সন্তোষকুমার ঘোষের জন্ম ২৩ ভাদ্র ১৩২৭ বঙ্গাব্দ (৯ সেপ্টেম্বর ১৯২০), অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ি নামের মহকুমা শহরে। বাবা সুরেশচন্দ্র। মা সরযূবালা।রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে বাংলা ও গণিতে লেটার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় (১৯৩৬) উত্তীর্ণ হন।বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বি এ (১৯৪০) পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ (অর্থনীতি)-তে ভর্তি হলেও পড়া অসমাপ্ত থেকে যায়।১৯৪১-৪২ নাগাদ ‘প্রত্যহ’ নামের কাগজে সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত। তারপর ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় যোগদান। ১৯৪৬-এ বিবাহ। স্ত্রী নীহারিকা। ১৯৫০-এ সাব-এডিটর হিসেবে ‘স্টেটসম্যান’-এ যোগ দেন, ১৯৫১-তে আনন্দবাজার প্রতিষ্ঠানের পত্রিকা ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’-এর চিফ-সাব-এডিটরের দায়িত্ব নিয়ে দিল্লি যান। ১৯৫৮-তে কলকাতায় ফিরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র বার্তা-সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৪-তে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ও ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’-এর সংযুক্ত সম্পাদক। ১৯৭৬-এ ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র যুগ্ম-সম্পাদক ।প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘পৃথিবী’ (নবশক্তি, ১৯৩৭), প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বিলাতী ডাক’ (ভারতবর্ষ, ১৯৩৭)। ‘কিনু গোয়ালার গলি’ উপন্যাস ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশের সময়েই পাঠক ও সাহিত্যিক মহলে যথেষ্ট সাড়া ফেলে দেয়।পুরস্কার: আনন্দ পুরস্কার (১৯৭১), বিশেষ আনন্দ পুরস্কার (১৯৭২), আকাদেমি পুরস্কার (১৯৭২)।‘তাইওয়ান কবি সংঘ’ থেকে ১৯৮৪-তে সাম্মানিক ডি লিট উপাধি-প্রাপ্তি। মৃত্যু: ১৪ ফাল্গুন ১৩৯১ (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫)।
"কিছুকাল আগে একটি সত্যিকার মৃত্যুকে জেনেছি, তখন আবার যেন নিজে নিজেই টের পেলাম, অনুপস্থিতিও একটা মৃত্যু, মৃত্যুর মতোই।"
দীর্ঘ উপন্যাসটির পুরোটাই মা-কে লেখা এক চিঠি কিংবা স্বগতকথন। অনেক নাটকীয় ঘটনা আছে এখানে। সুনীলের ভাষা ধার করে বলা যায় লেখক যেন কিছুক্ষেত্রে অপদেবতার সাধনা করেছেন (একটার পর একটা দুঃসহনীয় ঘটনা ঘটে যেতে থাকে নায়কের জীবনে।) এতোকিছুর পরও "শেষ নমস্কার শ্রীচরণেষু মাকে" ভালো লাগলো। কারণ সন্তোষকুমার ঘোষ যেভাবে যা বর্ণনা করেন তা বিশ্বাস্য মনে হয়, আপন মনে হয় কথককে। বিপুল বেদনার্ত এক জগত আর তার মানুষজনকে সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যতার সাথে উপস্থাপনের জন্য এই লেখা স্মরণীয়।
কথাসাহিত্য জগতে সন্তোষকুমারের আত্মপ্রকাশ ছোটগল্পকার হিসাবে(গল্পটির নাম - বিলাতী ডাক)। উপন্যাসটি ' দেশ ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।১৯৭২ এর আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত উপন্যাস এটি। উপন্যাসটি পত্রাকারে লেখা। স্বভাবতই এটি একটি পত্রপন্যাস ।
তাঁর প্রথম চিঠি " শ্রীচরণেষু মা! " এই বাক্যটিই উপন্যাসটির প্রারম্ভিক বাক্য, আর শেষ হলো " মা তাই না? " বাক্যটির মধ্য দিয়ে। - শুরু ও শেষে মাতৃ সম্মোধন, সমগ্র উপন্যাস মাকে লেখা সন্তানের একটি চিঠি ।এই একটি চিঠিই সম্পূর্ণ উপন্যাস। এক সন্তান তার মাকে পাঠানো চিঠিতে নিজের শৈশব - কৈশোর - যৌবনের পরিচয় দিয়ে তার বর্তমান পৌঢ়াবস্থায় যন্ত্রণা দগ্ধ রূপটি প্রকাশ করেছে।
১৯৭২ সালে অকাদেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত "শেষ নমস্কারঃ শ্রীচরণেষু মা'কে"। বইটিকে লেখকের আত্মজীবনী নির্ভর ধরা হয়ে থাকে। চিঠির আঙ্গিকে লেখা এই নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে নিঃসন্দেহে এক অনন্য সংযোজন।
"আসলে মা আর ছেলের সম্পর্কের মধ্যে পা টিপে টিপে যে এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তার নাম বয়স। সে-ই বদলে দেয়, সে-ই মূল, আমরা ভুল করে তাকে 'বন্ধু', 'বউ' বা বিভিন্ন নাম দিয়ে থাকি। আদম আর ইভের মধ্যে যেমন ছদ্মবেশী সাপ, মা আর ছেলের সম্পর্কের নন্দনে তেমনই বয়স। সেই বয়সই আমাদের বদলে দেয়, ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে দূরে ঠেলে দেয় ক্রমশ।"