আনন্দগোপাল তাঁর কৈশোরে, যৌবনে বাবা-মা, বড়দি-মেজদি, দুই জামাইবাবু, ভাগ্নে-ভাগ্নিদের নিয়ে যে-জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, তাকে মনে হত সুখের প্রবাহ। ছোট-ছোট দুঃখের ছায়া মাঝে মাঝে উঁকি দিলেও আনন্দগোপাল মনে করেছিলেন নিপুণ জীবনযাপনই সুখ। ভাল ছেলে হয়ে পড়াশোনা, ভাল রেজাল্ট, ভাল চাকরি, নির্মলার মতো ভাল বউ— এমনকী অফিস কলিগ নূপুরকে নিয়ে আলগা স্বপ্ন দেখা, সব কিছুতেই সুখের স্পর্শ। অথচ কোথায় যে নিদারুণ দুঃখ লুকিয়ে আছে তা আনন্দগোপাল স্বপ্নেও ভাবেননি। একমাত্র সন্তান সোনু, ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার পর আনন্দগোপাল আবিষ্কার করলেন সুখ আসলে জলছবি, কেবলই মুছে যায়। বরং অনাগত ভবিষ্যতের দিনগুলো ক্রমশ হয়ে ওঠে ভয়ংকর। সোনুর মতো একটি জীবন্মৃত ছেলেকে তাঁরা কার কাছে রেখে যাবেন? অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে বৃদ্ধ আনন্দগোপাল ও নির্মলা আজ অসহায়। দ্বিতীয় কাহিনীতে আর এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তন্ময় ও আশালতার জীবনে এল মিনু। ওঁদের একমাত্র নাতনি। এক নতুন আনন্দের অতল খনি। একটু একটু করে বড় হচ্ছে মেয়েটি। তাকে দেখে তন্ময়-আশালতার মনে পড়ে যাচ্ছে নিজেদের ছেলে-মেয়ের শৈশবের দিনগুলি। পুত্র এবং পুত্রবধূর সঙ্গে তাঁদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে নিয়ত। মেয়ে বিয়ের পরে দূরে চলে গেছে। এখন ওঁদের কেবলই মনে হয় নানা ভয় তাড়া করছে। সম্পর্ক হারানোর, পরিবার ভাঙার, চাকরি যাওয়ার, ভয় জীবনের, ভয় ভবিষ্যতের। এরই মধ্যে হঠাৎ ওঁরা ছেলের পদোন্নতি ও বদলির খবর পেলেন। মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে গেল তন্ময়-আশালতার সুখ-দুঃখের পৃথিবী। মিনু এবার চলে যাবে অজানা ভবিষ্যতে। তন্ময়-আশালতা মেনে নিতে পারেন না এই ভবিতব্য।
রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।
নিরবচ্ছিন্ন জীবনে অনেক কিছুই আমাদের একঘেয়ে হয়ে যায়। তখন আন্দাজ করতে পারা যায় না সুখ আর দুঃখের দিকগুলো। আনন্দমোহনের অভ্যস্ত জীবন যাপনে ছিল কেবলই ছোটো ছোটো সুখী মুহূর্তের সম্ভার। শেষ পর্যন্ত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন সে দেখে একমাত্র সন্তান সোনু আর পাঁচজন শিশুর মতো সুস্থ স্বাভাবিক নয়, তখন অনাগত ভবিষ্যতের চিন্তায় এক লহমায় বদলে যায় জীবনের জলছবি।