গঙ্গা, কলুষনাশিনী গঙ্গা। সমস্ত পাপ মুছে যায় যার স্পর্শে, তিনিই গঙ্গা। পৌরাণিক সে দেবীকে নদী করে পৃথিবীতে বইয়েছিলেন ভগীরথ। তাই তাঁর আরেক নাম ভাগীরথী। বহতা সে নদী কোথাও দিক পরিবর্তন করে, পরিবর্তিত হয় নাম।
কেবল নামই নয়, রূপও বদলে যায়। কখনও সে স্বর্গের দেবী হয়ত মর্ত্যের কোন সাধারণ নারীর মাঝে আত্মপ্রকাশ করেন। কেউ তাঁকে চিনতে পারে, কেউ কারে না। তেমনই এক নারী ময়না বৈষ্ণবী। গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে বেড়ান তিনি। ভালোবাসেন মানুষকে। মুছিয়ে দিতে চান তাদের দুঃখ।
ময়না বৈষ্ণবীর মতো করেই ভাবে আরেকটি মানুষ। সে সিদ্ধার্থ, সিদ্ধার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়। কৈশোর পেরবার পর থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছেলেটি। বন্ধু মোহনলালের বাড়িতে একদিন তাঁর পরিচয় ময়না বৈষ্ণবীর সাথে। সিদ্ধার্থের মাঝে কি দেখেছিলেন ময়না, তা তিনি জানেন না। তবে মনে হয়েছিল কি এক অজানা ক্ষমতা আছে ছেলেটার মাঝে।
জেলা মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদকুলি খাঁ-র মুর্শিদাবাদ। সিরাজের মুর্শিদাবাদ। সেকালে বিখ্যাত হয়েছিল নবাবদের জন্য। তারপর মুর্শিদাবাদ আর রাঢ়কে মানুষ চিনেছিল বাউল-বৈষ্ণব সাধকদের বিচরণের জায়গা বলে। সেই মুর্শিদাবাদের গ্রাম তেকোণা, চতুষ্কোণা। সময় গত শতাব্দীর শেষ দশক।
ময়না জেনেছিলেন তাঁর আখড়া নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত। জানিয়েছিলেন সিদ্ধার্থকে। সিদ্ধার্থ, সে গ্রামে অর্বাচীন। তবু চেষ্টা করেছিল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। তারপরেই ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো ময়নাকে। বলা চলে সেই থেকেই সিদ্ধার্থের উত্থান শুরু।
নদী ভাঙছে। আর নদীর পাড়ে বলাই মণ্ডলের আম-বাগান। বলাই মণ্ডল কৃষক, কিন্তু তিনি পড়াশোনা জানেন। সারাদিনের কাজের পর খাতা কলম নিয়ে বসেন। কবিতা লেখেন, কবি তিনি। সেই সঙ্গে টের পান আমবাগানে ঘুরে ফেরা ফিসফিসানি।
গ্রামের সবচেয়ে ধনী সুকুমার পোদ্দারের ছেলে অনির্বাণ ভালোবাসে পিতার কাছে অর্থ-ঋণে আবদ্ধ কৃষকের কন্যাকে। পিতার অমত জেনে সে যুগল আত্মহত্যা করতে গেলে, অনির্বাণ ঝাঁপ দিতে পারে না। কিন্তু তুলতুলির তুলোর মতো শরীর মণ্ডে পরিণত হয়।
ওদিকে সিদ্ধার্থ কাজ করে চলে। সেই সঙ্গে অর্জন করে জনপ্রিয়তা। সঙ্গে বহুজনের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। এমনকি তাঁর প্রাণের বন্ধু মোহন হয়ে ওঠে তারই শত্রু। কিন্তু সিদ্ধার্থ থেমে থাকে না। পরম-প্রাণ দাদু বোধিসত্ত্ব তাঁকে শক্তি জুগিয়ে চলেন। ময়না বৈষ্ণবীর স্মৃতি তাঁকে এগিয়ে দেয় নতুন পদক্ষেপের দিকে।
তিলোত্তমা মজুমদারের এ উপন্যাসের বিস্তৃতি এতোই বৃহৎ যে তাকে কয়েকশত শব্দে বন্দি কিংবা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সে চেষ্টাও মূর্খতা। সুলিখিত এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট তুলনামূলক ছোট, ভারতের এক রাজ্যের এক জেলার কয়েকটি গ্রাম। কিন্তু আখ্যানের ভেতরকার ব্যঞ্জনা যুগপৎ মহৎ এবং বৃহৎ।
উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয়েছে পাঁচালী, কবিতা ইত্যাদির মাধ্যমে। লেখার মাঝে মাঝে উঠে এসেছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, যাপিত জীবনের প্রাকৃত এবং প্রকৃত চিত্র। সেই সঙ্গে পুরাণকথার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানের বাস্তবতা, পরম নিপুণতায়। প্রতিটি চরিত্রকে এঁকেছেন স্পষ্ট করে, পূর্ণতা পেয়েছে প্রায় সবাই।
প্রচ্ছদ কিংবা ফ্ল্যাপ দেখলে মনে হবে এ বই লেখা হয়েছে মুর্শিদাবাদের বাউল বৈষ্ণবদের নিয়ে। সেই ভেবেই পড়তে শুরু করা। কিন্তু প্রথমে প্রশ্ন জেগেছিল, তাহলে নামকরণ এমন কেন? উত্তর পাওয়া গেলো উপন্যাস শেষ করে।
লেখিকা মুর্শিদাবাদকে পটভূমি করে এঁকেছেন ভারত কিংবা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, ব্যবসা, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক প্রতিরূপ। মিহির রক্ষিত, দীপেন হাজরা সেই আবহমান স্বার্থপর কুটিল রাজনীতির প্রতিভু। সুকুমার পোদ্দার গ্রাম্য মহাজন। তেমনই দুলু বাউলের মধ্যে ফুটে উঠেছে এক খাঁটি মানুষের রূপ। তাঁর মাধ্যমেই লেখিকা তুলে এনেছেন বাউল বৈষ্ণব জীবনের, সাধনের কিছু কথা। সমান্তরালে হারাধন আর মৌসুমির অদ্ভুত অবৈধ সম্পর্ক।
কিন্তু সেটা উপন্যাসের একটা অংশ কেবল। এর পাশাপাশি রয়েছে জীবন বাস্তবতা। ইদরিশ, নিসার, বলাই মণ্ডল, হারাধনের পরিবার তাদের প্রতিনিধি। সিদ্ধার্থ তাদের ত্রাতা নয়, বন্ধু। এমন সুহৃদ, যার কাছে মন খুলে দেওয়া যায়। মোহনের পিতামহী, নয়াঠাকুরমা যেন নিজেই সমস্ত প্রাচীন, হারিয়ে যাওয়া লৌকিক সম্পদের ছবি। তাঁর মাঝে ফুটে ওঠে নানা গল্প, উপকথা, ব্রতকথা। তেমনই বসিরের মুখে বারবার আসে মুর্শিদাবাদের নবাবী আমলের কাহিনী।
তিলোত্তমা মজুমদারের এ উপন্যাস মানুষের কথা বলে। বলে আবহমান বাংলার মানুষের জীবনের কথা। তাঁর লেখনি কখনও সে মানুষের শঠতায় ধিক্কার জানায়, কখনও করুনা করে। খনার বচন, শিবের গাজন, পিরের থানের মানত, গঙ্গার পৌরাণিক গল্প ফিরে আসে বারবার। সেই সঙ্গে আসে নদী বিজ্ঞান। পুরাণ আর বিজ্ঞানকে পাশাপাশি রেখে বহতা নদীর চরিত্র দেখিয়েছেন তিনি। দেখিয়েছেন মানুষের দূষণে নদীর ফুঁসে ওঠা। বন্যার তোড়ে মানুষকে বাস্তুহারা করা।
কিন্তু সব ছাড়িয়ে এ উপন্যাস এক রাজনৈতিক উপন্যাস। কেননা মানুষ কোন না কোন ভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত। রাজপাটের জন্য মানুষ শোষণ করে, শঠতা করে। কিন্তু শুদ্ধতাও খোঁজে কেউ কেউ। ময়না বৈষ্ণবীকে স্মরণ করে নতুন পথ খোঁজে সিদ্ধার্থ। আর বাস্তুহারা বলাই মণ্ডলের ছেলে তখন খোলা আকাশের নিচে পিদিমের আলোয় লেখে তার প্রথম কবিতা।