। “অপরাধী না হয়েও বিচারের মুখোমুখি”—এই থিমে শিল্পীর নৈঃশব্দ্য হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় দোষ। এক ধরনের Kafka-esque anxiety কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ব্যক্তি জানে না, কীসে সে দায়ী, অথচ এক অদৃশ্য কাঠামো তাকে ‘নজরবন্দি’ রেখেছে।
এই ত্রিমুখী পাঠে, “নজরবন্দি” হয়ে ওঠে শুধু একটি গল্প নয়, বরং এক ধরনের moral hallucination—যেখানে আমরা প্রত্যেকে নিজস্ব কামু, নিজস্ব উইজেল, এবং নিজস্ব কাফকা-র প্রতিচ্ছবি খুঁজি।
‘সমান্তরাল’— একটি অন্তর্মুখী গল্প—প্রেমের প্রতিকৃতি আঁকে, কিন্তু সে রঙে রাঙানো নয়। সেখানে ক্যানভাসে ছড়ানো থাকে শুধু দাগ, স্মৃতির ছোপ আর সময়ের ফাটল। এই গল্প একধরনের emotional palimpsest—যেখানে পুরোনো প্রেমের কালি পুরোপুরি মোছা যায় না, বরং নতুন অনুভবের ওপরেও তার ছায়া পড়ে। এখানে প্রেমিক-প্রেমিকার শরীর কখনোই এক হয় না, কিন্তু চেতনার স্তরে তারা নিঃশব্দে একে অপরকে স্পর্শ করে যায়—দ্রুত, অনির্দিষ্ট, অনুচ্চারিতভাবে। এক অতল নিঃসঙ্গতার দুই ধ্বনি যেন সমান্তরালে বাজতে থাকে।
এই প্রেক্ষিতে যখন Nicholas Sparks-এর The Notebook-এর সঙ্গে এই গল্পের তুলনা করি, তখন দুইটিকে ঘিরে প্রেমের দর্শন এবং অভিজ্ঞতার রূপ একেবারেই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। Sparks-এর গল্পে প্রেম শরীরী, মর্ত্য, আবার কোনও এক রকম স্বর্গীয়ও। Alzheimer-এর স্মৃতিভ্রষ্টতা সত্ত্বেও Allie আর Noah তাঁদের প্রেমকে শরীরের শেষ কোষ অবধি টেনে নিয়ে যান। এমনকি স্মৃতিশূন্যতার অন্ধকারেও তারা একে অপরকে খুঁজে পান, চিনে নেন। এই পুনর্মিলন একধরনের epiphany—এক চুমু, বিস্মৃতির আগে শেষ প্রার্থনা।
‘সমান্তরাল’-এ ঠিক তার উল্টো। এখানে এমন কোনো শরীরী মিলন ঘটেই না। এটি এক unwritten notebook—যার প্রতিটি ফাঁকা পৃষ্ঠা সাড়া দেয় হারিয়ে যাওয়া শব্দের প্রতিধ্বনিতে। এখানে প্রেম কখনো পরিপূর্ণভাবে জন্মায়নি, বরং অনুভূতির অতিরিক্ততা ও বিকার চরিত্রগুলিকে ছিঁড়ে ফেলে। Murakami-র Sputnik Sweetheart-এ যেমন নিঃসঙ্গতা চরিত্রকে অন্তরালে সরিয়ে নেয়, কিংবা Elena Ferrante-র The Days of Abandonment-এ বিচ্ছেদ নিজেই এক নায়িকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে—‘সমান্তরাল’-এর প্রেমও তেমন এক বাস্তবতা-ভাঙা অনুভূতির ছায়া।
Sparks-এর The Notebook একধরনের রোম্যান্টিক আদর্শবাদের গাথা। সেখানে প্রেম শুধু টিকে থাকে না, তা পুনরুত্থিত হয়। এটা এক emotional resurrection, যেখানে অতীত, শরীর, স্মৃতি—সব মিলেই এক অদম্য মানবি�� সংযোগের ছবি আঁকে। কিন্তু ‘সমান্তরাল’-এ প্রেম কোনওদিন পূর্ণরূপে জন্মায়ই না। এটি এক premature elegy, এক অসমাপ্ত শোকগাথা, যেখানে প্রেম আসার আগেই মরে গেছে।
এই দুইটি গল্পের মাঝে পার্থক্যগুলো যদি সরল ভাষ্যে উপস্থাপন করি, তা হলে আমরা দেখতে পাই:
প্রথমত, প্রেমের ধরণ: ‘সমান্তরাল’-এ প্রেম একতরফা, নৈঃশব্দ্যভরা, অনুভবমাত্র। এর বিপরীতে, The Notebook-এ প্রেম পূর্ণ, শরীরী, এবং পুনরায় জীবনপ্রাপ্ত।
দ্বিতীয়ত, সময়: ‘সমান্তরাল’-এ সময় সবসময় অনুপস্থিত—সব কিছুই যেন দেরিতে ঘটে। প্রেম আসে, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষণ ফুরিয়ে গেছে। আর Sparks-এর গল্পে সময় একটি পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদ—স্মৃতির ভেতর ডুব দিয়ে প্রেম ফিরে আসে।
তৃতীয়ত, স্পর্শ: ‘সমান্তরাল’-এ শারীরিক স্পর্শ অনুপস্থিত; সেখানে কেবল অনুভব আছে—মনের গভীরে। The Notebook-এ স্পর্শ এতটাই বাস্তব যে স্মৃতিহীন শরীরেও প্রেম টিকে থাকে।
চতুর্থত, আশাবাদ: ‘সমান্তরাল’ আমাদের দেয় ক্ষীণ, টুকরো টুকরো এক আবেগ, যার শেষ নেই, শুধু অনুরণন আছে। আর The Notebook বলবে, “Never give up. Love conquers all.”
লেখার স্টাইলের দিক থেকেও এই পার্থক্য লক্ষণীয়: ‘সমান্তরাল’-এর ভাষা কমকথা, অনুভবের খোঁজে—একটা impressionistic minimalism। আর Sparks লেখেন একধরনের আবেগঘন, সুরেলা lyricism-এ, যা পাঠককে ভালোবাসার তীব্রতায় ডুবিয়ে রাখে।
সবমিলিয়ে তুলনাটি দাঁড়ায় এরকম — ‘সমান্তরাল’-এ প্রেম একতরফা, নিরব, দেরিতে আসা এক অনুভূতি; সময় ও স্পর্শ সেখানে অনুপস্থিত, আর তার ভাষা এক মিনিমাল, খণ্ডিত আবেগের প্রতিচ্ছবি।
পক্ষান্তরে The Notebook-এ প্রেম দু’তরফা, শরীরী এবং স্বর্গীয়ভাবে জয়ের প্রতীক; সময় সেখানে পুনরুদ্ধার হয়, স্পর্শ বাঁচিয়ে রাখে সম্পর্ককে, আর লেখা আবেগে ভাসে এক গীতিক রোম্যান্টিসিজমে।
শেষমেশ, বলা যায়— ‘সমান্তরাল’ হলো আধুনিক জীবনের প্রেমের ছায়া। এক ফিসফিস করা ইমোজি-হীন মেসেজ: “seen” আছে, কিন্তু “reply” নেই।
আর The Notebook? তা বলে: “Love never dies.” ‘সমান্তরাল’ শুধু ফিসফিস করে ওঠে: “Love was never born.”
Samanta Schweblin-এর Fever Dream-এ আমরা দেখেছি এক অনির্ধারিত অসুস্থতা, এক অদৃশ্য বিষ, যা চরিত্রের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এবং বাস্তবতার সীমারেখাকে চূর্ণ করে ফেলে। ঠিক তেমনই “সমান্তরাল” গল্পেও সংযোগ এক বিষাক্ত আশ্বাস—মেসেজ আসে, কিন্তু দেখা হয় না; প্রেম থাকে, কিন্তু শরীর অনুপস্থিত; একে অপরকে খুঁজতে খুঁজতে যেন দুই রেললাইন পাশাপাশি চলে, কিন্তু মেলে না—like an infinite near-miss।
এখানে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তা শুধুই সম্পর্কের অনিশ্চয়তা নয়—এটি এক ভয়ানক ontological dislocation, এক আত্ম-পরিচয়ের সংকট। এটি Schweblin-এর toxic anxiety-র মতোই দগদগে—we are always unsure: are we in love, or in a fever dream of it?
Patrick Modiano-র উপন্যাসগুলিতে যেমন চরিত্ররা নিজেদের অতীত খুঁজতে খুঁজতে রাস্তা হাঁটে—নামহীন গলি, অর্ধ-ভোলা নাম, পুরনো ছবি আর স্মৃতির ভাঁজে একটা চেনা অথচ অধরা সত্তা খোঁজে—“সমান্তরাল”-এর প্রেমিক-প্রেমিকা তেমনই হাঁটে নিজেদের টেক্সটের মধ্য দিয়ে। তারা পুরনো চ্যাট খুলে দেখে, ডিলিট হওয়া ছবি মনে করার চেষ্টা করে, কিংবা গুগল ম্যাপের লোকেশন হিস্ট্রি ঘাঁটে—কিন্তু কিছুই পুরো পাওয়া যায় না। Love becomes an archival activity.
Modiano-এর গদ্যের মতোই, এখানে সময় গোলকধাঁধার মতো; যত এগোতে চাই, তত পিছিয়ে যাই—প্রেম একটা déjà vu, একটা déjà perdu।
Raymond Carver-এর short stories—বিশেষ করে “What We Talk About When We Talk About Love”—এর মতোই, “সমান্তরাল”-এর চরিত্ররা যা বলে না, তাতেই তারা সবচেয়ে বেশি নগ্ন হয়। এখানে কোনও চিৎকার নেই, ব্রেকআপ নেই, এমনকি closure-ও নেই। তবু একটা ক্ষত অনুভব করি, because every silence screams. কথোপকথন মাঝপথে থামে, অথবা একতরফা হয়—তবে সেই ফাঁকেই গড়ে ওঠে গল্পের আবেগ, পাঠকের প্রতি এক tacit appeal: তুমি তো বুঝছ, তাই তো?
Carver বলতেন—less is more. আর “সমান্তরাল” যেন সেই ক্ষয়িষ্ণু প্রেমের মিনিমালিস্ট চিত্রকলা—ক্যানভাসে তিনটা ব্রাশস্ট্রোক, কিন্তু মনে পড়ে যায় পুরো একটি সম্পর্ক।
এই চারজন লেখকের ছায়া “সমান্তরাল”-এ শুধু intertextual অলঙ্কার নয়, বরং তার narrative DNA-র অংশ। একে শুধু সম্পর্কের গল্প বললে ভুল হবে। এটি connection-এর বিলুপ্তি নিয়ে এক মনোলিথিক elegy।
শেষ পর্যন্ত, “সমান্তরাল” এমন এক প্রেমকথা, যা Ferrante-র অসহিষ্ণু অভ্যন্তরীন আর্তি, Murakami-র নরম নস্টালজিয়া, Sparks-এর আটপৌরে অথচ নৃশংস স্মৃতি, আর Schweblin-এর paranoiac disconnect-এর অনন্য সমাহার—একই সঙ্গে কবিতা, প্রহেলিকা আর পোস্টমর্টেম।
আর আপনি জানেনই, আমরা তো সেই পাঠক—যারা চুপচাপ বসে থাকি, একটা “seen” হয়ে যাওয়া মেসেজের পাশে, আর ভাবি, “তবে কি… প্রেমটা একতরফাই ছিল?”
এই দুই গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের অভিন্ন সুর যেন এক কণ্ঠে গাওয়া দুই রাগ—একদিকে সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা, অন্যদিকে প্রতিবাদের অর্থহীনতা। মূল প্রশ্নটা ঘুরেফিরে আসে: বিশ্বাস। মানুষ কাকে, কাকে না, এবং কবে বিশ্বাস করে? “সমান্তরাল”-এর প্রেমিক যেমন মনের গভীর থেকে অনুভব করে কিন্তু ছুঁতে পারে না, “নজরবন্দি”-র শিল্পী ঠিক তেমনই অনুভব করে প্রতিরোধ—যা উচ্চারিত হলেও অনুনাদ হয় না। দুটো গল্পই যেন সেই existential vacuum-এর চিত্র, যেখান থেকে বিশ্বাস জন্মায় না, জন্মায় শুধু এক অনন্ত প্রতীক্ষা।
এই অনির্বচনীয় ‘in-betweenness’-এর মধ্যেই, রাজা ভট্টাচার্যের দুই ভুবন আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়: হয় নিঃশব্দে হাঁটো, নয়তো ঝড়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থেকো—বিশ্বাস করো, অথবা নিঃস্ব হয়ে যাও।
ভট্টাচার্যের লেখায় সংযম আছে, কিন্তু সেই সংযমের মধ্যে যেন অশ্রুত উত্তেজনা লুকিয়ে থাকে। সংলাপগুলো অসমাপ্ত, বাক্যগুলো প্রায় গানের মতো ধ্বনিত। এমনকি বইয়ের এক দৃশ্য—শিল্পীর চিৎকার, “তুই কোথায় গেলি?”—তা একটিমাত্র মেয়ের উদ্দেশ্যে নয়, বরং গোটা সমাজকে টেনে আনা এক আহ্বান। এই মুহূর্তে, যখন সাহিত্যের পর্দা খুলে যায় বাস্তবের মঞ্চে, তখন প্রতিটি শব্দ যেন একটা নিষ্পাপ সত্যের ইঙ্গিত দেয়।
এই বই “Magical Realism” নয়, কিন্তু ঠিক তার বিপরীতে, একধরনের “Hyperrealism” রূপে দাঁড়ায়—যেখানে প্রতিটি অনুভূতি এতটাই সত্যি, যে তার প্রতিচ্ছবি দরকার পড়ে না। Hannah Arendt-এর কথায়, “banality of evil” হয় যখন মানুষ নীরব থাকে; আর “নজরবন্দি” সেই নীরবতার বিরুদ্ধে এক জোরালো মৌনবিক্ষোভ, যেটা সাহিত্যের প্রতিটি স্তরে নৈতিক প্রশ্ন উসকে দেয়।
প্রেম ও প্রতিবাদ—এই দুটি ছায়া দিয়ে রাজা ভট্টাচার্য যে “দুই ভুবন” সৃষ্টি করেছেন, তা আসলে আমাদের একটাই পৃথিবীর দুই অন্যমুখী চেহারা। Toni Morrison-এর Beloved বা Rajkamal Chaudhary-র ছোটগল্পগুলোর মতো, যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বৃহৎ সমাজের প্রতীক হয়ে উঠে, ঠিক তেমনি এই সংকলনে ব্যক্তিগত গল্পের অজস্র আড়ালে সামাজিক চেতনার গভীরতা প্রতিফলিত হয়।
সবশেষে, দুই ভুবন কোনো নিছক সাহিত্যসংকলন নয়। এটি একখানা সাহসিকতার আয়না, যেখানে আমরা সবাই ঝুঁকে দেখি—আমি কি সত্যিই প্রেমে বিশ্বাস করি? আমি কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি? এই প্রশ্নগুলো যতক্ষণ মনের ভেতর বাজতে থাকবে, ততক্ষণই এই বই পাঠকের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
এটি সেই বই, যা এক বসায় শেষ হয় না—এটি ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করতে হয়, কারণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত, আপনি আসলে শুরুই করেননি।
এই গভীর অনুভূতি ও অনির্বচনীয় আত্মজিজ্ঞাসার সুরে, দুই ভুবন আমাদের মনে জ্বালিয়ে দেয় সেই অন্তর্নিহিত সত্যকে, যা লেখকের কলম থেকে বেরিয়ে আসে যেমন একটি অমর কাব্যের মতো—চিরন্তন, বেদনাদায়ক, আর অপরিমেয়।
পুনশ্চ: বাঙালি পাঠকবিশ্বে রাজা'দার অগণিত অনুরাগী আছেন—যথার্থভাবেই। ওঁর সাহিত্যের গভীরতা, চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর ভাষার সূক্ষ্ম অলংকার বহু হৃদয় ছুঁয়েছে। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পাঠক হিসেবে আমি যেভাবে ওঁর সঙ্গে সংযুক্ত—তা নিছক পাঠকের আসন থেকে নয়, যেন এক অন্তর্লীন আত্মীয়তায় বাঁধা পড়েছি আমি। মনে হয়, আমি নই যেন, আমার ভেতরের এক গভীর, চুপচাপ সত্তা ওঁর লেখায় নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজে পেয়েছে। ওঁর লেখা পড়ার সময়, শব্দগুলো আর শুধু ভাষা থাকে না—সেগুলো হয়ে ওঠে একেকটা ধ্বনি, যা আমার মনের না-বলা অনুভবগুলিকে সুর দেয়। প্রতিবার পড়ার সময় মনে হয়, ‘এই তো, এ কথাটা তো আমিই বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি।’ রাজা'দার ভাষা আমার আত্মার অনুবাদ, আর তাঁর গল্প আমার অভিজ্ঞতার অলিখিত দিনপঞ্জি।
তাঁর লেখা শুধু পড়া যায় না, বোধ করা যায়—যেমন হৃদয় অনুভব করে হৃদয়কে, শব্দ ছাড়াই।