ছ’টি বিখ্যাত উপন্যাসের বর্তমান খণ্ডটিতে আছে 'খারিজ'-যা শুধু বাংলা উপন্যাসেই পালাবদল ঘটায়নি, পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিতে। আছে 'লজ্জা'-যা নিয়ে ছবি করার শেষ বাসনা ছিল ঋত্বিক ঘটকের। আছে 'হৃদয়'-যার সম্পর্কে নীহাররঞ্জন রায়ের স্বতঃপ্রণোদিত চিঠির উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে প্রথমেই। আছে 'বীজ'-যা অভিভূত করেছে সর্বস্তরের বিদগ্ধ পাঠকদের। এ ছাড়া আর দু’টি উপন্যাস 'যে যেখানে দাঁড়িয়ে' এবং 'পরাজিত সম্রাট'-যার একটিতে চিরে চিরে দেখানো হয়েছে ব্যক্তিহৃদয়, অন্যটিতে সমাজের বিবসন চিত্রপট।
রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।
"ছেলেবেলায় রথের মেলায় কেনা চার পয়সার রঙিন-কাচের দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে একটু নাড়া দিলেই এক-একবার এক-একটা নতুন ছক হয়ে যেত , কত রকমের রঙ জায়গা পাল্টে নতুন চেহারা নিত। প্রেম জিনিসটাও ঠিক তেমনি কিনা কে জানে। আসলে হয়তো নানা রঙের কয়েকটা কাচের টুকরো নিয়েই জীবন। কাচের পিছনেই ছুটে বেড়ানো। কোনোটার রঙ লাল, কোনোটা সবুজ আবার হলদে নীল বেগুনী কিংবা কমলা রঙের। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ থেমে পড়লে তুমি, প্রেম তোমার বুকের মধ্যে একটু নাড়া দিয়ে গেল আর চতুর্দিক তোমার সাত মিশালী রঙের মেঘ হয়ে স্বপ্ন বুনে দিল। তুমি রঙিন হয়ে উঠলে। কিন্তু আবার একটু নাড়া দাও, কোথায় কি, কাচ কাচ রঙিন কাচের টুকরো শুধু ।" বই - যে যেখানে দাঁড়িয়ে লেখক - রমাপদ চৌধুরী।
কর্মব্যস্ত জীবন থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি পেতে মুসাবনি হলুদপুকুরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেড়াতে আসে অনুপম। সাঁওতাল অধ্যুষিত এই নিরিবিলি অঞ্চলে হঠাৎ করেই হাটে দেখা হয় অঞ্জলির সাথে। এই হঠাৎ দেখায় অনুপম ও অঞ্জলির মধ্যে খুশির হাওয়া বইতে থাকে।২০ বছর আগের অব্যক্ত প্রেম তাদের মধ্যে জেগে ওঠে। কিশোর বয়সের ভালোবাসা কেউ কাউকে জানাতে পারেনি কিন্তু মনের মধ্যে তা এতদিন জিইয়ে রেখেছিল। এই অচেনা জায়গায় এসে সবকিছু ভুলে গিয়ে তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে চেয়েছিল। অনুপমের পরিবার ও অঞ্জলির পরিবারের মধ্যে নিয়মিত আসা যাওয়া হতে লাগল।এই সুবাদে অনুপমের ছেলে বাপ্পা ও অঞ্জলির মেয়ে ঝুনঝুনের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়।এই বন্ধুত্বের মধ্যে তারা তাদের কিশোর বয়সের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ছায়া দেখতে পায়,যার সুন্দর একটা পরিণতি তারা দুজনেই দেখতে চেয়েছিল। সচ্ছলতা, শান্তির সংসারে থেকেও অসুখী ছিল অঞ্জলি।তাই এই মধ্যবয়সে অনুপমের সাথে স্মৃতি জাগাতে এসে স্বামীর সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। হঠাৎ একটি ঘটনার কারণে অঞ্জলির মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়। স্বামীর সাথে ব্যবধান ঘুচে যায় কিন্তু অনুপমের সাথে চিরদিনের মতো দেয়াল তৈরি হয়।যে অনুপমের সান্নিধ্য সে দিবানিশি কামনা করতো, সেই অনুপমের উপস্থিতি তার কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।ফলে বাপ্পা ও ঝুনঝুনের মধ্যকার বন্ধুত্ব পরিণতির আগেই থমকে যায়।
ছোট সাধারণ একটি গল্প। কিন্তু সম্পূর্ণ গল্প জুড়েই রয়েছে লেখকের কথাসাহিত্যের নিপুণ ব্যবহার। লেখকের মাত্র তিনটি বই পড়েছি,কোনো বই আমাকে হতাশ করেনি।কাজেই নিশ্চিন্তে লেখকের লেখা পড়া যায়।
প্লট-চালিত নয়, এ ধরনের রচনাকে আমি বরং বলতে চাই অন্তর্মুখী-উপন্যাস। ঘটনার ঘনঘটা এসব উপন্যাসে গৌণ, মনের গতিই প্রধান।
রমাপদ যা করেন, তা হলোঃ আমাদের আটপৌরে জীবনে হঠাৎ একটা কাঁটা এনে হাজির করানো। তারপর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের চরিত্রদের নানারকম উপলদ্ধি হতে থাকে। স্বল্পায়তনে মাঝে সেইসব উপলদ্ধি হাজির করায় রমাপদের শক্তি অসামান্য। ‘খারিজ’ বা ‘লজ্জা’ উপন্যাসগুলো সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
লক্ষণীয় ব্যাপারঃ ওই ‘খারিজ’ কি ‘লজ্জা’ র আঙ্গিকে পৌঁছতে লেখকের সময় লেগেছে প্রায় দুই দশক। ‘খারিজ’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৪ সালে। তার আগের যে রচনাগুলো এই সমগ্রে জায়গা পেয়েছে (‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’ বা ‘পরাজিত সম্রাট’), সেগুলোর মাঝে উদ্দিষ্ট উপন্যাসগুলোর শক্তি কি সম্ভাবনা দেখা যায় খুব কমই।