এই গ্রন্থে আমার পাঁচ বছরের ইস্তাম্বুল-জীবনের কিছু মুহূর্তকে কখনো গদ্যে, কখনো পদ্যে, কখনোবা স্বপ্নের ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছি। জেগে থেকে ইস্তাম্বুলের যা কিছু দেখেছি, তার পাশাপাশি এই শহরে ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নগুলোর কদর না করলে এই স্মৃতিকথা অপূর্ণ থেকে যেত। বিশেষ করে এই পাঁচ বছরের প্রায় অর্ধাংশ আমাকে চলনশক্তিহীন জীবন যাপন করতে হয়েছে, এখনো তা-ই। হুইলচেয়ারে করে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ ইদানীং আর খুব একটা হয় না। তাই লুসিড ড্রিমিং অনেকটা ভরসা...
প্রচ্ছদ দেখে মনে হতে পারে, এটা হয়তো আরো একটা ভ্রমণ কাহিনী। "ইহা ভ্রমণকাহিনী নহে"। লেখক তুরস্ক সরকারের বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনার জন্যে ইস্তাম্বুল গিয়েছিলেন। সেখানে তার পাঁচ বছরের দিনযাপনের খন্ডচিত্র উঠে এসেছে এই বইতে। শহর ও দেশত্যাগের পিছুটানের সাথে নতুন শহরে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা ও অভিনবত্ব আবিষ্কার করার মিশেলে সহজ গদ্যে লিখেছেন। তার ফাঁকে ইস্তাম্বুল শহর, তুরস্ক দেশ, তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সুন্দর করে তুলে এনেছেন। বাংলাদেশের প্রতি স্মৃতিকাতরতা আসলেও অতোটা একঘেঁয়ে লাগেনি ব্যাপারটা। মাঝে বেশ কিছু সুন্দর মনোলগ আছে। লেখক টিউবারকোলোসিসে আক্রান্ত হয়ে মেরুদণ্ডের বেশ কিছু হাড় মেটাল প্লেট দিয়ে প্রতিস্থাপন করে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনের পর তিনি হুইল চেয়ারে অনেকটা স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন, তবে শরীরের নিম্নাংশে অনুভূতি পুরোপুরি ফিরে পান নি। এই পুরো পুনর্বাসন সময়টা জার্নাল বা ডায়েরির আকারে খন্ড খন্ড হয়ে উঠে এসেছে বইতে। লেখক এই শারীরিক প্রতিকূলতা নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন, বাংলা ভাষার কবিতা ও রচনা তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করছেন, তুর্কি ভাষার কবিতা বাংলায় অনুবাদ করছেন; পডকাস্ট করছেন, সেখানে মৌসুমী ভৌমিকের মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা আসছেন, ইমাম রুমীর বংশধর আসছেন, ঘুরতে বেরোচ্ছেন - সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আমরা পূর্ণ মানুষেরাও অনেকে যা কোনোদিন করিনি। তাঁর ক্রমাগত নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।
"""সাউথ ইন্ডিয়ান সহপাঠী হানান এসেছিল সাহায্য করতে। আমার জুতো জোড়া দেখে সে অবাক! 'আরেহ! এটা আমরা একসঙ্গে কিনেছিলাম তিন বছর আগে, সেটা না?' আমি বললাম 'হ্যাঁ! তাই তো, ভুলেই গিয়েছিলাম, তুমিও তো কিনেছিলে হুবহু একজোড়া!' হানান বলল, 'একদম নতুনের মতো আছে তোমারগুলো, মনে হয় গতকাল কেনা!' আমি তো খুশি হয়ে ধন্যবাদ জানালাম, ওরগুলো নাকি ছিঁড়ে গেছে। আর পরতে পারে না। পরমুহুর্তে মনে পড়ল, আমি তো দুইবছর হাঁটি না। (মানে, হাঁটতে পারি না আরকি।) হানানকে বললাম,'নতুন, কারণ চলৎশক্তিহীনতা!' ধন্যবাদ ফিরিয়ে নিলাম। হো হো হাসলাম দুজনই। ঘরে এসে জুতো জোড়া খুলতে গিয়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল! কিছু জিনিস পুরোনো হয়ে ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে গেলেও পারত।""""
অনুভূতিহীনতাকে কিভাবে অনুভব করা যায়, এটা নিয়ে উনার চিন্তা আমাকে কাঁদিয়েছে। তবে লেখককে এইটুক বলতেই হয়, আপনি শারীরিক অক্ষমতার সাথে মানসিক সংকীর্ণতার যে যোগাযোগ নিয়ে লিখেছেন, আপনি এই সুন্দর বইটি যে লিখলেন, সাথে আরো সুন্দর যেসব কাজ করেছেন, সেসব তো পূর্ণাঙ্গ মানুষেরাও করছে না, বা পারছে না - এই ক্ষেত্রে কি আপনি নিজেই একটা বাঁধা/ প্রতিবন্ধকতা জয়ের সুন্দর দৃষ্টান্ত না? ব্যক্তিগতভাবে লিগামেন্ট ছিঁড়ে প্রচণ্ড ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে বেশকিছু দিন। সেই স্মৃতি থেকে বলতে পারি, এতোটা কষ্ট নিয়ে আপনি যা করছেন, সেটা করার জন্যে প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি লাগে, আমাদের পূর্ণ মানুষেরও যেটার ঘাটতি রয়েছে।
লেখক তরুণ। বয়সে আমার কনিষ্ঠ, কিন্তু অভিজ্ঞতায় জ্যেষ্ঠ।
তার এই জ্যেষ্ঠতা তার বহুমাত্রিক প্রতিভা কিংবা ঈর্ষণীয় মেধার জন্য নয়। আন্তজার্তিক ছাত্র হিসেবে ইস্তাম্বুলের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সান্নিধ্যে আসার জন্যেও নয়। এগুলো ব্যতিরেকেও হুইলচেয়ারের জীবন তার অনুভূতিগুলোকে যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা দান করেছে, সময়ের প্রবাহযাত্রায় জীবন সম্পর্কে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্পষ্টতা দিয়েছে সেই অভিজ্ঞতাই তাকে আমার থেকে (হয়তো অনেকের থেকেও) নিয়ে গেছে এক ভিন্ন জ্যেষ্ঠতায়।
বইটি ইস্তাম্বুলের ভ্রমণকাহিনী নয়, দিনলিপিও নয়, নিছক স্মৃতিকথাও বোধ হয় বলাটা মুশকিল হয়ে যায়। হয়তো লেখকের ইস্তাম্বুল বাসের আত্মলিপি কিংবা আত্মবিলাপলিপি। এই বিলাপ অভিযোগের নয়, অনুযোগের নয়, প্রার্থনার নয়, অবিশ্বাসের নয়, এই বিলাপ ভোরের শিশিরের সাথে বৃষ্টির ফোঁটা মিশে যাওয়ার মত স্বচ্ছ অথচ গভীর।
যেখানে এসেছে ইস্তাম্বুল শহরের কথা, লেখকের ক্যাম্পাস ডরমিটরিবাসের স্মৃতি, দুরারোগ্য ব্যধি আক্রান্ত হাসপাতালের দিনগুলোর দ্বন্দ্ববিধুর অভিজ্ঞতা, হুইলচেয়ারের জীবন মেনে নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা, একাকীত্বের সাথে বোঝাপড়া, ইস্তিকলাল সড়কের কথা, রুমির ব্লাডলাইন মিস ছেলেবির সাক্ষাৎকার, এস্কিশেহিরের মুসা তোপকায়ার সাথে বন্ধুত্ব, সাবেক বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ও তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের দারুণ উষ্ণতা ইত্যাদি অনেক কিছুই।
এসেছে লেখকের মায়ের কথা। মায়ের মৃত্যুর কথা। মায়ের কবরের কথা। যেখানে আরবি হরফে লেখা আছে কবি নেজিপ ফাজ'লের, কবিতার দু'টি লাইন।
'তুমি নীরবতার মতো নির্জন, চিৎকারের মতো মুক্ত।'
লেখকের ব্যাপারে কিছু না জেনেই বইটা পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইস্তাম্বুল শব্দটা ছিল প্রমিনেন্ট। আগামী মাসে এক অন্তরঙ্গ বন্ধু যাচ্ছে ইস্তাম্বুল। তাই ভেবেছিলাম আমি যেতে না পারলেও আমার কিঞ্চিৎ ইস্তাম্বুল পাঠ আর বন্ধুর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কল্পনার মানস চোখে দেখে নিব দুই মহাদেশের ঐতিহাসিক সংযোগস্থল নগরটিকে। প্রসঙ্গত নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিখ্যাত সেই উক্তি বলতেই পারি, '"If the Earth were a single state, Istanbul would be its capital." কিন্তু পাঠ অভিজ্ঞতা শেষে লেখক তার জীবন হয়ে উঠেছে প্রমিনেন্ট। আর এখানেই বইটির এবং সম্পূর্ণ লেখাটির সার্থকতা।
লেখার ফাঁকে ফাঁকে এসেছে কবিতা। তুরস্কের বিখ্যাত কবিদের, রুমির, রবীন্দ্রনাথের, নিজেরও। তাই শেষ করার আগে, লেখক শাকিল রেজা ইফতির অনুবাদে তুর্কি কবি ওজদেমি আসাফের একটি কবিতা এখানে দেবার ইচ্ছেটা অগ্রাহ্য করতে পারছি না।
'অপেক্ষা করো! বলেছে তারপর চলে গেছে। আমি অপেক্ষা করি নি, সে-ও আর আসে নি। মৃত্যুর মত কিছু একটা ঘটেছিল কিন্তু কারোর মৃত্যু হয় নি।
১৩ টি ভাগে বিভক্ত পুরো বই টি! প্রথমেই লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি। ১৯৯৯ সালে দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ তার। তুরস্ক সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বইটিতে লেখকের হুইলচেয়ারে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে, যা তার জীবনকে প্রভাবিত করেছে। তিনি লুসিড ড্রিমিং (lucid dreaming) এর মাধ্যমে জগৎটিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন।
জল, যত্ন, রবির কিরণ সবটা থেকে বঞ্চিত, তবু বেঁচে বর্তে আছে। ও গাছ আর আমি মানুষ। এখানে লেখকের ফিজিক্যালি ডিজঅ্যাবল্ড হয়েও জীবনের স্রোতে ভেসে যাওয়ার দিকটা ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ থেকে নতুন একটা দেশে যেয়ে সেখানে খাদ্যের, প্রকৃতির বৈচিত্র্য, সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার দিকটি সুন্দর সাবলীল ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইস্তাম্বুলের ইস্তিকলাল স্ট্রিট, আঙ্কারা, অটোমান সাম্রাজ্যের অলিগলিসহ এক কথায় তার পাঁচ বছরের জীবনের এক সুন্দর রূপকার সৃষ্টি করেছেন বইটি তে। এছাড়া বিভিন্ন তুর্কি কবিতা বাংলায় অনুবাদকৃত ছিল। যার মধ্যে রুমি বংশের এক ব্যাক্তির সাথে লেখকের সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে।
একটা লাইন ছিল "তুমি নীরবতার মতো নির্জন, চিৎকারের মতো মুক্ত" লেখকের না পাওয়া ভালোবাসা এখানে পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা চাইলেই পারি নিশ্চিহ্ন হতে, কিন্তু আমরা চাই না। আমরা আকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। কিন্তু যা হারিয়ে যায় তা নিয়ে শুধু বসে থেকে সম্মান, সময় কোনোটাই নিঃশেষ করতে হয় না। তাই শাকিল রেজা ইফতি বলেছেন," যা হারিয়ে যায় তা নিয়ে বসে রইবো কতকাল"!
তুর্কী, ইস্তাম্বুল এর প্রতি আমার আলাদা একটা ফ্যাসিনেশন! সেই থেকেই এই বই কেনা! তুর্কী ড্রামা সিরিজ, খাবারের রেসিপি এগ্লা দেখে দেখে অভ্যস্ত। তাই বইটা পড়তে ও বেশ মজা লেগেছে!
যাই হোক, শাকিল রেজা ইফতি একজন সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল মানুষ। তার জীবনের অভিজ্ঞতা গুলো না শুধু তার প্রতিবন্ধকতা জয় করার প্রত্যেক টা মুহূর্ত অসাধারণ ভাবে লিখেছেন তিনি এই বই এ।
ভ্রমণ ও প্রবাস জীবন বিষয়ক বই গুলো এখন পছন্দের তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করলো!
This entire review has been hidden because of spoilers.
"অলকে তোমার কী ছিল, জানি না..... ওটা কি ঝড়ের কারুকাজ? নাকি আমার দৃষ্টিপথের কুড়িয়ে পাওয়া সীমানা... তোলপাড় করা প্রতিটি রেখায় মনে জাগে বসন্তরাজ।" -কবি ওজদেমির আসাফ অনুবাদ:শাকিল রেজা ইফতি আজ প্রায় এক মাস হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বইটার রেশ এখনও উঠতে পারছি না আশা করি বইটা ভালো কি মন্দ তা বুঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট প্রথমেই বলে রাখি এটা কোন ভ্রমণ কাহিনী নয় এটা লেখকের স্মৃতি কাতরতা ইস্তাম্বুল বা তুরস্ক নিয়ে ৪টি বই পড়েছি এটাই সবচেয়ে ভিতরের খবর বেশী জানাতে পেরেছে।
ছুটির দিনে শাকিল রেজা ইফতির ‘আমার ইস্তাম্বুল’ শেষ করলাম। ইস্তাম্বুল জীবনের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা, টুকটাক ইতিহাস, গদ্য-পদ্য আর ব্যক্তি জীবনের এক টুকরো শোকগাথা এ বই! দারুণ সময় কাটলো।
১২ অক্টোবর, ২০২৪ ঈ. || বেলা— ৪:৪৫ মিনিট
This entire review has been hidden because of spoilers.