এক-একজন মানুষের ভিতরে কতখানি মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আর বেদনার নদী প্রবাহিত হতে থাকে, তা আমরা ধারণাও করতে পারি না। শুধুমাত্র উপর থেকেই আমরা তাদের জীবনকে দেখতে পাই। তার ভিতরের জটিলতা আর বেদনার অন্তঃসলিলা ফল্গুধারাকে আমরা খুঁজেও পাই না। তারা জীবনের বেদনাকে ডাকা দেয় মধু-কূপি ঘাসের আবরণে। 'সূর্যাস্তের শেষ রঙ' উপন্যাসের মিলিও তার জীবনের সমস্ত বেদনা আর জটিলতাকে এভাবেই ধারণ করে রেখেছিলো।
মিলি জীবন ছিলো রঙিন প্রজাপতির মতো। সে উড়তে জানতো। নদীর মতো প্রবাহিত হতে জানতো। তার রূপ ছিলো প্রভাতের শুভ্রতার ন্যায় স্বচ্ছ আর ধানী রঙের মতো সতেজ, রক্তরকরীর মতো কমল। তার সৌন্দর্যে সক্কলকে মোহিত করে রাখতে পারতো। কিন্তু এই সৌন্দর্যই তার কাল হলো।
মন্টু নামে কুৎসিত এক না-মানুষ মিলির জীবনটা করে তুলছিলো হাবিয়া দোজখ। মন্টু জোর করে মিলিকে তুলে নিয়ে যায় এবং বিয়ে করে। এবং অকথ্য অত্যাচার করে। বিতিকিচ্ছিরি ভাবে সেক্সচুয়াল টর্চার করতো মিলিকে।
এক সময় মন্টু ক্রসফায়ারে মারা যায়। এবং তার কিছু দিন বাদে মিলি জানতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা। এবং সে মন্টুর মতোই কুৎসিত দেখতে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।
মিলি সব ছেড়ে ছুড়ে মেয়ে নিয়ে চলে যায় বান্দরবান। কিন্তু মিতুল যে দেখতে কুৎসিত তা বারংবার মনে করিয়ে দেয় এই সমাজ। এই সমাজ এমন সুন্দর মায়ের সঙ্গে এমন কুৎসিত দেখতে মেয়েকে মেনে নিতে পারে না। মিতুল বড় হতে হতে এই বাস্তবতা বুঝে পেলে। এবং নিজের সঙ্গে এক মনস্তাত্ত্বিক ভাঙা গড়ায় মেতে উঠে। মায়ের থেকে সে দূরে সরে যায়। এবং খুব বিচ্ছিরি রকমের আচরণ করে মিলির সঙ্গে। মিলির সঙ্গে শান্তনু নামে একজনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো একসময়। বান্দরবান এসে মিলির সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায় আবার।কিন্তু তাদের বন্ধুত্বের চেয়ে মিতুল শান্তনুর সঙ্গে জড়িয়ে যায় বেশি। দু'জনের তুমুল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। শান্তনু মিলির সঙ্গে মিশুক, তা মিতুল কোনোভাবেই সহ্য করতে পারে না। এমনি সব নাটকীয় ভঙ্গিতে এগুতে থাকে কাহিনী। এবং উপন্যাসের এক পর্যায়ে মিলির বন্ধু নীলু এক দুঃখময় অধ্যায় উঠে আসে।
নাসরীন জাহানের লেখার প্রতি আমার তুমুল আগ্রহ জেগেছিলো তার ছোটগল্প পড়ে। তার ভাষার মাধুর্যতা আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করেছিলো সেসময়। তারপর খুঁজে খুঁজে বেশ কিছু উপন্যাসও পড়া হয়েছে। সেইসব লেখা ছিলো ভীষণ মনে রাখার মতো। সেইসব লেখার সঙ্গে 'সূর্যাস্তের শেষ রঙ' কে ঠিক কোথাও একটা মেলাতে পারলাম না। সেই ঐশ্বর্য, সেই ভাষার দ্যোতনাকে যেন কোথাও একটা হারিয়ে ফেললাম। নাসরীন জাহানের লেখা পড়তে গেলে ভীষণ একনিষ্ঠতা সহিত পড়তে হতো। একবার মনোযোগ ছুটে গেলেই, যেন খেই হারিয়ে পেলতাম। কিন্তু পড়ে উঠে বেশ কিছুক্ষণ তার থেকে বেরুতে পারতাম না। মনে হতো আমার উপর ভর করে থাকতো সমস্ত অবহটা। কিন্তু 'সূর্যাস্তের শেষ রঙ' এ এসে সেইটে হলো না। জলের মতো সব পড়ে গেলাম।
জমে উঠতে গিয়েও কোথাও যেন বারবার ছিড় খাচ্ছিলো কাহিনী। আর আমার সেই পুরানো নাসরীন জাহানকে আমি হন্যে খুঁজে চলেছি সেখানে। পেতে গিয়েও হারিয়ে পেলে, আবার ধোঁয়াশায় আকস্মিক তিনি আবির্ভাব হয়ে আবার উত্তরীয় তলে হারিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনি নাটকীয় দশায় আমি উপন্যাসটা শেষ করে উঠে,অনুভব করলাম নিজের মধ্যে প্রবাহিত দুঃখবোধকে। সে দুঃখবোধ মিলি ও মিতুলের জন্যে। তাদের অন্ততে মধু কূপি ঘাসের তলায় লুকিয়ে রাখা দুঃখদের জন্যে।