Second Volume of Complete Collected Works of Manoranjan Bhattacharya.
‘রামধনু’ পত্রিকার সম্পাদক মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য পাঠকের বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক বিদগ্ধ সাহিত্যিক। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর দু’মাস তেইশ দিনের জীবন; অথচ কী বর্ণময়! তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন একাধিক রত্নসম ছোটোদের হাসির গল্প এবং গোয়েন্দা গল্পে। তাঁর সৃষ্ট জাপানি গোয়েন্দা ‘হুকা-কাশি’ বাংলা শিশুসাহিত্যের সম্পদ।
মনোরঞ্জনের মৃত্যুর প্রায় ৮৪ বছর পরে দুই খণ্ডে তাঁর স্বনামে, সম্পাদক হিসেবে এবং ছদ্মনামে লেখা সমস্ত রচনা এই প্রথম প্রকাশিত হল। রচনা সমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ডে থাকছে তাঁর একমাত্র অনূদিত উপন্যাস, গোয়েন্দা হুকা-কাশি এবং ‘নূতন পুরাণ’ ব্যতীত সমস্ত ছোটোগল্প এবং একগুচ্ছ প্রবন্ধ। পরিশিষ্ট অংশে রয়েছে তাঁর অকাল প্রয়াণের পর রামধনুতে প্রকাশিত বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণা, কবিতা, চিঠিপত্র। এছাড়াও স্থান পেয়েছে ‘মনোরঞ্জন স্মৃতিরক্ষা তহবিল’, ‘মনোরঞ্জন চিরস্মৃতি পুরস্কার প্রতিযোগিতা’, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন বইয়ের বিজ্ঞাপন ও আলোচনা, বংশপঞ্জি এবং বিভিন্ন দুর্লভ পারিবারিক চিত্র।
গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত প্রতিভাধর সাহিত্যিক বাংলার শিশু-কিশোরদের মনের বিকাশ নিয়ে রীতিমতো ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। তাঁদের মেধা ও শ্রমে সেই সময় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল বাংলা সাহিত্য। কিন্তু যুগ বদলায়। কালের অমোঘ নিয়মে তাঁদের কাজ, এমনকি তাঁদের নামটুকুও হারিয়ে যায় নতুন যুগের পাঠকের মন থেকে। এমনই একজন মানুষ হলেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। 'রামধনু' পত্রিকায় তাঁর লেখালেখি শিশু-কিশোর পাঠকদের পাশাপাশি বড়োদের, এমনকি সমকালীন অন্যান্য সাহিত্যিকদেরও আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর কিছু-কিছু লেখা পরবর্তীকালে পাঠকের সামনে ফিরে আসে। গোয়েন্দা হুকাকাশির কীর্তিকলাপ, 'নূতন পুরাণ' নামে পৌরাণিক তথা মহাকাব্যিক চরিত্রদের এ-কালে নিয়ে এসে আধুনিক ও সরস গল্পমালা— এগুলো একাধিক প্রকাশকের উদ্যোগে আজকের পাঠক নতুন করে উপভোগের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু মনোরঞ্জনের সামগ্রিক সাহিত্যকীর্তির পুনরুদ্ধার, বিশেষত 'রামধনু' পত্রিকার মাধ্যমে কিশোর মনের বিকাশের লক্ষ্যে তাঁর প্রয়াসের একটি মূল্যায়ন এযাবৎ হয়নি। এইবার হল। মন্তাজ (একটি কল্পবিশ্ব ইমপ্রিন্ট) থেকে সন্তু বাগের সম্পাদনায় দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই রচনাসমগ্র মনোরঞ্জনের যাবতীয় কাজের সঙ্গে 'রামধনু'-র ইতিহাসকেও ফিরিয়ে আনল আমাদের সামনে। সত্যি বলতে কি, 'সম্পাদকীয়' পড়েই টের পেলাম কাজটা কতখানি কঠিন ছিল। তার পরেও যে এমন অসাধারণ মুদ্রণে, শুদ্ধভাবে (এবং প্রথম প্রকাশের পাঠ অনুযায়ী), সর্বোপরি মূল অলংকরণের সঙ্গে লেখাগুলো পাওয়া গেল, এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব সম্পাদক সন্তু বাগের। মনোরঞ্জনের দ্বারা অনূদিত একটি উপন্যাস, তেতাল্লিশটি ছোটোগল্প, পনেরোটি প্রবন্ধ, 'স্মৃতির পূজা' শীর্ষক অংশে মনোরঞ্জনের অকালপ্রয়াণের পর তাঁর স্মৃতিতে রচিত বিভিন্ন লেখা, পুরোনো বিজ্ঞাপন, বংশপঞ্জি, ফটো— এ-সব দিয়ে ভরা রয়েছে এই খণ্ডটি। তার সঙ্গে এটি শিল্পী ফণীভূষণ গুপ্তের কাজের একটি আর্কাইভও হয়ে উঠেছে। মনোরঞ্জনের লেখা জীবন্ত হয়ে উঠত যাঁর আঁকায়, তাঁর কাজের পুনর্বাসনের সঙ্গে এই খণ্ডটি তাঁকে উৎসর্গও করে সম্পাদক পথিকৃৎদের উদ্দেশে যথার্থ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। লেখাগুলো আজও পড়লে আশ্চর্যরকম আধুনিক লাগে। তবে ওই মান্ধাতার আমলের উপন্যাসটির বদলে মনোরঞ্জনের জাদুকরি কলম যদি ডিকেন্স, স্টিভেনসন, বা অস্কার ওয়াইল্ডের কোনো লেখা অনূদিত আকারে পেশ করত, তাহলে ব্যাপারটা অনেক বেশি উপভোগ্য হত। সে-বিষয়ে অবশ্য এখন আর কিছু করার নেই। তবে বাকি লেখাগুলোর জন্য, আর সামগ্রিক সম্পাদনার জন্য— যে নিরিখে বইটিকে অন্য সম্পাদকদের কাছে মডেল হিসেবে পেশ করা চলে— বইটা অবশ্যই সংগ্রহ করতে ও পড়তে অনুরোধ করব। 'মনোরঞ্জন মিউজিয়াম' ব্লগ-এর স্রষ্টা অকালপ্রয়াত সৌরভ দত্তকে বড্ড মিস্ করছিলাম বইটা পড়তে গিয়ে। মনোরঞ্জনের রচনার এমন উজ্জ্বল উদ্ধার দেখলে মানুষটি যে কতখানি খুশি হতেন, তাই ভাবছিলাম শুধু। এমন একটি অসাধারণ কাজকে দয়া করে উপেক্ষা করবেন না।
কিছু কিছু লেখক আছেন, শিশুকাল থেকে তাঁদের সুখ্যাতি শুনে বড় হতে হতে আফসোস হয় "ইশ , আর কয়েক বছর আগে জন্মালে ভাল হত " । রামধনু পত্রিকা এবং তার সম্পাদক কে নিয়ে আমার এরকমই আফসোস ছিল । কিন্তু এই দুই খন্ডের সমগ্র সেই দুঃখ লাঘব করেছে । আজকের যুগে লেখকের মূল ভূমিকা, টিকা সমস্ত বাদ দিয়ে সংকলন প্রকাশের বিরক্তিকর অভ্যেস প্রচলিত। সন্তু বাবু কে ধন্যবাদ, স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে একটি প্রকৃত সমগ্র উপহার দেওয়ার জন্য । নামে ,বেনামে প্রকাশিত সমস্ত লেখা/অনুবাদের পাশাপাশি চিঠি, কবিতা, বইয়ের বিজ্ঞাপন , স্মৃতিচারণ, সাহিত্য প্রতিযোগিতা , মূল অলংকরণ সহ এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা ।