আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে যাঁরা এ-উপন্যাস পাঠ করেছিলেন তাঁদের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে ‘লালবাঈ’। বিস্ময়ের কথা আজকের পাঠককেও এ বই সমান অভিভূত করে। বহু ভাষায় অনূদিত এই অসামান্য সৃষ্টি সর্ব অর্থেই কালোত্তীর্ণ। ইতিহাসের উপাদান বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে বর্ণময় হয়ে উঠে ঐতিহাসিক উপন্যাসের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল বাংলা ভাষায়; রবীন্দ্রনাথের ‘রাজর্ষি’ ও ‘বউ ঠাকুরাণীর হাট’ সমৃদ্ধ করেছিল সেই ধারাকে। কিন্তু তারপর প্রাচীন বাংলার ইতিহাস উপেক্ষিত হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘকাল। হয়তো সে কারণে সে-সময়ে প্রায়-অপরিচিত লেখক রমাপদ চৌধুরী বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যময় পুরাবৃত্তকে তুলে এনেছিলেন তাঁর উপন্যাসে, যা প্রকৃতপক্ষে। বঙ্গদেশে উচ্চাঙ্গসংগীতের আগমনে বাংলার নিজস্ব একটি সংগীতধারার জন্মবৃত্তান্ত। উপরন্তু এ-উপন্যাস বাংলার তথা ভারত-ইতিহাসের সেই মহাসন্ধিক্ষণের অসামান্য ইতিকথাও। ‘লালবাঈ’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যে-আলোড়ন দেখা দিয়েছিল, পাঠকমহলে আজও তা স্মরণীয় হয়ে আছে। এ-উপন্যাসের সাফল্য ও জনপ্রিয়তার প্রভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাসের লুপ্তধারাটি পুনরায় সঞ্জীবিত করে তোলেন খ্যাতিমান লেখকরাও। কিন্তু ‘লালবাঈ’ তার মধ্যে নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক।
রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।
Oneidin por Ekta bhalo historical fiction porlam. Osadharon golpo. Lekhon shoili admirable . Bishnupurer Na Jana kotha ar Jana kotha notun kore bola hoach!
সপ্তদশ শতকের কথা , মুঘল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর যখন আওরঙ্গজেব। মুঘল সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি তখন সর্বাধিক সে সাথে প্রজাপীড়ণ ও ধর্মীয় নির্যাতন চরমে উঠেছে। সে সময়ই বাংলার প্রায় স্বাধীন এক রাজ্য মল্লভূম , নামমাত্র শর্তে মুঘলদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ। সমগ্র ভারতকে এক ধর্মের ছাদের তলায় এনে মুঘল সাম্রাজ্য নিস্কন্টক করতে বদ্ধপরিকর আওরঙ্গজেব চূড়ান্ত নির্যাতন শুরু করেছেন বিধর্মীদের উপর। গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেবালয়। সংগীত, বাদ্য, নৃত্য, চিত্রকলা নিষিদ্ধ হয়েছে। বৈষ্ণব ধর্মীয় মল্লভূমের রাজধানী বিষ্ণুপুর তখন সংগীতের পীঠস্থান। আশ্রয় দিয়েছে একাধিক সংগীতজ্ঞকে। সে সময় বিষ্ণুপুর আসেন তানসেন ঘরানার বংশদীপ বাহাদুর খান। তার সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে সংগীতের যে উৎকর্ষতায় পৌঁছায় বিষ্ণুপুর তা থেকেই জন্ম নেয় বিষ্ণুপুর ঘরানা। সতেরো শতকের বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ও মল্লভূমের রাজধানী বিষ্ণুপুরের সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক উত্থান পতন এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। উপন্যাসের নাম লালবাঈ হলেও এই উপন্যাসের মূল চরিত্র তাকে বলা যায়না। উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এর কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজনীতি। রাজনীতিতে যেমন চিরশত্রু বা চিরবন্ধু বলে কিছু হয়না তেমনি এই উপন্যাসের কোনো চরিত্রকেই ভালো ও খারাপের শ্রেণীবিভাগে আলাদা করে রাখা যায়না। কোনো এক মুহূর্তের লোভ লালসা মত্ত চরিত্র পরের মুহূর্তে ভীষণ মানবিক গুন্ সম্পন্ন হয়ে উঠেছে। প্রজাহিতকারী রাজা কখনো হয়ে উঠেছে প্রজা পীড়ণকারী অত্যাচারী। মানব চরিত্রের এই দ্বিমুখী রূপকে অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
'লালবাঈ' এক ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস; ইতিহাস নয়। এতে আছে আশ্চর্য সব চরিত্র, আছে আমাদের অতি পরিচিত বিষ্ণুপুর পটভূমির অজানা জন্মকথা, সেই সঙ্গে আছে প্রতিশ্রুতি সেই অত্যাশ্চর্য বিষ্ণুপুর ঘরানার উৎস কাহিনী চিনিয়ে দেবার। অথচ, এ সকল রসদ থাকা সত্ত্বেও সেই উপন্যাস যখন আমার কাছে ব্যর্থ হল, তখন প্রশ্ন করি — কোথায় ভুল হল? উত্তর: চালিকাশক্তির অভাব।
ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাসের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যজগতের আজকের পরিচয় নয়, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তার মানদণ্ড স্থির করে গিয়েছেন অতি উচ্চস্থানে। পরবর্তীকালে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে যেই মুন্সিয়ানা খুলেছে, রমাপদ চৌধুরীর এই উপন্যাস সেই শ্রেণীতে নিজেকে উন্নীত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তার প্রথম কারণ পরিচালক-শক্তির অভাব। কোন সালে গল্প আরম্ভ হচ্ছে, তারপর ক্রমশ কখন সেটা অতীতে হাম্বীরের রাজত্বকালে চলে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে, সেটা খুব সুস্পষ্টভাবে লেখায় ফুটে ওঠে না। কারণ লেখার ভাষায় ভীষণ জড়তা। ঝরঝরে ভাষার ধ্বনিমাধুর্য এই বইতে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত।
দ্বিতীয়ত, এই ভাষার জড়তার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী ভাবে এসে গেছে পুনরুক্তি। একই কথা, একই অনুভূতির চর্বিত চর্বণ পাঠকের, অন্তত আমার কাছে ক্রমেই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, যদিও ইতিহাসের নানান বিখ্যাত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কাল্পনিক চরিত্রদের বেশ সাবলীলভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক, তবে কোনো চরিত্রকেই মানবিক করে তুলতে পারেননি। বিষ্ণুপুররাজ রঘুনাথের চরিত্রকে যদিবা চেষ্টা করেছেন খানিকটা বিবর্তিত করতে, তবে সেটাও অক্ষম চালনাশক্তির দোষে ব্যর্থ হয়েছে।
চতুর্থ, এবং শেষ যেই কারণে 'লালবাঈ' আমার প্রিয় উপন্যাসগুলির মধ্যে উত্তীর্ণ হতে পারেনি; কাহিনীর ভূমিকায় ও উৎসর্গ-অংশে যতটা আড়ম্বরপূর্ণভাবে বিষ্ণুপুর ঘরানার জন্মকাহিনী জানাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লেখক, মূল কাহিনীতে তার সিকি-আনা ভাগটুকু দেখা যায়নি। বরং উপসংহারে এক অতীব সরলরেখায় সেই কাজটি শেষ করবার চেষ্টা করেছেন।
আর কি বলব? পাঠক হিসেবে যা বুঝেছি তা এই— হাতের সব তাস দেখিয়ে দেওয়ার মধ্যে মুন্সিয়ানা নেই, বরং পরের তাসটি দেখবার জন্য পাঠককে আগ্রহে অধীর করে দেওয়াই লেখকের প্রকৃত জয়। তবু, এসকল নঞর্থক দিক থাকা সত্ত্বেও গল্পটি একবার পড়া যায়। কেবল গল্পের খাতিরেই।