ভারতীয় উপমহাদেশের নানান প্রদেশের উপদেবতা, অধিদেবতা ও অশুভ অস্তিত্বের বিশ্বাস নির্ভর সাতটি অতিলৌকিক আতঙ্ককাহিনি। এই বইয়ের অধিদেবতা বা অপদেবতারা হলেন বাক, বালান্তিন, আহামৌ, বলিষ্ঠামারু, আনছেরি, আনাঙ্গু ও ভুরে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁদের অধিষ্ঠান। কাহিনিগুলি গড়তে গিয়ে লেখিকারা আমাদের তথা সমাজের মুখের সামনে একটা আয়নাই যেন তুলে ধরেছেন, যেখানে এই আতঙ্কের মুখ হয়ে সমাজের ভয়াবহ মুখটাই ফুটে উঠেছে যেন!
১৯৮৩ সালে বিশ্ববরেণ্য ইংরেজ সাহিত্যিক রোয়াল্ড ডাল একটি ভূতের গল্পের সংকলন সম্পাদনা করেন: "Roald Dahl's Book of Ghost Stories"। এই বইটির জন্য গল্প চয়ন করতে গিয়ে ওঁর মনে হয় "I began to wonder if the really good ghost story belonged solely to the female. Was she perhaps more sensitive in that small delicate area than the male?" ভদ্রলোক যদি এই "ছায়া মায়া অন্ধকার" নামক ভয়ের গল্পের সংকলনটি পড়তেন, নির্ঘাৎ মুচকি হেসে "Didn't I tell you so?" বলে উঠতেন।
হেডপিসে যেরকম লেখা, বইটি একেবারেই তাই: "ভারতীয় উপদেবতা, অধিদেবতা, ও অশুভ অস্তিত্বকে নিয়ে সাত হরর কাহিনী"। আধুনিক বাংলা হরর সাহিত্য যেভাবে তন্ত্র-মন্ত্রের জং লেগে একেবারে অপাঠ্য হয়ে উঠেছে, তাতে এক ঝলক টাটকা বাতাস নিয়ে এলো এই সঙ্কলনটি। ভারতবর্ষের মতো বৈচিত্রময় দেশ, যেখানে পথ চলতে চলতে বদলে যায় মানুষের মুখের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, সেখানে দেশের আনাচে কানাচে যে নানাবিধ রোমাঞ্চকর রুরাল/আর্বান লেজেন্ড ছড়িয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।
এই সঙ্কলনে সাতজন বাঙালি মহিলার বলিষ্ঠ কলমে উঠে এসেছে এরকমই সাতটি গ্রামীণ কিংবদন্তি, যথা আসামের বাক, কোঙ্কন প্রদেশের বালান্তিন, মিজোরামের আহামৌ, কর্ণাটকের বলিষ্ঠামারু, কুমায়ুন-গাড়োয়াল অঞ্চলের আঁছেরী, তামিলনাড়ুর আনাঙ্গু, ও উত্তরবঙ্গের ভুরে নামক সাত অপদেবতার/অপদেবীর ভয়াল আখ্যান। অবশ্য এই গল্পগুলি শুধুই ভয় দেখায় না, এই হরর কাহিনীগুলির মাধ্যমে লেখিকারা ভারতীয় নারীদের দৈনিক সুখ-দুঃখ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হাতে তাঁদের দৈনিক নির্যাতন ও নানাবিধ যন্ত্রণার গল্পও বলে চলে সঙ্গে সঙ্গে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহিলাদের লেখা ভয়ের গল্প প্রচুর থাকলেও, এরকম ফোকাসড নারীবাদী আতঙ্ককাহিনীর সঙ্কলন বোধহয় এই প্রথম।
এবার আসি গল্পগুলোয়। এই ধরণের অ্যান্থোলজি বা সঙ্কলনে সাধারণতঃ ভালো-মন্দ গল্প মিলে-মিশে থাকে। এই সঙ্কলনটিও যে একেবারে সেই দোষে দুষ্ট নয় তা বলবো না, কিন্তু যেগুলো তুলনামূলক ভাবে দুর্বল গল্প, সেগুলোও এখনকার গড়পড়তা ভয়ের গল্পের থেকে এতটাই উন্নত, যে সঙ্কলনে তাদের ঠাঁই দেওয়া নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকে না।
সঙ্কলনের প্রথম গল্প হলো তন্দ্রা বন্দ্যোপাধ্যায়-রচিত "মোহিনী"। আসামের এক গ্রাম্য গৃহবধূ সংসারের যাঁতাকলে পিষতে পিষতে প্রতিবাদ করে ওঠে ও সেই প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসাবে গ্রামের পুকুর থেকে উঠে আসে অপদেবী বাক। এর পর পিয়া সরকারের "মাই" বলে বালান্তিনের গল্প; সদ্য মিসক্যারেজ হওয়া একটি মেয়ের যন্ত্রণার এই গল্পটিতে ভৌতিক উপস্থিতি সামান্য হলেও, শেষের টুইস্ট-টুকু মারাত্মক। শরণ্যা মুখোপাধ্যায়ের "আহামৌ" মোটামুটি প্রেডিক্টেবল হলেও মন্দ না।
এর পর বলতে হয় অনুষ্টুপ শেঠের লেখা "আক্কাকেরির জঙ্গলে"-র কথা। এই লেখিকার একটি গল্প আগে পড়েছিলাম ("বাঘনখ"), যেটা বিশেষ পোষায়নি, তাই গল্পটা সম্বন্ধে একটু সংশয় ছিল, কিন্তু ভদ্রমহিলা তাঁর টানটান লেখনীতে যে গল্পটা নামিয়েছেন, তা এই সঙ্কলনের অন্যতম রত্ন। কর্ণাটক-মহারাষ্ট্র সীমান্ত অঞ্চলের আক্কাকেরির জঙ্গলের ভয়াল উপদেবতা বলিষ্ঠামারুর সঙ্গে এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা একটি দৃঢ়চেতা মেয়ের দ্বৈরথের গল্পটি পড়তে পড়তে গ্যান্ডালফের কথা মনে পড়ছিলো। "The Hobbit" উপন্যাসে উইজার্ড গ্যান্ডালফকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে এই অ্যাডভেঞ্চারে বিলবোর মতো সামান্য হবিটকে কেন বেছে নিলেন, তখন গ্যান্ডালফ বলেন “I have found that it is the small everyday deed of ordinary folks that keep the darkness at bay. Small acts of kindness and love...”; গ্যান্ডালফের এই উক্তিটিই এই গল্পের মূলমন্ত্র।
এর পর আসে অদিতি সরকারের "সেই সব বালিকারা", যা কুমায়ুন-গাড়োয়াল প্রদেশের আনছেরির গল্পের মাধ্যমে বলে আমাদের দেশে আজও ঘটে চলা এক জঘন্য অপরাধের কথা, ও বিগত কয়েক মাস ধরে ঘটে চলা গণ-আন্দোলনের নিরিখে বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। "মোহিনী" গল্পের বাকের মতো এই গল্পেও আনছেরি উঠে এসেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে অসহায়ের হাতিয়ার হিসাবে। ঋতুপর্ণা চক্রবর্তীর "মোহিনী-মায়া" গল্পেও তামিলনাড়ুর অপদেবী আনাঙ্গুও যেন পুরুষতন্ত্রের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো শক্তিরূপী এক দেবী।
এম. ডি. মহাশ্বেতার গল্প "কমলাবাগান ও অলীক জোনাকিরা" এই সঙ্কলনের শেষ ও দীর্ঘতম গল্পই শুধু নয়, এই সাতটি গল্পের মধ্যে নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। বাকি গল্পগুলির মতো "কমলাবাগান" ও বলে নারীর ওপর পিতৃতান্ত্রিক অনাচারের গল্প, কিন্তু এই গল্প জয়ের নয়, পরাজয়ের। এক নারী কিভাবে নিজেই পিতৃতন্ত্রের ধারক ও বাহক হয়ে উঠে নিজের সন্ততির প্রতি নির্মম হয়ে উঠতে পারেন, লিম্বু উপজাতির অপদেবতা "ভুরে"-র মাধ্যমে সেই গল্পই বলে "কমলাবাগান"। এর বেশী কিছু বলার নেই এই গল্প সম্বন্ধে, খালি এটুকুই যে বইটা শেষ করেছি গত পরশু, এখনো মনের মধ্যে "কমলাবাগান"-এর রেশ রয়ে গেছে, হয়তো আরো অনেকদিন থাকবে।
সিরিয়াস সাহিত্য ও genre ফিকশনের যে চিরকালীন বৈরিতা, তাও অনেকাংশে ঘুচিয়ে দিতে পারে "ছায়া মায়া অন্ধকার"। গুরুগম্ভীর বিষয় আলোচনা করার একমাত্র পরিসর যে শুধুই সিরিয়াস সাহিত্য ও genre ফিকশন কেবল হালকা চালের ভূত-গোয়েন্দা-ফ্যান্টাসি ইত্যাদির জায়গা, এই বিরক্তিকর বিভাজন দূর করে দিক "ছায়া মায়া অন্ধকার", এই কামনাই করি। বহুকাল পর Goodreads-এ কোনো বইকে পাঁচতারা রেটিং দিলাম।
চমৎকার বাঁধাই, পরিচ্ছন্ন মুদ্রণ এবং শুদ্ধ বানানের সাহায্যে সযত্নে নির্মিত এই হার্ডকভার বইয়ের লেখাগুলো পড়ে শেষ করলাম গত এক দিনে। উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচলিত সাতটি অপদেবতা বা অপশক্তিকে কেন্দ্রে রেখে লেখা হয়েছে এই বইয়ের সাতটি বড়োগল্প। তারা, আর তাদের উপজীব্যরা হল~ ১. তন্দ্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'মোহিনী-মায়া'— 'বাক'; ২. পিয়া সরকারের 'মাই'— 'বালান্তিন'; ৩. শরণ্যা মুখোপাধ্যায়ের 'আহামৌ'— 'আহামৌ'; ৪. অনুষ্টুপ শেঠের 'আক্কাকেরির জঙ্গলে'— 'বলিষ্ঠামারু'; ৫. অদিতি সরকারের 'সেই সব বালিকারা'— 'আনছেরি'; ৬. ঋতুপর্ণা চক্রবর্তীর 'মোহিনী-মায়া'— 'আনাঙ্গু'; ৭. এম.ডি.মহাশ্বেতার 'কমলাবাগান ও অলীক জোনাকিরা'— 'ভুরে'। বেশ কয়েকজন লেখক স্বীয় কল্পনা এবং অন্য অন্ধকারকে মিথ বা কিংবদন্তির আখ্যানের চেয়েও ভয়ানক ও বিপুলায়তন করে ফেলেছেন; ফলে গল্পটাই তলিয়ে গেছে। কয়েকটি লেখা ক্ষুরধার ও মিতভাষী হয়ে স্রেফ গল্পটা বলেছে— যার আশায় বইটা কেনা ও পড়া। উদাহরণ হিসেবে অদিতি সরকারের লেখাটির কথা বলা যেতে পারে। সব মিলিয়ে বইটা অলৌকিক সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও ভাববার-মতো হয়ে থাকবে বলেই মনে হয়।
The book was recommended to me by a friend, whose taste in horror is impeccable. I was pleasantly surprised to find a book written in bengali that does not offer half baked theories of kala jadu, and tantrik traditions, instead delves deep into the folk culture. All seven stories are rooted into regional customs and traditions, especially marginalized ones, most often than not with a feminist twist, that goes beyond the shallow understanding of women's rights. The stories also juxtapose the so called modern culture and the traditional beliefs and understanding of nature, humanity, community, and makes one question the true meaning of modernity. Highly recommended. Some typos are there, and next editions should be better proofread, hopefully.