স্বাভাবিকভাবেই একজন যুবককে নফস ও শয়তান নানাভাবে পরাস্ত করার চেষ্টা করে। কারণ, জীবনের এই বেলাটায় মানুষের ভেতর যৌন-তাড়না থাকে বেশি। আর একে ব্যবহার করেই যুবককে ঘায়েলের চেষ্টা করা হয়।এ তো হলো সাধারণ হিসাব। কিন্তু আমাদের এ নষ্ট সময় ও পরিবেশে একজন যুবককে অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। রাস্তার বেপর্দা পরিবেশ থেকে শুরু করে কলেজ-ইউনিভার্সিটির সহশিক্ষা, ইন্টারনেটের মতো জরুরি উপকরণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা চরম অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্রোতে ভেসে আসা নানারকমের আজাব… সব মিলিয়ে যুবক এখন বিপদে। আগে যে যৌবন ছিল বিপুল সম্ভাবনার আধার, এখন সে যৌবন যেন হাজারো বিপদের আশঙ্কা ।‘এখন যৌবন যার’ বইতে লেখক তুলে ধরেছেন এক আখ্যান, যুবক যাকে আঁকড়ে ধরতে পারবে এই অকুল দরিয়ার অবলম্বন হিসেবে।
বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, যেন কোনো বুজুর্গ মানুষ সামনে বসে স্নেহভরে উপদেশ দিচ্ছেন। ভাষা খুবই সরল, উপদেশমূলক এবং হৃদয়ে দাগ কাটার মতো। তবে আমার ব্যক্তিগত মনে হয়েছে—নারীদের প্রসঙ্গে ব্যবহৃত কিছু শব্দচয়ন যদি আরেকটু নরম ও সংযত হতো, তাহলে ভালো লাগতো। কারণ অনেক সময় এ ধরনের শব্দ যুবতী পাঠকদের কাছে ভিন্ন বা ভুল বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। তারপরও বইটিতে যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যৌবনকে সঠিক পথে পরিচালনা করা, নিজের চরিত্র ও ঈমানকে শক্ত রাখা—এসব বিষয়ে বইটি গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়।
জীবনে যতো যা কিছুই ঘটে যাক না কেনো, যৌবন তার সময়মতো আসে, আবার একসময় চলে যায়। কারণ যৌবনের সম্পর্ক শরীরের সাথে, বয়সের সাথে। অন্য কিছুর সাথে না।
আল্লাহ কাল কিয়ামতের ময়দানে তার দেয়া প্রতিটা নিয়ামতের হিসাব নেবেন। সাথে এই যৌবনের হিসাবও নেবেন। আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে বানিয়েছেন তার ইবাদতের জন্য। তার মধ্যে যৌবনকালের ইবাদত আল্লাহর কাছে সবচাইতে বেশি পছন্দনীয়। কিন্তু আমাদের কি সেদিকে খেয়াল আছে? কথা তো ছিল এই সময়টাতে পড়াশোনায় মন দিবো, কিন্তু মন তো দিয়েছি অকাজে। কথা তো ছিল নিজ স্ত্রীকে সময় দিব, কিন্তু সময় তো দিয়েছি বিয়া না করা প্রেমিকাকে। কথা তো ছিল ৫ ওয়াক্ত সালাতে মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কাছে হাজিরা দিবো, কিন্তু হাজিরা তো দিয়েছি শয়তানের কাছে। কথা তো ছিল মন দিব কুরআন শিক্ষায়, কিন্তু মত্ত হয়েছি গানবাজনায়। আর এদিকে সময় তো যেতেই থাকছে- মৃত্যুর দিকে। এটাই আমাদের অবস্থা নয় কি?
“এখন যৌবন যার” বইটা মূলত দিক-নির্দেশনামূলক একটা বই। বিশেষ করে ছেলেদের জন্য। বইটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো যেন শায়খ যুলফিকার আলী নকশবন্দী নিজে তার দরদমাখা কণ্ঠ দিয়ে আমাকেই বুঝাচ্ছেন- আমার কেমন সময় এসেছে, আমার কী করা উচিত আর কী করা উচিত না। কিছু ভুল- যেখান থেকে ১০০ হাত দূরে থাকাই কেবল যথেষ্ট নয়, বরং তার বিপরীতে আর কী করলে পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না তার পরামর্শ দিচ্ছেন আমাকে।
যদিও বইটার অনেকগুলো এমন দিক আছে যেগুলো আমার কাছে একটু অন্যরকম মনে হয়েছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে আর যাদের উদ্দেশ্যে বইটা লিখা সে কথা চিন্তা করলে এইটুকু নিতান্তই তুচ্ছ।
বইটির বিষয় বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। ভালো হয় নিজে একটু যেকোনো অনলাইন বুকশপ ভিজিট করে সূচিপত্রে একটু চোখ বুলান। নিজেই বুঝে যাবেন এর গুরুত্ব।
যৌবন, শুধু বয়সের একটি ধাপ নয়, এটি শক্তি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার বিস্ফোরণ। এখন যৌবন যার বইটি সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার এক গভীর আহ্বান। এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা তরুণ হৃদয়কে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, দিকনির্দেশনা দিয়ে ছুঁতে চায়। বইটিতে যৌবনের চ্যালেঞ্জ, নফসের টানাপোড়েন, সময়ের অপচয়, সম্পর্কের জটিলতা এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা কঠোর উপদেশের মতো নয়; বরং আন্তরিক এক শুভাকাঙ্ক্ষীর কণ্ঠস্বরের মতো, যা ধীরে ধীরে অন্তরে প্রবেশ করে। পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, এই বই তরুণদের ভয় দেখায় না বরং তাদের মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দেয়। যৌবন যে এক মহান আমানত, তা এখানে স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। সময়কে কীভাবে অর্থবহ করা যায়, চরিত্রকে কীভাবে দৃঢ় করা যায়, এবং আত্মাকে কীভাবে পরিশুদ্ধ রাখা যায় এসব প্রশ্নের উত্তর বইটি ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে উপস্থাপন করেছে। আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিতে, এই বই আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে, যৌবনকে আমরা সহজভাবে নিই, অথচ এই সময়টাই ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করে। বইটি আমাকে সময়ের মূল্য নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। ভাষা সাবলীল, বক্তব্য পরিষ্কার, এবং সম্পাদনা সুসংগঠিত। বিশেষ করে সম্পাদকীয় উপস্থাপনা পাঠকে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রাঞ্জল করেছে। সামগ্রিকভাবে, এখন যৌবন যার তরুণদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। এটি শুধু অনুপ্রেরণা দেয় না; দায়িত্ববোধও জাগিয়ে তোলে।
জীবনের সবচেয়ে “প্রোডাক্টিভ” সময় যৌবন। এই সময়টায় যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি কমনীয়ভাবে হাতছানি দেয় তা হচ্ছে নারী। ভয়াবহ এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করে যাওয়ার বিকল্প নেই। এজন্য সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে অভিজ্ঞ কোনো আলিম থেকে উপদেশ/পরামর্শ পাওয়া, যা কিনা বেশ দুষ্প্রাপ্য। এই অভাবটা অনেকটাই পূরণ করে দিয়েছে এই বই।
কুদৃষ্টির কুফল, কারণ, প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পাশাপাশি কুদৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের কুরআনী, নববী ও বুজুর্গদের শেখানো পদ্ধতিগুলোর আলোচনা এসেছে।
দুআ নিয়ে চমৎকার একটা কথা পেয়েছি: বারবার পড়ার নামই দুআ না আসলে। দুআ হচ্ছে প্রার্থনা, মনেপ্রাণে কোনো কিছু চাওয়া।
সর্বোপরি, যৌবনে দিকনির্দেশনা পাওয়ার মতো অসাধারণ একটা বই। বারবার পড়ার পাশাপাশি আমল করে উপকৃত হতে পারার মতো একটা বই।
অনুবাদের কথা না বললেই নয়। মূল বইটা উর্দুতে লিখা, সেটা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন আবু মিফদা সাইফুল ইসলাম। পড়ার সময় ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে অনুবাদ পড়ছি, মাশাআল্লাহ।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বিশেষ করে আমাকে ও আমাদেরকে এই বরকতময় বই থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুক।