উত্তর-স্বাধীনতা পর্বের শহর কলকাতা এ উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। দেশভাগজনিত উদ্বাস্তু সমস্যা, নারীপাচারচক্র ও সেই সঙ্গে ভারতবর্ষের প্রধান শহরগুলোতে বেশ্যাবৃত্তির ব্যাপক ব্যবসা, জমি-কেনাবেচার কারবারে দেদার মুনাফা, সেকেন্ড ফাইভ ইয়ার প্ল্যান আর ইন্ডিয়ার ইন্ডাসট্রিয়ালাইজেশন, আর এশিয়ার বৃহত্তম শক্তি হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা। মার্কিন দেশে মিত্রতা কি যাত্রা’ শেষ করে নেহেরু কংগ্রেস সদস্যদের ইন্দোরে ডেকেছেন। অ্যাংলো ফ্রেঞ্চ আর্মি চলে যাবার পর আরো ঘোরালো হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থাটা। ডলারের না রুবলের? কার কব্জায় যাবে দেশ? আকাশছোঁয়া বাড়ির সংখ্যা যেমন বাড়ছে প্রতিদিন, গাড়ির তুলনায় কলকাতার রাস্তার ঘাটতি প্রতিদিন সমস্যা বাড়াচ্ছে। নেহেরুর দেশে দেশে শুভেচ্ছা সফরের মধ্যেই শুরু হল সীমান্তে চীন-ভারত সংঘর্ষ....। বিমল মিত্রের উপন্যাসে নগর কলকাতা যে ব্যাপকতায় প্রতিবিম্বিত, সেই প্রসার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আর কোনো কথাকারের কলমে নেই।
Bimal Mitra (bengali: বিমল মিত্র) was a prominent Bengali writer who wrote several novels. Bimal Mitra was equally adept in writing in Bengali as well as in Hindi, and has more than one hundred novels and short stories to his credit. Many of Bimal Mitra's novels have been made into successful films. One of his most popular works, Shaheb Bibi Golam (January 1953) which was adapted into a hugely popular movie
সদাব্রতকে আমার অসম্ভব ভালো লেগে গিয়েছে। দেড় দিন প্রচণ্ড জ্বরের পর গতসন্ধায় যখন আমার হুস আসল, তখন 'একক দশক শতক' নিয়ে বসেছিলাম। ১০৪ থেকে থার্মোমিটার এর পারদ তখন ১০১ তে নেমেছে। প্রাক্তন কলকাতায় জার্নিটা তখন শুরু হয়ে এইমাত্র শেষ হলো। জ্বরের ঘোরে বা যে কারণেই হোক, সদাব্রত একদম মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। অনেক ভালো একটা ছেলে, লাজুক, ভদ্র, পরোপকারী, ভুলেও কারো খারাপ চায় না, অথচ সবাই তাকে ভুল বোঝে ! যাই হোক, ক্রাশের গুণগান না গেয়ে রিভিউটা লিখি......
বই: একক দশক শতক। লেখক: বিমল মিত্র।
আপনি যখন 'একক দশক শতক' হাতে নিয়ে যাত্রা শুরু করবেন, সদ্য স্বাধীন হওয়া কলকাতার বাসিন্দারা জানে না সেই স্বাধীনতার মানে! যখন ৩৬০ পৃষ্ঠার যাত্রা শেষ করবেন..... তখনও কলকাতা শহরের হিন্দুস্থান পার্কে পেনশন হোল্ডারদের সামনে শিবপ্রসাদ গুপ্ত দেশসেবার গল্প করে করে যান। তখনও সোনাগাছির পদ্মরাণীর ফ্ল্যাটে প্রতিদিন বেলফুলের মালা ফেরি করতে আসে ফুল ওয়ালা। পাঁঠার ঘুগনি প্লেট ঘরে ঘরে সাপ্লাই দিয়ে বেড়ায় সুফল। তখনও সন্ধ্যা হলে পাড়ার উঠতি ছোকরারা এসে ঘরগুলোতে ঢোকে। আর খিল দেয়া দরজার ভেতরে হারমোনিয়াম, তবলা, ঘুঙুরের তালে গান শুরু হয়ে যায়- "চাঁদ বলে ও চকোরি বাঁকা চোখে চেয়ো না!" ওদিকে 'সুভেনির ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ' এ ফরেন পার্টস এর পারমিটের জন্য দিল্লির সাথে ট্রাঙ্ককল চালাচালি হয়। মিস্টার বোস রিসিভারটা তুলে বলেন- হ্যাল্লো! তখন মিসেস বোস বাথটাবের ভেতর শুয়ে হটওয়াটার ছেড়ে দিয়ে টার্ফের হ্যন্ডিক্যাপ মি পড়েন। তখনও পি জি হাসপাতালের কেবিনে ম্যানিলা বোসকে গলার নলদিয়ে গ্লুকজ খাওয়ানো হয়। তখনও বন্দনা দাস, শ্যামলিরা মধু গুপ্ত লেনের ক্লাবে 'মরা-মাটি'র রিহার্সেল দেয়। শম্ভু, কালিপদর দল আবার আগের মত অফিস থেকে এসেই ক্লাবে ঢোকে। তখনও বিনয় ইন্সটলমেন্টে স্যুট বানায় আর বাসের ভিড়ে মেয়েদের সাথে গা ঘেঁষাঘেষির আশায় দাঁড়ায়। তখনও কেদারবাবু মানুষ তৈরির স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছাত্র পড়িয়ে বেড়ান। মানুষ ভুলে যায় কুন্তি গুহদের ভুত-ভবিষ্যত। মন্মথ আর শৈল অপেক্ষায় থাকে সদাব্রতর কালাশৌচের কাল অতিক্রান্ত হওয়ার......
সবই ঠিকঠিক চলবে অথচ আপনি বইটা শেষ করে ভাবতে থাকবেন, এই উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা কারা?!?!!
আমার কাছে মনে হয়েছে স্বয়ং কলকাতাই বইটার প্রধান চরিত্র। মৃত্যু এখানে এত সস্তা বলেই জীবন এখানে মূল্যহীন! দারিদ্র এত নির্লজ্জ বলেই অর্থ এখানে এত দৃষ্টিকটু! প্রেম এখানে পণ্য বলেই ঘৃণা এখানে তু্চ্ছ! পাপ এখানে প্রচুর বলেই পূণ্য এখানে এত সুলভ! এ শুধু কুন্তি গুহর ইতিহাস নয়। বিনয়, শম্ভু, মন্মথ, সদাব্রতের ইতিহাস নয়। কেদারনাথ, শৈল বা বোস পরিবারের ইতিহাসও নয়। এ কলকাতারই ইতিহাস। একক দশক শতক এর ইতিহাস!
পৃথিবী তে অনেক দুঃখ আছে যার প্রতিকার মানুষের হাতে নেই...
বিমল মিত্র পড়া মানেই সবকিছু আবার নতুন করে দেখা...আবারো নিজের চিন্তা আর বিবেকের কাছে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়া... সুবৃহত উপন্যাস গুলোর থিম এক ই হলে ও প্রকাশভংগি ভিন্ন... আসামি হাজির, সাহেব বিবি গোলাম, কড়ি দিয়ে কিনলাম এর ই মতো "একক দশক শতক" এ ও সেই সমাজ, সময়,মানুষ আর তার সমসাময়িক রাজনীতি ছাড়াও কিছু যেনো আছে যা সুনীল,সমরেশ,শীর্ষেন্দু থেকে বিমল মিত্র কে আলাদা করে দেয়....
বিবেকের টানাপোড়েনে বিহবল সদাব্রত বারবার সেই দিপংকর এর কথা ই মনে করিয়ে দেয়...
‘একক দশক শতক’- এটি শুধু কুন্তি গুহর ইতিহাস নয়। বিনয়, শম্ভু, মন্মথ, সদাব্রতের ইতিহাস নয়। কেদারনাথ, শৈল বা বোস পরিবারের ইতিহাসও নয়। এ সময়ের ইতিহাস। এ কলকাতারই ইতিহাস। কলকাতাই এর নায়ক। কলকাতাই এর নায়িকা। এ একক দশক শতক এর ইতিহাস। বই পড়া শেষে ভালো মানুষ সদাব্রতের জন্য কেবল থেকে যায় আকাশ সমান দুঃখ। সে জীবন ভর ভেবে গেলো বাবা মার কথা, মাষ্টারমশাই এর কথা, বিনয়, শম্ভু, মন্মথ, শৈল, মনিলা, বোস, সমাজ, কলকাতা আর রাষ্ট্রের কথা। তার জন্য কিছু রইলো কি?
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর এত জনপ্রিয়তা সম্ভবত আর কোনো সাহিত্যিক অর্জন করতে পারেননি।নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘সত্যিই আমার কিছু হয়নি। অবশ্য তা নিয়ে আমি দুঃখও করি না। কারণ জীবনে যে কিছু হতেই হবে তারই বা কী মানে আছে। আকাশের আকাশ হওয়া কিংবা সমুদ্রের সমুদ্র হওয়াটাই তো যথেষ্ট। লেখক আমি হতে না-ই বা পারলাম, মূলত আমি একজন মানুষ। মানুষ হওয়াটাই তো আমার কাছে যথেষ্ট ছিল।’ তাঁর প্রতিটি উপন্যাস কলকাতা, সমাজ, সময় , মানুষ, রাজনীতি , দারিদ্র্য, প্রেম, পাপ, পূণ্য , মৃত্যুকে এতো সাবলীল ভাবে আমাদের দৃষ্টির সীমানায় নিয়ে আসে যা বাংলা সাহিত্যে অনন্য।