সে চলে গেছে! অভিমান করে চলে গেছে। কী উপায় ছিলো ওমন না করে! কাছাকাছি তো যাওয়া যাবে না তাঁর। কাছে টানলে ওই মুখপোড়া সমাজ যে চরিত্রে কলঙ্কের কালিমা লেপন করে দেবে। চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দেবে। চাইলেও তাঁকে কাছে টানা যাবে না যে! ওই শিশুর মতো আলাভোলা লোকটার মনে এতো অভিমান! চলে গেলো কাউকে কিছু না বলে। কেনো চলে গেলে তুমি! মন যে মানে না! চিন্তা, বড় চিন্তা হয়। এই হতভাগী নাহয় সমাজের শৃঙ্খলে বন্দী। সেও কী তাই!
"ওহে কী করিলে বলো পাইবো তোমারে
রাখিব আঁখিতে আঁখিতে",
কেউ কী একবার খোঁজ নিতে পারছে না! চিন্তা কী সব আমার একার হচ্ছে! চিন্তিত মন শুধু যে ভেতর বাহির দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এরকম নানান কথা হয়তো ভেসে চলেছে মেয়েটির মনে। পরনের ওই ধবধবে সাদা বিধবার থানের দিকে তাকিয়ে মেয়েটির বুক চিরে বেড়িয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।
সকলের বড় আদরের মেয়েটি। একা হাতে সামলে রাখে গোটা বাড়িটা। এ বাড়���র সকলের দিনে একবার হলেও মেয়েটিকে দরকার হয়। সকলের সব চাহিদা পূরণ করে ঠিক যেনো এক কল্পতরু হয়ে বেঁচে আছে মেয়েটা নিজের সব শখ আহ্লাদকে বিসর্জন দিয়ে। এ কেমন বেঁচে থাকা! যে চলে গেছে না বলে তাঁর জন্য কেনো এমন করে পুড়ে যাচ্ছে মনটা! সকলেই তো তাঁকে"বড়দিদি" বলে ডাকে, তবে ওই মুখে বড়দিদি ডাকটা কী কখনো শোনা হবে না আর! একটা প্রেমের গল্প বিধাতা কীভাবে লিখলেন দেখা যাক।
//এক আলাভোলা মাস্টারঃ
মা মরা ছেলেটা বিমাতার চোখের মণি। আদুরে বলা যায়। এবং ওই যে বলে আদরে বাঁদর। এই ছেলেটা বাঁদর হয়নি অবশ্য কিন্তু বড্ড ছেলেমানুষ তৈরি হয়েছে। নিজের কাজ নিজে করতে পারে না ঠিক করে। বাবা যখন বিলাতে পড়তে পাঠাতে চাইলেন বিমাতা তো শুনে হেসেই খুন। বললেন সুরোকে বিলেত পাঠালে আমাকেও সাথে পাঠিয়ে দিও।
একা তো কিছুই সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। হুম সুরো মানে পুরো নাম সুরেন্দ্রনাথ। পিতার অগাত সম্পত্তি বলেই বোধহয় লেখাপড়া ওই কোনো মতেই হয়ে গেলো। কিন্তু বন্ধুরা মিলে খোঁচাতে লাগলো বাপের হোটেলে আর কতদিন চলবে, নিজে স্বাধীনভাবে কিছু করলে তবেই তো বাপের ব্যাটা।
বন্ধুদের খোঁচা বড্ড গায়ে লাগলো। সুরেন্দ্রনাথ এক দুঃসাহসী কাজ করে ফেললো। কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে চলে এলো কোলকাতায়। এবং এখানে এসে পুরোপুরি অন্য ছদ্মবেশে সে পথে পথে ঘুরতে লাগলো। একদিন তাঁর আলাপ হলো বড় বাড়ীর এক বড় কর্তার সাথে।
তিনি তাঁর দৈন্য অবস্থা দেখে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করলেন। সুরেন্দ্রনাথ চট করে গুছিয়ে অর্নগল মিথ্যা বলে গেলো। নিজেকে গরীব প্রমাণ করে চাকরি খুঁজছে এমন ভাব। তখন তিনি মেয়ের মাস্টার হিসেবেই সুরেন্দ্রনাথকে বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। সুরেন্দ্রনাথ তখন ও বাড়িতে মাস্টার হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেলো।
প্রথমে কথা ছিলো বড় ছেলেকে পড়ানোর কিন্তু প্রথম দিনেই সুরেন্দ্রনাথের অঙ্কের মেধা দেখে ছেলে ভয়ে মিথ্যা বললো ও মাস্টার ছোট মেয়ে প্রমীলাকেই ভালো পড়াতে পারবে। বিএ ক্লাসের শক্ত বইয়ের পড়া সে কিছুই জানে না।
প্রমীলা ছোট মানুষ বাড়িতে কিছু পড়াশোনা অবশ্য করেছে। সুরেন্দ্রনাথ তাঁকে পড়াতে গিয়ে নিজের মনে অঙ্ক কষতে থাকতো, প্রমীলার কথা মাঝে মাঝে খেয়াল থাকতো না। খাবার কথা মনে থাকতো না, ঘুমের সময় ঠিক নেই। এই আলাভোলা মাস্টারকে আড়ালে চাকররা বলতো মাস্টারমশাই পাগলা।
// মাধবীলতার সৌরভঃ
বড় দুঃখী ব্রজ বাবুর বড় মেয়েটা। পোড়া কপালী অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে যখন বিধবার সাদা থান পড়ে বাপের বাড়িতে পা দিলো বাপের বুকটা ফেটে গেলো যেনো মেয়ের এই রুপ দেখে। "মাধবীলতা" বড় সুন্দর নাম তাঁর। স্বামীর আদর, ভালোবাসা পাওয়ার আগেই তাঁকে হারাতে হলো সব।
স্বামী চলে যাবার আগেও শোকে মুহ্যমান মাধবীর হাত ধরে এগুলোই আক্ষেপ করেছিল যে মাধবীকে তাঁর প্রাপ্য ভালোবাসা সে দিতে পারেনি। সেই শোক, সেই বেদনায় ভরা যৌবন নিয়ে মাধবী আর কিছু ভাবতে পারেনি শূন্য জীবনে। নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে গরীব দুঃখীর সেবায়। স্বামী যে যাবার আগে এমনটাই বলে গিয়েছিলেন। সবার কাছে বড় আদরের "বড়দিদি"। যে সবার সব আবদার রেখে যায় হাসিমুখে। নিজের কথা ভাবার সময় কোথায় তাঁর!!
// কিছু মধুর অত্যাচার, কিছু ভালোবাসাঃ
এ বাড়িতে আসার পরে থেকে সবসময় সুরেন্দ্রনাথের কানে এসে বড়দিদির কথা। কিন্তু তাঁকে কখনো দেখতে পায়নি। থালায় সাজানো সুন্দর করে খাবার, পরিপাটি করে সব গোছানো, কাজের জিনিস কাজের জায়গায়। সবখানে বড়দিদির যত্নের ছোঁয়া। সুরেন্দ্রনাথ ও একেক সময় এমন সব আবদার করে বসতো যে মাধবীকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হতো আবদার রাখতে।
কিন্তু কোথাও মনে মনে একটু হাসিমুখ দেখা যেতো। এই ছেলেমানুষ মাস্টারকে সামলাতে মাধবীরও ভালো লাগতো। ওই যে বলে না বিধাতার ইচ্ছে বোঝা বড় দায়। যে গাছটা একদিন ভালোবাসার ফুল দিতো সেই গাছটা এখনো যে মরে যায়নি। ফুলে ফুলে এখনো যে ভরে যায় তাঁর শাখা। বিধবার থান জড়িয়ে মনটাকে বেঁধে রাখা যায়। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছের কাছে যে নত হতে হয় মনকে।
"মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাই না
কেনো মেঘ আসে হৃদয়ও আকাশে
তোমারে দেখিতে দেয় না "
মনোরমা মাধবীলতার বাল্যকালের সখী। বুঝেছিলো এই হতভাগীর মন। যখন সুরেন্দ্রনাথ অভিমান করে ঘর ছাড়ে। কেনো ছেড়েছিল সেই উত্তর একটু রহস্য থাকুক না। কৌতুহল জাগুক মনের মাঝে।
আর কী দেখা হবে ভালোবাসার সাথে! আর কী এক হবে দুটি মন! হায়রে সমাজ! মাধবী যখন ঝরঝর করে কেঁদে বলেছিলো আমি যে বিধবা দিদি! সমাজ ব্যবস্থার উপরে ধিক্কার জন্মায়। যে সমাজ বিধবার জীবন বেঁচে থাকতেই নরক বানিয়ে দেয়।
আহা! সুরেন্দ্রনাথের অবুঝ আবেগ। হাসপাতালে শুয়ে কী আকুল আবেদন "বড়দিদি আমার জ্বর হয়েছে "। বড়দিদি এলেই যেনো সব ভালো হয়ে যাবে, সব ক্ষত সেরে যাবে। আহা এই ভালোবাসার মিলন কী হবে আদৌ শেষমেশ?
একবার দেখা হয়েছিল। কিন্তু.....! না থাক আর বলবো না। বাকিটা গোপন থাকুক।
// চরিত্রায়নঃ
আপাদমস্তক এক মিষ্টি ভালোবাসার অব্যক্ত চাওয়াগুলোর মাঝে চরিত্র বা গল্পের প্রান সুরেন্দ্রনাথ ও মাধবীলতা। এছাড়াও আছে মাধবীলতার বাবা, ভাই, ছোটবোন প্রমীলা, সুরেন্দ্রনাথের বাবা, বিমাতা। এরপর সুরেন্দ্রনাথের নায়েব। যখন সে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পায়। আর একজনের কথা বললাম না। শেষে মিলবে তাঁর পরিচয়। সেও কিন্তু সুরেন্দ্রনাথকে বড্ড ভালোবাসে।
// পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
শরৎচন্দ্রের লেখা! কী বলবো আমি জানি না এই বড়দিদি আমার ভালোলাগার একটা অনুভুতি। আমার মেয়েবেলার আবেগের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বইয়ের সাথে।
সুরেন্দ্রনাথের অবুঝ আবেগের, ছেলেমানুষীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। এবং এটা এতটাই ছিলো যে মাঝে মাঝে এখনো ছোট বোন এটা বলে খেপায় আমাকে যে সুরেন্দ্রনাথের মতো কাউকে দরকার।
এতো সুন্দর করে কীভাবে ভালোবাসার গল্প বলা যায়! আমার কিন্তু ভালো লাগে। কোনো অশ্লীল নোংরা কথাবার্তা নেই, কোনো কুৎসিত কামনা নেই অথচ কী গভীর ভালোবাসার অনুভূতি বোঝাতে পেরেছেন লেখক তাঁর লেখনীর মাধ্যমে।
তুলে ধরেছেন সমাজের জঘন্য প্রথা। যার যাতাকলে পিষে বিধবাদের জীবন আসলে নরক যন্ত্রনার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না।
ভালোবাসা তো অন্যায় নয়। ভালোবাসা যে না চাইতেই হয়ে যায়। দুটি মন মিলে যায় অজান্তেই।
ভালো থাকুক এই অবুঝ আবেগের ছেলেমানুষী। ভালো থাকুক সুরেন্দ্রনাথ, মাধবীলতা।
"ভালোবেসে নাহি যদি হয় সুখ
তবে কেনো মিছে ভালোবাসা!"
ভালোবাসা তবুও সুন্দর। ভালোবাসা তবুও মনকে জাগিয়ে তোলে। সহজে ভোলা যায় না। এড়িয়ে যেতে পারেনি মাধবীলতাও।
বইয়ের নামঃ "বড়দিদি"
লেখকঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৮/৫