সুমুদ্রিত, চমৎকার একগুচ্ছ অলংকরণে শোভিত, নয়নসুখকর ও শুদ্ধ মুদ্রণে পরিবেশিত এই ইতিহাসাশ্রয়ী থ্রিলার উপন্যাসটি হুশ করে পড়া হয়ে গেল। সকলোত্তরপথনাথ ধর্মপালের সুশাসনে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ আপাতভাবে শান্ত, কিন্তু তার তলায় ফল্গুর মতো বয়ে চলেছে ঘৃণার এক বিষনদী। তাতে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, ঈর্ষা, আবার অন্ধ প্রতিশোধস্পৃহাও। তারই প্রকাশ ঘটল এক সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার পাত্র বৌদ্ধবিহারে— সম্রাটের অনুগ্রহধন্য যে স্থানটিতে বণিকেরা ধন গচ্ছিত রাখেন। সামনে এল এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। তার বলি হল নিরীহ ক'টি প্রাণ। অবশেষে, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির তীব্র আলোয় মিথ্যা ও অবিশ্বাসের অন্ধকার বিদীর্ণ করে সত্যকে উন্মোচন করলেন এক তরুণ ভিক্ষু। কিন্তু এই আখ্যান এখানেই সমাপ্ত হল না। বরং পরবর্তী আঘাত তথা পরবর্তী রহস্যভেদের জন্য আমাদের অপেক্ষমান রেখেই লেখক আপাতত বিদায় নিলেন। এই লেখার ভালো দিক কী-কী? ১) বর্ণনার গুণে দেড় হাজার বছর আগের পরিবেশকেও একেবারে জীবন্ত করে তুলেছেন লেখক। ২) ইতিহাসের এই বিশেষ ক্ষণটিকে নিয়ে বাংলায় লেখালেখি— সে-ও আবার বৌদ্ধবিহারের ভেতরের জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে এমন আলোচনা— শুধু দুর্লভ নয়, প্রায় অভূতপূর্ব। ৩) চরিত্রগুলো অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে আঁকা হয়েছে। এই লেখার কোন-কোন জিনিস আরও ভালো হতে পারত বলে আমার মনে হয়? লেখনী অত্যন্ত সাবলীল ও গতিময় হওয়ায় লেখাটি আমরা দ্রুতগতিতে পড়ে ফেলি। তবে পড়ার পর আমার মনে হল, এই কাহিনির প্লটটি আদতে বড়োগল্প, বড়োজোর উপন্যাসিকা হওয়ার উপযুক্ত ছিল— যেমনটি আমরা লেখকের 'শিলালেখ'-তে পেয়েছি। এতে বর্ণনার আধিক্য আয়তন-বৃদ্ধি ঘটালেও মূল প্লট একটি বড়োগল্পের জন্যই উপযুক্ত ছিল। বরং 'সংকটে গৌড়'-এর সবক'টি পর্ব একত্র হলে একটি সময়সীমা জুড়ে উত্থান ও পতনের আখ্য্যানমালা জুড়ে একটি মনের মতো উপন্যাস হত। তাই এই বইটি পড়ে খুব ভালো লাগলেও শেষ অবধি কিঞ্চিৎ অতৃপ্তিই থেকে যায়। তবে বইটির বুকমেকিং দেখে শ্রদ্ধা হতে বাধ্য। নতুন প্রকাশনার প্রথম বইটি যাতে সর্বাঙ্গসুন্দর হয়, সে-বিষয়ে লেখক কোনোরকম আপোশ করেননি। ভরসা রাখি যে এই বইয়ের পরবর্তী পর্বটিও এমনই হবে। ইতিমধ্যে, ইতিহাসে, বিশেষত ইতিহাসাশ্রিত থ্রিলারে আগ্রহ থাকলে এই বইটি উপেক্ষা করবেন না।
সেন সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনের আগে গৌড় অঞ্চলটি পাল সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ ছিল এর প্রশাসনিক কেন্দ্র। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে বৌদ্ধ যুগে পাল বংশের রাজাদের সময় থেকে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। বাংলার ইতিহাসে গৌড় একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পড়ে ফেললাম, সেই গৌড়কে নিয়েই লেখিকা অঙ্গিরা দত্ত দন্ডপাটের লেখা রোমাঞ্চকর এক ঐতিহাসিক উপন্যাস।
পালযুগের প্রথমার্ধে, ধর্মপালের সময়ে গৌড়ের অর্থনীতি ধ্বংস করতে এগিয়ে এসেছিলেন কয়েকজন বিক্ষুব্ধ মানুষ। প্রধানত তাঁদের চক্রান্তেই শেষ হতে বসেছিল গৌড়বঙ্গের অর্থনীতি। জাল মুদ্রা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল সর্বত্র। এই উপন্যাসের কনফ্লিক্ট পয়েন্ট সেখান থেকেই শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে উপন্যাস যতই এগিয়েছে ততই গভীর গভীরতর হয়েছে ষড়যন্ত্রের পরিধি এবং অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ভাবেই ঘটেছে একের পর এক ক্রাইম।
ঐতিহাসিক ক্রাইম থ্রিলার হলেও এই উপন্যাসটি প্রধানত 'হাউ ডান ইট' ঘরানাকে বেস করে লেখা হয়েছে। প্রধান কনস্পিরেটর কে, তা লেখিকা উপন্যাসের প্রথম থেকেই পাঠকদের সামনে ওপেন করে দিলেও এতে গল্পের গতি বা সাসপেন্স এতটুকু নষ্ট হয়নি। আর এখানেই লেখিকার কলমের জোর ফুটে উঠেছে দারুণ ভাবে। এই উপন্যাসে বীরপল, জ্ঞানশ্রী, রত্নদীপ্ত সহ প্রতিটি চরিত্রকে দুর্দান্ত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
❤️ ভাল লেগেছে - ১. উপন্যাসের ভাষা। ২. প্লটের বৈচিত্র্য। ৩. কনস্পিরেসি তৈরির পদ্ধতি। ৪. অনুসন্ধান প্রক্রিয়া। ৫. ঐতিহাসিক পটভূমির আবহ নির্মাণ। ৬. প্রতিটি চরিত্রের গঠনগত বৈশিষ্ট্য। ৭. গল্প শেষের চমক ও টুইস্ট।
পরিশেষে কয়েকটি কথা না বললেই নয়, তমোজিৎ দেবের আঁকা বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। লেখিকার লেখা আমি আগেও পড়েছি কিন্তু এবারে এই থ্রিলারটির কনসেপ্ট, প্লট, ভাষা আমাকে মুগ্ধ করেছে। নির্দ্বিধায় একটি পর একটি পর্ব পড়ে গেছি, একটুও ক্লান্ত না হয়ে।
সামগ্রিক ভাবে বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি অসাধারণ। এরকম একটি ঐতিহাসিক থ্রিলার পাঠকদের উপহার দেবার জন্য চর্যা প্রকাশনকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করি, বইটি পাঠকপ্রিয় হবে।
গৌড়কে শশাঙ্কের পরে শুরু হওয়া মাৎস্যন্যায় থেকে উদ্ধার করেন গৌরাধিপতি গোপাল ,আর তারই সুযোগ্য পুত্র হলেন গৌড়াধীপ ধর্মপাল।।তার পুত্র যুবরাজ দেবপাল আর তার মন্ত্রী দর্ভপানি সেই সময় রাজগিরের শাসন ভার সামলাচ্ছেন।।এক কথায় রাজা ধর্মপালের শাসনকাল ছিল রামরাজ্য। তার যশগান লোকমুখে বহুল প্রচলিত ছিল বিভিন্ন লোকগানের মাধ্যমে।কিন্তু কোনো শান্তিই চিরস্থায়ী হয় না বা হতে পারে না।।যেখানে চাঁদ ও কলঙ্কমুক্ত নয় সেখানে গৌড় কি ভাবে শত্রুমুক্ত বা বিদ্রোহ মুক্ত থাকে।আর সেই বিদ্রোহ যদি প্রত্যক্ষ না হয়ে পরোক্ষ বা এককথায় Undercover হয়??এক বিরাট অংশের মানুষ তার জয়জয়কার করলেও একদল বিক্ষুব্ধ মানুষ গৌড় কে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র রচনা করে,।।কোন ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এই Deep and dedicated Conspiracy?? মহাপদ্মরাগ বৌদ্ধ বিহার এই ষড়যন্ত্রের মূল বিন্দু হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে,যার কেন্দ্রে আছে বিভিন্ন জীবিকা নির্বাহী মানুষের দল।কেউ বৌদ্ধ ভিক্ষু,কেউ বা সাপুড়ে,আবার কেউ বা বণিক।পেশা আলাদা হলেও তাদের লক্ষ্য এক,আর তা হল গৌড়ের সর্বনাশ।আর তা ঘিরেই একের পর এক হত্যা,ষড়যন্ত্র ইত্যাদি।তবুও খারাপের অপর পিঠে ভালোর বাস।কিছু মানুষ যেমন চাই গৌড়ের সর্বনাশ, তেমনই কিছু মানুষ সেই সংকট ময় পরিস্থিতিতে dedicated হয় গৌড় রক্ষায়।।শুরু হয় ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি ষড়যন্ত্র বিকল করার এক শ্বাসরুদ্ধ Dual।। তারা কি পারবে গৌড়কে এই প্রভূত সংকট থেকে সংকটমুক্ত করতে??ধরা পড়বে কি মূল ষড়যন্ত্রকারী??নাকি সব শেষ হয়ে যাবে অচিরেই,আর সফল হবে গৌড়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র??যদিও শেষ হইলেও হইলো নাকো শেষ।।মানে এখানেই গল্পের শেষ নয়।।Picture avi baki hai😎।। এ তো সবে সূচনাপর্ব।। এবার আসি আমার এই গল্পে ভালো লাগার দিকে ।। সত্যি বলতে,শুরুতে একটু মন্থর গতিতে গল্প এগোলেও মাঝামাঝি থেকে 3rd gear ধরে নিয়েছে।।এরপর কি,এরপর কি এমন একটা ভাব তৈরি করে দিয়েছে।।রোমহর্ষক Storyline এর পাশাপাশি বহুল ঐতিহাসিক বিবরণ এবং গল্পশেষে টীকা গুলো সত্যিই প্রশংসনীয়।।বহু না জানা জিনিস ও জানলাম।। আর এমন একটা গল্প রচনা করতে যথেষ্টই রিসার্চের প্রয়োজন হয় ,সেই জন্য লিখিকাকে সত্যিই hats off🫡🫡।। এই সিরিজের পরবর্তী খন্ডের অপেক্ষায় থাকলাম গভীর উৎসুক্য নিয়ে।।নিঃসন্দেহে একটা চমকপ্রদ থ্রিলার ওরফে ঐতিহাসিক থ্রিলার সিরিজ হতে যাচ্ছে সংকটে গৌড়; সেই নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।।আর এমন সিরিজ (Kalki's Pooniyan Selvan এর কথা মনে করিয়ে দেয়..) বাংলা ভাষায় তেমন হয়তো নেই।
আঙ্গিরাদন্ডপাঠের লেখা প্রথম পড়লাম। আনেকদিন থেকেই ওনার এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার কথা শুনছিলাম। আর দেখছিলাম লেখিকা তার এই লেখাটি নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। বইয়ের প্রচ্ছদ বা অলঙ্করন আত্যন্ত সমৃদ্ধ। লেখিকা তার মুখবন্ধে প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি কোন ইতিহাস লিখতে বাসেন নি। একটা পরিবর্তনশীল সময়কে সামনে রেখে সম্পুর্ন থ্রিলার লিখেছহেন। এটা লিখতে গিয়ে উথে এসেছে সেই সামায়ের শাসনব্যবস্থার একটা নিখুত চিত্র। সেই সামায়ের ধর্মিয় সামাজব্যবস্থা। জাদিয় সেই সামায়কার নাগরিক বা গ্রামীণ সামাজচিত্র এতে সে ভাবে নেই। হয়তো পরবর্তী পর্বে এগুলো ধীরে ধীরে আসবে। কাহিনির পটভূমিকা এক বৌদ্ধ বিহার। সেই সামায় বৌদ্ধ বিহারগুলি কি ভাবে বানিজ্য তথা শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নিজেদের কিভাবে প্রভাব বিস্তার কারেছিল, তা সুস্পষ্টরুপে লেখায় ফুটে উঠেছে। এতটা পড়ে কেও ভাববেন না যেন এটা একটা ইতিহাসনির্ভর গল্প। এখানে কাহিনীটাই মুখ্য। আর ইতিহাস এসেছে কাহিনির সঙ্গে সঙ্গী হিসেবে। এখানে আর একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার খলনায়ক সব সময় আমাদের সামনে হাজির। সব খল চরিত্র আর ঘটনা পাঠকের সামনে ঘটে চলেছে। আর কাহিনী এগোচ্ছে কি ভাবে ঘটনাগুলো বন্ধ করে খলনায়কের পর্দা ফাঁস হবে। শেষ পর্যন্ত তা হয়। আর দ্বিতীয় পর্বের সূচনাও হয়। অত্যন্ত উপভোগ্য আর টান টান রোমাঞ্চকর থ্রিলার। এবং সুখপাঠ্যও। লেখিকার লেখনিও বেশ সুন্দর। অযথা কাহিনী দীর্ঘায়িত করেন নি। ইতিহাসের ঘটনা টেনে কাহিনির মেদ বৃদ্ধি করেন নি। ঐতিহাসিক পটভুমিকায় একটা ঋজু সংক্ষিপ্ত কাহিনী তিনি অত্যন্ত কুশলাতার সঙ্গে পারিবেশিত করেছেন।
বাংলায় পাল বংশের শাসনকালের প্রথমদিকে, ধর্মপালের রাজত্বকালে মহাপদ্মরাগ বৌদ্ধবিহারে ঘটে যাওয়া এক ভিক্ষুর 'সর্পবিষে' হত্যা, এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা এক গভীর আর্থ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত - এই নিয়েই সংকটে গৌড় কাহিনীর সূচনা পর্ব। বাংলার ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে খুব বেশী নন-একাডেমিক লেখা নেই, তাই সময়কাল ও প্রেক্ষিত নির্বাচনের জন্য লেখিকাকে কুর্ণিশ। তথ্যনিষ্ঠ, কিন্তু তথ্যভারাক্রান্ত নয় - রিসার্চ করে লেখা সাবলীল এবং গতিময় গদ্য। সংলাপ, খাদ্য-পানীয়, পোষাক, জীবনচর্যা বর্ণনা - লেখিকা সব খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর রেখেছেন, এমনকি আতস কাঁচের ব্যবহারের পক্ষেও যৌক্তিক ব্যখ্যা দিয়েছেন। চরিত্রের চিত্রায়নের জন্য যেটুকু 'ফ্ল্যাশব্যাক' দেখাতে হয় সেটুকুই দেখানো হয়েছে, বাকিটা সাসপেন্স পরবর্তী পর্বের জন্য; যদিও তাতে এই ইতিহাসাশ্রয়ী থ্রিলারের গতি ক্ষুণ্ণ হয়নি কোনোভাবেই। পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো টাইম ট্র্যাভেল করে প্রায় দেড় হাজার বছর আগেকার সময়ে পৌঁছে গেছি - এতটাই প্রাণবন্ত লেখনী। অমীমাংসিত রহস্য বা ক্লিফহ্যাঙ্গার কারোরই ভালো লাগে না ঠিকই, তবে এই ব্যয়িতে উপযুক্ত সময়েই রাশ টানা হয়েছে - এটিও প্রশংসাযোগ্য! বইয়ের শেষে দেওয়া টীকা এবং তথ্যসূত্র আগ্রহী পাঠকের জন্যেও সহায়ক। শুধুমাত্র একটি স্থানে মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়লো (পৃ ৮৮) - খলক দত্ত হয়ে গেছেন খলক রায়। এ বাদে এই বইটি নিয়ে আর কোনো অভিযোগ নেই।
পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। লেখিকাকে অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা...