প্রখ্যাত ঐতিহাসিক এবং বিশিষ্ট সাহিত্যবোদ্ধা নীহাররঞ্জন রায় নয়া দিল্লি থেকে রমাপদ চৌধুরীকে লিখেছিলেন ‘আপনার বিষয়াশ্রয়, বিন্যাসের পরিপাট্য, নির্মাণদক্ষতা, ভাষার স্বচ্ছ ও সাবলীল গতি এবং জীবনের মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস, সব কিছুকে আপনি একসঙ্গে বুনেছেন অপরিসীম নিপুণতায়।...বস্তুত, আমি আপনার অনেক অনুরক্ত পাঠকের অন্যতম।’ সতেরোয় শুরু, পঁচিশে প্রতিষ্ঠিত, তিরিশের আগেই বিখ্যাত লেখক রমাপদ চৌধুরী ১৩৫০ থেকে আজ অবধি পঞ্চান্ন বছর ধরে লিখে গেছেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো প্রায় দেড়শো ছোট ও বড় গল্প। তাঁর সাতাত্তর বছরের জীবনে লেখা যাবতীয় গল্পের অখণ্ড সংগ্রহ এই গল্পসমগ্র। দুই মলাটের মধ্যে তাঁর একান্ত আপন জগৎ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে রাখা অর্ধ শতাব্দীর বাঙালি জীবনের নিটোল প্রতিবিম্ব। যা একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছে সমগ্র মধ্যবিত্ত জীবনের এপিক চলচ্চিত্র। অনেক জরুরি বিষয়ের দিকেই তিনি দৃষ্টি ফেলেছেন, বক্তব্যে তাই তিনি কখনও কখনও অস্বস্তিকর। নতুন স্বাদ, বিষয়বৈচিত্র্য, নিত্যনতুন আঙ্গিক এবং ভাষার ঐশ্বর্যে তিনি তুলনারহিত। এই সংগ্রহে আছে তাঁর ১৪৪টি গল্প। এতগুলি বিখ্যাত গল্প সেই একই কলম থেকে এও কম অবাক হবার মতো ঘটনা নয়। একই লেখক উপহার দিয়েছেন দরবারী বা রেবেকা সোরেনের কবর, আমি, আমার স্বামী ও একটি নুলিয়া, ফ্রীজ বা বসবার ঘর, একটি হাসপাতালের জন্ম ও মৃত্যু বা চাবি, আপট্রেন, বড়বাজার, আবার একই কলম থেকে ভারতবর্ষ বা বুকের মধ্যে ভূমিকম্প, কিংবা প্রদত্তার নগ্নদেহ, কাল আয়ো। বারবার তিনি ভেঙেছেন এবং গড়েছেন গল্প বলার রীতি। অথচ সব সময়েই তিনি আপন কালের মানুষের সঙ্গী। তাই বাংলা ছোটগল্পে তিনি একাই এক আন্দোলন।
রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।