বইঃ আমি মৃনালিনী নই
লেখকঃ হরিশঙ্কর জলদাস
প্রকাশনীঃ প্রথমা
পেজঃ ১৭০
মুল্যঃ ৩০০
কবিগুরু, ‘বিশ্বকবি’, ‘গুরুদেব’ সহ নানান শ্রদ্ধাবনত সম্ভাষণে অভিষিক্ত বাংলা সাহিত্যের গর্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমাদের অহংকার আর বিশ্ব সাহিত্যের অলংকার এই প্রবাদপুরুষ নিয়ে অপরাপর মনিষীদের উক্তি এরকম – “বাংলা সাহিত্যের চৌকাঠে আড়াআড়ি হয়ে অবস্থান করছেন রবী ঠাকুর, তাকে ডিঙ্গিয়ে যাবার কোন সাধ্য রাখেননি তিনি আর কারও জন্য!” আমরা ও সবাই মানি এ কথা। কিন্তু সারা বিশ্বের চোখে এরূপ তাপসসুলভ ব্যক্তিত্ব কি তাঁর ব্যক্তি এবং সংসারজীবনেও অনুরুপ ছিলেন? তার পরিবার, সংসার স্ত্রী সন্তান সবাইকে নিয়ে তিনি কেমন ছিলেন? তিনি কি সাংসারিক জীবনে, স্ত্রীর সাথে প্রত্যাহিক জীবনেও আলো জ্বালতে পেরেছেন?
ভবতারিণী থেকে মৃণালিনী হয়ে উঠার গল্পই 'আমি মৃণালিণী নই'। কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের সহধর্মিণী ভবতারিণীর বয়ানে বিয়ের দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সময়ের ঘটনার পর ঘটনা প্রায় অনুপুঙ্খ বিবরণ সমেত তুলে ধরেছেন।
পুরো উপন্যাসে এসব কথাই ডায়েরি আকারে লেখেন মৃণালিনী তথা ভবতারিণী। হরিশংকর বাবুর প্রসাদগুণসম্পন্ন লেখনীর গুণে সেই ডায়েরি হয়ে উঠেছে এক নারীর দলিত ব্যক্তিসত্তার দুঃখ ভারাক্রান্ত দিনলিপি।
কাহিনী সংক্ষেপঃ
রবীন্দ্রনাথের সংসার জীবন যখন শুরু হয়, তখন তিনি বাইশ বছরের যুবক। বাইশ বছর বয়সে যশোরের ফুলতলি গ্রামের নয় বছরের মেয়ে ভবতারিণীকে বিয়ে করেন তিনি। সেই ভবতারিণীই আমাদের মৃণালিনী। বিয়ের রাতে রবি ঠাকুর তার স্ত্রী ভবতারিণীর নাম বদলে মৃণালিনী রাখেন। কিন্তু কেন তার স্ত্রীর পৈত্রিক নাম বাদ দিয়ে অন্য নাম রাখলেন, তাও দুনিয়ার এতো নাম থাকতে মৃনালিনীই বা কেন রাখলেন? রবিবাবু তার স্ত্রীকে বলেছেন এভাবে -"মৃণালিনী অর্থ পদ্ম আর রবি মানে সূর্য। ভোরবেলার সূর্যের আলো পদ্মের উপর পড়লে পদ্ম পূর্ণভাবে বিকশিত হয়। রবি ছাড়া মৃণালিনী যেমন অপ্রস্ফুটিত থাকে তেমনি মৃণালিনী বিহীন রবিও অপূর্ণ।'" কিন্তু এ নাম রাখার পিছনে আরও একটা কারন আছে যা আপনারা জানতে পারবেন বইটা পড়ার মাধ্যমে।
মাত্র নয় বছরে মৃণালিনী জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির বউ হয়ে আসেন। সেই ছোট্ট বালিকাটিকে ভবতারিণী থেকে রবি ঠাকুরের মৃণালিনী করার দায়িত্ব নেন রবীন্দ্রনাথের মেজো বৌদি জ্ঞানদা দেবী। গেঁয়ো খোলস ছাড়িয়ে ভবতারিনীর ভেতর থেকে মৃনালিনীকে নির্মান করতে না পারা পর্যন্ত জ্ঞানদা বউদির মনে শান্তি নেই। পড়াশোনা শিখানো থেকে শুরু করে শাড়ি পড়া শিখানো- সবকিছু ঘষে মেজে তৈরি করে দেন জ্ঞানদা বৌদি। একটা সময় এই মৃণালিনীই হয়ে যান বাড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
দীর্ঘ এই সংসার জীবনে পাওয়া না পাওয়া, পূর্ণ অপূর্ণ সমস্ত কথা লিখে রেখে গেছেন মৃণালিনী। শুধু তার নিজের কথাই না জ্ঞানদা বৌদিসহ অনেকের কথাই লিখে গেছেন। এমনকি কাদম্বরী দেবীর কথাও বাদ দেননি তিনি। কাদম্বরী দেবী কে নিয়ে লিখেছেন- "কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে জ্যোতিদার বিয়েকে মেনে নিতে পারে নি জ্ঞানদা বউদি। প্রকাশ্যে জ্ঞানদা বউদি আর পরোক্ষ্যে সত্যেনদা নতুন বউঠানের বিরোধিতা করে গেছে। আর একটা সময় এসে চরম অবহেলা করেছে জ্যোতিদা। মৃনালিনী দেবী রবিবাবুর সাথে যে নতুন বউঠানের সম্পর্ক ছিল সে কথা বলেছেন অকপটে যেমন- "কাঠের পাটাতনে মুখোমুখি বসেছে তিনজন। রবিবাবু, নতুন বউঠান, আর জ্যোতিদা। জ্যোতিদা জোসনায় বিভোর, বউঠান জলে আর রবিবাবু বইঠানে"। বউঠানের মৃত্যুর বহু বছর ধরে ঘুমন্ত রবিবাবু বউঠান বউঠান বলে ডেকে উঠতো। মৃনালিনী দেবী নিজে বলেছেন- " রবিবাবু আর নতুন বউঠানের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর, ব্যাপক এবং সংস্কারমুক্ত"।
মৃনালিনী দেবী রবিবাবুর উপর আক্ষেপ করে বলেছেন- "তিন কন্যা আর দুই পুত্রের জন্ম দিয়েছি আমি। বাইরের মানুষ জানে রবিবাবু আর মৃনালিনীর দাম্পত্য জীবন অনেক সুখের। কিন্তু প্রকৃত সত্য এটা নয়? রব���বাবু আমাকে কখনো কাদম্বরী দেবীর মত ভালবাসেনি, আনার মত পছন্দ করে নি, আর ইন্দিরার মত মর্যাদা দেয় নি। এরপরও আমি আজীবন রবিবাবুর মৃনালিনী হতে চেষ্টা চালিয়ে গেছি। রবিবাবু ভালবেসেছে আনা তড়খড়কে, ভালবেসেছে তার নতুন বউঠানকে, আমাকে ভালবাসেন নি। এতো সবের পরে প্রশ্ন রবিবাবুর হৃদয়ে মৃনালিনীর স্থান কোথায়? আমি সারাজীবন তার সয্যাসঙ্গিনী, প্রয়োজনসঙ্গিনী হয়ে থাকলো হৃদয় সঙ্গিনী হতে পারলাম না"।
এই লেখায় যেমন তুলে ধরেছেন তিনি ঠাকুর বাড়ির আধুনিকতা তেমনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিকটি তুলে ধরতেও দ্বিধা করেননি। দ্বিধা করেন নি রবিবাবুর মনে সব সময় কি চলে তা ব্যক্ত করতে। যেমন তিনি বলেছেন- রবিবাবুর সব কিছু আছে, কিন্তু কি যেন নেই? তার পিতা, কন্যা, স্ত্রী, পুত্র প্রাচুর্য্য আছে, খ্যাতিও আছে। তারপরও নাই এর অপৃপ্তিতে মূহ্যমান রবিবাবু"।
পাঠ পর্যালোচনাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার পরিবার নিয়ে বিস্তারিত জানতে হলে বিস্তর পড়াশোনা করার প্রয়োজন হয়। সামান্য এই ক্ষুদ্র বই পড়ে আমি তার সম্পর্কে মন্তব্য করার মত কতটুকুই বা জানতে পারলাম জানি না, তবে যতটুকু জেনেছি তাতে আমার মনে হয়েছে রবিবাবুকে নিয়ে তার স্ত্রী মৃনালিনী দেবী যে সব কথাগুলো বলেছেন তা অতি রঞ্জিত। অবশ্য মৃনালিনী দেবীর বয়ানে এ বইটা লিখিত, সেখানে সত্য কথা বেশী থাকার কথা কিন্তু তারপর ও মনে হয়েছে - লেখক হরিশঙ্কর জলদাস ও কিছু কিছু কথা যোগ করে বইটার মাধুর্য্য বাড়াতে চেয়েছেন। যদিও হরিশংকর জলদাসের চুম্বক লেখনীতে আর মৃণালিনীর জবানীতে এ উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে জোর ঝাঁকুনি দেয়ার মত, কিন্তু তারপরও কিছু কথা থেকেই যায়।
বইটার আর একটা দিক আমার নজর কেড়েছে, তা হলো সে সময়ের বাল্যবিবাহ। একটা মেয়ে ঋতুমতি হবার আগেই স্বামীর গৃহে প্রবেশ করতো। তারপর জীবনের বাকী সময় সে অতিবাহিত করতো সন্তান জন্মদানে আর লালনপালনে। মৃনালিনীদেবীর জীবনেও এ রকম ঘটনা ঘটেছে। জীবনের অর্ধেক সময় তার কেটেছে আতুরঘরে আর ছেলেমেয়ে মানুষ করতে। আর একটা বিষয় লক্ষনীয় তা হলো- ঠাকুর পরিবারে মেয়েদের অবরোধবাসিনী করে রাখা। বিয়ের পর তাদের অন্দরে থাকতে হয়েছে সারাজীবন। এতো কিছুর পরও সে পরিবারের ছেলেমেয়েরা যেমন হয়েছে চরিত্রবান, তেমনি হয়েছে চরিত্রহীন।
মোট কথা সকাম এবং নিষ্কাম রবীন্দ্রনাথ, অর্থহিসেবী রবীন্দ্রনাথ, কন্যাদায়গ্রস্ত রবীন্দ্রনাথ, গৃহী রবীন্দ্রনাথ- এরকম ভিন্ন ভিন্ন অনেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথকে আমাদের মত সাধারন মানুষ পাওয়া যায় এ কাহিনির প্রতিটি বুননে ।
বইটা পড়তে গিয়ে কাদম্বরী বউঠানের প্রতি রবিবাবুর ভালবাসার কথা জানতে পারি এবং তার আত্মহত্যার কথা। এজন্য এ বইয়ের পর পড়ার লিস্টে রাখছি - "কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট" এবং "ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল"।
হ্যাপি রিডিং ♥♥♥
পৃথিবী হোক বইময় ♥♥♥