What do you think?


রাজা রামমোহন - প্রথম পদাতিক
রামমোহন রায়। সেই রাজ্যহীন রাজা, বাঙালির জীবনকে যে মহাপুরুষ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন। একথা বলতেই হয়, তাঁর চেয়ে বেশি দিক থেকে এই জাতিকে আর কেউ প্রভাবিত করেননি। কিন্তু কেমন ছিল সেই মানুষটির ব্যক্তিজীবন? ঠিক কোন পথে প্রথমে রাধানগর গ্রাম থেকে পাটনা, তারপর কাশী পেরিয়ে তিব্বত কিংবা কলকাতা থেকে সুদূর লন্ডনে পাড়ি দিলেন তিনি? গোঁড়া বৈষ্ণব পরিবারের সন্তান কোন জাদুমন্ত্রে একদিন হয়ে উঠলেন যুগান্তরের প্রথম যাত্রী? প্রাণহীন গবেষণা নয়, নিছক সাল-তারিখ নয়, এই প্রথম আলোকপাত করা হল রামমোহন রায়ের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অথচ দ্বিধান্বিত, উদ্ভাসিত অথচ বিষণ্ণ মুখের উপর। গবেষণাগ্রন্থ নয়, এই বই মানুষ রামমোহনের সন্ধানে যাত্রা করা এক উপন্যাস।
216 pages, Hardcover
First published January 1, 2024
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 5 of 5 reviews
July 11, 2024
কিছু-কিছু বই কোনোমতেই দু'মলাটের মধ্যে বন্দি কাগজ আর কালির সংকলন হয়ে থাকতে পারে না। তারা হয়ে ওঠে জ্বলন্ত মশাল। আলস্যের অন্ধকারে ভরা পথে তারা জ্বেলে দেয় বুদ্ধি ও বিবেকের আলো। আমরা তাদের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে পাই।
আলোচ্য বইটি তেমনই এক আলোকবর্তিকা।
এটির কেন্দ্রে আছেন এমন এক মানুষ— যাঁর নাম আমরা সবাই জানি, অথচ যাঁর জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান খুবই কম। তিনি হলেন রামমোহন রায়।
রাজা রামমোহন রায়।
এই 'রাজা' উপাধিটি তিনি অর্জন করেছিলেন। তবে অন্য অনেক রাজা আর রাজবাহাদুর বিস্মৃতির গভীরে তলিয়ে গেলেও রামমোহনের রাজত্ব আজও কায়েম আছে। কেন জানেন?
কারণ, আধুনিক ভারতবর্ষের মনোভূমি নির্মাণ তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। তাই আজও ভূপতি হিসেবে 'রাজা' হয়ে আছেন তিনি।
কিন্তু কেমন ছিল এই আলোর পথযাত্রীর জীবন?
কুসংস্কার ও কুপ্রথার কালগ্রাস থেকে নিজের দেশ ও সমাজকে বাঁচানোর চেষ্টায় তাঁর সংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল?
শত্রু ও কালের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী এই সংগ্রামে তিনি কোথায় জিতেছিলেন, আর কোথায়ই বা হেরেছিলেন?
রামমোহনের একাধিক জীবনী বাজারে সুলভ। এখনও বিদগ্ধ মহলে নানা বিষয়ে রামমোহনকে নিয়ে চর্চা চলে। কিন্তু প্রাকৃতজন— যারা ফেসবুকে মিম দেখে আর হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স করে 'শিক্ষিত' হয়— তাদের নাগালে আছেন কি এই মানুষটি?
এর আগে আধুনিক বাংলা তথা ভারতের অর্থনীতি ও সমাজভাবনায় এক পথিকৃৎ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে আমাদের সামনে জীবন্ত করে তুলেছিলেন রাজা ভট্টাচার্য। এবার তাঁর লেখায় সপ্রাণ হয়ে উঠলেন রামমোহন রায়। এই বই তারই খতিয়ান।
লেখক সরাসরি জানিয়েছেন যে এটি উপন্যাস। অর্থাৎ পাঠ্যবই বা রেফারেন্স হিসেবে এটিকে গ্রহণ করা অনুচিত। কিন্তু পড়ার পর মনে হল, রামমোহন ও তাঁর সমকালকে জানার জন্য এই বই-ই আদর্শ।
কেন?
প্রথমত, অত্যন্ত সাবলীল অথচ দৃঢ় লেখনীর মাধ্যমে লেখক অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণ থেকে শুরু করে পরের তিনটি দশককে একেবারে জীবন্ত করে তুলেছেন। এর ফলে সাল-তারিখের খুঁটিনাটি বাদ পড়লেও ঘটনাগুলো, আর রামমোহনের তথা সমাজের ওপর তাদের অভিঘাত অনেক বেশি করে আমাদের মনে থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত, ইতিহাস বইয়ের গতে বাঁধা সাদা-কালো বর্গীকরণের বাইরে থাকা মানুষেরাই যে আসলে সমাজকে আলো বা কালোর দিকে নিয়ে যায়— এই কথাটি খুব ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই বোধ হওয়াটি যে লোকশিক্ষার মস্ত বড়ো উপাদান, তা আর বলে দিতে হয় না।
তৃতীয়ত, শুধু রামমোহন নয়; বরং এই উপন্যাস যেভাবে ওই সময়ের যুগান্তকারী ঘটনা ও দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মানুষদের নিন্দা ও প্রশংসায়, গুণে ও দোষে ফুটিয়ে তুলেছে, তা সত্যিকারের ইতিহাসকে চিনতে ও বুঝতে শেখায়।
আর সব শেষে? শেষে আমরাও বুঝি যে প্রায় দুশো বছর পেরিয়ে গেলেও রামমোহনের লড়াই আজও শেষ হয়নি। লেখক চান, সেই লড়াইটা যেন আমরা চালিয়ে যাই। হয়তো তখনই, প্রথম পদাতিকের সঙ্গে আমরাও যেন এক অনন্তযাত্রায় শামিল হই।
এই বই শুধু রামমোহনকে নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস নয়। বরং "প্রেমের নিভৃত শিল্পে, পণ্যে, পিপাসায়, লোভে অত্যন্ত ঘুমন্ত সব মানুষের খেলাঘরে" প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার মতো বই এটি।
পত্র ভারতী সযত্নে, শুদ্ধ মুদ্রণে বইটিকে পরিবেশন করে আমাদের ধন্যবাদার্হ হলেন।
যদি আধুনিক ভারতবর্ষের পথিকৃৎকে চিনতে ও বুঝতে চান, তাহলে এই বই আপনারই জন্য।
আলোচ্য বইটি তেমনই এক আলোকবর্তিকা।
এটির কেন্দ্রে আছেন এমন এক মানুষ— যাঁর নাম আমরা সবাই জানি, অথচ যাঁর জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান খুবই কম। তিনি হলেন রামমোহন রায়।
রাজা রামমোহন রায়।
এই 'রাজা' উপাধিটি তিনি অর্জন করেছিলেন। তবে অন্য অনেক রাজা আর রাজবাহাদুর বিস্মৃতির গভীরে তলিয়ে গেলেও রামমোহনের রাজত্ব আজও কায়েম আছে। কেন জানেন?
কারণ, আধুনিক ভারতবর্ষের মনোভূমি নির্মাণ তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। তাই আজও ভূপতি হিসেবে 'রাজা' হয়ে আছেন তিনি।
কিন্তু কেমন ছিল এই আলোর পথযাত্রীর জীবন?
কুসংস্কার ও কুপ্রথার কালগ্রাস থেকে নিজের দেশ ও সমাজকে বাঁচানোর চেষ্টায় তাঁর সংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল?
শত্রু ও কালের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী এই সংগ্রামে তিনি কোথায় জিতেছিলেন, আর কোথায়ই বা হেরেছিলেন?
রামমোহনের একাধিক জীবনী বাজারে সুলভ। এখনও বিদগ্ধ মহলে নানা বিষয়ে রামমোহনকে নিয়ে চর্চা চলে। কিন্তু প্রাকৃতজন— যারা ফেসবুকে মিম দেখে আর হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স করে 'শিক্ষিত' হয়— তাদের নাগালে আছেন কি এই মানুষটি?
এর আগে আধুনিক বাংলা তথা ভারতের অর্থনীতি ও সমাজভাবনায় এক পথিকৃৎ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে আমাদের সামনে জীবন্ত করে তুলেছিলেন রাজা ভট্টাচার্য। এবার তাঁর লেখায় সপ্রাণ হয়ে উঠলেন রামমোহন রায়। এই বই তারই খতিয়ান।
লেখক সরাসরি জানিয়েছেন যে এটি উপন্যাস। অর্থাৎ পাঠ্যবই বা রেফারেন্স হিসেবে এটিকে গ্রহণ করা অনুচিত। কিন্তু পড়ার পর মনে হল, রামমোহন ও তাঁর সমকালকে জানার জন্য এই বই-ই আদর্শ।
কেন?
প্রথমত, অত্যন্ত সাবলীল অথচ দৃঢ় লেখনীর মাধ্যমে লেখক অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণ থেকে শুরু করে পরের তিনটি দশককে একেবারে জীবন্ত করে তুলেছেন। এর ফলে সাল-তারিখের খুঁটিনাটি বাদ পড়লেও ঘটনাগুলো, আর রামমোহনের তথা সমাজের ওপর তাদের অভিঘাত অনেক বেশি করে আমাদের মনে থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত, ইতিহাস বইয়ের গতে বাঁধা সাদা-কালো বর্গীকরণের বাইরে থাকা মানুষেরাই যে আসলে সমাজকে আলো বা কালোর দিকে নিয়ে যায়— এই কথাটি খুব ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই বোধ হওয়াটি যে লোকশিক্ষার মস্ত বড়ো উপাদান, তা আর বলে দিতে হয় না।
তৃতীয়ত, শুধু রামমোহন নয়; বরং এই উপন্যাস যেভাবে ওই সময়ের যুগান্তকারী ঘটনা ও দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মানুষদের নিন্দা ও প্রশংসায়, গুণে ও দোষে ফুটিয়ে তুলেছে, তা সত্যিকারের ইতিহাসকে চিনতে ও বুঝতে শেখায়।
আর সব শেষে? শেষে আমরাও বুঝি যে প্রায় দুশো বছর পেরিয়ে গেলেও রামমোহনের লড়াই আজও শেষ হয়নি। লেখক চান, সেই লড়াইটা যেন আমরা চালিয়ে যাই। হয়তো তখনই, প্রথম পদাতিকের সঙ্গে আমরাও যেন এক অনন্তযাত্রায় শামিল হই।
এই বই শুধু রামমোহনকে নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস নয়। বরং "প্রেমের নিভৃত শিল্পে, পণ্যে, পিপাসায়, লোভে অত্যন্ত ঘুমন্ত সব মানুষের খেলাঘরে" প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার মতো বই এটি।
পত্র ভারতী সযত্নে, শুদ্ধ মুদ্রণে বইটিকে পরিবেশন করে আমাদের ধন্যবাদার্হ হলেন।
যদি আধুনিক ভারতবর্ষের পথিকৃৎকে চিনতে ও বুঝতে চান, তাহলে এই বই আপনারই জন্য।
August 21, 2024
খুব ভালো বই।
October 6, 2024
চার বছর আগের কথা– রাজা ভট্টাচার্য স্যারের 'দ্বারকানাথ – পরাধীন দেশের রাজপুত্র' বইটি পড়েছিলাম। বাকিটা বলার আগে এখানে আমার একটা রোগের কথা বলে নেওয়াটা খুবই জরুরী। রোগটা হলো– আমি যখনই কোনো একটা বই পড়ি এবং পড়তে পড়তে সেই বইটা এবং বইটার লেখক আমার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন, তখন আমার মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত ধরণের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যায়। যার ফলে সেই বইতে বর্ণিত কোনো চরিত্র বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমি কল্পনা করতে থাকি যে কেমন হতো যদি এই পছন্দের লেখক মহাশয় (লিঙ্গভেদে মহাশয়া) এই চরিত্র বা ঘটনাকে নিয়েও আলাদা করে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখে ফেলেন! 'দ্বারকানাথ' পড়ার সময় রাজা রামমোহনের চরিত্রটা নিয়েও আমার মস্তিষ্কে এই বিক্রিয়াই খেলা করছিল।
অন্তর্যামীর বরে এবং রাজাবাবুর আশীর্বাদে এই বছর হাতে পেলাম 'রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক'। তাই বলে এটা মনে করার কোনো দরকার নেই যে বিগত চার বছর পাঠকবৃন্দ উনার আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত ছিল। আশীর্বাদ বর্ষিত হয়েছে বরাবরই 'লক্ষ্মণ চরিত মানস' (অক্টোবর ২০২০), বাল্মীকির রামায়ণে নেই (এপ্রিল ২০২১) এবং মেঘদূতম (জুন ২০২৪) রূপে। সেসব নিয়ে কথা হবে অন্যদিন। বৃষ্টি এলে ছাতা ধরে ভেজা থেকে বাঁচা সহজ, কিন্তু নাক চেপে মাটির সোঁদা গন্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা প্রাণঘটকম্! এমনটা করলে প্রাণ-বাবাজীকে বলতে হবে, "আজ এসো বাবা, পরে দেখা হবে"! কিন্তু পাঠকরূপী পাখিকে বইরূপী খাঁচায় কিভাবে ধরে রাখতে হয় তা আমাদের 'রাজা'-বাদশাহ ঠিকই জানেন।
বছরে ৬০/৭০ টা বইয়ের বেশী এই গরীব লোকটা পড়তে পারে না। এর মধ্যে বেশীরভাগ বই-ই একেকটা যুদ্ধ, আর যুদ্ধে হার-জিত তো লেগেই আছে! কিন্তু দু-চারজন লেখক এমনও রয়েছেন যাঁদের বই মানেই বরদান। রাজা স্যার এর মধ্যে নিঃসন্দেহে বিরাজমান। এবার আসি 'রাজা রামমোহন'-এ। এই বইয়ের 'লেখকের কথা'য় লেখা ছিল "এটি প্রথমত এবং শেষত একটি উপন্যাস। এই বইয়ে নীরস সত্য ও তথ্যের বিশ্লেষণ খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে।" কিন্তু বইটা পড়তে গিয়ে 'সত্য ও তথ্যের বিশ্লেষণ' খুঁজতে হয়নি একেবারেই কারণ সেসবে বইটি এমনিতেই ছিল বনগাঁ লোকালের মতোই ঠাসাঠাসি কাণ্ড! বইয়ের শুরুতে রাজা রামমোহনের intro-টা বেশ চমৎকার! তারপর শুরু হয় ২৬টি অধ্যায়ের এক সুশোভিত যাত্রা। এখানে আমার একটা ভালোলাগার কথা বলে রাখি– ২, ৩ এবং ৬ নম্বর অধ্যায়ে ভুবনমোহন গাঙ্গুলীর সাথে রামমোহনের অনেক গল্প-গুজব হয়। প্রথম দুটি অধায়ে রামমোহনের বয়স ছিল ১২ এবং শেষটাতে ২৯। এই ১৭ বছরের ফারাকটা রামমোহনের ভাষা এবং চিন্তাধারায় লেখক যেভাবে এঁকেছেন তা সত্যিই সাধুবাদের যোগ্য।
রামমোহনের বাল্মীকি রামায়ণ পাঠ থেকে শুরু করে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে গৃহত্যাগের বর্ণনাই হোক অথবা করণিকের চাকুরিলাভ থেকে রামমোহনের ভাষাজ্ঞানের পরিচয়ই হোক – কোত্থাও একতিলও মনে হয়নি যে এগুলো শুধুই নীরস তথ্য বা কেবলই উপন্যাসিক সদাবাহার। তথ্য এবং উপন্যাসিক মর্যাদার এক অনুপম মিশ্রণ প্রত্যেকটা অধ্যায়েই বিলক্ষণ। ৯ম অধায়ে রামমোহনের বউদিদির আত্মদাহ এবং ১৭তম অধ্যায়ে বীরনৃসিংহ মল্লিকের বাড়ির বউয়ের সতীদাহ প্রথার বর্ণনা পড়তে পড়তে শিউরে উঠেছিলাম। অন্যদিকে সশব্দে হেসেও ছিলাম রামমোহনের প্রথম 'স্বাস্থ্যপান' দীক্ষা এবং 'লোনা লাগা'র বর্ণনায়।
এই বইয়ের অনেকটাতেই জুড়ে রয়েছেন দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং ডেভিড হেয়ার। রামমোহনের জীবনজুড়ে রয়েছে এই দুজনের অসাংবিধানিক বন্ধুত্ব। তাছাড়াও রয়েছে ব্রাহ্মসমাজ, হিন্দু কালেজ, সংবাদ কৌমুদীর জন্ম বৃত্তান্তের সুঠাম বর্ণনা।
প্রচুর ধন-ঐশ্বর্য এবং সম্মানের বাহক এবং 'রাজা' উপাধির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও একসময় লোকদেখানোর তাগিদে সর্বহারা হয় ওঠেন ভারতবর্ষের এই লোকনায়ক। আমার মনে হয় কাউকে তাচ্ছিল্যের কাঠামোতে দাঁড় না করিয়ে বরং ইতিহাসের পাতা থেকে শিখে নেওয়া উচিত জীবনের গূঢ় রহস্য। আর এই গুপ্তধনের চাবি সার্বজনীন হয়েছে এক রাজার জুবানিতে আরেক রাজার কাহিনী।
যদি এই বইটা আগেই পড়ে থাকেন তবে আপনাকে অভিনন্দন। আর না পড়ে থাকলে বলবো – পা বাড়ান 'পত্রভারতী'র দিকে, সৎপথে কামানো আরও কয়েকটা টাকা খরচ করুন অতি উত্তম সৎ কম্মে এবং অবশ্যই পড়ে ফেলুন রাজা ভট্টাচার্যের 'রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক'।
বি. দ্র.:- আমার মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথা আগেই লিখেছি। 'রাজা রামমোহন' পড়ার সময়ও ওর নাচ খতম হয়নি। সতীদাহ প্রথা নিয়ে এই বইতে অনেকটা পড়েছি বলেই হয়তো আরেকটা নাম মগজে সাঁতার কাটছিল, আর তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই বইতে ওঁনার উল্লেখ নেই কারণ রামমোহন এবং ঈশ্বরচন্দ্র সমসাময়িক নন। তবে সতীদাহ প্রথা এবং বিধবাবিবাহ প্রচলন ভারতীয় নারীর সাথে জড়িত দুটো উল্লেখনীয় বিষয়, যার দুই প্রান্তে রয়েছেন স্বয়ং 'রাজা' এবং 'ঈশ্বর'! জানিনা এবারও অন্তর্যামীর বর এবং 'রাজা'-বাদশাহের আশীর্বাদ পাবো কি না, তবু মন বলছে–
"জিন্দেগী এক সফর হে সুহানা
ইহা কাল ক্যা হো কিসনে জানা।"
অন্তর্যামীর বরে এবং রাজাবাবুর আশীর্বাদে এই বছর হাতে পেলাম 'রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক'। তাই বলে এটা মনে করার কোনো দরকার নেই যে বিগত চার বছর পাঠকবৃন্দ উনার আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত ছিল। আশীর্বাদ বর্ষিত হয়েছে বরাবরই 'লক্ষ্মণ চরিত মানস' (অক্টোবর ২০২০), বাল্মীকির রামায়ণে নেই (এপ্রিল ২০২১) এবং মেঘদূতম (জুন ২০২৪) রূপে। সেসব নিয়ে কথা হবে অন্যদিন। বৃষ্টি এলে ছাতা ধরে ভেজা থেকে বাঁচা সহজ, কিন্তু নাক চেপে মাটির সোঁদা গন্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা প্রাণঘটকম্! এমনটা করলে প্রাণ-বাবাজীকে বলতে হবে, "আজ এসো বাবা, পরে দেখা হবে"! কিন্তু পাঠকরূপী পাখিকে বইরূপী খাঁচায় কিভাবে ধরে রাখতে হয় তা আমাদের 'রাজা'-বাদশাহ ঠিকই জানেন।
বছরে ৬০/৭০ টা বইয়ের বেশী এই গরীব লোকটা পড়তে পারে না। এর মধ্যে বেশীরভাগ বই-ই একেকটা যুদ্ধ, আর যুদ্ধে হার-জিত তো লেগেই আছে! কিন্তু দু-চারজন লেখক এমনও রয়েছেন যাঁদের বই মানেই বরদান। রাজা স্যার এর মধ্যে নিঃসন্দেহে বিরাজমান। এবার আসি 'রাজা রামমোহন'-এ। এই বইয়ের 'লেখকের কথা'য় লেখা ছিল "এটি প্রথমত এবং শেষত একটি উপন্যাস। এই বইয়ে নীরস সত্য ও তথ্যের বিশ্লেষণ খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে।" কিন্তু বইটা পড়তে গিয়ে 'সত্য ও তথ্যের বিশ্লেষণ' খুঁজতে হয়নি একেবারেই কারণ সেসবে বইটি এমনিতেই ছিল বনগাঁ লোকালের মতোই ঠাসাঠাসি কাণ্ড! বইয়ের শুরুতে রাজা রামমোহনের intro-টা বেশ চমৎকার! তারপর শুরু হয় ২৬টি অধ্যায়ের এক সুশোভিত যাত্রা। এখানে আমার একটা ভালোলাগার কথা বলে রাখি– ২, ৩ এবং ৬ নম্বর অধ্যায়ে ভুবনমোহন গাঙ্গুলীর সাথে রামমোহনের অনেক গল্প-গুজব হয়। প্রথম দুটি অধায়ে রামমোহনের বয়স ছিল ১২ এবং শেষটাতে ২৯। এই ১৭ বছরের ফারাকটা রামমোহনের ভাষা এবং চিন্তাধারায় লেখক যেভাবে এঁকেছেন তা সত্যিই সাধুবাদের যোগ্য।
রামমোহনের বাল্মীকি রামায়ণ পাঠ থেকে শুরু করে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে গৃহত্যাগের বর্ণনাই হোক অথবা করণিকের চাকুরিলাভ থেকে রামমোহনের ভাষাজ্ঞানের পরিচয়ই হোক – কোত্থাও একতিলও মনে হয়নি যে এগুলো শুধুই নীরস তথ্য বা কেবলই উপন্যাসিক সদাবাহার। তথ্য এবং উপন্যাসিক মর্যাদার এক অনুপম মিশ্রণ প্রত্যেকটা অধ্যায়েই বিলক্ষণ। ৯ম অধায়ে রামমোহনের বউদিদির আত্মদাহ এবং ১৭তম অধ্যায়ে বীরনৃসিংহ মল্লিকের বাড়ির বউয়ের সতীদাহ প্রথার বর্ণনা পড়তে পড়তে শিউরে উঠেছিলাম। অন্যদিকে সশব্দে হেসেও ছিলাম রামমোহনের প্রথম 'স্বাস্থ্যপান' দীক্ষা এবং 'লোনা লাগা'র বর্ণনায়।
এই বইয়ের অনেকটাতেই জুড়ে রয়েছেন দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং ডেভিড হেয়ার। রামমোহনের জীবনজুড়ে রয়েছে এই দুজনের অসাংবিধানিক বন্ধুত্ব। তাছাড়াও রয়েছে ব্রাহ্মসমাজ, হিন্দু কালেজ, সংবাদ কৌমুদীর জন্ম বৃত্তান্তের সুঠাম বর্ণনা।
প্রচুর ধন-ঐশ্বর্য এবং সম্মানের বাহক এবং 'রাজা' উপাধির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও একসময় লোকদেখানোর তাগিদে সর্বহারা হয় ওঠেন ভারতবর্ষের এই লোকনায়ক। আমার মনে হয় কাউকে তাচ্ছিল্যের কাঠামোতে দাঁড় না করিয়ে বরং ইতিহাসের পাতা থেকে শিখে নেওয়া উচিত জীবনের গূঢ় রহস্য। আর এই গুপ্তধনের চাবি সার্বজনীন হয়েছে এক রাজার জুবানিতে আরেক রাজার কাহিনী।
যদি এই বইটা আগেই পড়ে থাকেন তবে আপনাকে অভিনন্দন। আর না পড়ে থাকলে বলবো – পা বাড়ান 'পত্রভারতী'র দিকে, সৎপথে কামানো আরও কয়েকটা টাকা খরচ করুন অতি উত্তম সৎ কম্মে এবং অবশ্যই পড়ে ফেলুন রাজা ভট্টাচার্যের 'রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক'।
বি. দ্র.:- আমার মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথা আগেই লিখেছি। 'রাজা রামমোহন' পড়ার সময়ও ওর নাচ খতম হয়নি। সতীদাহ প্রথা নিয়ে এই বইতে অনেকটা পড়েছি বলেই হয়তো আরেকটা নাম মগজে সাঁতার কাটছিল, আর তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই বইতে ওঁনার উল্লেখ নেই কারণ রামমোহন এবং ঈশ্বরচন্দ্র সমসাময়িক নন। তবে সতীদাহ প্রথা এবং বিধবাবিবাহ প্রচলন ভারতীয় নারীর সাথে জড়িত দুটো উল্লেখনীয় বিষয়, যার দুই প্রান্তে রয়েছেন স্বয়ং 'রাজা' এবং 'ঈশ্বর'! জানিনা এবারও অন্তর্যামীর বর এবং 'রাজা'-বাদশাহের আশীর্বাদ পাবো কি না, তবু মন বলছে–
"জিন্দেগী এক সফর হে সুহানা
ইহা কাল ক্যা হো কিসনে জানা।"
February 3, 2026
রাজা রামমোহন - প্রথম পদাতিক
রাজা ভট্টাচার্য
পত্রভারতী
মম: ৩০০/-
বইটিতে রামমোহন রায়ের ঘরোয়া পরিবেশ, তার ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মজীবন, ব্রাহ্মসমাজ, কর্মজীবন সব ব্যক্ত হয়েছে, যেটুকু প্রয়োজন। কিছু বিষয় আগে থেকে পড়া ছিল, কিছু নতুন জেনেছি। এই বইতে তার সাথে দ্বারকানাথ ঠাকুরের যুগলবন্দীর বিবরণ বিস্তারিত আমি প্রথমবার পড়লাম। সামাজিক reformation এ তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগদান, কিছু তার জীবৎকালে, কিছু তার মানসপটে থাকলেও পরবর্তীকালে তার বাস্তবায়ন, ফার্সি, হিব্রু, ইংরেজি, আরবি সংস্কৃত, বেদ সব বিষয়ে তার অবিস্মরণীয় পান্ডিত্য, পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতা, ভাই, আত্মীয়দের সাথে তার দ্বন্ধ আদালত অবধিও পৌঁছেছে, শৈশব থেকে তিরোধান অবধি তার জীবনযাপন এতটাই বৈচিত্রময়- যে কোনো একটি বইতে বা পরিসরে তা ব্যক্ত করা অসম্ভব।
বইয়ের শেষের দিকে একটি বর্ণনা আমার মনের মধ্যে চিরকাল থেকে যাবে। বিলেত যাবার আগে রাজা রামমোহন রায় কিশোর দেবেন্দ্রনাথের সাথে একান্তে দেখা করলেন, হয়তো ব্রাহ্মসমাজের ভিত আরো শক্ত করে দিয়ে গেলেন। তিনি জানতেও পারলেন না, বা হয়তো জানতেন - তার পরম স্নেহের দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কিছু বছর পরেই এক চির-বিস্ময় উপহার দিতে চলেছেন বাঙালি তথা বিশ্বকে।
রাজা রামমোহন রায়, এই কথাই যথেষ্ট বইটি পড়তে। তার ওপর লেখকের লেখনী, শৈলী। রাজা ভট্টাচার্যের ঐতিহাসিক আর পৌরাণিক লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক। কিছু পড়েছি, কিছু পড়বো।
পুনশ্চ: সম্পূর্ণ আমার মত। রাজা রামমোহন রায়ের জীবন ঘটনাবহুল। তাই অনেক স্মরণীয়, অবিস্মরণীয়, আকস্মিক, হতবাক করার মতো পরিস্থিতি, মুহূর্ত বইটিতে রয়েছে। বেশিরভাগ খেতেই একটি বিশেষণ বিশেষভাবে লেখা হয়েছে সেই পরিস্থিতি বোঝাতে, সেটা হলো "বিস্ফারিত চক্ষু"। এই বিশেষণটি, আমার মতে, অত্যাধিক ব্যবহার করা হয়েছে বইটিতে, যে যেকোনো পরিস্থিতিতেই, যে সত্যি "চক্ষু বিস্ফারিত" হবার মতো ঘটনা আর সেরকম অবিস্মরণীয় লাগছে না।
রাজা ভট্টাচার্য
পত্রভারতী
মম: ৩০০/-
বইটিতে রামমোহন রায়ের ঘরোয়া পরিবেশ, তার ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মজীবন, ব্রাহ্মসমাজ, কর্মজীবন সব ব্যক্ত হয়েছে, যেটুকু প্রয়োজন। কিছু বিষয় আগে থেকে পড়া ছিল, কিছু নতুন জেনেছি। এই বইতে তার সাথে দ্বারকানাথ ঠাকুরের যুগলবন্দীর বিবরণ বিস্তারিত আমি প্রথমবার পড়লাম। সামাজিক reformation এ তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগদান, কিছু তার জীবৎকালে, কিছু তার মানসপটে থাকলেও পরবর্তীকালে তার বাস্তবায়ন, ফার্সি, হিব্রু, ইংরেজি, আরবি সংস্কৃত, বেদ সব বিষয়ে তার অবিস্মরণীয় পান্ডিত্য, পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতা, ভাই, আত্মীয়দের সাথে তার দ্বন্ধ আদালত অবধিও পৌঁছেছে, শৈশব থেকে তিরোধান অবধি তার জীবনযাপন এতটাই বৈচিত্রময়- যে কোনো একটি বইতে বা পরিসরে তা ব্যক্ত করা অসম্ভব।
বইয়ের শেষের দিকে একটি বর্ণনা আমার মনের মধ্যে চিরকাল থেকে যাবে। বিলেত যাবার আগে রাজা রামমোহন রায় কিশোর দেবেন্দ্রনাথের সাথে একান্তে দেখা করলেন, হয়তো ব্রাহ্মসমাজের ভিত আরো শক্ত করে দিয়ে গেলেন। তিনি জানতেও পারলেন না, বা হয়তো জানতেন - তার পরম স্নেহের দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কিছু বছর পরেই এক চির-বিস্ময় উপহার দিতে চলেছেন বাঙালি তথা বিশ্বকে।
রাজা রামমোহন রায়, এই কথাই যথেষ্ট বইটি পড়তে। তার ওপর লেখকের লেখনী, শৈলী। রাজা ভট্টাচার্যের ঐতিহাসিক আর পৌরাণিক লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক। কিছু পড়েছি, কিছু পড়বো।
পুনশ্চ: সম্পূর্ণ আমার মত। রাজা রামমোহন রায়ের জীবন ঘটনাবহুল। তাই অনেক স্মরণীয়, অবিস্মরণীয়, আকস্মিক, হতবাক করার মতো পরিস্থিতি, মুহূর্ত বইটিতে রয়েছে। বেশিরভাগ খেতেই একটি বিশেষণ বিশেষভাবে লেখা হয়েছে সেই পরিস্থিতি বোঝাতে, সেটা হলো "বিস্ফারিত চক্ষু"। এই বিশেষণটি, আমার মতে, অত্যাধিক ব্যবহার করা হয়েছে বইটিতে, যে যেকোনো পরিস্থিতিতেই, যে সত্যি "চক্ষু বিস্ফারিত" হবার মতো ঘটনা আর সেরকম অবিস্মরণীয় লাগছে না।
March 21, 2025
দ্বারাকানাথ পড়ার পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিলো তা রামমোহনে পূরণ হয়েছে বলেই মনে হয়।এই উপন্যাস রামমোহনের ছোটবেলা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত।এই উপন্যাসে রামমোহনের বিভিন্ন কর্মের বিবরণ আছে।খুবই নির্মেদ কাহিনী বিস্তার।সেখানে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই বর্ণনা আছে।এই উপন্যাসে এসেছে দ্বারকানাথ,ডেভিড হেয়ার প্রমূখ বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কর্ম সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে।ছোটবেলা থেকেই রামমোহন মূর্তি পূজার বিরোধী ছিলেন।তিনি নিরাকার ব্রহ্মের পূজারী ছিলেন।এই নিয়ে তর্ক যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেন।নিজের বৌদিকে স্বইচ্ছায় সহমরণে যেতে দেখে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন এই প্রথা তিনি বিলোপ করবেন।অনেক যুদ্ধের পর তিনি তা করেনও।পড়তে পড়তে পাঠক একদম রামমোহনের সাথে একাত্ম হয়ে যাবেন।শেষে রামমোহনের মৃত্যুতে এক কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে।
এই উপন্যাস এখন সবার পড়া উচিৎ। আমাদের এই সময়ে এক রামমোহনের খুব দরকার।যে বাঙালির হয়ে লড়বে আর মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে চিৎকার করবে।
এই উপন্যাস এখন সবার পড়া উচিৎ। আমাদের এই সময়ে এক রামমোহনের খুব দরকার।যে বাঙালির হয়ে লড়বে আর মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে চিৎকার করবে।
Displaying 1 - 5 of 5 reviews






