ইংল্যান্ডের নটিংহাম শহরের কাছেই ছিল বিশাল শেরউড জঙ্গল। সেই জঙ্গলে আস্তানা গেড়েছিল দুর্দান্ত দুঃসাহসী এক মহৎ হৃদয় দস্যু - রবিন হুড ও তার সাত কুড়ি দুর্ধর্ষ অনুচর। অত্যাচারী নর্মান শাসক, প্রজা-নিপীড়ক জমিদার, অসৎ ব্যবসায়ী আর অর্থ-লোলুপ বিশপ-মোহান্তদের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছিল রবিন; কিন্তু আবার লুন্ঠিত অর্থ দীন-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণের মাধ্যমে জয় করে নিয়েছিল সাধারণ মানুষের অন্তর। বিপদে সাহায্য চেয়ে কেউ কোনদিন ফিরে আসেনি তার দুয়ার থেকে। আসুন, লেখকের সাথে গিয়ে আমরাও ঘুরে আসি গভীর গহীন সেই শেরউড জঙ্গল থেকে।
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
রবিন হুডের উপর হলিউডি সিনেমা দেখেছি ৪টা, টিভি সিরিজ দেখেছি ১টা, কার্টুন সিরিজ ১টা, অ্যানিমে ম্যুভি ২টা, বই পড়েছি আরো ২টা। কিন্তু কাজীদা'র এই অনুবাদ সঙ্কলনের চেয়ে ভাল কিছু আর কোথাও পাইনি। কোন নির্দিষ্ট বই থেকে নয়, নানা বই মিলিয়েই কাহিনী কাঠামোটা দাঁড়িয়েছে বলে প্রায় মৌলিক লেখাই বলা যায়। শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধ যে কোন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পাঠকের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
আচ্ছা রবিন হুডের নাম শোনেনি এমন লিস্ট করলে কি একজন লোকেরও নাম উঠবে সেই লিস্টে? আমার সন্দেহ আছে। যদিও এর পিছনে মনে হয় বিটিভি/ইটিভির কিছুটা হাত আছে। তারা রবিন হুড ডাবিং করে দেখাত এইটুকুই শুধু মনে আছে আর মনে ছিল।
রবিন হুড। গরীব দুঃখিদের আশা ভরশা আর রক্তচোষা ধনীদের যম সে। কিন্তু রবিন হুড কিভাবে রবিন হুড হয়ে উঠেছে তা জানা যায় এই বই থেকে। ওই সময়ে ঘটে চলা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে জ্বলজ্বলে নাম রবিন হুড। এই বই এ রবিন হুডের সেই সব অবাক করা বীরত্বের কথা উঠে এসেছে। একই সাথে তার চতুরতার আর দৈনন্দিন জীবনে ঘটে চলা মজার মজার সব ঘটনা জানতে পারি আর হাসতে হাসতে কখন যে কাহিনীর শেষ প্রান্তে চলে আসি তার কোন খেয়ালই পাওয়া যায় না।
একটা বই শৈশবে কিরকম প্রভাব ফেলে তার একটা অসাধারণ উদাহরণ হতে পারে সেবার এই বইটা।রবিনহুড নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক অনেক বই,করা হয়েছে সিনেমা/টিভি সিরিজ।কিন্ত সেসবের কিছু কখনোই পড়ার বা দেখার ইচ্ছাটা জাগেনি আমার মনে।কারণ এই বই পড়ার পর এই বইয়ের স্ট্যান্ডারডেই সব রবিনহুডকে মাপতাম আমি এবং সেটা হত ওই রবিনহুডদের জন্য ফেয়ার হতনা।
এখনো মনে পড়ে সেই ফ্রায়ার টাক,লিটল জনের সাথে রবিনের প্রথম সাক্ষাৎ এর কথা।মনে পড়ে নটিংহ্যামে ধোকা দিয়ে রবিনের তীর প্রতিযোগিতায় ১ম হবার কথা এবং শেরিফকে লেখা সেই অবিস্মরণীয় ছড়া
" ভেবেছিলে ধরবে তাকে পড়বে ফাদে রবিনহুড পুরস্কারটা কে নিল আজ হাসছে তামাম শেরহুড"
তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে কোন বই পড়ে প্রথম আমার কেদে কেটে বিছানো ভাসানোর কথা।খুব খুউব প্রিয় একটা বই।কিন্ত যে এই বইটা চুরি করল তার উপর রাগ করলেও (যদিও জানিনা সে কে)তার রুচির প্রশংসা করতে হয়।আর বইটার ছবিগুলাও অসাধারণ।সেবাই এই বইটা রিপ্রিন্ট করা উচিত।বইমেলায় খুজেছি অনেকবার।
ছোটবেলার বই পড়া আর এখনের পড়ার মাঝে বিশাল পার্থক্য। তখন মুগ্ধ হয়ে পড়তে থাকতাম চোখ বড় বড় করে। আর এখন কেমন যেনো খুঁতখুতে হয়ে গেছি। সবসময় প্লটহোল কিংবা ছোটখাটো অসঙ্গতি খোঁজে বেড়ায় চোখ। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বইগুলো যদি ছোটবেলার মতন আবার পড়তে পারতাম! আমি নিশ্চিত কিশোর বয়সের অনেকে এখনো এই অসাধারণ বইগুলো মুগ্ধ হয়ে পড়বে। সেবা প্রকাশনীর সোনালী সময়ের সোনালী বই... কত যে স্মৃতির মুখোমুখি করে দেয়!
আইভানহো সহ সমসাময়িক আরো কিছু ইংরেজী সাহিত্য পড়ে রবিনহুড নামটা অনেক বছর ধরেই মাথায় ঘুরছিলো, সাথে আরো বিভিন্ন সোর্স থেকে নানান উপকথা শুনে একটু ধারনাও ছিলো যে রবিনহুড ব্যক্তি হিসেবে কেমন। তবে সব ধারনা ছাড়িয়ে গেলো কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘রবিন হুড’ অনুবাদটি পরে। এটা শুধু একটি অনুবাদ নয়, যেন এক নতুন প্রাণ পাওয়া সাহসিকতার গল্প। পশ্চিমা বিশ্বের এই কিংবদন্তি চরিত্রকে তিনি এমনভাবে বাংলায় উপস্থাপন করেছেন, যাতে বাংলার পাঠক একে খুব আপন করে নিতে পারে।
এই বইয়ে রবিন হুডের কাহিনি যতটা না বিদেশি, তার চেয়ে বেশি পরিচিত মনে হয় গরিবের বন্ধু, ধনীদের শত্রু, শাসকের চোখে বিদ্রোহী, কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখে বীর। লেখকের অনুবাদ ভঙ্গি সাবলীল, গতিশীল এবং চরিত্রগুলোর সংলাপ এমনভাবে বাংলায় রূপ পেয়েছে, যেন তারা আমাদের আশপাশেরই কেউ।
বিশেষ করে লিটল জন , ফ্রায়ার টাক কিংবা উইল স্কারলেটের মতো সহচরদের বর্ণনায় একটা রসবোধ আছে, যা কিশোর পাঠকদের মুগ্ধ করবেই। রবিন হুডের ধাঁধাধর্মী কথাবার্তা, বুদ্ধির খেলা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি তার অদম্য আকর্ষণ—সব মিলিয়ে গল্পগুলো চমৎকারভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
তবে অনুবাদটি শতভাগ হাওয়ার্ড পাইলের মূল টেক্সট অনুসরণ করেনি—অনেক জায়গায় সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, কিছুটা কিশোর উপযোগী করাও হয়েছে। এই সংক্ষিপ্তকরণ বইটির গভীরতা কিছুটা হালকা করে তুললেও, গল্পের মজাটা একটুও কমেনি। বরং পাঠের গতি বজায় রাখে। তাই এটি ছোটদের হাতে তুলে দেওয়ার মতোও একটি বই—তাদের সাহস, সততা, প্রতিবাদ ও বন্ধুত্বের মূল্য শেখানোর জন্য একদম উপযুক্ত। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো, এবং পড়া শেষেও মনে রয়ে যায় রবিন হুডের হাসিমাখা মুখ আর তির-ধনুক।
যারা শৈশব-কৈশোরে এই বইটি পড়েছেন, তাদের মনে অবশ্যই রোমাঞ্চের একটা নস্টালজিয়া কাজ করে। আর যারা এখনও পড়েননি—তাদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি দারুণ শুরু হতে পারে ক্লাসিক লোককাহিনি জগতে প্রবেশের।
টিমওয়ার্কের জন্য বিশ্ব সেরা একটি বই ‘রবিন হুড’। এটি পড়ার সময় একদম নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ার অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা, অ্যাডভেঞ্চার আর বীরত্ব। তাই লেখকের সাথে আমিও ঘুরে বেড়াই শেরউড থেকে নাটিংহামের বিভিন্ন অলিগলি। দেখেছি কীভাবে একটি সেরা টিম তৈরি ও পরিচালনা করতে হয়, অন্যদের সম্মান দিতে হয়, নীতি মেনে চলতে হয়, কর্তব্য পালন করতে ইত্যাদি। মানুষের মনে স্থান করে নেওয়ার জন্য এটি আদর্শ। রবিনে হুডের কেউ অলস নয়। প্রতি মুহূর্তে তারা অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নেয় এবং নিজেদের সেরা হিসেবে আরেকধাপ এগিয়ে নেয়। নিজেদের দল গায়ক থেকে শুরু করে পুরহিতসহ সবধরনের লোক দিয়ে পূর্ণতা দিয়েছে। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছে। গল্পের একদম শ��ষ অধ্যায়ে এসে সকল উত্তেজনা দমে গিয়ে দুঃখ আর সহানুভতিতে রূপ নেয়।
কাজী আনোয়ার হোসেন - বাংলাদেশের বইজগতের প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যময় এ মানুষটির সাহিত্যিক গুণ সম্পর্কে জেনেছিলাম 'রবিনহুড' এর মাধ্যমে। এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এটা রূপান্তর।
আর রবিনহুড এমনিতেই জঙ্গল-অ্যাডভেঞ্চার জনরায় প্রসিদ্ধ বই। শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের ফিল নিতে চাইলে বইটির বিকল্প নেই। হাসির খোরাকেরও অভাব নেই।
সেবা'র রবিনহুডের প্রচ্ছদটা আমার খুব পছন্দের। কোথায় যেন পড়েছিলাম কাজীদার পার্সোনাল ফেভারিট এই বই। কিশোর বয়সে হুহু করে কেঁদেছিলেন এই গল্প পড়ে। সেই কান্নার আবেগ যে এখানে ধরা থাকবে তাতে কোন সন্দেহ ছিল না।
ইংল্যান্ডের নর্মান রাজার হাত থেকে পালিয়ে শেরউড জঙ্গলে নিজেকে মানবিক দস্যুগোষ্ঠীর সর্দার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ❝রবিনহুড❞ এর গল্প নিয়ে এ বইটি। বইটি প্রথম পড়েছিলাম ক্লাস নাইনে থাকাকালে। কয়েকদিন আগে আবার পড়লাম। পড়ার শুরু করলেই নস্টালজিক হয়ে যাই।
এই বইটা এতটাই হৃদয়গ্রাহী যে শুরু করার পর থেকে খাওয়া, স্কুল, স্নান সব ভুলে গিয়েছিলাম প্রায়। এখনো মনে হয় যদি স্মৃতি মুছে ফেলে নতুন করে বইটা পড়ার আনন্দ পেতাম !
ছোটবেলায় যখন পড়েছিলাম, মনে মনে খুব ইচ্ছে হতো সবুজ বনে গিয়ে রবিন হুডের দলের সাথে যোগ দিব, দস্যু হব। আজ অনেকদিন পর দ্বিতীয়বারের মতো বইটা পড়লাম, ছোটবেলার অনুভূতি গুলো মনে পড়ে যাচ্ছে।
রবিন হুড, ছেলে বুড়ো সবার কাছেই পরিচিত এক নাম । যে কিনা অসহায় গরীব দুঃখীর বন্ধু আবার সেই সাথে অত্যাচারী শাসক কিংবা জুলুমকারীদের ত্রাস। ইংরেজি সাহিত্য তো বটেই পুরো বিশ্বসাহিত্যে রবিন হুড এক অনন্য চরিত্রের নাম । কিন্ত মজার ব্যপার হচ্ছে এই জনপ্রিয় চরিত্রের বাস্তব ঐতিহাসিক সত্যতা বা ভিত্তি তেমনটা পাওয়া যায় না । হয়ত কোন এককালে সত্যি সত্যি ই রবিন হুড নামের এক দস্যু ছিল প্রাচীন ইংল্যান্ডে যে সকল অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ - কড়ি ছিনতাই করে বিলিয়ে দিতো সে গরীব দুঃখীর মাঝে, বিপদে পাশে এসে দাড়াতো । এই ঐতিহাসিক চরিত্রের বাস্তব অস্তিত্ব নিরুপণের চেষ্টা বৃথা, এ চরিত্রের মহত্বের কাহীনিগুলো লোক মুখে প্রচারিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে । যেহেতু লোকমুখে প্রচুর প্রচারিত হয়েছে রবিন হুডের কাহিনী সেহুতু সেগুলো যে একেবারে আদি অকৃতিম অবস্থায় রয়েছে সেরকম ভাবাটা সমীচীন হবেনা। এসব কিছু বাদ দিয়ে নির্ভেজাল আনন্দ পেতে চাইলে, ক্ল্যাসিক কিশোর হিসবে পড়ে রবিন হুডের রহস্যময় চরিত্রের সাথে এডভেঞ্চারাস কাহিনীর মধ্যে নিজেকে নিয়ে গিয়ে আনন্দ পাওয়াটাই হল মুখ্য কথা ।
এবার বইয়ের ব্যাপারে আসি, রবিন হুড অসহায় দুঃস্থের বন্ধু আর অত্যাচারীদের ত্রাস, পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে যার চেয়ে ভালো আর কোন তীরন্দাজ বা লাঠিয়াল নেই । সে যে তীর ছোড়ায় সবার সেরা তার প্রমান দিয়েছে সে বারে বারে । অর্থ কড়ি লুট করে তা আবার গরীবের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার এই মহৎ কাজ তো আর একা করা সম্ভব নয়, তাই সে খুঁজে খুঁজে বের করেছে এমন এমন সব লোকদের যারা কেউ তীর ছোঁড়ায়, কেউবা লাঠি খেলায় বা অনান্য কাজে পারদর্শী। তাদের নেতা রবিন হুড যে শেরউডের জঙ্গলে আস্তনা করে থাকত তার দলবল নিয়ে। ধীরে ধীরে রবিন হুডের এই মহৎ কর্মের কথা ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশজুড়ে, সবাইর বাহবা পেতে থাকে সে । তো এই দস্যুবৃত্তি করতে গিয়ে স্বভাবতই সে স্থানীয় শেরিফের চোখে পড়ে যায় এবং কুটিল শেরিফ রবিনহুডকে হত্যা করে রাজার কাছে নিজের ক্ষমতা জাহিরে দৃঢসংকল্প নেয় । শেরিফের হাতে বারকয়েক রবিন ও তার সহযোগীরা ধরা পড়লেও বারে বারে তারা বেঁচে যায় । রবিনের এই বীরত্বের কথা শুনে পরবর্তীতে রাজা স্বয়ং ছদ্মবেশে এসে হাজির হন রবিনের ডেরায় এবং রবিন ও তার সহযযোগীদের সততা - শৃঙ্খলা দেখে মুগ্ধ হন ।
বইয়ের অনুবাদ কাজী আনোয়ার হোসেন এমনভাবে করেছেন যেন মনে হবে এটা কোন বিদেশী বইয়ের অনুবাদ নয়। বাংলা ভাষায় রচিত কোন এক কাহিনী। অত্যন্ত সুন্দর সাবলীল ভাবে অনুবাদ করেছেন তিনি ।