রামমোহন রায়। সেই রাজ্যহীন রাজা, বাঙালির জীবনকে যে মহাপুরুষ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন। একথা বলতেই হয়, তাঁর চেয়ে বেশি দিক থেকে এই জাতিকে আর কেউ প্রভাবিত করেননি। কিন্তু কেমন ছিল সেই মানুষটির ব্যক্তিজীবন? ঠিক কোন পথে প্রথমে রাধানগর গ্রাম থেকে পাটনা, তারপর কাশী পেরিয়ে তিব্বত কিংবা কলকাতা থেকে সুদূর লন্ডনে পাড়ি দিলেন তিনি? গোঁড়া বৈষ্ণব পরিবারের সন্তান কোন জাদুমন্ত্রে একদিন হয়ে উঠলেন যুগান্তরের প্রথম যাত্রী? প্রাণহীন গবেষণা নয়, নিছক সাল-তারিখ নয়, এই প্রথম আলোকপাত করা হল রামমোহন রায়ের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অথচ দ্বিধান্বিত, উদ্ভাসিত অথচ বিষণ্ণ মুখের উপর। গবেষণাগ্রন্থ নয়, এই বই মানুষ রামমোহনের সন্ধানে যাত্রা করা এক উপন্যাস।
কিছু-কিছু বই কোনোমতেই দু'মলাটের মধ্যে বন্দি কাগজ আর কালির সংকলন হয়ে থাকতে পারে না। তারা হয়ে ওঠে জ্বলন্ত মশাল। আলস্যের অন্ধকারে ভরা পথে তারা জ্বেলে দেয় বুদ্ধি ও বিবেকের আলো। আমরা তাদের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে পাই। আলোচ্য বইটি তেমনই এক আলোকবর্তিকা। এটির কেন্দ্রে আছেন এমন এক মানুষ— যাঁর নাম আমরা সবাই জানি, অথচ যাঁর জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান খুবই কম। তিনি হলেন রামমোহন রায়। রাজা রামমোহন রায়। এই 'রাজা' উপাধিটি তিনি অর্জন করেছিলেন। তবে অন্য অনেক রাজা আর রাজবাহাদুর বিস্মৃতির গভীরে তলিয়ে গেলেও রামমোহনের রাজত্ব আজও কায়েম আছে। কেন জানেন? কারণ, আধুনিক ভারতবর্ষের মনোভূমি নির্মাণ তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। তাই আজও ভূপতি হিসেবে 'রাজা' হয়ে আছেন তিনি। কিন্তু কেমন ছিল এই আলোর পথযাত্রীর জীবন? কুসংস্কার ও কুপ্রথার কালগ্রাস থেকে নিজের দেশ ও সমাজকে বাঁচানোর চেষ্টায় তাঁর সংগ্রাম কতটা কঠিন ছিল? শত্রু ও কালের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী এই সংগ্রামে তিনি কোথায় জিতেছিলেন, আর কোথায়ই বা হেরেছিলেন?
রামমোহনের একাধিক জীবনী বাজারে সুলভ। এখনও বিদগ্ধ মহলে নানা বিষয়ে রামমোহনকে নিয়ে চর্চা চলে। কিন্তু প্রাকৃতজন— যারা ফেসবুকে মিম দেখে আর হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স করে 'শিক্ষিত' হয়— তাদের নাগালে আছেন কি এই মানুষটি? এর আগে আধুনিক বাংলা তথা ভারতের অর্থনীতি ও সমাজভাবনায় এক পথিকৃৎ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে আমাদের সামনে জীবন্ত করে তুলেছিলেন রাজা ভট্টাচার্য। এবার তাঁর লেখায় সপ্রাণ হয়ে উঠলেন রামমোহন রায়। এই বই তারই খতিয়ান।
লেখক সরাসরি জানিয়েছেন যে এটি উপন্যাস। অর্থাৎ পাঠ্যবই বা রেফারেন্স হিসেবে এটিকে গ্রহণ করা অনুচিত। কিন্তু পড়ার পর মনে হল, রামমোহন ও তাঁর সমকালকে জানার জন্য এই বই-ই আদর্শ। কেন? প্রথমত, অত্যন্ত সাবলীল অথচ দৃঢ় লেখনীর মাধ্যমে লেখক অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণ থেকে শুরু করে পরের তিনটি দশককে একেবারে জীবন্ত করে তুলেছেন। এর ফলে সাল-তারিখের খুঁটিনাটি বাদ পড়লেও ঘটনাগুলো, আর রামমোহনের তথা সমাজের ওপর তাদের অভিঘাত অনেক বেশি করে আমাদের মনে থেকে যায়। দ্বিতীয়ত, ইতিহাস বইয়ের গতে বাঁধা সাদা-কালো বর্গীকরণের বাইরে থাকা মানুষেরাই যে আসলে সমাজকে আলো বা কালোর দিকে নিয়ে যায়— এই কথাটি খুব ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই বোধ হওয়াটি যে লোকশিক্ষার মস্ত বড়ো উপাদান, তা আর বলে দিতে হয় না। তৃতীয়ত, শুধু রামমোহন নয়; বরং এই উপন্যাস যেভাবে ওই সময়ের যুগান্তকারী ঘটনা ও দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া মানুষদের নিন্দা ও প্রশংসায়, গুণে ও দোষে ফুটিয়ে তুলেছে, তা সত্যিকারের ইতিহাসকে চিনতে ও বুঝতে শেখায়। আর সব শেষে? শেষে আমরাও বুঝি যে প্রায় দুশো বছর পেরিয়ে গেলেও রামমোহনের লড়াই আজও শেষ হয়নি। লেখক চান, সেই লড়াইটা যেন আমরা চালিয়ে যাই। হয়তো তখনই, প্রথম পদাতিকের সঙ্গে আমরাও যেন এক অনন্তযাত্রায় শামিল হই।
এই বই শুধু রামমোহনকে নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস নয়। বরং "প্রেমের নিভৃত শিল্পে, পণ্যে, পিপাসায়, লোভে অত্যন্ত ঘুমন্ত সব মানুষের খেলাঘরে" প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার মতো বই এটি। পত্র ভারতী সযত্নে, শুদ্ধ মুদ্রণে বইটিকে পরিবেশন করে আমাদের ধন্যবাদার্হ হলেন। যদি আধুনিক ভারতবর্ষের পথিকৃৎকে চিনতে ও বুঝতে চান, তাহলে এই বই আপনারই জন্য।
বই নয়, পাণ্ডুলিপির ছদ্মবেশে এক জীবন্ত চেতনা — ‘রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক’ পাঠ-অনুভব
রাজা ভট্টাচার্যের লেখা ‘রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক’ নিছক একটি জীবনী নয়, এবং নিছক একটি উপন্যাসও নয়। এটি ইতিহাসের নির্মম কালানুক্রম থেকে মুক্ত হয়ে উঠে আসা এক বহুমাত্রিক আত্মজীবনীমূলক শিল্পনির্মাণ—যেখানে তথ্য নয়, আলোড়নই মুখ্য। এখানে কেবল তারিখ বা ঘটনা নয়, রামমোহন নামক এক মহামানবের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যায়।
এই বই পড়তে পড়তে পাঠক বুঝতে পারেন—রামমোহন যেন ছিলেন এক সমগ্র যুগের নিঃসঙ্গ অথচ দৃঢ় পায়ে হাঁটা পদাতিক, যিনি ঘোরতর অন্ধকারে জ্বেলে ছিলেন চিন্তার দীপশিখা। আর এই দীপ্ত শিখার ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে এক স্বগতসংলাপরত মানুষ—ভগ্ন হৃদয়, ঋদ্ধ চৈতন্য, অন্তর্দ্বন্দ্বে দগ্ধ এক পথিক, যিনি তাঁর নিজের সমাজ, ধর্ম, পরিচিতি—সবকিছুর গণ্ডি ভেঙে সামনে এগিয়ে গেছেন।
‘উপন্যাসের মোড়কে লেখা হলেও’—এই বাক্যটিই এই গ্রন্থের প্রকৃত প্যারাডক্স। কারণ এটি এমন এক রচনাপরিসর, যেখানে উপন্যাসের সৌন্দর্য আর জীবনীগ্রন্থের দায়িত্বশীলতা পরস্পরকে খণ্ডন না করে বরং একে অপরকে পরিপূরক করে তোলে।
রাজা ভট্টাচার্যের কলম নিঃশব্দ, কিন্তু তার নিঃশব্দতায় আছে বজ্রের ধ্বনি। কোনো মোসাহেবি নেই, কোনো অতিনাট্যও নেই—আছে গভীর অনুধ্যান আর সময়ের হৃদস্পন্দন শোনার শিল্প। এই বই আমাদের শেখায়, ইতিহাস শুধু বিজয়ীর রক্তাক্ত তরবারির গল্প নয়—তা বহুসময়ে ভাঙা কণ্ঠে উচ্চারিত ‘না’ শব্দটির গল্পও। আর সেই ‘না’—যা সতীদাহ প্রথা, কুসংস্কার, সামাজিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রামমোহনের একা লড়াই—এই উপন্যাসের প্রতি পাতায় রক্তিম রেখায় আঁকা আছে।
‘প্রথম পদাতিক’ কেবল অতীতকে স্মরণ নয়—এটি আমাদের ভবিষ্যতের বিবেক-সংলাপও। বইটি পড়ে শেষ করলে মনে হয়, এ যেন নিছক পৃষ্ঠা উল্টে যাওয়া নয়, বরং ইতিহাসের ধুলো মুছে একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়া—যেখানে রামমোহনের চোখের দৃষ্টির ভিতর দিয়ে আমরা নিজের মুখটাই দেখতে পাই।
উপন্যাস না জীবনী? — না, এটি এক কথায় একজন মহামানবকে চিনে ফেলার অন্তরঙ্গ ভ্রমণ।
লেখক শুরুতেই সতর্ক করে দেন—“এটি প্রথমত এবং শেষত একটি উপন্যাস।” তাই যদি আপনি পাতায় পাতায় সাল-তারিখের খুঁটিনাটি খুঁজে ফেরেন, ইতিহাসের পরীক্ষার জন্য টুকে নেওয়ার মতো তথ্য চান—তবে হয়তো আপনি ভুল রেলগাড়িতে উঠে পড়েছেন।
কিন্তু যদি আপনি জানতে চান, অনুভব করতে চান—কেমন ছিল সেই বালক, যে রাধানগরের গোঁড়ামি-সিক্ত বাতাসে চোখ মেলে দেখেছিল এক ভবিষ্যতের আলোর স্বপ্ন? যে বেদ-বাইবেল-কোরআনকে সমান শ্রদ্ধায় আত্মস্থ করে নিজের ভিত গড়েছিল জ্ঞানে, যুক্তিতে আর সহিষ্ণুতা-ভিত্তিক মানবধর্মে? তবে আপনি ঠিক বইয়ের পাতায় আছেন।
এখানে রামমোহন শুধুই সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর নন, কিংবা ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পাঠ্যবইয়ের পরিচিত মুখও নন—এখানে তিনি হয়ে ওঠেন এক প্রশ্নশীল পলাতক, এক স্বপ্ন-দ্রষ্টা চিন্তক, এক নির্জন পথিক—যিনি ইংরেজরাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও নিজের বিশ্বাসের পাটাতন টলতে দেননি।
এই উপন্যাস তাই কোনো দস্তাবেজ নয়—এ এক হৃদয়গ্রাহী সান্নিধ্য, যার প্রতিটি অধ্যায় যেন ধরা দেয় সময়ের ক্যানভাসে এক বিস্মৃত ধ্বনির মতো। এই বই পড়া মানে ইতিহাসের পাঠ নয়, এক মানুষের জীবন বুঝে ফেলা—একটা অস্থির সময়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া, আর সময়ের আগেই হাঁটতে শুরু করা এক আশ্চর্য মানুষের পাশে হাঁটার অভিজ্ঞতা
আমার ব্যক্তিগত বিকার: “রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলেই পড়া শুরু করলাম…”
রাজা ভট্টাচার্যের আগের বই ‘দ্বারকানাথ – পরাধীন দেশের রাজপুত্র’ পড়ে আমি যেন একরকম পাঠকীয় জ্বরে, এক তুরী��়ানন্দ প্রসূত ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলাম — সেই বই ছিল নেশা, ছিল মোহ, ছিল গায়ে লেপ্টে থাকা এক অদৃশ্য জ্বরের মতো, যা সহজে নামে না। সেই জ্বরেই হঠাৎ একদিন মনে হল—আচ্ছা, যদি লেখক এবার রামমোহনকে নিয়ে কিছু লেখেন? সেই স্বপ্নের স্বরূপ ফল হাতে পেলাম এই বইয়ে, ‘রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক’।
কিন্তু, পড়ার শুরুতেই একটা দ্বন্দ্ব মাথা চারা দিল — পুরনো বিরাগ, পুরনো তর্ক, পুরনো রাগ। মনে পড়ে গেল, সেই ‘রাজা’ উপাধি তো মুঘল সম্রাট আকবর শাহ (২) দিয়েছিলেন, আর রামমোহন সেই রাজোপাধি কাঁধে চাপিয়ে বিলেতে পাড়ি জমিয়েছিলেন, ইংরেজদের দরবারে দাদনের দরখাস্ত নিয়ে। স্বীকার করতে কুন্ঠা নেই, দীর্ঘদিন ধরে আমি তাঁকে দেখেছি সুবিধাবাদী দালালরূপে— আমার কাছে ‘রামমোহন’ ছিল একটা ভঙ্গুর বিশ্বাসের নাম।
কিন্তু এ বই পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়ে যেন সেই বিশ্বাস যেন কোন রসাতলে তলিয়ে গেল। আর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক নতুন রামমোহন—যাঁর মধ্যে ছিল আত্মসন্ধান, আত্মত্যাগ, আর দুর্ভেদ্য দৃঢ়তা।
একটা কথা এখন বুক ঠুকে বলা যায়—রাজা ভট্টাচার্য শুধুই লেখক নন, তিনি রামমোহনকে আমার চোখে আবার এক পরিপূর্ণ 'মানুষ' করে তোলার একনিষ্ঠ কারিগর।
কে জানে, হয়তো এ জন্মে আমার পূর্বজন্মের ক্ষোভ কেটে গেছে! হয়তো এ এক দেরিতে ফোটা শ্রদ্ধার ফুল, যার সুবাস আজও গায়ে লেগে আছে।
সময়ের পথিক—রামমোহনের বহুস্তরীয় জীবন
এই বইয়ের নির্মাণশৈলী এতটাই নিপুণ, যে আপনার মনে হবে, যেন ইতিহাসের আয়নার ভেতর ঢুকে আপনি হাঁটছেন এক জীবন্ত মানুষের পাশে — রামমোহন, সময়ের প্রথম পদাতিক। ছোট ছোট অধ্যায়গুলো যেন ছোট গল্পের মতো — প্রতিটি অধ্যায়ে একটি করে মনস্তাত্ত্বিক ল্যান্ডস্কেপ উন্মোচিত হয়। কোথাও দ্বিধা, কোথাও দৃঢ়তা, কোথাও আবার নিঃসঙ্গতা—কিন্তু সবকিছুর মধ্যেই এক বিস্ময়কর মানবিকতা।
সবচেয়ে মুগ্ধ করে যে জায়গাটা—ভুবনমোহন গাঙ্গুলীর সঙ্গে মাত্র ১২ বছর বয়সী রামমোহনের প্রথম আলাপ, আর ২৯ বছর বয়সের একান্ত কথোপকথনে তাঁর ভাষা ও ভাবনার যে রূপান্তর, তা দেখে থমকে যেতে হয়। এই বয়সভেদে চিন্তার পরিপক্বতা, দৃষ্টিভঙ্গির paradigm শিফট—সবটাই এত সূক্ষ্মভাবে আঁকা, যেন লেখকের কলমে কেবল তথ্য নয়, নিজেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে 'সময়'। সেই অজানা কবির উক্তির মতো, "Time, once a silent stream, now pulses with breath — alive in every heartbeat, in every step we dare to take."
লেখক এখানে শুধু চরিত্র নির্মাণ করেননি, বরং সময় ও মননের অন্দরের মানচিত্র এঁকেছেন নিখুঁত যত্নে—যাতে রামমোহন কেবল এক ঐতিহাসিক চরিত্র হয়ে না থেকে হয়ে ওঠেন এক যাপনযোগ্য, অনুসন্ধানযোগ্য মানুষ।
বৌদির সতীদাহ আটকাতে পারেননি! সেই অপারগতার যন্ত্রণাতেই জ্বলে উঠেছিল যে আগুন, তা-ই পরবর্তীতে রূপ নিয়েছিল এক জাতীয় মশালে — সমাজ-সংস্কারের, মানুষের পক্ষ নেওয়ার, এবং আপাদমস্তক গোঁড়ামিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার সাহসে। সেই আগুনের দেদীপ্যমান রেখা ধরে এগোয় এই উপন্যাস।
ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা, নিরাকার ঈশ্বরোপাসনার পক্ষে উপনিষদ থেকে যুক্তি টেনে আনা, সংবাদ কৌমুদীর পত্রিকার প্রয়াস, হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় ডেভিড হেয়ারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এগোনো—সবটাই এসেছে এক অসাধারণ ভারসাম্যে: তথ্যনিষ্ঠ অথচ উপন্যাসিক রসোত্তীর্ণতায় পূর্ণ।
এই বই পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়—আমরা কোনো ‘মূর্তি’ নয়, কোনো অলংকৃত মনুমেন্ট নয়, বরং এক flesh-and-blood মানুষকে চিনে ফেলছি। এ মানুষ যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনই প্রেমময়। যেমন যুক্তিনিষ্ঠ, তেমনই আবেগপ্রবণ। এবং ঠিক এই দ্বন্দ্বেই তাঁর মহত্ত্ব। The juxtaposition of character-development comes out in all its glory.
এই রামমোহন নিখুঁত নন, কিন্তু ঠিক সেই জন্যেই তিনি আমাদের পাঠক-হৃদয়ের এত কাছের, এত জীবন্ত। ইতিহাস নয়, যেন আত্মজৈবনিক কোনো সাহসের দলিল হয়ে ওঠে তাঁর জীবন, এবং রাজা ভট্টাচার্যের কলম সেই জীবনকেই নতুন আলোর নিচে দাঁড় করিয়ে দেয়।
রাজা উপাধি—দালালি না রাজনৈতিক কৌশল?
আকবর শাহ (দ্বিতীয়)-এর হয়ে বিলেতে রামমোহনের যাত্রা—একটা সময় পর্যন্ত যেটা মনে হতো নিছকই দরবারি দালালি, এক সুবিধাবাদী পলিসি, এখন সেটাই প্রতিভাত হয় নব আলোকে।
এই বই পড়তে গিয়ে বোঝা যায় — লেখক এই বিতর্কিত অধ্যায়টিকেও এড়িয়ে যাননি, বরং অদ্ভুত এক ভারসাম্যে, নরম অথচ দৃঢ় হাতে খোলস খুলে দেখিয়েছেন: এটা কেবল টাকা বাগানোর চেষ্টা নয়, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজেদের দেশের দাবিগুলো উচ্চারণ করার দার্ঢ্য।
রামমোহনের সেই পদক্ষেপ—আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, ‘soft diplomacy’-এর এক নিদর্শন বললে ভুল হয় না। উপাধির আড়ালে ছিল এক বাঙালি কূটনীতিকের নখদর্পণ, যিনি ইতিহাসের কণ্ঠস্বর হয়ে বলছিলেন, “আমরা প্রবলভাবে আছি, এবং আমরা জানি আমাদের প্রাপ্য কী।”
ফলে, যাঁরা এতকাল রামমোহনের এই পদক্ষেপকে নিছক সুবিধাবাদ বলে ঠাওরেছিলেন, তাঁদেরও বাধ্য হয়ে ভাবতে হয়—তথ্য এক জিনিস, আর তার প্রেক্ষাপট আরেক। ইতিহাসের ঘটনাকে যদি তার সময়ের আলোয় না দেখি, তবে বিচারে পড়ে যায় ছায়া। History without context is a shadow without shape — it may move us, but it cannot teach us.
আর সেই ছায়া সরিয়ে যখন তাকানো যায়, তখন দেখা যায়—এই মানুষটি কেবল একটি উপাধির ধারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের এক অগ্রগামী কণ্ঠ, এক জাতীয় বিবেক, যিনি নিজেকে ব্যুৎপত্তির পুণ্যসলিলে স্নান করিয়ে তৈরি করেছিলেন ভবিষ্যতের জন্য।
তাঁকে তাই আর শুধু ইতিহাসের পাতায় ‘রাজা’ বলে টাঙিয়ে রাখা যায় না। তিনি আজও আছেন—পাল্টে দেওয়ার নীলনকশা হাতে, আজকের পাঠকের চিন্তায়, দ্বিধায়, আর বিবেচনার ভিতরে।
ভাষা, গঠন, আর চরিত্রের শ্বাসপ্রশ্বাসে গাঁথা উপন্যাস
রাজা ভট্টাচার্যের কলমে ভাষা কখনও কোলাহল করে না — বরং তা নীরবে ধ্বনিত হয় এক ধ্রুপদী সরোদের মতো। শব্দচয়নে নেই অহংকার, কিন্তু আছে প্রাঞ্জলতা আর আবেগের পরিশীলন। উপন্যাস হলেও প্রতিটি বাক্যে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট পায় ছায়াসঙ্গীর মতো জায়গা—না চোখে পড়ে, না হারায়।
গল্পের গঠন এতটাই চিত্তাকর্ষক যে, আপনার মনে হতে বাধ্য যে আপনি এক দীর্ঘ ছায়াছবির ভেতর দিয়ে হাঁটছেন — দৃশ্যপট বদলাচ্ছে, সময় বদলাচ্ছে, কিন্তু চরিত্রেরা থেকে যাচ্ছে, মনের ল্যান্ডস্কেপে।
রামমোহনের মতো প্রজ্ঞাসম্পন্ন, জটিল এক মানুষ রাজা বাবুর কলমে হয়ে ওঠেন flesh-and-blood বাস্তবতা। তাঁর দ্বিধা, দহন, একাকীত্ব—সবটাই স্পর্শ করে পাঠকের অভ্যন্তর।
দ্বারকানাথ ঠাকুরের অসাধারণ উপস্থিতি, ডেভিড হেয়ারের সহমর্মিতাময় বন্ধুত্ব, বীরনৃসিংহ মল্লিকের সামাজিক সংকট, এমনকি সেই শেষ পর্বে ব্রিস্টলের রাস্তায় একা হেঁটে যাওয়া রামমোহনের ছায়ামূর্তি—সব চরিত্রই যেন একটি করে বজ্রনির্ঘোষ।
এই উপন্যাসে চরিত্ররা শুধু কথাই বলে না, অনুভবও করায়, প্রশ্নও তোলে। তারা সময়কে ছাপিয়ে এসে দাঁড়ায় বর্তমানের আঙিনায়।
এমন জীবন্ত চরিত্র নির্মাণ সমসাময়িক বাংলা জীবনীভিত্তিক সাহিত্যে বিরল। আর তা সম্ভব হয়েছে শুধু এই জন্য যে, লেখক চরিত্রদেরকে তথ্য দিয়ে সাজাননি—তাঁদের অন্তরাত্মার জটিল মানচিত্র পাকা কার্টোগ্রাফারের মতো পড়ে দেখেছেন। আর তাতেই পাঠক বুঝতে পারে — চোরটিত্রগুলো স্রেফ ইতিহাসের মুখোশ নয়, চরিত্রগুলো পাঠকেরই বিভিন্ন সত্তার প্রতিফলন।
প্রচ্ছদ ও প্রকাশনার মেলবন্ধনে একটা পূর্ণ শিল্পকর্ম
মৃণাল শীলের আঁকা প্রচ্ছদটি চোখে লেগে থাকার মতো। রামমোহনের মুখাবয়বে যেমন ধরা আছে আলো-আঁধারের দ্বন্দ্ব, তেমনই ধরা আছে সময়ের গাম্ভীর্য। প্রচ্ছদটা যেন নীরবে চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে — '��ই বই শুধুই পড়ার বস্তু নয় হে, এটি এক অন্তর্গত অভিযাত্রা, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা নয়, প্রতিটি ধারা তোমায় টেনে নিয়ে যাবে ইতিহাসের নিঃশব্দ অলিগলিতে। যেন পৃষ্ঠাগুলি বলছে, "When history comes alive in the pages of a book, the past is no longer behind us — it walks beside us, whispering its truths into the present."
আর প্রকাশনা? পত্রভারতী সেই জায়গাতেই স্থির যেখানে “standard” শব্দটা শুধু প্রচল নয়, একরকম দায়িত্ব। পরিপাটি বাঁধাই, ঝকঝকে ছাপা, আর কাগজের টেক্সচার—সবকিছু মিলিয়ে বইটা হয়ে উঠেছে একখানা collectible artifact। শুধু পড়ার বইই নয়, সংগ্রহে রাখার আর flaunt করার
শেষে যা বলার থাকে: এই বই কেবল পাঠ নয়—এ এক অনুভবের যাত্রা
‘রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক’ এমন একটি বই, যা আপনাকে dry history শেখায় না — জাগিয়ে তোলে আপনার অন্তরের ইতিহাসবোধ। উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায় যেন সময়ের গায়ে হাত রেখে বলে—“চলুন, একটু হেঁটে দেখা যাক, কেমন ছিল সেই আলো-আঁধারির যুগ।”
আঠারো-উনিশ শতকের ভারি বাতাস, গোঁড়ামির কুয়াশা, যুক্তির দীপ্তি, কাঁপা কণ্ঠে সত্যের স্বর—সব মিলিয়ে মনে হবে, রামমোহন আপনার হাতে হাত রেখে, ঠিক আপনার পাশেই হাঁটছেন। তাঁর হাতে মশাল, আপনি অপলক তাকিয়ে সেই শিখার দিকে —ভবিষ্যৎ আলোকিত করার দায় যেন এখন আপনারই হাতে।
এই উপন্যাস পাঠ করা মানে শুধু ইতিহাস জানা নয়—নিজেকে প্রশ্ন করা, “আমিও কি হতে পারি একজন পদাতিক?”
এখনও পড়েননি? তবে এখনই পড়ুন।
পড়ে ফেলেছেন? তাহলে অন্য কাউকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করুন। কারণ, ‘প্রথম পদাতিক’ শুধু এক ব্যক্তির লড়াই নয়—এটা আমাদের সবার লড়াই। "In collective struggle, we do not merely bear the weight — we become the force that moves mountains."
চার বছর আগের কথা– রাজা ভট্টাচার্য স্যারের 'দ্বারকানাথ – পরাধীন দেশের রাজপুত্র' বইটি পড়েছিলাম। বাকিটা বলার আগে এখানে আমার একটা রোগের কথা বলে নেওয়াটা খুবই জরুরী। রোগটা হলো– আমি যখনই কোনো একটা বই পড়ি এবং পড়তে পড়তে সেই বইটা এবং বইটার লেখক আমার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন, তখন আমার মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত ধরণের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে যায়। যার ফলে সেই বইতে বর্ণিত কোনো চরিত্র বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমি কল্পনা করতে থাকি যে কেমন হতো যদি এই পছন্দের লেখক মহাশয় (লিঙ্গভেদে মহাশয়া) এই চরিত্র বা ঘটনাকে নিয়েও আলাদা করে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখে ফেলেন! 'দ্বারকানাথ' পড়ার সময় রাজা রামমোহনের চরিত্রটা নিয়েও আমার মস্তিষ্কে এই বিক্রিয়াই খেলা করছিল। অন্তর্যামীর বরে এবং রাজাবাবুর আশীর্বাদে এই বছর হাতে পেলাম 'রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক'। তাই বলে এটা মনে করার কোনো দরকার নেই যে বিগত চার বছর পাঠকবৃন্দ উনার আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত ছিল। আশীর্বাদ বর্ষিত হয়েছে বরাবরই 'লক্ষ্মণ চরিত মানস' (অক্টোবর ২০২০), বাল্মীকির রামায়ণে নেই (এপ্রিল ২০২১) এবং মেঘদূতম (জুন ২০২৪) রূপে। সেসব নিয়ে কথা হবে অন্যদিন। বৃষ্টি এলে ছাতা ধরে ভেজা থেকে বাঁচা সহজ, কিন্তু নাক চেপে মাটির সোঁদা গন্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা প্রাণঘটকম্! এমনটা করলে প্রাণ-বাবাজীকে বলতে হবে, "আজ এসো বাবা, পরে দেখা হবে"! কিন্তু পাঠকরূপী পাখিকে বইরূপী খাঁচায় কিভাবে ধরে রাখতে হয় তা আমাদের 'রাজা'-বাদশাহ ঠিকই জানেন। বছরে ৬০/৭০ টা বইয়ের বেশী এই গরীব লোকটা পড়তে পারে না। এর মধ্যে বেশীরভাগ বই-ই একেকটা যুদ্ধ, আর যুদ্ধে হার-জিত তো লেগেই আছে! কিন্তু দু-চারজন লেখক এমনও রয়েছেন যাঁদের বই মানেই বরদান। রাজা স্যার এর মধ্যে নিঃসন্দেহে বিরাজমান। এবার আসি 'রাজা রামমোহন'-এ। এই বইয়ের 'লেখকের কথা'য় লেখা ছিল "এটি প্রথমত এবং শেষত একটি উপন্যাস। এই বইয়ে নীরস সত্য ও তথ্যের বিশ্লেষণ খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে।" কিন্তু বইটা পড়তে গিয়ে 'সত্য ও তথ্যের বিশ্লেষণ' খুঁজতে হয়নি একেবারেই কারণ সেসবে বইটি এমনিতেই ছিল বনগাঁ লোকালের মতোই ঠাসাঠাসি কাণ্ড! বইয়ের শুরুতে রাজা রামমোহনের intro-টা বেশ চমৎকার! তারপর শুরু হয় ২৬টি অধ্যায়ের এক সুশোভিত যাত্রা। এখানে আমার একটা ভালোলাগার কথা বলে রাখি– ২, ৩ এবং ৬ নম্বর অধ্যায়ে ভুবনমোহন গাঙ্গুলীর সাথে রামমোহনের অনেক গল্প-গুজব হয়। প্রথম দুটি অধায়ে রামমোহনের বয়স ছিল ১২ এবং শেষটাতে ২৯। এই ১৭ বছরের ফারাকটা রামমোহনের ভাষা এবং চিন্তাধারায় লেখক যেভাবে এঁকেছেন তা সত্যিই সাধুবাদের যোগ্য। রামমোহনের বাল্মীকি রামায়ণ পাঠ থেকে শুরু করে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে গৃহত্যাগের বর্ণনাই হোক অথবা করণিকের চাকুরিলাভ থেকে রামমোহনের ভাষাজ্ঞানের পরিচয়ই হোক – কোত্থাও একতিলও মনে হয়নি যে এগুলো শুধুই নীরস তথ্য বা কেবলই উপন্যাসিক সদাবাহার। তথ্য এবং উপন্যাসিক মর্যাদার এক অনুপম মিশ্রণ প্রত্যেকটা অধ্যায়েই বিলক্ষণ। ৯ম অধায়ে রামমোহনের বউদিদির আত্মদাহ এবং ১৭তম অধ্যায়ে বীরনৃসিংহ মল্লিকের বাড়ির বউয়ের সতীদাহ প্রথার বর্ণনা পড়তে পড়তে শিউরে উঠেছিলাম। অন্যদিকে সশব্দে হেসেও ছিলাম রামমোহনের প্রথম 'স্বাস্থ্যপান' দীক্ষা এবং 'লোনা লাগা'র বর্ণনায়। এই বইয়ের অনেকটাতেই জুড়ে রয়েছেন দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং ডেভিড হেয়ার। রামমোহনের জীবনজুড়ে রয়েছে এই দুজনের অসাংবিধানিক বন্ধুত্ব। তাছাড়াও রয়েছে ব্রাহ্মসমাজ, হিন্দু কালেজ, সংবাদ কৌমুদীর জন্ম বৃত্তান্তের সুঠাম বর্ণনা। প্রচুর ধন-ঐশ্বর্য এবং সম্মানের বাহক এবং 'রাজা' উপাধির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও একসময় লোকদেখানোর তাগিদে সর্বহারা হয় ওঠেন ভারতবর্ষের এই লোকনায়ক। আমার মনে হয় কাউকে তাচ্ছিল্যের কাঠামোতে দাঁড় না করিয়ে বরং ইতিহাসের পাতা থেকে শিখে নেওয়া উচিত জীবনের গূঢ় রহস্য। আর এই গুপ্তধনের চাবি সার্বজনীন হয়েছে এক রাজার জুবানিতে আরেক রাজার কাহিনী। যদি এই বইটা আগেই পড়ে থাকেন তবে আপনাকে অভিনন্দন। আর না পড়ে থাকলে বলবো – পা বাড়ান 'পত্রভারতী'র দিকে, সৎপথে কামানো আরও কয়েকটা টাকা খরচ করুন অতি উত্তম সৎ কম্মে এবং অবশ্যই পড়ে ফেলুন রাজা ভট্টাচার্যের 'রাজা রামমোহন – প্রথম পদাতিক'। বি. দ্র.:- আমার মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথা আগেই লিখেছি। 'রাজা রামমোহন' পড়ার সময়ও ওর নাচ খতম হয়নি। সতীদাহ প্রথা নিয়ে এই বইতে অনেকটা পড়েছি বলেই হয়তো আরেকটা নাম মগজে সাঁতার কাটছিল, আর তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই বইতে ওঁনার উল্লেখ নেই কারণ রামমোহন এবং ঈশ্বরচন্দ্র সমসাময়িক নন। তবে সতীদাহ প্রথা এবং বিধবাবিবাহ প্রচলন ভারতীয় নারীর সাথে জড়িত দুটো উল্লেখনীয় বিষয়, যার দুই প্রান্তে রয়েছেন স্বয়ং 'রাজা' এবং 'ঈশ্বর'! জানিনা এবারও অন্তর্যামীর বর এবং 'রাজা'-বাদশাহের আশীর্বাদ পাবো কি না, তবু মন বলছে– "জিন্দেগী এক সফর হে সুহানা ইহা কাল ক্যা হো কিসনে জানা।"
দ্বারাকানাথ পড়ার পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিলো তা রামমোহনে পূরণ হয়েছে বলেই মনে হয়।এই উপন্যাস রামমোহনের ছোটবেলা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত।এই উপন্যাসে রামমোহনের বিভিন্ন কর্মের বিবরণ আছে।খুবই নির্মেদ কাহিনী বিস্তার।সেখানে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই বর্ণনা আছে।এই উপন্যাসে এসেছে দ্বারকানাথ,ডেভিড হেয়ার প্রমূখ বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কর্ম সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে।ছোটবেলা থেকেই রামমোহন মূর্তি পূজার বিরোধী ছিলেন।তিনি নিরাকার ব্রহ্মের পূজারী ছিলেন।এই নিয়ে তর্ক যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেন।নিজের বৌদিকে স্বইচ্ছায় সহমরণে যেতে দেখে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন এই প্রথা তিনি বিলোপ করবেন।অনেক যুদ্ধের পর তিনি তা করেনও।পড়তে পড়তে পাঠক একদম রামমোহনের সাথে একাত্ম হয়ে যাবেন।শেষে রামমোহনের মৃত্যুতে এক কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে। এই উপন্যাস এখন সবার পড়া উচিৎ। আমাদের এই সময়ে এক রামমোহনের খুব দরকার।যে বাঙালির হয়ে লড়বে আর মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে চিৎকার করবে।