M. R. Akhtar Mukul (in Bengali: এম. আর. আখতার মুকুল) was a Benaglee author and journalist from Bangladesh; earned fame for Chorompotro, a radio programme from Shwadhin Bangla Betar Kendra.
'এম আর আখতার মুকুল' নামটা শুনলে প্রথম যে শব্দটা সামনে আসে তা হলো 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'। বাঙালির ভরসার একটা নাম, স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থপতি ও মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা দানকারী 'চরমপত্র'-র প্রকাশক এম আর আখতার মুকুল এবার লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সমসাময়িক কালে পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া এক সশস্ত্র বিদ্রোহের ইতিহাস যার নাম 'নকশালবাড়ী আন্দোলন'। সেই ভরসা থেকেই বইটি হাতে নেয়া। আমার নকশালবাড়ী আন্দোলন সম্পর্কে খুব বেশি জানা শোনা নেই। আর জানার জন্য এর থেকে ভালো সোর্স আর কি হতে পারে!
শিলিগুড়ির অদূরের একটি থানা নকশালবাড়ি। ১৯৬৭ সালে সেখানে শোষিত খেত মজুর, চা বাগান শ্রমিকদের মাধ্যমে ঘটেছিলো এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র বিপ্লব, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কমরেড চারু মজুমদার। কলেজ ড্রপআউট, মার্কসীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ চারু মজুমদার ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী। অপরপক্ষে, তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় কম্যুনিস্ট পার্টি (সংশোধনবাদী সিপিআই) ছিলো যারা যে কোনো বিপ্লবের বিরোধী। যার ফলে দলে ভাঙন অনিবার্য হয়ে পড়ে। দল থেকে বহিস্কৃত হন চারু মজুমদার সহ অনেকে। কিন্তু চারু মজুমদারের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তার দল ক্রমশ সংখ্যায় ভারী হতে থাকে। ১৯৬৭ সাল পরবর্তী ২ বছরে কেন্দ্রীয় কম্যুনিস্ট দল থেকে পদত্যাগ করে প্রায় ৪১ হাজার সমর্থক আর গঠিত হয় "ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেলিনবাদী)", ইতিহাসে এরাই নকশালপন্থী হিসেবে পরিচিত।
নব্য কংগ্রেস ও সিপিএম/সিপিআই এর অফিসিয়াল শত্রু হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে নকশালদের। উভয় গ্রুপের মধ্যে চলতে থাকে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা। নকশালদের বিরোধী হিসেবে কংগ্রেস ও সিপিএম এর সাথে যোগ দেয় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। একটি পরিসংখ্যান অনুসারে ১৯৭০ এর মার্চ থেকে ১৯৭১ এর আগস্ট পর্যন্ত ১৮ মাসে পশ্চিমবঙ্গে ১৩৪৫ জন নকশালবাদী নিহত হন; সিপিএম এর কর্মী নিহত হন ৩৬৮ জন, আর আটক হয়েছিল কতো তার কোনো হিসেব নেই।
কমরেড চারু মজুমদার সহ নকশালদের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মী মারা যান এবং গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে। জেলে এবং জেলের বাইরে নকশালপন্থীদের মধ্যে শুরু হলো ভাঙন। অনেকেই চারু মজুমদারের বিরুদ্ধাচারণ করতে লাগলেন। মৃতের ক্ষত আর ধর-পাকরে দল যখন এক্কেবারে বিপর্যস্ত তখন জেলে কোনো এক ভোরে নতুন এক সূর্য দেখা দিলো। খবর এলো অতিসুরক্ষিত জেল থেকে পালিয়েছেন বেশ কিছু নকশাল নেতৃত্ববৃন্দ, আর এই জেল ভাঙার মাস্টারমাইন্ড কমরেড আজিজুল হক। তারপর কমরেড আজিজুল হকের নেতৃত্বে পলায়নপর আর কিঞ্চিৎ সংশোধনবাদীদের বাদ দিয়ে নতুন করে তৈরী হলো নকশালদের দ্বিতীয় সেন্ট্রাল কমিটি। শুরু হলো আরেক দফা সশস্ত্র সংগ্রাম। কিন্তু পুলিশের অতিরিক্ত দমন নীতির কারনে এই সর্বশেষ 'চারুপন্থী' বিল্পবী বেশিদিন বাইরে থাকতে পারলেন না। গ্রেপ্তার হলেন আরেকবার। কিন্তু গ্রেপ্তারের এক মাস হলেও তাঁকে কাগজে কলমে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। কেউ জানতোনা তিনি ইতোমধ্যে জেল হাজতে। এই সুযোগে চলতে থাকে তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন। জেলেই কেটে যায় তার জীবনের মূল্যবান ১৮ টি বছর! একটা চ্যাপ্টার-এ কমরেড তপন গায়েন এর কারা নির্যাতনের বর্ণনা আমার কাছে এক্কেবারেই ঘৃণাদায়ক ও অস্বস্তিকর ঠেকেছিলো। নকশালবাদীদের যেভাবে নির্যাতন করা হতো তা অমানবিকতার সব ইতিহাসকে মাড়িয়ে যায়।
১৯৭২ সালে চারু মজুমদার এর জেল হাজতে মৃত্যু হয়। ১৯৭৩ সাল পরবর্তী বছরগুলোতে নকশালপন্থীরা ৭ টি উপদলে বিভক্ত হলেও আশি'র দশকে তা তিনটিতে রুপ নেয়, যার শেষ গ্রুপটির নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড আজিজুল হক, নকশালদের শেষ সূর্য। কমিউনিস্ট সরকার জ্যোতি বসুর কারাগারে আটক কমরেড আজিজুল হকের ৫৩ দিনের রোজনামচার একটা সারসংক্ষেপ পাওয়া যায় এই বইয়ের একটা চ্যাপ্টারে। কে যেন বলেছিলেন, "একজন বিপ্লবী একজন কবিও"। সত্যিই তাই। আজিজুল হকের লেখার অপরিপক্কতা দেখে রীতিমতো হকচকিয়ে গেছি। মনে হয়েছিলো উনি আরো কেন লিখলেন না! তাঁর কিছু কথা কোট করছি, পড়লেই বুঝতে পারবেন তার জ্ঞানের ধাঁর কতটুকু — "অবিশ্বাসী মানুষ বলে কোনো মানুষ থাকতে পারে না। মানু্ষ মাত্রই আছে একটা নির্ভরতার প্রশ্ন। নির্যাতিত মানুষ, নিপীড়িত মানুষ বোঝে তার নির্যাতনের কারণ কি। কিন্তু যখন যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে (অবশ্যই তার সীমাবদ্ধতা সহ) এখান থেকে মুক্তির উপায় পায় না তখনই সে তার সমস্ত বিশ্বাস অর্পণ করে বসে কোনো 'ভগবান' বা 'ভূত' এর ওপর। আর তার ফায়দা ওঠায় ধান্দাবাজরা।"
এছাড়াও ডায়েরীতে এসেছে জেল হাজতে তাঁর উপর করা অমানুষিক নির্যাতন এর বর্ণনা এবং জেলের দূর্ণীতি অনিয়মের কথা। পুলিশদের 'কয়েদীদের জন্য আগত দুধ' বিক্রির ব্যাবসা, কয়েদীদের নিকট 'খাটিয়া' ব্যাবসা আর কারাগারের ডাক্তারদের কাছ থেকে মন গড়া প্রেস্কিপশন বানিয়ে, দামী দামী ওষুধ লিখিয়ে সরকারের টাকা হাতিয়ে নেয়ার মত কিছু বিব্রতকর দূর্ণীতির অভিযোগ এনেছেন তিনি। জেলের পুরো সিস্টেমটাই যে দূর্ণীতিগ্রস্থ, তাঁর এই স্বগোতক্তিই তা প্রকাশ করে — "জেলের একটা গোলাপ, বেলফুল কিংবা রজনীগন্ধা ছিঁড়ে নাকের কাছে আনলেও তার কোনো গন্ধ নেই।"
পরবর্তীতে নকশালদের দমনের নায়ক সিপিএম এর জ্যোতি বসু নির্বাচনে জয় লাভ করে পশ্চিমবঙ্গের সরকার গঠন করেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুয়ায়ী ১৯৮০ সালে মুক্তি দেন সকল রাজবন্দীদের। একদিকে নকশাল আন্দোলন থেকে চীনা নেতৃবৃন্দের সমর্থন প্রত্যাহার ও নকশাল নেতৃত্বে চরম মতবিরোধ সৃষ্টি, এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে দাঁড়ালে পশ্চিম বাংলার নকশাল আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। নকশালপন্থীরা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যান, কেউ কংগ্রেসে যোগদান করেন, কেউ বা কেন্দ্রীয় কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে সাংসদ হন, আর বেশিরভাগ সংশোধনবাদীরা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিহার করে 'আন্দোলনের ধরন'- এ পরিবর্তন আনেন।
নকশালদের পতনে তাদের 'সশস্ত্র হামলার ইতিহাস'- কে দায়ী করা হলেও মূলত দলটি দূর্বল হওয়ার প্রধান কারন ছিল তাদের দলের মধ্যে ভাঙন। নকশালদের দমন করেছে একসময়কার তাদেরই নেতা সিপিএম এর জ্যোতি বসু। সংশোধনবাদী আর কোর মার্কস-লেলিনবাদীদের ঝামেলা সারাটা সময় লেগে থাকতো। এমনকি এদের নিজেদের মধ্যেও সশস্ত্র হামলার ঘটনা আছে। ১৯৭১ এর নভেম্বরে কমরেড সত্যনারায়ণ সিং বিহারে নকশালপন্থীদের এক কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং ডাকেন। 'জীবিত থাকার পরেও' সেই মিটিং এ অনুপস্থিত থাকার দায়ে চারু মজুমদারকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়, নতুন সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পান সত্যনারায়ণ সিং খোদ। নেয়া হয় চারু মজুমদার এর 'সংকীর্তনতাবাদ' এর বিরুদ্ধে নতুন সংশোধনী কর্মসূচি। প্রতিষ্ঠাতা চারু মজুমদারকে ধরিয়ে দিয়েছিলো এই নকশালরাই। ১৯৭২ সালের ১৬ই জুলাই চারু গ্রেপ্তার হন। তাঁর গ্রেপ্তারের কিছুদিন আগে দলের দু'জন কর্মী গ্রেপ্তার হন, পরবর্তীতে তারা জানান যে তারা ইচ্ছা করেই চারু মজুমদারকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন কারন তিনি (চারু) একটা গণআত্মসমার্পনের পরিকল্পনা করছিলেন যেটা তাদের পছন্দ হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এদের সকলের কাছেই চারু মজুমদার ভারস্বরুপ হয়ে পড়েছিলেন। এক সময়ে আত্মত্যাগের বক্তব্য যারা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিলো তারা স্বয়ং চারু মজুমদারকেই বলি দিলো। গ্রেপ্তারের পর হৃদরোগী চারু মজুমদার ১২ দিন লকআপে নির্যাতন সহ্য করার পর ২৮ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নকশালদের পতনের পেছনে আরেকটা মূখ্য কারন হলো তাদের 'আদর্শচ���যুতি'। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এর পুরোধা লেলিন এর বিপ্লব একরকম, তার ধাঁচে পরবর্তীতে চীনে মাও যে বিপ্লবের ডাক দেন তা আরেকরকম। নকশালরা ছিলেন চীনপন্থী, কিন্তু খোদ চীন ও তাদের বিপ্লবের ধরনে সন্তুষ্ট ছিলেন না। কমরেড সৌরিন বসু দলের প্রতিনিধি হয়ে চীনে গেলে প্রেসিডেন্ট চৌ এন লাই তাদের আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন — এক দেশের পদ্ধতি আরেক দেশে হুবহু প্রয়োগ করা যুক্তিযুক্ত নয়। 'চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান' — এই ধারনাও তিনি ভুল প্রমান করে বলেন, "তোমাদের চেয়ারম্যান হবে তোমাদের দেশ থেকেই, তা না হলে এটা জাতিগত বিবাদ ছড়াবে।"
'শ্রেণীশত্রু খতম' এর নামে নিরস্ত্র ট্রাফিক পুলিশ হত্যার নিন্দা করেন। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নেতা কাং শেঙ — 'যে শ্রেণীশত্রু খতম করেনি সে কম্যুনিস্ট নয়' — এমন প্রচারের বিরোধিতা করেন এবং বলেন, "আমাদের মনে হয়েছে তোমাদের সাধারণ দিশা ঠিক আছে, কেবল কয়েকটি নীতি উপযুক্ত নয়। কৃষকদের মৌলিক স্বার্থ ও তার কৃষি সংগ্রামকে অগ্রাহ্য করে সশস্ত্র সংগ্রামের কোনো ভিত্তি থাকে না, তাই তা সফল ও হয়না। তোমাদের কোন ভূমি-নীতি নেই, এইভাবে কি করে হবে? প্রথমে তো আমাদের একটি ভূমিনীতি ঠিক করতে হবে যার ভিত্তিতে কৃষককে জমায়েত করবো, তারপর সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে।"
চৌ এন লাই যোগ করেন, "মৃত্যুকে আমরা ভয় পাই না, মৃত্যু প্রয়োজনীয় হওয়া চাই। কিন্তু হঠকারী ও বৃথা মৃত্যু অপ্রয়োজনীয়। আমরা কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যরা এরকম এ্যানার্কিস্ট কার্যকলাপের সাথে একমত হতে পারিনা।" চীনফেরত সৌরিনবসুর মুখে এসব শুনে কমরেড চারু মজুমদার শুধু একটা কথাই বলেন - "তা কিছুটা তো আমরা বিচ্যুত হয়েছি-ই"। কিন্তু তিনি তার সশস্ত্র সংগ্রাম এর পথ পরিবর্তন করেন নি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংশোধনবাদীদের বিপক্ষে কথা বলে গেছেন। আমার ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র অনুধাবন থেকে আমি মনে করি - যে আন্দোলন কৃষকের অধিকার নিয়ে সে আন্দোলনে কৃষকদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হতো। শুধু নিজে অস্ত্র হাতে না তুলে কৃষকের হাতে অস্ত্র তুলে দিলে হয়তো আন্দোলনটার ফল ভিন্ন হতে পারতো।
এবার আসি আখতার মুকুল কতটা আশা পূর্ণ করতে পেরেছেন তার বিশ্লেষণে।
বইয়ের নাম 'নকশালদের শেষ সূর্য', আর তা বলতে তিঁনি নকশাল আন্দোলন এর শেষ 'সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী' নেতা কমরেড আজিজুল হক-কে বুঝিয়েছেন, কভারে তাঁর ছবিও দিয়েছেন। কিন্তু বই-তে তাঁকে নিয়ে চ্যাপ্টার মাত্র একটাই। মানে বইটার আনুমানিক মাত্র ২০-২৫ শতাংশে আজিজুল হক এর কথা লেখা আছে। তাহলে তাঁর নামে নামকরণের কারন কী? আমরা পাঠকরা অনেকসময় বই এর নাম দেখেই ভিতরে কী আছে গেইজ করে নিই। কিন্তু তা না পাওয়া গেলে হতাশ হই। আর এ বইটি আখতার মুকুল এর সম্পাদনা গ্রন্থ, এক এক জনের লেখা নিজের মত টাইটেল বসিয়ে সম্পাদনা করেছেন। তাই এ বইতে তথ্যের রিপিটেশন ছিলো চোখে পড়ার মতো। বইয়ের তথ্যগুলি অনেকটাই অগোছালো ঠিক আমার রিভিউ এর মতো। আরো বেশি কিছু আশা করেছিলাম, কিন্তু হতাশ হয়েছি। রেটিং এভারেজ (দুই তারা) দিতে গিয়েও এক তারা বাড়িয়ে দিয়েছি কারন নকশাল আন্দোলন নিয়ে পড়া এটা আমার প্রথম বই; বেশ কিছু তথ্য, কিছু ইতিহাস জেনেছি যা আগে জানা হয়নি, তাই তার কৃতজ্ঞতা স্বরুপ।