ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নানাবিধ পরিচয় আছে। কিন্তু তিনি যে একজন গল্পকার ছিলেন সে কথা আজ অনেকেই বিস্মৃত। তিনি তাঁর ব্যস্তময় কর্মবহুল জীবনে বেশ কিছু ছোটগল্পও লিখেছিলেন যা বিশ ও ত্রিশের দশকের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর এসব গল্প নিয়ে প্রথম গল্পের বই বের হয়। ১৯৩০ সালে রকমারি নামে। বইটি সে সময় পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। এরপরও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কিছু গল্প বিভিন্ন সময় লিখেছিলেন। রকমারি বইয়ের মুখবন্ধ-এ তিনি লিখেছেন, 'এর প্রায় সব গল্পই নানান কাগজে বেরিয়ে গিয়েছে। আজ এক জায়গায় করে সকলের সামনে ধরলুম। যদি কারও ভাল লাগে, আমার কলম ধন্য হবে।' ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সেরা গল্প বইয়ের মোট বারোটি গল্পে তৎকালীন সময়ের নানান চিত্র উঠে এসেছে। মূলত এসব গল্পের ভেতর দিয়ে পাঠক ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এক ভিন্ন পরিচয় খুঁজে পাবেন। তৎকালীন সমাজের নানা বিষয়-আশয়ের প্রতি তাঁর সুতীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এসব গল্পকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। এছাড়া এসব গল্পে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষের জীবনের গল্প পরিষ্ফুটিত হয়েছে। ১০) পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৬৪
ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গল্পকার পরিচয়ের সাথে আমাদের অনেকের আগে দেখা হয় নি। তাঁর সর্বকনিষ্ঠ ছেলে শিল্পী মুর্তজা বশীরের ভূমিকায় এই গল্পকথকের সাথে পরিচিতি লাভ হলো।
১৯৩১ সালে প্রকাশিত 'রকমারি' গল্পগ্রন্থের নতুন নামকরণ হচ্ছে "ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সেরা গল্প"। স্টোরি আছে ১২ টি। আমার অবশ্য এ গল্প সংকলনের আগের নামটি বেশি পছন্দের।
কারণ এক ডজন রকমারি স্বাদের আখ্যান নিয়ে হাজির হয়েছেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তাঁর স্টোরিটেলিং এ আছে পরিমিতিবোধ। খুব অবভিয়াস বিষয়-আশয় লেখক রচনা করেছেন ইশারা-ইঙ্গিতের সাথে, কখনও ছোট ছোট আবার কখনও একটু দীর্ঘ বাক্যগঠনের সাথে।
গ্রন্থে তিরিশের দশক অনুভব করতে পারা, মানুষের নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করেছেন জনাব শহীদুল্লাহ। তাঁর লেখনাশক্তির মূল জায়গা এ গল্পবইয়ে সম্ভবত এটা-ই। অল্পে অনেক কিছু বলে ফেলাটা। কিছু গল্পের পুনর্নামকরণ দেখা যায়।
বিবাহিত এবং মেধাবী ছাত্র রশীদের বিদেশ-বিভুয়ে পরকীয়াতে জড়িয়ে পড়া, সেটাকে তেমন একটা কিছু মনে না করার ব্যাপারটা পাঠক পড়ার সময়ও ঐভাবে অল্পসময়ের জন্য ভাবতে পারেন। 'লা পারিযিয়েন' এ এটা লেখকের লেখনিশক্তির প্রকাশ বলা চলে। ফরাসি হতে অনূদিত 'নষ্টচন্দ্র' রিডারের মনে আবছা থ্রিলার এবং আধা-ভৌতিক আবহ সৃষ্টি করতে পারে, মূল বিষয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও। 'বেহেশতের পত্র'এ একজন পাঞ্জাবী যোদ্ধার যুদ্ধে কুশলতা থাকার পরও তাঁর মেয়েকে বিদায় দিতে গিয়ে কুশলতার অভাব ফুটে উঠেছে। 'লকখীছাড়া' গল্পে ধনীর উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তানের একজন পীরের অনুসন্ধানে নেমে পড়া এবং সেই গুণিজন পীরের কাছ থেকে পাওয়া দরদপূর্ণ ইসলামের শিক্ষা মনকে ছুয়ে যায়।
খলীফা হারূনুর রশীদ আছেন এক গল্পে। সুলিখিত গদ্যে লিখা 'বিশ্বাসের মূল্য' আমার ভালো লেগেছে অনেক। 'রসবতী'এ লেখক পত্রিকার সম্পাদকদের নিয়ে মৃদুমন্দ খোঁচাটাই দিলেন।
আমার মতে 'ভবিষ্যতের মানুষ' সবচেয়ে ইন্ট্যারেস্টিং গল্প। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একদিকে স্যাটায়ারে পূর্ণ অন্যদিকে বিবর্তনবাদের যুক্তি নিয়ে এসেছেন এখানে। 'বিলাত ফেরত' গল্পটি আসলে এটা অবশ্যম্ভাবী আই ওপেনার।
বইটির মধ্য দিয়ে তিরিশের দশকে সময় পরিভ্রমণ করতে গিয়ে খেয়াল করলাম গল্পকার মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ইসলাম প্রশ্নে কবুলিয়তের পক্ষে অর্থাৎ জোরজবরদস্তির বিপক্ষে। ইসলাম বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা মোগলদের মতো, দরদপূর্ণ।
গল্পকার শহীদুল্লাহর ফরাসী হতে অনূদিত 'গোরু চোর' গল্পে আমরা একটা চিরায়ত ডিস্টোপিয়ার দেখা পাই পৃষ্ঠা ৫০ এ।
পাহারাদার রাত্রের মত শেষ পাইপ সাজতে সাজতে বললে--- "কেউ কখখনও জানতে পারে না। ... তুই জানিস নে কি ক'রে তোর একটা রাঙা গোরু হ'ল। ... আমি জানি নে কি ক'রে আমি জেলখানার পাহারাদার হ'লাম। লোকের ভিড়ও জানে না কেন তারা ফাঁসি ফাঁসি ব'লে চেঁচায়! ... দুনিয়া যে ঘোরে তা' কি দুনিয়া জানে?" তারপর সে চুপটী ক'রে পাইপ টানতে লাগলো।...
বই রিভিউ
নাম : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সেরা গল্প লেখক : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভূমিকা : মূর্তজা বশীর প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০১৮ প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ প্রকাশক : পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. জনরা : ছোটগল্প সংকলন। রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ