আসামের এক পাহাড় ঘেরা গ্রাম চাপটুক। সেই গ্রামেরই এক কনভেন্ট স্কুলে একের পর এক ঘটে চলেছে রহস্যজনক আত্মহত্যা। কিন্তু কেন? কী হবে স্কুলের গ্রাউন্ডে রক্ত পড়লে? স্কুলের রাইট উইং-এর তিনতলা কেন ছাত্রদের জন্য নিষিদ্ধ? কেন রাত দশটার পর লক করে দেওয়া হয় স্কুলের সমস্ত টয়লেট? দি হোলি প্যাসেরাইন হাসপাতালে একের পর এক ভর্তি হচ্ছে অদ্ভুত সব পেশেন্ট। রাতারাতি তাদের শরীরে গজিয়ে উঠছে একাধিক হাত-পা। ভয়ংকর রকমের হিংস্র হয়ে উঠছে তারা! কী ঘটছে এই প্রত্যন্ত পাহাড়ি হাসপাতালে! আসামের সবচাইতে প্রাচীন জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি হল দিমাসা সম্প্রদায়। কেউ কেউ বলে তারা মহাভারতের ভীম-পত্নী হিরিম্বার বংশধর। কিন্তু কোন্ অন্ধকার লুকিয়ে আছে তাদের লোককথায়? কার ফিরে আসা নিয়ে দি হোপ হাইস্কুলের প্রত্যেকে আতঙ্কিত! কী হবে যখন দি হোপ হাইস্কুলে শুরু হবে সুইটুর খেলা?
আপনারও যদি আমার মতো 'সামান্য' অ্যাঙ্গার ইশ্যুস থেকে থাকে, তাহলে এসব বই থেকে শতহস্ত দূরে থাকাটাই মঙ্গল। আপনার ও আপনার পকেট, দুই মক্কেলের ভালোর জন্যেই বলছি। কারণটা সহজ, ত্রিজিৎ এখানে এক্কেবারে সৃজিত রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। বাজে পোয়েট্রি মাফ করবেন, তবে বাংলা ছবির সাথে একটু-আধটু পরিচয় থাকলেই আমার তুলনার তাৎপর্য বোঝা সহজ হয়ে দাঁড়ায়। (দেখুন : কেরিয়ারের শুরুতে অমন সলিড স্টার্ট পেয়েও কেমন করে একজন গুণী মানুষে, রদ্দি-মিডিওক্রিটির ধোঁয়ায় বিলীন হয়ে যায়।)
স্রেফ কনসেপ্ট নিয়ে বলতে গেলে, 'সুইটু'র কাঠামো বেশ পরিচিত। হাই-স্কুলের পটভূমিতে ভয়ের গল্প নতুন কিছু নয়। হরর, বিশেষত এশীয় হররের দুনিয়ায়, এ জিনিস যথেষ্ট দ্রষ্টব্য। এ কি বি-গ্রেডের জাপানি ছবি বা মাঙ্গা ও অ্যানিমে ঘেঁটে দেখলেই দেখবেন কিশোরমনের ছুকছুকানির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ধরনের ভয়াল গপ্পো খুঁজে পাচ্ছেন। এরই সাথে, ভারতবর্ষের আসামের গ্রাম্য পাহাড়ি লোকগাথা ও কালোজাদুর আগ্রহোদ্দীপক সংমিশ্রণ।
মানছি, কতকটা এর সন্ধানেই বইটা কিনেছিলাম আমি। 'কভারম্যান' অভিব্রত সরকারের সুন্দর প্রচ্ছদখানি দেখে ভেবেছিলাম বুঝি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফোক-হরর ট্র্যাডশনের সাথে ভারতীয় অলৌকিক সাহিত্যের একটি সরস ককটেল খেতে পাবো। কিন্তু কে জানত, দুশো টাকা খরচ করে একটা গোবেচারা মদবিহীন মকটেলও জুটবে না কপালে? আমিও যা গবেট। নইলে 'আখিদা' পড়ে কেউ ত্রিজিৎ করের থেকে কোনরূপ আশা রাখে আর?
আমি রেখেছিলাম।
এখন বুঝি যে বইয়ের 'ভূমিকা' পড়েই মনে মনে প্রমাদ গোনা উচিত ছিল। বিশেষ করে, যেখানে লেখক কৈফিয়ত হিসেবে বারংবার বলছেন, যে এই বই একেবারেই গুরুগম্ভীর কিছু নয়। এর থেকে খুব জটিল কিছু আশা করে না এগোনোটাই বাঞ্ছনীয়। ('গুরুগম্ভীর দর্শন বা উপলব্ধির আশা না রেখে নিখাদ প্লিজিং হরর ঘরানার বই হিসেবে এই লেখাটি পড়লে লেখক হিসেবে খুশি হব।') এই 'প্লিজিং হরর' শব্দটির ব্যবহার লেখক 'আখিদা'-র শুরুতেও করেছিলেন। এবং আমরা সবাই জানি হাও দ্যাট টার্নড আউট টু বি...
তবে, এই ক্ষেত্রে ওনাকে সরাসরি দোষ দেবো না আমি। 'প্লিজিং' বলতে উনি যেরকম হালকা, রক্তস্নাত, স্বল্প পরিধির নৃশংস হররের উল্লেখ করছেন। সেই ধরণের সিনেমা আমারও দিব্যি প্রিয়। যা সচরাচর 'খারাপ ছবি' হলেও রাত বিরেতে আয়েশ করে দেখতে ভারী মজা। তবে, এই জিনিস যখন বইয়ের পাতায় নেমে আসে, তখনই দরকার হয়ে পড়ে অনেকটা স্কিলের। আচমকা ভিসুয়াল মিডিয়াম থেকে বঞ্চিত হয়ে গল্প আদ্যোপান্ত ভার দিয়ে দাঁড়ায় লেখকের কলমের কাঁধে। এ এক গুরুদায়িত্বই বটে। আর এখানেই আমাদের স্রষ্টা ডাহা ফেল।
অবশ্য, স্প্ল্যাটারপাঙ্কের গ্রাফিক মনোভাব নিয়ে গদগদে বাংলা সিরিয়াল লিখতে বসলে বুঝি এমনটাই হয়।
তেড়ে আসবেন না আবার। অনেকেই আপনারা এখনো এ জিনিস পড়ে ওঠেননি। তাই বুঝতে পারছেন না, কি রেটের মেলোড্রামা উপচে পড়ছে এতে। লেখকের অবশ্য এই খাতেও কৈফিয়ত হাজির। সেই ভূমিকাতেই উনি বলে রেখেছেন যে "এই উপন্যাসের সব চরিত্ররাই এই প্রজন্মের, যাদের আমরা বলি ‘জেন জি’। তাদের সবার বয়স অল্প, মনে সদ্য কৈশোরের ফল্গুধারা, জীবনের গম্ভীর সত্যিগুলো তারা এখনও উপলব্ধি করেনি। তাই পাঠকদের অনুরোধ দয়া করে তাদের কীর্তিকলাপের জন্য লেখককে দোষ দেবেন না! দয়া করে স্মরণ করবেন যে, পরিণত বয়সে আমাদের যা কিছু বালখিল্যতা মনে হয়, কৈশোরে সেগুলোই ছিল আমাদের বাঁচা-মরার প্রশ্ন!"
ঠিকই তো। কিশোর কিশোরীদের কাছে 'নো মন, ওনলি হরমোন', আর বস্তাপঁচা আবেগী ডায়ালগই তো দিব্যি মানানসই। কিন্তু তাও, বইটি পড়ে উঠে, লেখককে স্রেফ একটা কথাই জিজ্ঞেস করতে মন চায়... "শেষ কবে কোন টিনেজারের সাথে কথা বলেছিলেন বলুন তো?" রাগ হতাশা ক্লান্তি মিলিয়ে, ওনাকে বলতে ইচ্ছে হয়, "আপনাকে মশাই, ডায়নোসর উপাধি প্রদান করতে মন চাইছে হঠাৎ!"
আসামের পাহাড়ি এলাকার ক্রিশ্চান কনভেন্ট স্কুলের সিংহভাগ চরিত্রের মুখে বাংলা বলিয়েই ক্ষান্ত হননি লেখক, উপরন্তু সংলাপ লেখনীর ক্ষেত্রে অহেতুক নাটুকেপনার প্রক্ষেপণ, তুলনামুলক কঠিন বাংলার ব্যবহার, ও গামলা গামলা আবেগ ঢেলে বিরক্তির ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করেছেন একেবারে। বুঝলাম যে, 'দি হোপ হাই স্কুল'-এর বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রই বাঙালি, এমনটা দেখিয়ে একটা ছোটখাট লুপহোল তৈরি করেছেন নিজের জন্য। দেখতে গেলে, লেখার তাগিদে এটুকু মানাই যায়। তবে, হায়রে কালান্তক ডায়লগ!
আমি মানুষটা বাংলা উপন্যাসে ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষার গা-জোয়ারি উপস্থাপনা খুব একটা পছন্দ করিনা। তবে, যদি একবার, মাত্র একটিবারের জন্য, কোনো এক ক্ষেত্রে ব্যাপারটা বেশ মানানসই হতো, তাহলে সেটা এখানেই ছিল। সামান্য 'বাংলিশ' বা 'হিঙ্গলি' আরোপণে উপন্যাসটির লাভ বই ক্ষতি হতো না কোনো।
কিন্তু তার বদলে, ক্লাস ইলেভেনের পরিপক্ব জেন-জির মুখে, "বুকের ভেতর আমরা যত কোনো দুঃখকে চেপে রাখি সেই দুঃখ ততই জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের মনের ওপর চেপে বসে।" গোছের সংলাপ বলিয়ে কেলেংকারী করেছেন লেখক। এ তো গেল অজস্রের মাঝে একটি উদাহরন। ঠিক এর পরেই, আরেকটি মেয়ে প্যানিক অ্যাটাকের পাবলিক হ্যাজার্ড নিয়ে বলতে গিয়ে, বাক্যে করে ওঠে 'ব্যাঙ্গ, বিদ্রুপ' প্রভৃতি, শব্দসমষ্টির ব্যবহার। হাসি, ঠাট্টা, তামাশা নয়! একেবারে ব্যাঙ্গ, বিদ্রুপ! ভেবে দেখুন তো একবার? ব্যাপারটা কি বাস্তবসম্মত বা কনভারসেশনাল দাঁড়ায়?
পাঁচ-পাঁচটি বই লেখার পরেও এমন কাঁচা বিভ্রান্তি কোনো পাবলিশড্ অথরের কাছে আশাতীত। উপরন্তু, লেখকের গদ্যে ফেসবুকের গন্ধ আজও বিদ্যমান। সেই একই ধাঁচের অধ্যায় শেষের ক্লিফহ্যাঙ্গার। সেই তাড়াহুড়ো। সেই এলিপসিস ও প্রশ্নবোধকের অতিমারী। উপরোক্ত উল্লেখিত সংলাপ বিভ্রাট, বইয়ের শুরুতে সামান্য নিয়ন্ত্রিত হলেও উপন্যাস যত এগিয়েছে ততই জাঁকিয়ে বসেছে লেখাজুড়ে।
তাও যদি বুঝতাম, গপ্পে কোনো জোর আছে। বাপের জন্মে ভাবিনি, এ জিনিস এতটা ক্লিশেড হবে। পাহাড়ি আবহ, দিমাসা লোকগাথা, কিংবদন্তি, অভিশাপ, রিচুয়াল স্যাক্রিফাইস - একগুচ্ছ জমাট উপাদানে দাঁড়িয়ে থেকে জল ঢেলেছেন লেখক। টিনেজ প্রেমের লঘু ট্র্যাকটাও নেহাতই বিস্মরণযোগ্য। প্রত্যাশিত হিসাবে, ওতে অনুভূতির চেয়ে ক্রিঞ্জ বেশি। লেখক অবশ্য সবটাই বয়সের দোষ হিসেবে দাগিয়ে দিতে চাইবেন। তবে, মন জানে, এ জিনিসে সম্ভাবনা ছিল আরও।
শেষলগ্নে আবার রবীন্দ্র-সঙ্গীতের একটা কমিকাল ক্যামিও পাবেন। অবশ্য, কোনো লাভ হয় না ওতে। লেখকের এই উপন্যাস, সব ক্ষেত্রেই বিশ্রী। একশোয় নেগেটিভ গোছের কালান্তক পারফরমেন্স। এ জিনিস পড়ে, কারও ভয় পাওয়াতো দুরস্ত, সামান্য গা ছমছম করলেও আশ্চর্য হতে হয়। ধুস!
Netflix এ যেন একটা হরর টিনেজ মুভি দেখলাম। কভার টা দেখে যতটা ভয় পাব ভেবেছিলাম তার ওয়ান পারসেন্ট ও পাইনি। বইটার ব্যাপারে বলতে হলে বলতে হবে টপিক ভালো, শেষের প্লট টুইস ও ঠিকঠাক। তবে মনে হয় আমার বয়স হয়ে গেছে, তাই সেভাবে মনে ধরে নি