শরৎচন্দ্রের ছোট ছোট উপন্যাসগুলো সবসময়ই আমার বেশী প্রিয়। কোথাও একবিন্দু বোর করে না এগুলো। অরক্ষণীয়াও সেরকম একটা উপন্যাস।
মেয়ের বয়স তের পেরিয়েছে। গরীবের মেয়ে তারপর কালো! এখনই বিয়ে না দিলে সমাজে জাত যাবে,এরমধ্যে বাবা মারা গেলেন। দুঃখিনী সেই মেয়ের দুঃখের আঁচ এটুকু পড়েই পাওয়া যায়।
রং দেখে একজন মানুষকে বিচার করা অবশ্যই ঘৃণ্য মন মানসিকতার পরিচয়। বর্তমান সমাজ একটা মেয়ের রং,বয়স এসবে ছাড় দিয়েছে। যেকোনো মেয়েই তার যোগ্যতা দিয়ে একজন পরমসুন্দরীর থেকে ওপরে চলে যেতে পারে এবং পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে পারে। কিন্তু তখনকার সমাজ এমন ছিল না। তখন মেয়েদের পড়াশোনা করতে দেয়া হতো না এবং কোনোরকমে বেড়ে উঠতে না উঠতেই পাত্রের সন্ধান শুরু হয়ে যেত। আর সেই কারণেই তখন একমাত্র মুখ্য বিষয় ছিল রুপ। দুঃখের বিষয় বউ ঠেঙ্গানো,বিপত্নীক,বুড়ো,আধবুড়ো,কানা,বোবা যাই হোক ছেলেদের বউ জোটার ব্যাপারে সমাজ উদার কিন্তু একটা নিস্পাপ কুমারী বাচ্চা মেয়েরও তের পেরোতে বিয়ে না হলে সমাজের মাথা কাটা যায়। খুশীর ব্যাপার যে এমন কুৎসিত সমাজ বদলেছে। তারপরেও সেই সমাজের মানুষদের বংশধরদের কেউ কেউ সিকি পরিমাণ তুচ্ছ মানসিকতা নিয়ে এখনো বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে যারা মেয়ের জোর করে বিয়ে দেয়, যারা মেয়ে কালো বলে গালি দেবার সময় মেয়েটার কেমন অনুভূত হচ্ছে তাকিয়েও দেখে না। সেসব মেয়েরা এই বই পড়ে নিশ্চয়ই নিজেদের রিলেট করতে পারে আজও।
গল্পে আসি, দুর্গার মেয়ে জ্ঞানদার বয়স তের ছাড়িয়েছে। তার বাসায় প্রায়ই যাতায়াত করে অতুল। চমৎকার একটা ছেলে। এবং জ্ঞানদাকে পছন্দও করে সে। এটা সেটা উপহার নিয়ে আসে। মৃত্যুশয্যায় ওর বাবাকে কথা দিয়ে বলে, মেয়েকে নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই।
কিন্তু মানুষের মন বদলাতে কতক্ষন? যখন তোমার আত্নীয়স্বজন কানের কাছে সারাক্ষণ মেয়েটিকে শাকচুন্নী,পেত্নী বিশেষণে বিশেষায়িত করছে। বিশেষ করে স্বামী মারা যাবার পর দুর্গা অতুলকে একদন্ড তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না মেয়েকে নেবার জন্য। যা মানুষ ভালোবেসে গ্রহন করে তাই যখন চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয় সেটাকে বোঝা মনে হতে কতক্ষন?
দজ্জালের মধ্যে একমাত্র দুর্গার বড় জা। কোনো কথাই মুখে বাঁধে না তার। ছোট জা মানুষটা ভালো কিন্তু নিজের মতো থাকে, মাঝেমধ্যে জ্ঞানদার জন্য তার প্রাণও কাঁদে। বাপের বাড়িতে ভাইবৌটা তার ভালো, কিন্তু ভাইটা নিজের কিছু ধার শোধ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে বউমরা এক গাঁজাখোরের সাথে ভাগ্নির বিয়ে দেবে বলে।
পাত্র যে একেবারে জোগাড় হয়না তা না। আধবুড়ো ঘাটের মড়া মাঝেমধ্যে জোটে। চেহারা একদম খারাপ জ্ঞানদার তাও না। ম্যালেরিয়ায় ভোগার পর থেকে তাকে দেখলে আর ঘাটের মরাও পছন্দ করেনা।
শহর থেকে মাধুরী আসে। সম্পর্কে জ্ঞানদার বোন। রুপে গুণে অনন্য। তার রুপের সামনে ছোট এতটুকু হয়ে থাকে মেয়েটা। সবাই তাদের দুজনের তুলনা করে তাকে ছিঃ ছিঃ করে। অথচ তার যে রুপ নেই,সে যে গরীবের মেয়ে,তার যে বাবা নেই,সে যে ম্যালেরিয়ায় ভুগে চেহারা হারিয়েছে,তার যে প্রসাধন কেনার পয়সা নেই এতে তার দোষ কোথায়? আর সুন্দর চেহারা হওয়ায় মাধুরীর কৃতিত্বই বা কোথায়? এটার কোনোটাতেই কি হাত আছে তাদের কারো? চেহারা সুন্দর না হলে একটা মেয়ে যত কটুক্তি শোনে,রং কালো হলে সে যতবার পাত্রপক্ষের সামনে থেকে 'না' শুনে ফেরত আসে এটা কি সে ডিজার্ভ করে? সমাজ বদলেছে,এযুগের মেয়েদের এসব সহ্য করতে হয় না। কিন্তু সে যুগের মেয়েরা যারা এই আধুনিক যুগে জন্মায়নি বলে বলির পাঁঠা হয়েছে তাদের এতে কি যায় আসে? তারা জন্মেছে,একগাদা না পাওয়া নিয়ে চলে গেছে। আর কি তারা ফিরে আসবে?
ছোট্ট কিন্তু চমৎকার একটা উপন্যাস। পদে পদে জ্ঞানদাকে বিয়ে না হবার জন্য,রুপ নিয়ে,রং নিয়ে যত কথা যত কটুক্তি যত হাসাহাসি সহ্য করতে হয়েছে পড়তে অসম্ভব কষ্ট লাগে। খুব খারাপ লাগে,রাগ হয়। আর এটাই উপন্যাসের কৃতিত্ব। লেখক সত্যের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। পাঠককে ভাবাতে পেরেছেন, রাগাতে পেরেছেন। লেখক জিতে গেছেন।