এই দেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে সেই কবে থেকেই ভয় আর ভয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তেনাদের গা-ছমছমে উপস্থিতি। দ্রুত অগ্রসরমান নগরায়নের তোড়ে সেইসব দেশজ ভয়ের উপাদান ক্রমেই অতীতের হলুদ পাতার আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। তবু, ভয় পেতে আমরা বোধহয় ভালবাসি। অজানার ভয়, অন্ধকারের ভয়। লক্ষণীয় বিষয়, আমাদের ভূতেরা, গ্রাম-গঞ্জের লৌকিক কাহিনিতে প্রাচীনকাল থেকে রয়ে যাওয়া অশরীরিদের জায়গা নিচ্ছে তন্ত্র-মন্ত্র অথবা বিদেশি ‘হরর’; রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার থেকে নেকড়ে-মানব, জম্বিরা। এই মাটির ভূতেরা কোথায় গেল তবে? তেনাদের কথা বলবে কে? চেনা মাটির অচেনা ভয়দের সঙ্গে এবার পরিচয়ের পালা পাঠকদের।ছ’টি কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘চেনা মাটির অচেনা ভয়’ লৌকিক ভয়ের কাহিনি সংকলন, লিখেছেন ছ’জন দক্ষ কাহিনিকার। এই দেশের নানান অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই কাহিনিগুলি পাঠকের মনে আমাদের এই দেশের মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ভয়ালরসের রোমাঞ্চকে পুনরায় সঞ্চারিত করবে, এমনটাই আমাদের বিশ্বাস। চেনা মাটিতে অচেনা ভয়ের আঁচড় দীর্ঘস্থায়ী হোক, এই আশা।
"পাহাড়্যে বহুত কিছু ঘ'ট্যে, আপনারা শহরে বইস্যে সি রহস্যকে বুইঝতে লারবেন।" - সেন্দুর সিংমুড়া।
শহরবাসীদের গ্রামগঞ্জ নিয়ে বেশ কিছু রোমান্টিকতা রয়েছে। গ্রামের মানুষেরা নাকি খুবই সহজ সরল, রোজ সকালে প্রান্তরাভিমুখী কৃষকেরা শিশিরে পা ধোয়, গৃহিণীরা উনুনের সামনে বসে ঘাম মোছে-- পুকুরে ছিপ, মাটির মেঝেতে গোবর লেপা, মন্দিরের ঘন্টার আওয়াজ, জোনাকিদের ঝড়। এছাড়াও রয়েছে মেঠো ভূতেদের আর উপদেবতাদের গল্প। ব্রহ্মদৈত্য, পেত্নী, মেছো ভূত, গেছো ভূত, শাকচুন্নিরা একদিকে; মাকাল, মা শীতলা, বনবিবি, যখা যখি, বসন্ত রায়েরা আরেকদিকে। এই ফর্দ লম্বা, তার থেকে আরও লম্বা গল্পের সংখ্যা। তার উপর আজকাল গ্রামের গল্প পাবলিক গিলছে ভাল, বিশেষ করে "পঞ্চায়েত"-এর মত ওয়েবসিরিজের দয়ায়। এই রোমান্টিকতার বাইরেও যে গ্রাম রয়েছে, সেগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, ভারতীয় সংস্কৃতির জাইটগাইস্টে সেটার দেখা সহজে পাওয়া যায় না। ক'মাস আগে শ্যাম বেনেগালের "মন্থন" দেখতে গিয়ে মনে পড়ল, আরে, এই তো ভারতের গ্রাম! পুরো আনফিলটার্ড, আনসেন্সরড। সেই গ্রামও তো বড্ড সুন্দর। ভয়ঙ্কর সুন্দর।
এত কথা বললাম, কারণ অন্তরীপ প্রকাশিত "চেনা মাটির অচেনা ভয়" বইটি এই প্রথম আর দ্বিতীয় গোত্রের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় পরে। মূলত ভারতের লৌকিক গল্পের সংকলন। ছয়, ছয় খানা গল্প- যেন ছয়, ছয় খানা কিল, হজম করতে অসুবিধা হতে পারে, কিন্তু মনে রেশ থাকবে অনেকদিন।
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের গল্প "রাক্ষস ও সুন্দরী"-এর ফরম্যাট বিউটি আর বিস্টের মত। "শেপ অফ ওয়াটার"-এর যুগে তাই গল্পের প্লট নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করবো না। এই গল্পের পটভূমি পশ্চিমবঙ্গ নয়, সুদূর লাক্ষাদ্বীপে। দেবজ্যোতিবাবুর লেখাগুলোর কনসেপ্ট চিরকালই অভিনব হয়, এই গল্পেও তার অন্যথা হয়নি। "রাক্ষস"-এর জীবনচক্র গল্পের প্রথমেই বেশ সুন্দরভাবে বর্ণিত রয়েছে, যা আমার মত ফ্যান্টাসি প্রেমিকদের অত্যন্ত ভাল লাগবে। গল্পের থিম অবশ্যই যৌনতা আর নারীর যৌন স্বাধীনতা নিয়ে। বাংলা গল্পে "মনস্টার রোমান্স"-এর ফেমিনিস্ট রূপ আর কোথাও পড়েছি বলে মনে পড়ছে না।
"বোঙ্গাই" পিয়া সরকার প্রণীত রাঢ় বাংলার গল্প। আমার মতে, এটিই এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ গল্প, কারণ এই গল্পে অতিপ্রাকৃতকে নিয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল রইলেও, আসল ভীতি এসেছে সমাজের অন্ধকার দিক থেকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বাবলম্বী নারীদের জীবনে যে বিভীষিকা নেমে আসতে পারে, তা কোনও অপদেবতার থেকেও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর, অনেক বেশি কুটিল, অনেক বেশি ক্ষুধার্ত।
"দেও" ও "বিষহরি" এর লেখক তমোঘ্ন নস্করের গল্প "পোষ্য" আমাদের নিয়ে যায় বীরভূমে, অন্ধবিশ্বাসের অমানিশায়। এই গল্পে লৌকিকতার ব্যাপার একটু কম রয়েছে। ব্যাপারটা অদ্ভুতই লেগেছে আমার, কারণ তমোঘ্নবাবুকে পাঠকমহল লৌকিক উপদেবতা আর অপদেবতার গল্পের জন্যেই চেনে। তবু প্লটের বাঁধন অত্যন্ত টানটান। গল্পের ট্যুইস্ট আগে থেকে বুঝে নিলেও, এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করেছি।
শিশির বিশ্বাসের "ফিরিঙ্গির গড়" সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলের গল্প, বিশেষ করে "বড়িশাল গান" নামে এক ম্যিথকে কেন্দ্র করে (লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত কিনা জানি না, অনলাইনে কিছু পাই নি)। গল্প অতীত আর বর্তমানের দুইটি সময়প্রবাহকে নিয়ে হলেও আমার অতটাও ভাল লাগে নি৷ সুন্দরবনের ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য জানতে পেরেছি বটে, কিন্তু সেইটুকুই। তবে গল্পটা অত্যন্ত ভাল রিসার্চের ফলাফল, তাই লেখককে সাধুবাদ জানাই।
সৌমিত্র বিশ্বাস প্রণীত "চন্দ্রকুহেলী" পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের গল্প। আরও পরিষ্কার করে যদি বলি, "চন্দ্রকুহেলী" অযোধ্যা পাহাড়ে আদিবাসীদের আদিম জগতে আমাদের মত শহুরে লোকেদের অনুপ্রবেশের গল্প। সেই আদিম জগতে ভূত কুদিদ নামে এক পাখি বাচ্চাদের হাসির মত আওয়াজ করে ডাকে। সেই আদিম জগতে-- অরণ্যমাঝে-- কাভি নামে এক রহস্যময় জায়গায় পরিরা নেমে আসে শিকার করতে। মূলত পলিটিকালি চার্জড গল্প হলেও, লৌকিকতার মোড়কে সেটাকে পরিবেশন করা হয়েছে হরর গল্প হিসাবে। নন-লিনেয়ার ভাবে লেখার ধরণটিও আমার বেশ ভাল লেগেছে।
শেষ গল্পটা, কিশলয় জানার "সুন্দর অন্ধকার", কোচবিহারের "চণ্ড" নামে এক কামুক অপদেবতাকে নিয়ে। এই গল্পটা ওই পত্রভারতী বা অন্যান্য প্রকাশনীর জনপ্রিয় গল্পগুলোর মত৷ সেই, অপদেবতা এসে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করলো, ইত্যাদি। লেখনী ভাল হলেও, এই গল্পটা সবথেকে দুর্বল মনে হয়েছে আমার। এমন ফর্মুলাটিক গল্প আগের পাঁচটা গল্পের পর আশা করি নি। গল্পের ধাঁচ এতটাই পরিচিত যে, গল্পের প্রেক্ষাপটে (পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও জেলা) আর (যে কোনও অপদেবতা) ঢোকাতে পারলেই আরেকটা জেনেরিক গল্প খাড়া করা যাবে। তবে, আমার মনে হয়, বেশির ভাগ পাঠকদের এই গল্প ভাল লাগতেও পারে। আর যতই হোক, এটা তো মিডনাইট হরর স্টেশনের যুগ। ক্লিশের জয়জয়কার।
প্রতিটা গল্প নিয়েই (শেষ গল্পটাও) অনেক অনেক লেখালিখি করায় যেত, কিন্তু আমি চাই সবাই একটু চমক পাক। আমার তরফ থেকে এই বই রেকমেন্ডেড৷ বৃষ্টির রাত্রে, ছুটির দিনে অথবা শীতের অলস দুপুরে, পড়ুন আর পড়ান।