প্রতিপক্ষ ওয়েবজিনে রওশন সালেহার আমার এক নদীর জীবন ধারাবাহিক প্রকাশ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলা আত্মজৈবনিক সাহিত্যে মৌলিক অবদান হিশাবে সাগ্রহ প্রশংসা কুড়িয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীন অবিভক্ত বাংলা এবং সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের নানা খণ্ডচিত্র উঠে এসেছে রওশন সালেহার গদ্যসাহিত্যে। ভারত ভাগের আগে পরে বাংলার একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুসলিম নারীর পারিবারিক ও সামাজিক সংগ্রামের যে ছবি তিনি তাঁর গদ্যে তুলে এনেছেন তা শুধু সাহিত্যের নয়, সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসে বিদ্যার ক্ষেত্রেও অনবদ্য অবদান। অবিভক্ত বাংলায় নোয়াখালী, ঢাকা ও কলকাতার সমাজ জীবন, রাজনীতি, শিক্ষাপ্রসার ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ, ইতিহাসের নানা বাঁক ইত্যাদি বাঙালি মুসলিম পরিবারের অন্দরমহল থেকে আত্মজৈবনিক কথনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরার শৈলী অসাধারণ। বাংলা সাহিত্যে রওশন সালেহা নীরবে শক্ত স্থান দখল করে নিয়েছেন। এই বইটির আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব একজন শিক্ষিকার কঠিন জীবনের লড়াই। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনকে নতুন করে দেখা, শিক্ষাক্ষেত্রে জীবনসংগ্রাম, কর্মজীবনে অবসর এবং পরিণত বয়সের উপলব্ধি তাঁর গদ্যভঙ্গির মধ্যে জীবন্ত। এক বসাতেই পড়ে ফেলার মতো। পড়ার পর মনে হয় একজন সংগ্রামী নারীর জীবন ঘনিষ্ঠভাবে আমাদের জীবনের পাশে এসে বসে পড়ল বুঝি! আমরা স্তম্ভিত হয়ে এক নদীর বয়ে চলার আওয়াজ শুনতে থাকি।
এই বছর আমার পড়া অন্যতম সেরা বই হয়ে রইল শিক্ষয়িত্রী রওশন সালেহার আত্মস্মৃতি 'আমার এক নদীর জীবন'। রুসাফা প্রকাশনীর সাড়ে তিন শ পাতার এই আত্মকথা এক বাঙালি মুসলমান নারীর জীবনসংগ্রামের ইতিবৃত্ত।
ফেনীর একটি খানদানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রওশন সালেহা। তখনো বাঙালি পরিবারে কন্যাশিশুর জন্ম আনন্দের বার্তাবাহী নয়। তাই আইনজীবী পিতার উল্লাস বাকিদের তত স্পর্শ করেনি। ছোটোবেলায় দুরন্ত ছিলেন রওশন সালেহাকে মায়ের বকুনি খেতে হয়েছে। ত্রিশের দশকের গোড়ার কথা। শুনতে হয়েছে মেয়েদের এটা করতে নেই, ওটা করতে হয় না ইত্যাদি।
পিতার আইনব্যবসার কারণে নোয়াখালী শহরে চলে আসেন। আজ থেকে এক শ বছর আগে এক বাঙালি মুসলমান মেয়ের পড়াশোনা করতে চাওয়া যুদ্ধের চাইতে কম ছিল না। রওশন সালেহার এই বয়ানের সামাজিক মূল্য অনেক।
স্কুল পাস করার আগেই নিজের চাইতে প্রায় দ্বিগুণ বয়সী কলকাতার রেল অফিসের চাকরিজীবী চৌধুরী পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল রওশন সালেহার। বিয়ের পর পড়াশোনা আরও কঠিন হয়ে গেল।
রওশন সালেহার স্বামী ছিলেন পুরুষতন্ত্রের খাঁটি পূজারি। স্ত্রীকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলেন বটে। কিন্তু এরপর কখনোই সহজে পড়াশোনা করতে সাহায্য করেননি। আয়-রোজগার করতেন না। কিন্তু স্বামীত্ব ফলাতেন ষোলআনা।
এসব অত্যাচার সহ্য করেও হাল ছাড়েননি। দেশভাগের পর নোয়াখালী গার্লস স্কুলে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর ঢাকার মতিঝিল সরকারি বালিকা স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নারীদের কর্মক্ষেত্রে কোন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো, তার একটা উদাহরণ।
রওশন সালেহার আত্মস্মৃতি বাঙালি মুসলমান নারীর সংগ্রামের প্রতীক। যে কোনো পাঠকের বইটা পড়লে ভালো লাগার কথা। লেখকের গদ্য খুব সুন্দর ও গতিশীল।