‘উত্তম পুরুষ’ পুস্তক আকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে এবং আশা করি এ- কথা বলা অতিশয়োক্তি হবে না যে উপন্যাসটি পাঠক-পাঠিকা ও সমালোচকদের কাছে আশাতীত সমাদার লাভ করে।
‘উত্তম-পুরুষ’ এর প্রথম প্রকাশের সময় এখনকার যেসব পাঠক-পাঠিকা জন্মগ্রহণও করেন নি, বা করে থাকলেও যাঁদের বর্ণ-পরিচয়ও হয় নি, বা হয়ে থাকলেও যাঁদের গল্প-উপন্যাস ও কবিতা পাঠের বয়স হয় নি, তাঁদের অনেককেই কোনো কোনো উপলক্ষ্যে হঠাৎ এই প্রশ্ন করতে শুনিঃ ‘উত্তম পুরুষ’ সম্পর্কে এতো শুনেছি, কতো বইয়ের দোকানে খুঁজেছি, কিন্তু কোথঅও দেখি না কেন?
প্রশ্নটা তাঁরা করতেই পারেন। কারণ প্রথম মুদ্রণগুলো দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে যাবার পর, প্রায় পনেরো বছর হতে চললো, উপন্যাসটি আর পুনর্মুদ্রিত হয় নি। আজকের পাঠক-পাঠিকাদের এই বিশেষ কৌতূহলের একটি কারণ বোধ করি এই যে উপন্যাসটি ১৯৬১ সালে ‘আদমজী পুরষ্কার’ ও লাভ করে। এই সুদীর্ঘকাল পর ‘মুক্তধারা’-র উদ্যোগে বইটি আবার আজকের পাঠক-পাঠিকাদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমিও আবার এই প্রথম দিনের আনন্দ লাভ করছি। একটি কথা বোধ হয় বলা দরকার।
ইংরেজিতে যাকে বলে পিরিয়ড-নভেল ‘উত্তম পুরুষ’ হচ্ছে তাই। একটি বিশেষ সময়কে এই উপন্যাসে ধরে রাখবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সময় স্থির হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। তবু বইয়ের পাতায় থাকে।
Rashid Karim was born in Kolkata, West Bengal in 1925. He did his BA from the Calcutta Islamia College (now Maulana Azad College), an affiliated college of the University of Calcutta. After the partition of the sub-continent in 1947, his family moved to Dhaka.
He began writing during the British period, continued during the Pakistan period but wrote his major novels during the Bangladesh period. It was in independent Bangladesh that his career as a writer reached its zenith. Rashid Karim penned his first story at the age of fourteen. So he began quite early. But his first story was published in 1942 in Mohammed Nasiruddin's Saogat. After that he did not write till 1961, when began the second phase of his writing career. His first novel Uttam Purush was published that year. It made him widely known and brought him the prestigious Adamjee Award. Two years later Prashanna Pashan instantly turned him into a major novelist of the Bengali language. Again he went into hibernation, this time for a decade. After the liberation of Bangladesh in 1971, he published his epic novel, Amar Jato Glani, in 1973. This novel helped his fame reach its peak. Till this period he was known as a gifted writer who wrote less but wrote very well. But from then on he wrote and published regularly. Prem Ekti Lal Golap was published in 1978.
Rashid Karim had battled paralysis for nineteen years before his death. He could not write a single word during that long period and died at Ibrahim Cardiac Centre in Dhaka on 26 November 2011.
"আমি সবসময়ই উত্তম পুরুষ। কিন্তু কাহিনীকার স্বয়ং যখন 'আমি' - তখন তাঁকে অধমও হতে হয়। তা না হলে হয়তো তার নিজের মর্যাদা থাকে, কিন্তু সত্যের থাকে না।"
রশীদ করীম পড়ে ক্রমাগত হতাশ হতে হচ্ছে। হতাশ হওয়ার কারণ এই না যে তিনি খারাপ লেখেন। আফসোসটা এখানেই যে তিনি যথেষ্টই ভালো লেখেন কিন্তু শেষদিকে এসে গল্প কেমন যেন পেঁচিয়ে যায়, পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। "উত্তম পুরুষ " এর তিন চতুর্থাংশের সঙ্গে "দুর্দান্ত, অসাধারণ, অনন্য" অনেক বিশেষণ যোগ করা যায় কিন্তু শেষটা এতো ম্রিয়মাণ, এতো তুচ্ছ যে বিশ্বাস হতে চায় না। প্রশংসা করার মতো বিষয়ের অভাব নেই এ বইতে। গত শতকের চল্লিশের দশকে কলকাতায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক,নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের যাপিত জীবন,নারীদের অবস্থা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক মন্দার অভিঘাত জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে রশীদ করীমের কলমে। কিন্তু উপসংহার সব বরবাদ করে দিলো। তীরে এসে তরী ডোবানো একেই বলে।
রশীদ করীমের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে।অর্থাৎ, পাকিস্তান শাসনামলে। প্রকাশকালটি উপন্যাসের কাহিনীর সাথে কোথায় যেন মেলবন্ধন ঘটাচ্ছিল।
আমাদের 'উত্তম পুরুষ' এর নাম শাকের। তিনি কলিকাতায় থাকেন। আসলে পুরো কাহিনীই বিভাগপূর্ব কলিকাতাকে ঘিরে। দেশভাগ দরজায় কড়া নাড়ছে, রাজনীতিতে মুসলিম লীগ নিজেদের দাবীকে বেশ বাঙালি মুসলমান মানসে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে। হিন্দু- মুসলমান দ্বন্দ্ব বেশ কল্কে পাচ্ছে।
শাকেরের সাথে ফুটবল খেলতে গিয়ে বন্ধুত্ব হয় অভিজাত পরিবারের মুশতাকের। শাকেরের বাবা নিম্নমাঝারি সরকারি কর্তা, আর মুশতাকের বাবা উচ্চপদস্থ। সেই পদের গৌরব রয়েছে তাদের পরিবারের সকলের। বিশেষত, মুশতাকের দু'এক বছরের বড় সেলিনার।
শাকেরের সাথে ঘটনাপ্রবাহে সহপাঠী শেখরের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে, বাড়িতে যাওয়াআসা থাকলেও ধর্মের গন্ডি পেরোয় নি সে সম্পর্ক।কেন শাকের আর শেখর, সলিলদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ রসায়ন হয় নি তার প্রেক্ষিতে ধর্মীয় সংস্কার আর জিন্নার পাকিস্তান দাবীকে উপজীব্য করে লিখতে চেয়েছেন। রশীদ করীমের শাকের এখানে কিন্তু মুসলিম লীগের কট্টর সমর্থক।
এদিকে, যে সেলিনা শাকেরকে গুণতির মধ্যেই ধরতে চাইত না;সেই শাকেরই যেন ঘটনাচক্রে নিজের বয়োজ্যেষ্ঠ আধুনিক সেলিনার কাছাকাছি চলে আসে। সেলিনা কিন্তু মনে রাখার মতই চরিত্র। সেই উপন্যাসকে পাল্টে দিতে পারে নাটকীয়ভাবে।
শেষে নিহার ভাবিই কম কিসে!
শেষ ভাল যার, সব ভাল তার। ঔপন্যাসিক রশীদ করীম বিভাগপূর্ব কলিকাতার হিন্দু- মুসলমানের সামাজিক অবস্থাকে দেখাতে অনেকগুলো নির্ণায়কের ইঙ্গিত করতে চেষ্টা করেছেন - তাতে অনেকটা সফল তিনি। কিন্তু -
লেখার গতি আর কাহিনীতে মাঝেসাঝে নাটুকেপনা ঢুকে যাচ্ছিল। তাই বিরক্ত হতে গিয়েও শেষপর্যন্ত পুরো হতাশা এনে দেননি রশীদ করীম।
সময় টা টালমাটাল! ঠিক দেশ ভাগের আগের ঘটনা । ছোট্ট শাকের থেকে যুবক শাকের হয়ে ওঠার গল্প উত্তম পুরুষ। মধ্যবিত্ত পরিবার। পরিবারের কর্তা চাকরি করে দূর দেশে। ফলে শাকের বেড়ে খুব স্বাধীন ভাবে। উশৃঙ্খল ভাবে নয়।
সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের যা হয়,নুন আনতে পাত্তা ফুরোয়। শাকেরদের অবস্থা অতটা খারাপ ছিল না। চলনসই বলা চলে। কাজেই, সে দারিদ্র্যের ভয়াল থাবা থেকে সামান্য দূরে থাকলেও,দারিদ্র্য তাকে না ছুঁয়ে যায় নি। কষ্টে থাকলে অভিজ্ঞতা পাকা হয় সহজে,মানুষ চেনা কঠিন থাকে না। শাকেরের ক্ষেত্রে ও তা হয়। চারপাশ খুব অল্প বয়স থেকে সে বুঝতে শুরু করে। মেধাবী হওয়ার দরুন সব কিছু তার নখেদর্পনে থাকে,সহজে বুঝেও ফেলে।
অভাব মানুষের চরিত্রে দারুণ প্রভাব ফেলে কিন্তু শাকের এই দিকে বিপরীত। সে তার স্বভাব বা চরিত্র কুপথে গমন করতে দেয় নি। ফলে মানুষের চারদিকের অনাচার, শঠতা তাকে পীড়ন করে খুব। আঘাত পায় আবার মেনে নেয়। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তাকে করে অন্য শাকের!
রশীদ করীমের লেখা আগে পড়িনি। হয়ত পড়তে আরো দেরি হতো,যদি না পুরাতন বইয়ের দোকানে "উত্তম পুরুষ " সে দিন খুঁজে পেতাম।
রশীদ করীম সম্পর্কে আমার প্রথম মতামত,লেখকের লেখনী শৈলী দারুণ। ভীষণ ভালো লেগেছে। তবে উপন্যাস হিসেবে " উত্তম পুরুষ " আমার মেলোড্রামাটিক মনে হয়েছে। কিছু টা এলোমেলো তো বটেই। বইয়ে যে জিনিস টা খুব ভালো তা হচ্ছে, লেখক সময়টা কে আঁকতে পেরেছেন চমৎকার করে। তৎকালীন দেশ ভাগ নিয়ে মানুষের মনে বয়ে চলা উৎকণ্ঠা, তৎপরতা খুব অল্প হলেও, যা বলেছেন তাতে সময়টা কে বোঝা যায় ভালো। কিন্তু সেলিনা কে নিয়ে বেশি টানাটানি করার কারণে ই লেখাটা একটু হালকা হয়ে গেছে বলে আমার মনে হলো।
সর্বোপরি প্রথম রশীদ করীম পড়ার অভিজ্ঞতা ভালো। লেখকের লেখার ধরন টা বড্ড ভালো লেগেছে, আরো কিছু লেখা পড়া দরকার। পড়ব।
যিনি বলেন, তিনিই উত্তম পুরুষ। ব্যকরণের সংজ্ঞা বলে বলে, বক্তার নাম উত্তম পুরুষ। কিন্তু বক্তা কি বলেন? গল্প।
রশীদ করিম এখানে গল্প বলেছেন নিজ জবানীতে। দেশভাগ পূর্ব সময়ে কলকাতায় বসবাসকারী এক নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলমান বালকের গল্প। সব ক'টা বিষয়ই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শাকের নামে চরিত্রটি নিজ মুখে নিজের গল্প বলে। যে কিনা যাদুকরী ফুটবল খেলোয়াড় আর ফুটবল থেকেই গল্পের শুরু।
শাকেরের বাবা সরকারী চাকুরে, সাব ডেপুটি। কিন্তু তাদের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। কেননা পিতার পদটি সম্মানের হলেও মাইনেটা অতি স্বল্প। শাকেরের মাকে তাই শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে হয় না, কেননা থালে সব সময় শাকেরও জোগাড় থাকে না।
সেই বালক বয়স থেকেই শাকের জানে, জীবনটা তার সহজ না। তাই মুশতাক যতোই শাকেরকে স্বাভাবিক বন্ধু বানাতে চেষ্টা করুক, শাকের সহজ হতে পারে না। মুশতাকের বোন সেলিনা, তা আরও হতে দেয় না। কিশোর থেকে যুবক হয়ে উঠতে থাকা শাকেরের আত্মসম্মান, পৌরুষ, সবখানে সেলিনার নির্মম আক্রমন। এমনকি সেলিনার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটা জানার পরও।
ওদিকে বিভাগ-পূর্ব কলকাতায় একটা মুসলিম কিশোরের জীবন কেমন? যদিও তার বেশিরভাগ বন্ধু হিন্দু, এবং তাদের কারও জন্য নিবেদিত, তবু বন্ধুর বাড়িতে তার ভাত কিংবা পানি খাওয়া বারন। হয়তো বন্ধু পরিবারটির চরম দারিদ্র্যে শাকেরই সহায়, তবু তাকে সরে সরে থাকতে হয়। এবং সময়ের সাথে যুবক শাকের যদিও মুসলিম লীগের ঘোর সমর্থক হয়, কিন্তু বন্ধুত্ত্বে তার খাদ জমেনি।
ভাষা এবং গল্পের নির্মানে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন রশীদ করিম। শাকেরের বাল্য, কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পনের সেই জটিল ঘুর্ণাবর্তের ছবি এঁকেছেন তিনি। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে সমাজ, সময়, সম্পর্কের নানান আখ্যান। কিন্তু, কিছু চরিত্রের কোন প্রয়োজন ছিল না। কেন এবং কী কারনে তাতের সৃষ্টি, তা লেখক ভালো জানেন।
তবে এটা কী লেখকের নিজের গল্প? হওয়া প্রয়োজন নেই। নিজের গল্প না হলেও উ��্তম পুরুষে বয়ান করা যায়। যে গল্প, গল্পের চরিত্রের নিজের সে গল্পের বয়ান উত্তম পুরুষে হওয়াই উচিত।
শাকেরের বাবা মাদারিপুরের একজন সাব ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। শাকের তার মা আর দুই ভাই কে নিয়ে কলকাতায় থাকে। তখনকার সময়ে ম্যাজিস্ট্রেটরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যে খুব স্বচ্ছল ছিলো না এইখানে শাকেরের পারিবারিক অবস্থা দেখলে তা কিছুটা আন্দাজ করা যায়। উত্তম পুরুষ শুনলে একটা দ্বিধা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে কারণ বাংলা অভিধানে উত্তম পুরুষের দুইটা অর্থ আছে - এক হলো উৎকৃষ্ট আর দুই হলো যে নিজের সম্বন্ধে বলে aka first person. উপন্যাস পড়লে দ্বিধা দূর হবে এরকম নিশ্চয়তা দিতে পারি নে। তবে এইটুকু বলতে পারি যে লেখক রশিদ সাহেব উপন্যাসের মূল চরিত্র শাকের কে মনের মাধুরি মিশায়া অপমান করার চেষ্টা করেছেন। কখনো তার উপকরণ ছিলো দারিদ্রতা, কখনো অতিরিক্ত বিশ্বাস, কখনো ভালোবাসা আবার কখনো বন্ধুত্ব...
একটা মহান উক্তি দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না---- ″ অওরাত কা চাক্কার বাবু ভাইয়া, অওরাত কা চাক্কার "
১৯৪০ দশকের কলকাতা। দেশভাগের ডামাডোল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ আর দুর্ভিক্ষের এই সময়টাতেই বেড়ে উঠেছে শাকের। মধ্যবিত্ত এক মুসলিম পরিবারে ভালোই কাটছিল তার দিনকাল কিন্তু যখন ফুটবল খেলার সূত্রে মুশতাকের সাথে পরিচিত হলো এবং স্কুলে ভর্তি হলো তখন সে সম্মুখীন হলো অন্য এক বাস্তবতার যেখানে আর্থিক অবস্থা নিযে তাকে লজ্জিত হতে হলো, নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য লুকিয়ে থাকতে হলো। সংকটটা আরও ঘনীভূত হলো যখন মুশতাকের বোন সেলিনার তীব্র কটাক্ষ আর তার চরিত্রের এক অন্ধকার দিক জানার পর দুজন কাছাকাছি এলো, জড়িয়ে পড়ল এক নামহীন সম্পর্কে। উত্তাল সময়ে কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখা শাকেরের সে এক উত্তাল সময়।
উপন্যাসের একটা উপশাখা হলো ‘ পিরিয়ড নোভেল' যেখানে লেখক ইতিহাসের কোনো এক বিশেষ সময়ের আচার-আচরণ, প্রথা, রীতিনীতি, সংস্কার, টানাপোড়েনকে কল্পিত কিছু চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন। ‘ উত্তম পুরুষ ‘ তেমনই একটা ‘ পিরিয়ড নোভেল' যেখানে রশীদ করিম দেশভাগ-পূর্ব সময়ের কলকাতার মুসলমান সমাজের এক চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। একদিকে যেমন এসেছে দেশভাগ নিয়ে মাতামাতি, বাংলার দুর্ভিক্ষ তেমনি এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবের কথাও। এসেছে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কথা, আবার স্থান পেয়েছে অর্থের কাছে শুদ্ধতাবাদী ধর্মের পরাজয়ের কথাও। অর্থাৎ বলতে গেলে বইটার নায়ক শাকের নয় বরং সময় যে চালিত করেছে শাকেরদের।
অন্যদিক থেকে গল্পটা শাকেরের। প্রথমদিকে উঠে এসেছে তার বড় হওয়া আর শেষদিকে যৌবনের উত্তাল সময়ের কথা। দ্বিজাতিতত্ত্বে গভীর বিশ্বাসী শাকের একদিকে যেমন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য সরব দাবি করেছে অন্যদিকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে লড়াই করেছে জীবনের দাবির বিরুদ্ধে। তার মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন সেই সমযের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের কথা ; আপ্রাণ চেষ্টা করে পরীক্ষার ফি জোগাড় করে দেওয়া বন্ধুর ঘরে ঢুকতে না পারা, মুসলমান হওয়ায় বাঙালি নয় বলে কথা শোনা, তার পোশাক কোনো পোশাক নয় এমন কথা শোনা ইত্যাদি। আর অন্যদিকে শাকেরের ব্যক্তিগত জীবনের দ্বন্দ্বও এসেছে সমানতালে। দরিদ্র হওয়ার হীনমন্যতা, মুসলমান হওয়ার হীনমন্যতা, সেলিনা দ্বারা প্রতারিত হওয়া, চন্দ্রার দিকে এগুতে চেয়েও এগুতে না পারা, নিহার ভাবির সামনে আবেগী হয়ে পড়া ইত্যাদি। সেলিনা চরিত্র ভীষণ উপভোগ্য একটা চরিত্র ছিল ; প্রথমদিকের অহংকারী সেলিনা থেকে মাঝের দুর্দশাগ্রস্ত ও আবেগী সেলিনা আর শেষদিকের কূটকৌশলী সেলিনা – বিশেষ নজর কেড়েছে চরিত্রটা।
বেশ উপভোগ করেছি বইটা, একটা সময়কে যেন চোখের সামনে দেখা। সাথে লেখকের চমৎাকার বয়ান আর খুঁটিনাটি বর্ণনা বইটার স্বাদ আরও বাড়িয়েছে। তবে কিছুটা অভিযোগ আছে শেষটা নিয়ে। হঠাৎ করে শেখরের পুরো পরিবারের ওমন নৈতিক স্খলন বা নিহার ভাবির ওমন অদ্ভুত আচরণ ঠিক হজম করতে পারি নি। দু-একটা জায়গা বাদ দিলে, পুরো বইটা চমৎকার ছিল। রিকমন্ডেড!
গদ্যের নির্মাণশৈলী পাঠক কে মুগ্ধ করলেও বর্ণনার প্রবাহ একমুখী, মনে হবে সবাই একি ভাবে সংলাপ বলে যাচ্ছে। এ কারণেই প্রধান দুইটা বা তিনটা চরিত্রের বাইরের কোন চরিত্রের মাঝে যেমন আলাদা করে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়না, তেমনি মনে হয় এই চরিত্রগুলোর প্রয়োজনীয়তাই বা উপন্যাসে কতটুকু?
উপন্যাসের গতি কখনো থমকে থাকেনি, সব সময় চলমান। একি ভাবে উপন্যাসে পাওয়া যাবে ছোট খাট অনেক ঘটনা বা সময়ের বিস্তারিত বর্ণনা। তৎকালীন সামাজিক জীবনে হিন্দু-মুসলিম পারষ্পারিক মনোভাব দেখানোর পাশাপাশি দেখানো হয়েছে মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের জীবন আলেখ্য। উত্তম পুরুষ এখানে পুরুষের বিশেষন নয়, সর্বনাম (First Person)। উত্তম পুরুষ গত শতাব্দীর বাঙালি মুসলমান সমাজের যাপিত জীবনের দলিল। তবে দলিল সম্পূর্ণ নয়, আংশিক বা খন্ডিত।
নিঃসন্দেহে রশীদ করীমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম উত্তম পুরুষ।
যু দ্ধ সবসময় আতঙ্কের এক বিষয়, যা মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযু দ্ধের খবর বাতাসে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আতঙ্কে দিন পার করছে কলকাতাবাসী। এই বুঝি বো মা এসে পড়ে তাদের উপর! এমন অবস্থায় দেশে যেমন দুর্ভিক্ষের আনাগোনা— মানুষ ঠিকমতো খেতে পারছে না, জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকা দায়! ঠিক তেমন করে আলোচনা হচ্ছে দেশভাগেরও। হিন্দু ও মুসলিম দুই জাতিসত্তা, যা কখনো একসাথে মেশে না। একই সাথে কত থাকা হলো, একসাথে কত আলাপন, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসব-আয়োজন; তবুও তারা এক হতে পারবে না। কারণ, ধর্ম তাদের আলাদা করে তুলেছে। এক ভূখণ্ডে থাকলেও কখনোই তারা এক হতে পারে না। যতই ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকুক, জোরালো অনুভূতি থাকুক; দিন শেষে দূরত্বই তাদের সামনে অবধারিত। যে বিষয় একটি বিশাল ভারতবর্ষকে দুইভাগে ভাগ করার ভবিতব্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
তবে এত কিছুর আগে থেকেই আমাদের গল্পের সূচনা হয়েছে। এ গল্পের মূল নায়ক শাকের। যার উত্তম পুরুষের বয়ানে যে গল্পটা আমরা জানতে পারি। শাকের বা তার পরিবারকে মধ্যবিত্ত বলাই চলে। তার বাবা খুবই সাধারণ সরকারি চাকরি করেন। থাকেন পরিবার থেকে দূরে। মা, বড় দুই ভাইয়ের সাথে কলকাতায় শাকেরের বাস। খুবই কষ্ট করে দিন কাটাতে হয় শাকেরের পরিবারকে। এক সময় তো পড়াশোনাও হয়তো হবে ��া বলে ভেবে নেওয়া হয়, কিন্তু তারপরও কোনমতে চলে যায়। স্কুলে ভালো ছাত্র শাকের পড়াশোনা করে ধাপে ধাপে উন্নতি করে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও জবরদস্ত শাকের।
গল্পের শুরুটা একটা ফুটবল ম্যাচের। লেখকের দুর্দান্ত বর্ণনা ও শাকেরের খেলার মধ্য দিয়ে কার সূচনা। এখানেই পরিচয় হয় মুশতাকের সাথে। সেখান থেকে তার পরিবারে আনাগোনা। কিন্তু একটা বিশাল বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় আর্থিক প্রতিপত��তি। অভিজাত মুশতাকের পরিবারে তাই আড়ষ্ট এক অনুভূতি মনের মধ্যে জমা হয়। মুশতাকের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। অন্যদিকে সবাই সেটা মানবে কেন? মুশতাকের বোন সেলিনার কথাই ধরা যাক! বড়লোকের পরিবারের বড় সন্তান। কিছুটা ঔদ্ধত্যও বটে। ফলে শাকেরকে ছোটো করতেও দ্বিধা করে না।
রশীদ করীমের লেখা এর আগে না পড়লেও বইটা সম্পর্কে জানাশোনা ছিল। পড়লাম, মুগ্ধ হলাম। লেখনশৈলী নিয়ে বলার কিছু নেই। ভাষাগত দক্ষতা খুবই দারুণ। ভাষার এই দক্ষতাকে আমি দুইভাগে বিচার করি। প্রথমভাগে কঠিন কঠিন শব্দচয়নে পাঠকের মনে মুগ্ধতা ছড়ানো, অন্যদিকে খুব সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে বর্ণনা করলেও শব্দের গাঁথুনিতে মাধুর্যতা রাখা। রশীদ করীম দ্বিতীয় অংশের লেখক। তার ভাষা খুবই সাবলীল, বর্ণনা দারুণ, গতিশীল গল্প বলার ধরন বেশ ভালো লেগেছে। লেখায় একরত্তি মেদ নেই। গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই যেন বর্ণনা করেছেন।
এক্ষেত্রে একটি সমস্যার লক্ষ্য করেছি। আমি বরাবর মেদহীন লেখা পছন্দ করি। লেখকের লেখা সে কারণে ভালো লেগেছে। মেদহীন রাখতে গিয়ে কিছু জায়গায় ঘটনা এত বেশি সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল, ফলে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল আসলে কী হচ্ছে। এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল কিছু ঘটনা। একটু বর্ণনার আশ্রয় নিলে ক্ষতি হতো না। লেখকের লেখায় একটা বিষয় লক্ষণীয়। তিনি কিছু ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করেন, সরাসরি উল্লেখ না করেই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেন। পাঠক তার পাঠের মধ্য দিয়ে বুঝে নিবে আসলে কী হচ্ছে। কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ঘটনা এসেছিল গল্পের প্রয়োজনে, লেখক সেখানে সরাসরি বর্ণনার আশ্রয় নেননি। বর্তমানের অনেক লেখক রং চড়িয়ে সেগুলোর যে আদল দিতেন, ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। অথচ লেখক কী সাবলীল, অবলীলায় কিছুই বর্ণনা না করে ঘটনাপ্রবাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন।
আমার সবচেয়ে দুর্দান্ত লেগেছে উপমার ব্যবহার। কিছু অংশে লেখক এমন সব উপমার ব্যবহার করেছেন, পড়তে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছি। যেন চোখের সামনে দৃশ্যপট উন্মুক্ত হয়েছে, ঘটনাগুলো এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে প্রকৃতি, রাতের পরিবেশ লেখকের লেখার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছিল। তবে একটু নাটুকে দৃশ্য অবশ্য ছিল বিভিন্ন অংশে। যা কমিয়ে রাখতে পারলে আরও বেশি ভালো লাগত। একটি বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে সেই অংশগুলো।
লেখক মূলত সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি শাকেরের জীবন দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। তৎকালীন সময়ে হিন্দু, মুসলমানের যে বিভেদ তা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। বিশেষ করে কলকাতার মতো শহরে মুসলমানদের অবজ্ঞা করা হতো রীতিমত। তাদের সাথে একই বাটিতে খাবার খেলে জাত চলে যাবে, মুসলমান পরিবারের ছেলেকে বাসার ভেতরে ঢুকতে দিলে, নিজেদের ব্যবহৃত পেয়ালায় চা দিলে নিজেরাই অচ্ছুত হয়ে পড়বে। যদি দেওয়াও যায়, তাহলে সেই কাপ-বাটি ফেলে দিতে হবে। সেই সমাজে হিন্দুদের চিন্তাধারা ছিল এমনই। অবশ্য শুধু মুসলমানদের সাথেই নয়, হিন্দুদের মধ্যেও কি ভেদাভেদ কম আছে?
মুসলমানদের অবজ্ঞা করার আরো বিষয় আছে। হিন্দুশ্রেণী মনে করত, মুসলমানরা শিক্ষিত হতে পারে না। স্কুল কলেজে তাই মেরিট লিস্টে হিন্দুদের নাম। কিন্তু যখন কোনো মুসলমান লিস্টে চলে আসে, তখন সেই স্কুলের মুসলিম শিক্ষকের যে আনন্দের সীমা থাকে না। তাছাড়া মুসলমানদের কথাতেও তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। অনেকে এসবের সাথে মানিয়ে নিতে পারত না। তাই সংখ্যালঘুদের একটু মাথা নত করতেই হতো। হিন্দুয়ানী সমাজের মতো করে চলতে হতো, কথা বলতে হতো। শুধু সমাজে নিজের অবস্থান পাঁকা করার জন্যই। এই বিভক্ত সমাজের রূপরেখাটাই লেখক যেন তুলে এনেছেন।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে, মুসলমানদের শক্তিশালী দিক তুলে আনতে লেখক যে যুক্তিতর্কের অবতারণা ঘটিয়েছেন। হিন্দুরা মনে করত, এই ভারতবর্ষ কেবল তাদের। তাই দেশভাগের বিরুদ্ধে তারা ছিল। অথচ যে মুসলমান সমাজে অবজ্ঞার শিকার হয়েছে, তাদের কাছে নিজস্ব ভূখণ্ড পরম চাওয়া। দুইশ বছর ব্রিটিশরা যে শাসন করে গিয়েছে, তার মূলেও ছিল হিন্দুরা। হিন্দু জমিদার, রাজারা আমন্ত্রণ না জানালে ব্রিটিশদের এই শাসন সম্ভব হতো কি না তাও একটা প্রশ্ন। এছাড়া বিখ্যাত সব সাহিত্যিকদের মুসলিম জাতির প্রতি অবজ্ঞাও লেখক তুলে ধরেছেন।
তখন যেহেতু বিশ্বযু দ্ধ চলছে, এর আঁচ লেগেছে কলকাতাতেও। শঙ্কায় কাটে, কখন বো মা আছড়ে পড়ে এখানে। দুর্ভিক্ষ লেগেছে, অনেকেই পেট পুড়ে খেতে পারে না। এ যেন অভিজাত ও নিচু শ্রেণীর পার্থক্য সামনে এনে দেয়। একদিকে বড়লোকের মেয়ের জন্মদিনের আয়োজন, অন্যদিকে অভুক্ত শ্রেণীর খাওয়ার আশায় মিষ্টির দোকান লুট করে। তাতে বড়লোকদের যায় আসে না। অন্যদিকে গরীব শ্রেনী অনাহারে থেকে একটু খেতে পেলেই বর্তে যায়।
বইটা যেন ভাতৃত্বের এক অন্যতম নিদর্শন। আর্থিক দিক দিয়ে পার্থক্য থাকলেও মুশতাকের সাথে শাকেরের সম্পর্ক বেশ ভালো লেগেছে। অন্যদিকে ধর্মের ভেদাভেদ থাকার পরও শেখর আর শাকেরের যে সম্পর্ক, তাও দারুণ। বন্ধুত্ব তো এমনি হয়, যেখানে কোনো বিভেদ বাঁধা হতে পারে না। এখানে সন্তানদের নিয়ে মায়ের লড়াইটাও মুখ্য। গরীব অবস্থা সন্তানের হীনমন্যতার কারণ হলেও, মায়েরা সবকিছু মেনে নিয়েই জীবন পার করে দেয়। মায়ের সাথে ছেলে-মেয়েদের এই বন্ধন খুব দৃঢ়। অন্যদিকে বাবার সাথে সম্পর্ক হয় শীতল। ভালোবাসার কথা বলা যায় না। কেমন যেন দূরত্ব তৈরি করে। হয়তো বাবাদের গাম্ভীর্য এখানে দায়ী।
এই উপন্যাসে অনেক বেশি চরিত্রের আনাগোনা ছিল। কিছু চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিছু চরিত্র আবার ঘটনা প্রবাহে গুরুত্ব পেয়েছে। পরে আবার হারিয়ে গিয়েছে। তিনটা ভিন্ন নারী চরিত্রের কথা এখানে বলা যায়। চন্দ্রা, সেলিনা কিংবা নিহার ভাবী। প্রতিটি চরিত্র ভিন্ন, স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল। প্রয়োজনের তাগিদে তাদের অনুভূতি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। চন্দ্রার যে পরিস্থিতি এখানে বর্ণিত, তা হয়তো তার ভবিতব্য-ই ছিল। কেননা যার বাবা উপকারীর উপকার স্বীকার না করে অঘটন ঘটিয়ে উধাও, তার কী-ই বা করার আছে?
সেলিনা চরিত্রটি বেশ ইন্টারেস্টিং। নারীদের ছলনার কাছে একজন ছেলে অসহায় হয়ে পড়ে। তারই চিত্র যেন সেলিনা। যার ছলনায় এমনভাবে ডুবে যেতে হয়েছে, শেষটা তাই ভুল করেও তার অনুভূতি শূন্য। কেননা নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে ভুল করলে দোষের হয় না। অন্যদিকে নিহার ভাবী একাকীত্বকে এমনভাবে বরণ করেছেন, কাউকে দরকার কথা বলার জন্য। একটু শপিং কিংবা রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করে খাওয়ার জন্য। তিন নারী চরিত্রের ভিন্ন রূপ গল্পে যেমন প্রাণ দিয়েছে, একটু বিরক্তির কারণ হিসেবেও থেকে গিয়েছে। না সামাজিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে রচিত উপন্যাসে এরূপ প্রেম বা নারী চরিত্রের সাথে নাটুকে ভাব খুব একটা পছন্দ হয়নি।
সমাপ্তি আরেকটু ভালো হতে পারত মনে হয়। তবে এভাবে দেখতে পারলে ঠিকঠাক লাগে, আমাদের জীবনের গল্প তো শেষ হবার নয়। কোনো এক সময় ঘটনায় পজ হলেও আবার চলতে থাকে আপন ধারায়। এই থেমে যাওয়া গল্পকে একটা উপন্যাস ধরে নেওয়া যায়। একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে খচখচ করছিল। কেন সেলিনা এমন করল, তার উত্তর একদম শেষ পৃষ্ঠায় দেওয়া আছে। এখানে যেমন শাকের থমকে গিয়েছিল, থেমে গিয়েছিল তার এক জীবনের গল্প। হয়তো পরবর্তীতে আবার কোনো গল্পে শাকের আসবে। ভিন্ন ভিন্ন কিছু ঘটনায় তখন আবারো উপন্যাস হবে।
শাকেরের বয়স বেড়ে যায় কেউ তাকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা মাথায় আনে না।হঠাৎ করে যখন একদিন স্কুলে যাওয়া সৌভাগ্য হয় তখন ভর্তি হয় ক্লাশ সিক্সে।সেই থেকে ঘরের বাইরে জগত সম্পর্কে জানা শুরু।ফুটবল খেলার মাধ্যমে বন্ধুত্ব হয় ধনী মুশতাক ও সেলিনার সাথে।কিন্তু বন্ধু হওয়ার পর শাকের প্রথম বুঝতে পারে তারা কত গরীব। অর্থের অভাবে শেখর মেট্রিক পরীক্ষা দিতে পারছে না,শাকের ঠিকই সেটা খেয়াল করে টাকা জোগাড় করে আনে নিজে জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার বিক্রয় করে।বন্ধু সলিলের অর্থ খরচের বেহিসাবিপনা আর ধর্মের প্রতি উদারতার মধ্যেও শাকের তার মতলব টের পায়।চন্দ্রা হিন্দু শাকের মুসলিম হলেও যে বলে," আমার বিপদে তোমাকে ডাকলে সাড়া দিবে তো" এই আকুলতায় যে পরম নির্ভরতা তা শাকের বুঝে, রাখী বেঁধে ভাই বানানোতেই তা আরো দৃঢ় হয়।সেলিনা বয়সে ছোট শাকেরকে হঠাৎ প্রেমে পড়ার কথা বলা,পালিয়ে বিয়ে করার পরিকল্পনা করা,দেশের অসন্তোষজনক অবস্থা সবকিছুই শাকেরকে আয়নাতে একজন উত্তম পুরুষের চোহারা দেখায়।
উপন্যাসের ভিতরে আপনি লেখকের অস্তিত্ব টের পাবেন।তিনি নিজেই চরিত্রকে বহন করে নিয়ে গেছে।মূল চরিত্র "শাকের" এর প্রতিটি গল্প বলায় আপনি লেখকের মনোভাবকে উপলব্ধি করতে পারবেন।
শাকের মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের ছেলে।তার পরিবারে মা, বাবা ও তারা তিন ভাই।সব ভাই লেখাপড়া করে।পুরো উপন্যাসে রহস্যজনক চরিত্র শাকেরের মেজ ভাই।হঠাৎ সমাজের চাপে অত্যন্ত পড়ুয়া মেধাবী মেজ ভাইয়ের মধ্যে উন্মাদনা দেখা দেয়।কিন্তু সে যে মানসিক কষ্টে আছে, ধর্ম আর সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে সেই পুরোটাই উপন্যাসের রুপ।
ধনীলোকের প্রদর্শন করা মানসিকতাও দেখা মিলে মুশতাক ও তার বোন সেলিনার মধ্যে।উপন্যাসে সেলিনা সুন্দরী, শিক্ষিতা,রুচিবান ধনী মুসলিম ঘরের মেয়ে।হিন্দু ছেলের প্রেমে পড়ে কিন্তু সে ছেলে তার সাথে যে প্রতারণা করে তার সবটুকু জানে একমাত্র শাকের।শাকের বয়সে ছোট তাও শাকেরের সাথে যে প্রেমের বন্ধনের ছবি ফুটে ওঠে তা শিহরিত হওয়ার মত।
শাকেরের হিন্দু বন্ধু শেকর, সলিল এরা ছিল সমাজে অংশ।দেশভাগের ফলে সবার জীবনের পরিবর্তনই ছিল সমাজের বাস্তব চিত্র। শেকরের পরিবারের পরিবর্তন থেকে বুঝা যায়,অর্থ সকল অশান্তির মুক্তি নয়,বরং মানসিক শান্তির জন্য অর্থ নয়,দরকার নিজস্বতার মুক্তি।
উপন্যাসের শাকের যে সত্যিই উত্তম পুরুষ সেজন্যই বোধ হয় নিহার ভাবীর সাথে এত সখ্যতা দেখানো হয়েছে।এতে শাকেরর প্রতি একটা উদার মানসিকতা তৈরি হয়।
দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেশ ভাগ কলকাতা শহরের স্বল্প সংখ্যক মুসলিমের উপর যে প্রভাব ফেলে তা সুন্দর ফুটে উঠে।
শুধু জাতীয়তাবোধই মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস করে না,অর্থের মাধ্যমেও মানুষের শ্রেনীবিন্যাস হয়।অর্থের সাথে মানুষের চাওয়া পাওয়াগুলো কিভাবে পরিবর্তন হয় বা পূর্ণতা পায় শাকেরের মনস্তাত্ত্বিক উপস্থাপনে সেটা বুঝা যায়।
শেষ করলাম এই মহান গ্রন্থ। পড়বো পড়বো করেও প্রায় দুই বছর লেগে গেল কিন্তু পড়তে লাগলো একটা দিন, এতদিনের অপেক্ষা এত অল্পে শেষ হয়ে যায় মানতে পারি না। দেশভাগের অব্যবহিত পূর্বের সময়কে লেখনীর কালিতে আবদ্ধ করা হয়েছে। দেশভাগের যত উপন্যাস (আগুনপাখি ব্যতীত) পড়েছি তা সবই হিন্দু সম্প্রদায়ের লেখকদের। শেখরের সাথে শাকেরের বন্ধুত্বই অসাম্প্রদায়িকতার এপিটমি, এটাই কাম্য। বাংলাদেশে এটাই বিরাজ করুক। আরেকটি কথা না বললেই নয়, শেষে এসে সেলিনা শাকেরের কাছে একটি রহস্য উন্মোচন করে, যা আমাকে থ্রিলের পরশ দিয়েছে, আমি ভেবেছিলাম লেখক আর সেলিনাকে আর আনবেন না যেহেতু শাকের আরেকজন সঙ্গী ইতোমধ্যে পেয়ে গেছিলো। যাইহোক, পড়ে ভালই লাগলো।
গল্পটা কি সেটা মুখ্য না। গল্পটা কিভাবে সেটা মুখ্য। উপন্যাসের ভাষাটা দূর্দান্ত। একদিনে পড়ে শেষ করলাম। রশীদ করিমের জীবনী পড়েছি। এক অমূল্য রত্ন বাংলা ভাষার। এবং অবশ্যই, অনাদৃত।
2025 সালে তার জন্মশতবার্ষিকী। বাংলা ভাষার সাহিত্য যাদের ভালোবাসা, তাদের রশিদ করিম পড়তেই হবে।
"বিচিত্র মানব মনের গতি। বিচিত্রতর দরিদ্র-সন্তানের মনস্তত্ত্ব। বহির্বিশ্বে বেড়ে উঠবার সব পথ রুদ্ধপ্রায় দেখে অন্তর্লোকে তার পরিণতিটা কত দ্রুতই না আসে।"
ভালো লেগেছে এই লাইনগুলো: অতীতের দিকে কিছুটা বিমোহিত দৃষ্টিতে ফিরে ফিরে তাকানো মানব চরিত্রের একটা পুরাতন দুর্বলতা। যে-কাল মহাকালের গর্ভে চিরকালের মত হারিয়ে গেছে, সেই সময়কার দুএকটি ক্ষুদ্র স্মৃতিখন্ড যখন চিত্তপটের উপর ছায়া ফেলে, তখন ছোট্ট একটি অশরীরী দীর্ঘশ্বাস বরঞ্চ অতীতের বন্ধন থেকে মুক্তিই এনে দেয়।
তৎকালীন মুসলমানদের সেন্টিমেন্ট এর সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা পেয়েছি এই বইটা পড়ে, তবে কাহিনী এর শেষটা ছিল খুব abrupt
This entire review has been hidden because of spoilers.
বন্ধু 'অপু' একরকম জোর করেই পড়িয়েছিল। রহস্যরোমাঞ্চ টাইপ বইয়ের ভিড়ে এই বই দেখে মুখ পানসে হয়ে গিয়েছিল। নিমরাজি হয়ে দু'পাতা পড়তেই ম্যাজিক। এক বসাতেই শেষ করেছিলাম।