Jump to ratings and reviews
Rate this book

শেষ নমস্কার

Rate this book
Tamil
624

**Contents and Sample Pages**

























324 pages, Hardcover

First published March 1, 2013

4 people are currently reading
60 people want to read

About the author

Santosh Kumar Ghosh

15 books2 followers
সন্তোষকুমার ঘোষের জন্ম ২৩ ভাদ্র ১৩২৭ বঙ্গাব্দ (৯ সেপ্টেম্বর ১৯২০), অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ি নামের মহকুমা শহরে। বাবা সুরেশচন্দ্র। মা সরযূবালা।রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে বাংলা ও গণিতে লেটার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় (১৯৩৬) উত্তীর্ণ হন।বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বি এ (১৯৪০) পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ (অর্থনীতি)-তে ভর্তি হলেও পড়া অসমাপ্ত থেকে যায়।১৯৪১-৪২ নাগাদ ‘প্রত্যহ’ নামের কাগজে সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত। তারপর ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় যোগদান। ১৯৪৬-এ বিবাহ। স্ত্রী নীহারিকা। ১৯৫০-এ সাব-এডিটর হিসেবে ‘স্টেটসম্যান’-এ যোগ দেন, ১৯৫১-তে আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠানের পত্রিকা ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’-এর চিফ-সাব-এডিটরের দায়িত্ব নিয়ে দিল্লি যান। ১৯৫৮-তে কলকাতায় ফিরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র বার্তা-সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৪-তে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ও ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’-এর সংযুক্ত সম্পাদক। ১৯৭৬-এ ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র যুগ্ম-সম্পাদক ।প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘পৃথিবী’ (নবশক্তি, ১৯৩৭), প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বিলাতী ডাক’ (ভারতবর্ষ, ১৯৩৭)। ‘কিনু গোয়ালার গলি’ উপন্যাস ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশের সময়েই পাঠক ও সাহিত্যিক মহলে যথেষ্ট সাড়া ফেলে দেয়।পুরস্কার: আনন্দ পুরস্কার (১৯৭১), বিশেষ আনন্দ পুরস্কার (১৯৭২), আকাদেমি পুরস্কার (১৯৭২)।‘তাইওয়ান কবি সংঘ’ থেকে ১৯৮৪-তে সাম্মানিক ডি লিট উপাধি-প্রাপ্তি। মৃত্যু: ১৪ ফাল্গুন ১৩৯১ (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫)।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
7 (46%)
4 stars
3 (20%)
3 stars
3 (20%)
2 stars
1 (6%)
1 star
1 (6%)
Displaying 1 - 5 of 5 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,668 reviews432 followers
Read
September 24, 2025
"কিছুকাল আগে একটি সত্যিকার মৃত্যুকে জেনেছি, তখন আবার যেন নিজে নিজেই টের পেলাম, অনুপস্থিতিও একটা মৃত্যু, মৃত্যুর মতোই।"

দীর্ঘ উপন্যাসটির পুরোটাই মা-কে লেখা এক চিঠি কিংবা স্বগতকথন। অনেক নাটকীয় ঘটনা আছে এখানে। সুনীলের ভাষা ধার করে বলা যায় লেখক যেন কিছুক্ষেত্রে অপদেবতার সাধনা করেছেন (একটার পর একটা দুঃসহনীয় ঘটনা ঘটে যেতে থাকে নায়কের জীবনে।) এতোকিছুর পরও "শেষ নমস্কার শ্রীচরণেষু মাকে" ভালো লাগলো। কারণ সন্তোষকুমার ঘোষ যেভাবে যা বর্ণনা করেন তা বিশ্বাস্য মনে হয়, আপন মনে হয় কথককে। বিপুল বেদনার্ত এক জগত আর তার মানুষজনকে সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যতার সাথে উপস্থাপনের জন্য এই লেখা স্মরণীয়।
Profile Image for Madhurima Nayek.
361 reviews134 followers
March 25, 2019
কথাসাহিত্য জগতে সন্তোষকুমারের আত্মপ্রকাশ ছোটগল্পকার হিসাবে(গল্পটির নাম - বিলাতী ডাক)। উপন্যাসটি ' দেশ ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।১৯৭২ এর আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত উপন্যাস এটি। উপন্যাসটি পত্রাকারে লেখা। স্বভাবতই এটি একটি পত্রপন্যাস ।

তাঁর প্রথম চিঠি " শ্রীচরণেষু মা! " এই বাক্যটিই উপন্যাসটির প্রারম্ভিক বাক্য, আর শেষ হলো " মা তাই না? " বাক্যটির মধ্য দিয়ে। - শুরু ও শেষে মাতৃ সম্মোধন, সমগ্র উপন্যাস মাকে লেখা সন্তানের একটি চিঠি ।এই একটি চিঠিই সম্পূর্ণ উপন্যাস। এক সন্তান তার মাকে পাঠানো চিঠিতে নিজের শৈশব - কৈশোর - যৌবনের পরিচয় দিয়ে তার বর্তমান পৌঢ়াবস্থায় যন্ত্রণা দগ্ধ রূপটি প্রকাশ করেছে।
Profile Image for Wasee.
Author 51 books787 followers
September 19, 2018
১৯৭২ সালে অকাদেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত "শেষ নমস্কারঃ শ্রীচরণেষু মা'কে"। বইটিকে লেখকের আত্মজীবনী নির্ভর ধরা হয়ে থাকে। চিঠির আঙ্গিকে লেখা এই নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে নিঃসন্দেহে এক অনন্য সংযোজন।

"আসলে মা আর ছেলের সম্পর্কের মধ্যে পা টিপে টিপে যে এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তার নাম বয়স। সে-ই বদলে দেয়, সে-ই মূল, আমরা ভুল করে তাকে 'বন্ধু', 'বউ' বা বিভিন্ন নাম দিয়ে থাকি। আদম আর ইভের মধ্যে যেমন ছদ্মবেশী সাপ, মা আর ছেলের সম্পর্কের নন্দনে তেমনই বয়স। সেই বয়সই আমাদের বদলে দেয়, ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে দূরে ঠেলে দেয় ক্রমশ।"

Profile Image for Preetam Chatterjee.
6,943 reviews370 followers
July 11, 2025
“শেষ নমস্কার” ও মাতৃত্বের প্রতিধ্বনি: এক সাহিত্যিক অনুসন্ধান

(এই রিভ্যু আমি উৎসর্গ করলাম অগ্রজ ও বন্ধু , কথাশিল্পী / সমালোচক, ঋজু গঙ্গোপাধ্যায়'কে)

১) আলোচনার নান্দীমুখ:

“But there's a story behind everything. How a picture got on a wall. How a scar got on your face... But behind all your stories is always your mother's story, because hers is where yours begin.” — Mitch Albom, For One More Day

প্রতিটি গল্পের নেপথ্যে আরেকটি গল্প লুকিয়ে থাকে—স্মৃতির কোণে, কোনো চুপচাপ ফ্রেমে, অথবা বুকে রাখা এক দাগের মতো। আর সেই সব গল্পেরও মূল থাকে একটিমাত্র নামের কাছে ফিরে—মা। তিনিই সেই প্রথম গল্প, যার গর্ভ থেকে আমাদের সকল বর্ণনা, ব্যথা, ভালোবাসা, বিরহ—সবকিছু জন্ম নেয়।

এই মাতৃত্ব, এই অনন্ত ঋণের ভিতরেই জন্ম নেয় কিছু সাহিত্য, যাদের পাঠ আমাদের চেতনাকে শুধু স্পর্শ করে না, কখনও-কখনও ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সন্তোষকুমার ঘোষের শেষ নমস্কার এমনই এক উপন্যাস—যেখানে মাতৃত্ব আর মাতৃবিয়োগ একসঙ্গে পথ হাঁটে; যেখানে মায়ের নিঃশব্দ উপস্থিতি একটি পুত্রকে বাধ্য করে মুখোমুখি হতে নিজেকে, তার স্মৃতিকে, এবং তার অপরাধবোধকে।

এখানে ‘মা’ কেবল রাঁধুনি, স্নেহময়ী সত্তা নন—তিনি এক রহস্যময় অবয়ব, যাঁর নিজের জীবন, ভালবাসা, ভাঙন, নীরবতা—সবই এতদিন ছেলের দৃষ্টির আড়ালে ছিল। উপন্যাসের শুরুতেই যখন লেখক বলেন,

“মা আমার চেয়ে অন্তত কুড়ি বছরের বড়, এটা আমি জানি। কিন্তু ঠিক কত বড়, কত বছর বয়সে তিনি মারা যেতে পারেন, তা আমার জানা নেই।”

তখনই পাঠকের মনে এক প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই আমাদের মায়েদের চিনি?

শেষ নমস্কার আসলে সেই চেনা না-চেনার সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অন্তর্দর্শন। এই উপন্যাস সেইসব না-বলা কথার প্রতিধ্বনি, যা হয়তো আমরা কখনও বলতে পারিনি, কিংবা সাহস করিনি বলতে—আর মা’রাও যা চুপচাপ বয়ে নিয়ে গেছেন। এটি এক স্মৃতিচারণ নয়, বরং স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়া—যেখানে একটি পুত্র শেষবারের মতো চোখ মেলে চায় তার মায়ের দিকে, আর বুঝতে চায়, তাঁর সব গল্পের জন্ম তো সেখান থেকেই।

২) উপন্যাসের রূপরেখা ও অন্তর্লীন আবেগ:

এটি মূলত এক পুত্রের আত্মদর্শনের দীর্ঘ যাত্রা—যার শুরু তাঁর মা'র মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেই খুলে যায় এমন এক দরজা, যার ওপারে একজন ‘মা’ নন, একজন ‘মানুষ’ দাঁড়িয়ে আছেন—নিঃসঙ্গ, অপূর্ণ, বিস্মৃত, অথচ অনন্তভাবে স্পর্শকাতর।

উপন্যাসের শুরুতেই লেখক বলেন— “মা আমার চেয়ে অন্তত কুড়ি বছরের বড়, এটা আমি জানি। কিন্তু ঠিক কত বড়, কত বছর বয়সে তিনি মারা যেতে পারেন, তা আমার জানা নেই।”

এই সরল স্বীকারোক্তির ভিতরেই লুকিয়ে আছে একটি অসাধারণ জটিলতা। এখানেই ধরা পড়ে—ছেলেটি জীবনের এতগুলো বছর মাকে শুধুই ‘মা’ হিসেবে দেখেছে, একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়। সেই মানুষটির নিজের শৈশব, যৌবন, স্বপ্ন, প্রেম, অসুখ, নিঃসঙ্গতা, প্রতিবাদ—সব কিছুই থেকে গেছে তার দৃষ্টির বাইরে।

‘শেষ নমস্কার’ এই অদৃশ্যতাকেই দৃশ্য করে তোলার চেষ্টা—একজন মায়ের জীবনের ছেঁড়া পৃষ্ঠাগুলো নতুন করে পড়ে ফেলার প্রচেষ্টা। মৃত্যুশয্যার একান্ত নীরবতা এখানে আত্মজিজ্ঞাসার শব্দে পরিণত হয়, আর প্রতিটি স্মৃতির পরতে পরতে প্রশ্ন জেগে ওঠে—“কে ছিলেন আমার মা, সত্যিই?”

এ উপন্যাস কেবল এক মাতৃহারা ছেলের শোকগাথা নয়। বরং এটি এক প্রয়াস—মা নামক সম্পর্কের পেছনে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিসত্তাকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। এটি একরকম re-humanisation of the mother figure—যেখানে মা শুধুই পরিচর্যার প্রতিমূর্তি নন, বরং flesh-and-blood এক নারী, যার হাসি, কান্না, ক্লান্তি ও লজ্জা আছে।

এই পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়েই ছেলেটি তার নিজের অস্তিত্বকেও নতুনভাবে দেখতে শুরু করে। মায়ের গল্পের ভিতর দিয়েই সে পৌঁছায় নিজের গল্পে—যেমনটা মিচ আলবম বলেছিলেন,

“Behind all your stories is always your mother's story, because hers is where yours begin.”

৩) Thematic সেতুবন্ধন: বিশ্বসাহিত্যের আলোয় “শেষ নমস্কার”

সন্তোষকুমার ঘোষের শেষ নমস্কার যেন নিছক এক ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, বরং তা বিশ্বসাহিত্যে ছড়িয়ে থাকা মা-সন্তান সম্পর্কের গভীরতম প্রতিধ্বনির অংশ। এই উপন্যাসের আবেগ ও আত্মবিশ্লেষণ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা তাকে বসিয়ে দেখি সেইসব অনন্য গ্রন্থের পাশে—যেখানে মাতৃত্ব কেবল পরিচর্যার ভূমিকা নয়, বরং এক জটিল, রহস্যময়, এবং কখনও-কখনও আত্মঘাতী অনুভব।

ক) ইডিপাল আকর্ষণ ও আত্মপরিচয়ের সংকট: D.H. Lawrence-এর Sons and Lovers-এ গার্ট্রুড মোরেল যেন তার পুত্র পলের উপর নিজের সমস্ত ভরসা চাপিয়ে দেন। এই মানসিক পরজীবিতা পলের প্রেমজ জীবন বারবার ধ্বংস করে। ঠিক তেমনি, শেষ নমস্কার-এর লেখক উপলব্ধি করেন—তাঁর মা হয়তো নিঃসঙ্গ ছিলেন, নিঃশব্দে এক ধরনের নির্ভরতার আকুতি লুকিয়ে রেখেছিলেন, যেটা ছে���েরা কোনোদিন বুঝতে চায়নি বা পারেনি।

আর Gora-তে রবীন্দ্রনাথ মাতৃত্বকে রক্তের সূত্র থেকে ছাড়িয়ে, এক আত্মিক ও আদর্শগত সম্পর্কের রূপে নির���মাণ করেন—যার প্রতিধ্বনি আমরা শেষ নমস্কার-এও পাই, যেখানে মাতৃত্বের পরিচয় জাগে স্মৃতির ভিতর দিয়ে, আত্মানুসন্ধানে।

খ) মাতৃত্বের নীরবতা ও দগ্ধ ভালোবাসা: Room-এ এমা ডোনাহ্যু এক মার সাহসিকতাকে দেখান, যিনি একটা ছোট ঘরের ভেতরেই ছেলের জন্য নির্মাণ করেন এক গোটা কসমস—আশ্রয়, প্রেম, শিক্ষা, জীবন। শেষ নমস্কার-এও মায়ের সেই নীরব লড়াই থাকে—অস্পষ্ট, কিন্তু ছেলের স্মৃতির প্রতিটি পরতে বিদ্যমান।

যেমন পথের পাঁচালীতে সর্বজয়া বারবার ঝড় সামলে দাঁড়িয়ে যান, তেমনি শেষ নমস্কার-এর মা-ও নিজের দুঃখের ভাষা গিলে ফেলেন, কিন্তু এক অস্ফুট উপস্থিতিতে চিরকাল ছেলের হৃদয় জুড়ে থেকে যান। ভাষাহীন ভালোবাসার অনুরণন—সেই তো সবচেয়ে গভীর শব্দ।

গ) আঘাত, দুঃখ এবং মাতৃত্বের জঠরগর্ভ অন্ধকার: Beloved-এ টোনি মরিসন দেখান কীভাবে এক মা অতিমাত্রায় ভালোবাসার চাপে নিজের সন্তানকে আত্মোৎসর্গের পথে ঠেলে দেন। আবার The Fifth Child-এ ডরিস লেসিং দেখান এমন এক সন্তানের গল্প, যাকে ভালোবাসতে গিয়ে মা নিজেই হিংস্রতার শিকার হন।

শেষ নমস্কার-এর লেখকও ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, তাঁর মা শুধু ‘স্নেহময়ী’ ছিলেন না। তিনি ছিলেন না-বলা যন্ত্রণার আধার—একজন যিনি একাকী নিজের দহন বয়ে নিয়ে গেছেন, ছেলেদের সুরক্ষিত রাখতে চেপে গেছেন নিজের ক্লান্তি, লজ্জা, ক্ষোভ।

ঘ) হারানো মায়ের ছায়া ও অনুপস্থিতির প্রভাব: Haruki Murakami-এর Norwegian Wood-এ চুপ করে থাকা মায়ের অনুপস্থিতি গুমরে ওঠে ছেলের ব্যক্তিত্বে। আবার Faulkner-এর The Sound and the Fury-তে এক শীতল, নিঃস্পৃহ মা তার সন্তানদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। এইসব ‘non-mothers’ বা ‘absent mothers’ আসলে সন্তানদের মানসিক মানচিত্রে রেখে যান দগদগে শূন্যতা।

ঠিক তেমনি শেষ নমস্কার-এর লেখকও মায়ের মৃত্যুর পর অনুভব করেন—তাঁর গল্পগুলোর মধ্যিখানে এক নীরব অথচ তীব্র অনুপস্থিতি কাজ করছে। যেটা এতদিন তিনি খেয়ালই করেননি—যেন কোনো দরজা সবসময় খোলা ছিল, অথচ তিনি ভিতরে কখনও ঢোকেননি।

এইভাবেই শেষ নমস্কার শুধু একটি ব্যক্তিগত শোকগাথা নয়, বরং একটি সাহিত্যিক অন্বেষা—যেখানে মাতৃত্ব শব্দটির ভেতর ঢুকে দেখি তার দহন, তার নিরবতা, তার বিস্মরণ, এবং সবশেষে—তার মহিমা।

৪) এক ব্যক্তিগত স্মৃতিপত্র: উপন্যাসের শেষে একটি চিঠি

এই উপন্যাসের সবচেয়ে করুণ, আর হয়তো সবচেয়ে সত্য অংশটি লুকিয়ে আছে তার শেষ পাতায়—একটি চিঠিতে, যা এক পুত্র লেখে তার মৃত মাকে। এই চিঠি যেন সমস্ত উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত অথচ বিস্ফারিত আত্মা।

“এই উপন্যাস শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে তোমার শরীরটাও নিথর হয়ে যাবে মা।”

এই একটি বাক্যেই জীবন ও সাহিত্য একসঙ্গে দারুণ মিশে যায়। লেখক জানেন—এই উপন্যাসের মাধ্যমেই তিনি মাকে আবার একবার ছুঁতে চাইছেন, আবার একবার বিদায় জানাচ্ছেন। বাস্তবে যেটা বলা হয়নি, সেই “শেষ নমস্কার”টি লেখা হয় কাগজে।

“তুমি আমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসতে মা। আমি সেটা নিতে পারতাম না।”

এই স্বীকারোক্তি যেন সব ছেলেদেরই গোপন অপরাধবোধ। কখনও তারা ভালোবাসা নিতে পারে না, কখনও তা ফিরিয়ে দেয়, আবার কখনও সেই ভালোবাসার ওজনেই তারা ভেঙে পড়ে।

এই চিঠিতে আমরা পাই—

১) এক পুত্রের অনুশোচনার দহন,

২) এক মৃত্যুর পর পরিপূর্ণ উপলব্ধির বিস্ফোরণ, আর

৩) মাতৃত্বের অসহায় রূপের সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়ানো এক সন্তান।

এইখানেই শেষ নমস্কার কেবল একটি আখ্যান নয়, হয়ে ওঠে একটি স্মরণমালা—একজন মৃতার জন্য, যিনি কখনও পুরোপুরি মরেন না।

কারণ যেমন Mitch Albom লিখেছিলেন:

“But there's a story behind everything…
But behind all your stories is always your mother's story,
because hers is where yours begin.”

এই উপন্যাসের শেষ চিঠিটাই তাই পাঠকের কাছে একটা মৌন শেষ নমস্কার—যা উচ্চারিত হয় না, কিন্তু থেকে যায় কাগজের নিচে, চোখের জলে, কিংবা বুকের ভিতর এক গভীর শূন্যতায়।

৫) সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি: এক চিরকালীন অনুচ্চারিত শব্দের প্রতিধ্বনি

“শেষ নমস্কার” কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি এক অনুচ্চারিত বিদায়ের স্থির প্রতিমা। বাংলা সাহিত্যে এমন কম সাহিত্যকর্মই আছে, যেখানে মা-সন্তান সম্পর্ককে এমন সাহসিকতায়, এমন আন্তরিকতায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে—যেখানে “মা” কেবল আবেগের অবয়ব নন, বরং এক সত্তা, এক ছায়া, এক অপরিণত সত্যের প্রতিচ্ছবি।

এই উপন্যাসে মা হয়ে ওঠেন একান্ত ব্যক্তিগত, অথচ মহাজাগতিক বাস্তবতার প্রতীক। এখানে মাতৃত্ব নিখুঁত নয়—ত্রুটিপূর্ণ, জর্জরিত, নিঃশব্দ; কিন্তু তার ভালোবাসা অবিনশ্বর, অমোচনীয়।

“My mom smiled at me. Her smile kind of hugged me.” — R.J. Palacio, Wonder

এই লাইনটি যেন “শেষ নমস্কার”-এর প্রতিটি শব্দের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। উপন্যাসটি বারবার মনে করিয়ে দেয়, মায়েরা ভাষায় নয়, অভিমানে, চুপচাপ ভালোবাসায় কথা বলেন। পাঠকের মনেও জেগে ওঠে সেই অস্ফুট স্মৃতি—মায়ের হাসি, কপালের ঘাম, আর বুকের ভিতরে জমে থাকা না-বলা ভালোবাসা।

জীবনের কাঠামোটা অনেকটা Mirror of Erised-এর মতো—আমরা দেখি যা আমরা হারিয়েছি, অথবা যা আর কোনওদিন ফিরে পাবো না।

“Can you think what the Mirror of Erised shows us all?" Harry shook his head.

"Let me explain. The happiest man on earth would be able to use the Mirror of Erised like a normal mirror, that is, he would look into it and see himself exactly as he is. Does that help."

Harry thought. Then he said slowly, "It shows us what we want... whatever we want..."

"Yes and no," said Dumbledore quietly.

"It shows us nothing more or less than the deepest, most desperate desire of our hearts. You, who have never known your family, see them standing around you. Ronald Weasley, who has always been overshadowed by his brothers, sees himself standing alone, the best of all of them. However, this mirror will give us neither knowledge or truth. Men have wasted away before it, entranced by what they have seen, or been driven mad, not knowing if what it shows is real or even possible.

"The Mirror will be moved to a new home tomorrow, Harry, and I ask you not to go looking for it again. If you ever do run across it, you will now be prepared. It does not do to dwell on dreams and forget to live, remember that.

Now, why don't you put that admirable cloak back on and get off to bed.” ― J.K. Rowling, Harry Potter and the Sorcerer's Stone

এই উপন্যাস সেই দর্পণের মতই আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের সবচেয়ে গভীর ইচ্ছেটিকে—আমাদের মায়ের মুখ, হয়তো শেষবারের মতো।

এবং যখন George Washington বলেন: “All I am I owe to my mother...”

তখন আমরা বুঝতে পারি—“শেষ নমস্কার”-এর প্রতিটি পৃষ্ঠা সেই ঋণস্বীকারেরই এক রূপ। লেখক তার সত্তার প্রতিটি ভাঁজ খুলে দেখান কিভাবে এক “অস্পষ্ট সম্পর্ক” আজীবন তাকে রচনা করে গেছে।

এটি সেই ধরণের উপন্যাস, যা শেষ হয়ে গেলেও বাকিটা পাঠককে দিয়ে লেখায়। যে উপন্যাসটি মনে করিয়ে দেয়— আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ের ভিতরে এক ‘শেষ নমস্কার’ চুপ করে বসে থাকে। সময়মতো তা না বললে, সে অনুচ্চারিত শব্দ হয়ে বুকের ভিতর আজীবন নীরব প্রতিধ্বনি তোলে।

এই উপন্যাস তাই পাঠকের চোখে জল আনে না— এই ন্যারেটিভ পাঠকের অন্তরাত্মায় মেলে ধরে একটা আয়না — যেখানে প্রতিফলিত হয় একজনের হারিয়ে যাওয়া মা, আরেকজনের বলা না-বলা, অস্ফুট শেষ নমস্কার।

এবং ঠিক তখনই আমরা বুঝি—এই গল্প শুধু লেখকের নয়। এটা আমাদের সকলের।

অলমতি বিস্তরেণ।


Addendum, 2025, Re-read:

শ্রীচরণেষু মাকে: শেষ নমস্কারের পুনর্পাঠে আত্মার আয়না

সন্তোষকুমার ঘোষের আত্মজৈবনিক উপন্যাস শেষ নমস্কার—একটি দীর্ঘ চিঠির মতো লেখা, কিন্তু পাঠ শেষে মনে হয় যেন আত্মার এক অনর্গল বর্ণনাপর্ব। এ কেবলমাত্র একটি পুত্রের তার মৃতা মাকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠির ধারাবাহিকতা নয়; বরং এ এক আত্মসন্ধানের যাত্রা—যেখানে মা মানে শুধু ব্যক্তি নয়, বরং এক প্রোটোটাইপ, এক নৈর্ব্যক্তিক গৃহস্থ ঈশ্বরীর প্রতিমা, যাঁর ছায়া আমরা আজীবন খুঁজি। ১৯৭২ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত এই রচনাটির পঠন যেন নিজেকেই ফিরে ফিরে দেখার শাস্ত্রীয় সাধনা।

আমি যখন বইটি পড়ছিলাম, প্রতিটি পৃষ্ঠার সাথে যেন আত্মোপলব্ধির এক নতুন দ্বার খুলে যাচ্ছিল। লেখক নিজেকে ভেঙে ভেঙে পুনর্গঠিত করছেন—জন্মের ব্যথা থেকে শুরু করে মৃত্যুর গহ্বরে নামার আগে পর্যন্ত এক সমগ্র জীবনকে ছুঁয়ে, ছিন্ন করে আবার জোড়া দ��চ্ছেন। তিনি লেখেন—"পরে জেনেছি সব মানুষই আসলে একা", এই একাকিত্ব বোধের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান মাতৃরূপে পরমাত্মাকে।

একদিকে যেমন রয়েছে লেখকের শৈশবে দেখা মৃত দাদার দীর্ঘ ছায়া, অন্যদিকে মাতৃসম্ভাবনার জটিল অন্বেষণ। মা যেন সবকিছুর কেন্দ্র, কিন্তু তার অস্তিত্বও যেন এক রহস্য, এক অনিঃশেষ অন্বেষা। কখনো রাগ, কখনো অভিমান, কখনো অপরাধবোধ, কখনো বা নিঃশব্দ ভালোবাসার পংক্তিমালা। আত্মদহন আর আত্মমুক্তির দ্বন্দ্বে পূর্ণ এই গদ্যরূপী আখ্যান—আসলে এক দীর্ঘ প্রার্থনা, যার ভাষা অতুলনীয়ভাবে সরল অথচ তীব্র। তাঁর সেই স্বীকারোক্তি—"আমি কি নিজেই না বুঝে একটা মরা মানুষকে হিংসা করছি?"—এই পংক্তি পড়ে বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগে।

পাঠের অভিজ্ঞতায় একধরনের থেরাপি রয়েছে। যেন লেখকের হাত ধরে আমিও নিজের ভেতরের দীর্ঘদিনের জমে থাকা কুয়াশাকে ছুঁয়ে দেখছি। এই বই শুধুমাত্র লেখকের কৈশোর-যুবাবস্থার অভিজ্ঞতার কথা নয়, বরং তাতে ছড়িয়ে আছে এক-একটা চিঠির মধ্যে চাপা অশ্রু, নীরব পাপবোধ, এবং পরিশেষে মুক্তির চেষ্টা।

আমার নিজের মায়ের উদ্দেশে লেখা চিঠির অভ্যন্তরীণ অভিঘাত আর শেষ নমস্কার-এর পাঠ-অভিজ্ঞতা মিলেমিশে একটা অদ্ভুত ভারসাম্য রচনা করেছিল। নিজের অক্ষমতা, রাগ, এবং অপরাধবোধের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আমি হঠাৎ উপলব্ধি করেছিলাম—এই উপন্যাস আমার জন্যও লেখা হতে পারে। সবারই মা থাকে, কিন্তু সবাই কি তাঁকে খুঁজে পায়? লেখক যেন সেই নিখোঁজ মাতৃরূপের সন্ধানেই পথ হাঁটছিলেন।

এবং এই হাঁটাচলা ছিল সংবেদন, ভাষা এবং নির্জন আত্মালাপের এক শুদ্ধ উদযাপন। কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তীর লেখা ভূমিকা ও আলোক চক্রবর্তীর 'শেষ নমস্কার' নামক আলোকপাত-নিবন্ধটি পাঠকে লেখকের ব্যক্তিগত ভূগোলে ঢুকতে সাহায্য করে। আর তখনই বোঝা যায়—এ উপন্যাস নয়, এ এক দেহরেখা, রক্তে লেখা, আত্মায় গাঁথা।

শেষমেশ পাঠের শেষে শুধু একটা প্রশ্নই মাথায় ঘুরছিল—এই স্বীকারোক্তি কি শুধুই সন্তোষকুমার ঘোষের? নাকি আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এই আত্মসমীক্ষার একটা জায়গা থেকে যায়, যাকে আমরা কেবল জড়তা আর ভয় দিয়ে চাপা দিই? সম্ভবত, সেই চেপে রাখা কথাগুলোরই প্রতিধ্বনি হল এই উপন্যাস। এবং তাই, শেষ নমস্কার শুধু বই নয়—এ এক আয়না, যেখানে তাকালে, আমাদেরও দেখা যায়।
Profile Image for Gain Manik.
353 reviews4 followers
June 14, 2024
মা ও ছেলের সব সম্পর্ক সবসময় মধুর হয় না। এই উপন্যাস সত্য তুলে ধরেছে
Displaying 1 - 5 of 5 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.