আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে তিন হাজার মাইল দূরত্বে থাকা দুটো মানুষের মাঝে বন্ধুত্বের বাহন হয়ে উঠে কিছু চিঠি আর বেশ কিছু পুরোনো বই। বিংশ শতাব্দীর মাঝের সময়ে যখন ইংল্যান্ডের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে,তখন লন্ডনের সেকেন্ডহ্যান্ড পুস্তকবিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘মার্কস অ্যান্ড কো.’-এর সুলভ মূল্যে বই বিক্রির বিজ্ঞাপন নজরে আসে নিউ ইয়র্কের চিত্রনাট্যকার হেলেন হ্যানফের। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফ্র্যাঙ্ক ডোয়েলের সাথে লেখিকা বই বেচা-কেনা সংক্রান্ত আলাপ সারতে পত্র-যোগাযোগ শুরু করলেও দীর্ঘ কুড়ি বছরের অসংখ্য চিঠি বর্তমানে তাদের বন্ধুত্বের অমূল্য স্মারক। দুটি দেশের সীমানা পেরিয়ে চিঠিগুলো আজও মানবতার উষ্ণতার জানান দিয়ে যায়। বন্ধুত্বের মাহাত্ম্য ধারণ করে চলা দুই বন্ধু এবং তাদের খুব কাছের মানুষদের মধ্যকার চিঠিগুলো ‘৮৪,চ্যারিং ক্রস রোড’ নামে এক মলাটে সুসজ্জিত হয়ে আসে ১৯৭০ সালে। আসুন,বন্ধুত্বের এই অমূল্য নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে রই। বন্ধু হয়ে বন্ধুর বিপদে-আপদে পাশে থাকার গল্প শোনা হোক আরো একবার।
পত্রোপন্যাসের প্রতি কেন জানি আমার সব সময়ই অন্য রকম এক দুর্বলতা কাজ করে। বুদ্ধদেব গুহর সবিনয় নিবেদন, কুমুর চিঠি কিংবা নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব বইগুলো যে কত্ত বার পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। হেলেন হ্যানফের ৮৪, চ্যারিং ক্রস রোড বইটার প্রতি আগ্রহটাও ঠিক এই কারণেই। চিঠির পর চিঠি লিখে ২০ বছরের বন্ধুত্বের এক মাইলফলক রচিত হয়েছে নিউইয়র্কের চিত্রনাট্যকার হেলেন হ্যানফ এবং লন্ডনের ফ্র্যাংক ডোয়েলের মধ্যে।
"যদি কোনোদিন চ্যারিং ক্রস রোডের ৮৪ নম্বরে যাও, তবে আমার হয়ে ওটাকে একটা চুমু দিও..."
বইয়ের এই শেষ লাইনটা পড়ার পর বুকের ভেতর যে হাহাকার তৈরি হয়, তা কোনো রিভিউ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। আজ লিখছি সাহিত্যের ইতিহাসের সুন্দর এক পত্রালাপের গল্প। দুই চিঠিবন্ধুর গল্প।
নিউ ইয়র্কের একজন লেখিকা হেলেন হ্যানফ এবং লন্ডনের একটি পুরনো বইয়ের দোকানের ম্যানেজার ফ্র্যাঙ্ক ডোয়েলের মধ্যে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলা চিঠিপত্রের একটি সংকলন। ১৯৪৯ সালে হেলেন যখন লন্ডনের ‘মার্কস অ্যান্ড কোং’ নামক দোকানে দুষ্প্রাপ্য বইয়ের খোঁজে চিঠি লেখেন, তখন থেকেই এই অদ্ভুত সুন্দর বন্ধুত্বের শুরু।
একটা বইয়ের অর্ডার দিয়ে শুরু হওয়া কিছু চিঠি যে ২০ বছর ধরে একটা আস্ত জীবনকে আগলে রাখবে, সেটা হয়তো হেলেন বা ফ্রাঙ্ক কেউই ভাবেননি।
বইটির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর সম্পর্কের রূপ বদল। পেশাদারী বই কেনাবেচার চিঠিগুলো কখন যে নিঃশব্দে গভীর বন্ধুত্বে রূপ নিল, পাঠক হিসেবে আপনি টেরই পাবেন না। হেলেনের চটপটে আমেরিকান হিউমার আর ফ্র্যাঙ্কের মার্জিত ব্রিটিশ রেসপন্স। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ পাঠ অভিজ্ঞতা।
কিছু বই থাকে যা শেষ করার পর মনে হয়, একটা আস্ত জীবন পার করে এলাম। এই বইটাও ঠিক তেমনই। এটি কেবল একগুচ্ছ চিঠির সংকলন নয়, বরং আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে বাস করা দুই অচেনা মানুষের হৃদয়ের সেতুবন্ধন।
এই ইন্সট্যান্ট ম্যাসেজিংয়ের যুগে বসে এই বইটা পড়লে বুঝা যায় একটা চিঠির জন্য অপেক্ষা করার মধ্যে কী তীব্র আনন্দ আর ব্যাকুলতা লুকিয়ে থাকে।
যাদের চিঠি পড়তে ভালো লাগে বা পত্রোপন্যাস তারা এই বইটা পড়তে পারেন।
১৯ শতকের গল্প।মোবাইল ছিল না।কোনো যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না।মানুষের সাথে যোগাযোগের উপায় চিঠি আদান প্রদান।তেমনি আমেরিকার হেলেন হ্যানফ চিঠি লিখেন ইংল্যান্ডের বুকশপ 'মার্কস এন্ড কোং' কে।সাধারণ একটি চিঠি।কয়েকটি বইয়ের নাম আর শর্ত জুড়ে দেয় বই হতে হবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর দাম হবে ৫ ডলারের ভিতর। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী ফ্র্যাংক ডোয়েল চিঠির জবাব দেন।বুক-পোস্টের মাধ্যমে বই পাঠিয়ে দেন।বই পেয়ে হেলেন মহা খুশি।এর পর হেলেন বই কিনতে থাকে।একসময় হেলেনের সাথে ফ্র্যাংক ও বুকশপের অন্যন্যা সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়।চলতে থাকে চিঠি আদান প্রদান।উপহার দেওয়া নেওয়া!
সব চিঠি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় নি।কিছু চিঠি গায়েব।তারা জানতোই না যে কখনো এই চিঠি মলাট বন্ধি হয়ে বইয়ে রুপ নিবে।
কাহিনীর শেষটাও বিষাদময়।চিঠি আদান-প্রদান,বই কিনা নেওয়া চলতে থাকে কুড়ি বছর।কখনো দেখা হয় নি তাদের।দেখা হওয়ার আগেই একজন চিরবিদায় নিলো।
অনুবাদ ছিল দুর্দান্ত।পড়ার সময় মনেই হয় নি অনুবাদ। সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি বই। বইপ্রেমিদের একবার হলেও পড়া উচিত।
"বই মেলতে নিলে আগের পাঠকের সবথেকে বেশিবার পড়া পাতায় বই নিজ থেকে মেলে যায়। হ্যাজলিট যে - বার হাতে পেলাম, বইটা মেলে ধরল তার 'আমার নতুন বই পড়তে বিরক্ত লাগে' পাতা, আর আমি কী করলাম জানেন? আগের সেই পাঠকের সমর্থনে রীতিমতো তারস্বরে চেঁচিয়ে স্লোগান দিলাম, 'কমরেড!' "
বইটির প্রতি পাতায় চিঠি। ঠিক যেন কোনো ডকুমেন্টরি। তবে কিছু চিঠি গায়েব। সব চিঠি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। তাই বলে পড়তে বা বুঝতে কোনো অসুবিধে হয়নি। বইয়ের শেষটা বিষাদময়। এই বইয়ে অনুবাদ ছিল দুর্দান্ত। এতো সুন্দর করে শব্দ পর শব্দ বুনে গেছেন, মনে হয়নি এটি অঅনুবাদিত বই।
সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি বই। বইপ্রেমীদের একবার হলেও পড়া উচিত।
দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা আন্তরিক বন্ধুত্ব, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং ভৌগোলিক দূরত্বের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে হৃদয়ের সংযোগের এক অনন্য দলিল ❝৮৪, চ্যারিং ক্রস রোড❞।
এই এক পত্রোপন্যাস। কোনো নাটকীয় ঘটনা বা গভীর কাহিনী নয়— তবু পাঠ শেষে এক ধরণের শূন্যতা, প্রশান্তি ও অনুভূতির ভার অনুভব হয়। হেলেনের সপ্রতিভ লেখনী ও চরিত্রগুলোর আন্তরিকতা বইটির প্রতি ভালোবাসায় বাঁধে।
• প্রিয় অংশ- ❝বইয়ের পুস্তানিতে না নিয়ে আলাদা করে কার্ডে লেখার ঝক্কি পোওানোর কোনো দরকার ছিল না। যদিও মনে হয় আপনাদের বইবিক্রেতা সভা বইতে কোনো খুঁত হয়ে যাওয়ার ভয়ে কাজটা করতে পারেনি। কিন্তু যদি করতেন, সেটা খুঁত নয়, বরং বর্তমান মালিকের জন্য তা অমূল্য অলংকরণ হয়ে রইত। (হয়তো ভবিষ্যৎ মালিকের ব্যাপারেও কথাটা খাটে। পুস্তানির সাদা পৃষ্ঠায় লেখা উৎসর্গ, মার্জিনে ছোটোখাটো মন্তব্য, এসব আমার কাছে ঠিক বইয়ের মতই মূল্যবান। আগের পাঠক হয়তো পড়তে পড়তে আমারই মতো কোনো পাতায় এসে আটকে গেছে। বইয়ের কোনো অনুচ্ছেদে এসে আমারই মতো থমকে যাওয়া কোনো পাঠক হয়তো আজ আর দুনিয়ায় নেই। তবু বইয়ের পাতায় হাত বুলিয়ে তাদের সাথে আমার সহযাত্রা গড়ে ওঠে। তারা সকলেই হয়ে ওঠেন আমার বইমিতা।)❞
❝কিন্তু মার্কস অ্যান্ড কো. আজও সেখানেই আছে। যদি তুমি ৮৪,চ্যারিং ক্রস রোড পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাও, তবে আমার হয়ে একটা চুমু এঁকে দিয়ে এসো, ঠিক আছে? এটুকু দাবি আমার থাকল। ❞
একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইটা শেষ করলাম। বন্ধুত্ব কী এমনও হতে পারে? আজকের যুগে এসে এটা হয়তো চিন্তাও করা যায় না৷ মিস্টার ফ্র্যাঙ্ক মারা না গেলে কী হতো?মিস্টার ফ্র্যাঙ্কের সাথে যদি লেখিকার দেখা হতো তবে কী হতো? হয়তো আমাদের এই সুন্দর বন্ধুত্বের কথা জানা হতো না, হয়তো! 'স্বশিক্ষিত মাত্রই শিক্ষিত', লেখিকা হেলেন হ্যানফ কথাটির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
ইন্টারনেট যুগের মানুষ হিসেবে চিঠিপত্র খুবই আকর্ষণীয় আমার কাছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে দেশের ভেতরেই প্রায় বিপরীত প্রান্তের অনেক মানুষের সাথেই ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছে যাদেরকে বস্তব জীবনে সামনাসামনি দেখিনি, তবে দেখতে চাই সুযোগের অপেক্ষা। আমার আর বইটির বাস্তব চরিত্র গুলোর আকাঙ্ক্ষা একই। পুরাতন বইয়ের দোকানী ও আলাদা একটি দেশের একজন লেখিকার বই কেনা কে উদ্দেশ্য করে দীর্ঘ কুড়ি বছরের চিঠি আদান-প্রদান, গড়ে উঠা সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়েই ৮৪, চ্যারিং ক্রস রোড। রেশ রয়ে যাওয়ার মতো বই।
এই অত্যাধুনিক স্ক্রিনের যুগে এসেও চিঠি জিনিসটা আমাকে প্রচুর আকর্ষণ করে। শুধু মাত্র পত্রের মাধ্যেমে আলাপচারিতার জন্যই শুরু করা। বলাবাহুল্য কিছুদূর পড়ার পরই বইটি আমাকে মার্কস অ্যান্ড কো আর লেখিকার এপার্টমেন্টে বারবার হাজির করেছে। বইয়ের পাশাপাশি সে সময়কার জীবন যাপনের যে পরিবর্তন সেটা কি সুন্দর করে দুজন মানুষের চিঠিতে ফুঁটে উঠেছে! দারুণ একটা সময় কাটলো বইটার সাথে।
বইটা প্রথমে পড়ে আগাতে পারি নাই। বাট পরে আবার পড়া শুরু করলাম, তারপর আর রেখে উঠেতে পারিনি। অসাধারন একটি বই। একজন বুক শপের বই বিক্রেতা ও একজন বই ক্রেতা এর ভেতরে কিছু সুন্দর সুন্দর বই নিয়ে তাদের পত্র আদান-প্রদান গুলা ছিলো অসাধারন। এইভাবে বুকসপটি ও তাদের ফ্যামিলির সবার সাথে কীভাবে যে ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে মিস হ্যালেন হেনোফ এর সেইটা জানতেই বইটা পড়ে ফেলুন।
হেলেন হ্যানফ ছিলেন একজন অবিখ্যাত চিত্রনাট্যকার যার আর্থিক দৈন্যতা তার বই পড়ার তীব্র আগ্রহকে দমাতে পারেনি। আগ্রহের মাত্রা ঠিক এমন যে নিউইয়র্কে বসে সুদূর লন্ডনে উপস্থিত "মার্কস অ্যান্ড কো" নামের বুকশপ কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো, উদ্দেশ্য বুকশপটির মাধ্যমে সুলভ মূল্যে সেকেলে দুর্লভ সকল পুস্তক বাগিয়ে নেওয়া। এভাবেই হেলেন এর মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বইকে কেন্দ্র করে চিঠি প্রেরণ করার যাত্রার সূচনা হয় ১৯৪৯ সালে যা হস্তান্তরিত হতে থাকে সুদীর্ঘ বিশ বছর ধরে। মার্কস অ্যান্ড কো এর বিশ্বস্ত কর্মী ফ্র্যাঙ্ক ডোয়েলই ছিলেন হেলেনের পত্রমিতা যার জের ধরে মার্কস অ্যান্ড কো এর বাকি সদস্য ও ফ্র্যাঙ্ক এর পরিবারের সদস্যদের সাথে হেলেনের সখ্যতা গিয়ে ঠেকে অনেক দূরে।
পত্রগুলোর বিষয়বস্তু যে শুধু পুরাতন সকল বইয়ের সন্ধান নিয়ে ছিল তা নয়, বরং কোনো একটি বই হাতে পেয়ে হেলেনের অভিব্যক্তি প্রকাশ, নির্ভেজালভাবে তার আর্থিক অসচ্ছলতার অবস্থান স্বীকার, নতুন কোনো কাজ পেলে তা জানানো, ফ্র্যাঙ্ক এর পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়া, তার পাঠানো উপহারগুলো ফ্র্যাঙ্ক ও বাকিদের কেমন লেগেছে তা জানতে চাওয়া, কোনো এক বইয়ের ভাষা বা অনুবাদ পছন্দ না হলে ফ্র্যাঙ্ককে তা বিনা সংকোচে জানানো কিংবা ওমুক এক বই পাঠাতে কেন বিলম্ব হচ্ছে তারও অভিযোগ প্রকাশ করা, এমন আরও কত কী! অপরদিকে হেলেনের নীড়ে যেন মার্কস অ্যান্ড কো এর বই দিয়ে বাড়ির ছাদ পূর্ণ হয়ে যায় তা সুনিশ্চিত করতে কার্পণ্য করেনি ফ্র্যাঙ্ক। পৃথিবীতে এমন সকল মানুষের বাসও আছে তবে।
বইটা অদ্ভুত সুন্দর, একেকটা চিঠি একেক রকম অভিব্যক্তি প্রকাশ করে যেন। আমার তো খুব আফসোস হয় এই ভেবে যে কত কী বই পড়ি কিংবা কিনি কিন্তু সেসব ঘটনার অভিব্যক্তির জানান দেওয়ার জন্য কাউকে পাইনা কারণ আমার নিকটবর্তী মানুষদের সাথে দুঃখজনক হলেও বইয়ের কোনো সংযোগ নাই। তো আর কী বা করার, বুক রিভিউ লিখে সেসবের শূন্যস্থান ভরাট করে যাচ্ছি। বইয়ে বেশ কিছু চিত্র আছে তবে হেলেনের বই দিয়ে ঠাসা দেয়ালের চিত্র না থাকায় একটু আফসোস হলো বটে।