গান্ধারী-ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্রের অন্যতম বিকর্ণ সেই অনন্যতম, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যিনি প্রতিবাদে মুখর, মানুষের অপমানে-অসম্মানে যিনি শোচনাদগ্ধ। বিকর্ণ মানুষের চিরন্তন বিবেক। বিকর্ণের জীবনকাহিনী বিবেকেরই জয়গাথা। মহাভারতের এই উপেক্ষিত চরিত্রটিকেই তাৎপর্যপূর্ণ মহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন এ-যুগের বিবেকবান কথাকার হর্ষ দত্ত। মহাভারতের এক স্মরণীয় তবু স্বল্পপরিচিত চরিত্র বিকর্ণ। গান্ধারী-ধৃতরাষ্ট্রের শতপুত্রের অন্যতম, বীর, সাহসী ও সর্বোপরি সত্যপ্রিয় বিকর্ণ অনন্যতম হয়ে উঠেছেন সভাপর্বে, যেখানে কুরুকুলে একমাত্র তাঁকেই দেখি শুভবোধের অবিচল প্রতীক হয়ে প্রতিবাদ করছেন পাঞ্চালীর লাঞ্ছনার। জিতা না অর্জিতার-দ্রৌপদীর এই উদ্যত প্রশ্নের সামনে যখন প্রত্যেকে বিমূঢ়, একমাত্র ন্যায়নিষ্ঠ এই ধার্তরাষ্ট্রকেই দেখি বিচারপ্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছেন দ্রুপদনন্দিনীর সপক্ষে। মানুষের চিরন্তন বিবেকের প্রতিভূ এই বিকর্ণকেই স্বমহিম প্রাসঙ্গিকতায় ফিরিয়ে এনেছেন হর্ষ দত্ত। সভাপর্ব থেকে বিকর্ণ-জীবনের অন্ত্যপর্ব পর্যন্ত যে সমূহ উপাদান ছড়িয়ে ছিল সমগ্র মহাভারতে, অনুপুঙ্খ অনুসন্ধানে তাকেই একত্র করে, কল্পনা ও ভাষার অসামান্য প্রয়োগকৌশলে, তিনি এঁকেছেন বিকর্ণের জীবন-কাল ও সমাজ-সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিচিত্র।
হর্ষ দত্তর জন্ম ১৯৫৫, কলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন বঙ্গবাসী কলেজ-স্কুল, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপনা বৃত্তির সঙ্গে নিযুক্ত থাকবেন- এই লক্ষ্যে সাধ্যমতো পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণির এম.এ এবং এম.ফিল।অধ্যাপনার সুযোগ পেলেও, আশির দশকে রাজনীতি-অধ্যুষিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবল প্রকোপে, এই পথে যেতে পারেননি। গ্রহণ করেছিলেন সাংবাদিকতার বৃত্তি।রামকৃষ্ণ-ভাবান্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছেন আবাল্য। অস্ট্রেলিয়া, চিন, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং ইত্যাদি দেশে সাহিত্যসংক্রান্ত আমন্ত্রণে ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজে পরিভ্রমণ করেছেন।লেখক হিসেবে স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। যেমন সমরেশ বসু সাহিত্য পুরস্কার, বিচয়ন সাহিত্য পুরস্কার, নিবেদিতা পুরস্কার, দ্বিজেন্দ্রলাল স্মৃতি পুরস্কার, আনন্দ-স্নোসেম পুরস্কার, তারাপদ বসু পুরস্কার ও উত্সব সম্মান।
মহাভারত এর কাহিনীর সারসংক্ষেপ আমাদের সকলের ই প্রায় জানা।কুন্তী,কর্ণ,পঞ্চপাণ্ডব,দ্রৌপদী,সৌবল শকুনি,মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী এবং তাদের সন্তান দুর্যোধন,দুঃশাসন প্রমুখের নাম ও পরিচয় সম্পর্কেও আমরা অনেকেই জানি,কিন্তু এসব নাম ছাড়া আরও একটি নাম আছে,আর সেই নামটি হল 'বিকর্ণ'!হ্যাঁ,বিকর্ণ নামটি আমাদের অনেকের কাছেই হয়তো একদম নতুন মহাভারত প্রসঙ্গে,হয়তো মহাভারতের বহুল চর্চিত চরিত্রগুলির তুলনায় নামটি নিয়ে চর্চাও সে ভাবে হয় নি,কিন্তু চর্চা হোক বা না হোক, বিকর্ণ চরিত্রটি মহাভারত প্রসঙ্গে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র।কেন,কীজন্য... তার উত্তর মিলবে হর্ষ দত্তের লেখা পৌরাণিক নির্ভর এই অসম্ভব সুন্দর বইটি তে।
মহাভারতের মতো সুবিশাল মহাকাব্যের এক বিন্দু জল পরিমাণ ও হয়তো আমার জানা নেই। তবে আগ্রহ বোধ করি বলে, গুটি গুটি পায়ে এগোতে থাকি। ধার্তরাষ্ট্র বিকর্ণ কৌরব বংশের সহস্র পুত্রের মাঝে এক আলাদা স্ফুলিঙ্গই বটে। স্বমহিম বিকর্ণের চরিত্রের বিশদ অনুসন্ধানে স্বাভাবিকতই কিছু কল্পনা ও যোগকৃত হয়েছে লেখার স্বার্থে, সেটুকু স্বাধীনতা লেখকের থাকে বলেই মনে করি। আগ্রহ জাগানিয়া বলে পাঠে আনন্দের কমতি হয়নি।