কিছু কিছু প্রচারণা ছাপিয়ে যায় সত্যকে; কিছু কিছু সত্য ঢাকা পড়ে যায় অপরিচ্ছন্নতার জঞ্জালে। ইতিহাস যদি পরিসংখ্যানের মত ‘গ্রেট লায়ার’ না হয়, তো সেটি হয়ে ওঠে বাবুরনামা’র মত অশ্রুসজল প্রেম ও সত্যের উপাখ্যান। যে উপাখ্যানের অবকাঠামো তৈরি হয় রক্ত, ত্যাগ আর ক্রন্দনের প্রস্তরে কিন্তু চোখে পড়ে শুধু বাইরের ঝলমলে রঙ। সেই কোমল চামড়া তুলে- তুলে এ-গ্রন্থের পাতায়-পাতায় আঁকা হয়েছে মুক্তির সত্যলিপি- যা আমরা ভুলতে বসেছি বর্তমান প্রাপ্তির আনন্দে। যে সন্তান মায়ের গর্ভযাতনা উপলব্ধি করতে চায়- তাকে যেমন জননীর বুকে কান পেতে শুনতে হয় মায়ের হৃদয়ের গোঙানি, তেমনি কোন বাংলাদেশী মুসলমান স্বনিভর হয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইলে, আত্মপরিচয়ে বলিয়ান হয়ে পথ চলতে চাইলে, অবশ্যই তাকে পাঠ করতে হবে এই আঁকরগ্রন্থ। অনুসন্ধানী এবং কৌতুহলী যে-কোন পাঠককে লেখক দেখিয়ে দেবেন তার ফেলে আসা পথের চিহ্ন। একশো সিঁড়ির নিচেই রয়েছে অন্ধকার,বর্বরতা এবং হিংসা-বিদ্বেষের কত অজানা গহ্বর! কেউ যদি সত্যিই আত্মপরিচয় ভুলে যেতে না চান, চলুন- তাকিয়ে দেখি নিজেদের অতীতকে, গৌরব ও আত্মত্যাগে যা একুশে ফেব্রুয়ারির মতোই সমুজ্জ্বল।
“বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ” এই গ্রন্থে তিনি ১৯০৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও পূর্বে বাংলা জনপদে যত আন্দোলন ও সংগ্রাম হয়েছে সেগুলোও উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে ব্রিটিশদের বাংলা দখল, কোম্পানির চিরায়ত বন্দোবস্ত, সরাসরি ব্রিটিশ রাজ—এর ফলে যত আন্দোলন, বিদ্রোহ, সংগ্রাম ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেছেন। সব লেখকেরই পক্ষপাত থাকে, কিন্তু উনারটায় বেশিই লক্ষণীয়! দ্বিজাতিতত্ত্ব যে মিথ্যা, এর মূলে যে বৈষম্য—এগুলো বেশি হাইলাইট না করে উনি হিন্দু/মুসলিম এই দুই তত্ত্বকে বেশি হাইলাইট করেছেন। এছাড়াও, উনি সকল দোষ এককভাবে হিন্দুদের, বিশেষ করে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দিয়েছেন; মুসলিম এবং তপশিলি হিন্দুদের উনি দুধে ধোয়া তুলসী পাতা হিসেবে দেখিয়েছেন। এই বইটিকে আপনি একটি মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদী বই হিসেবে ধরতে পারেন। কারণ হিসেবে হিন্দু অনেক মনীষীদের উনি অবজ্ঞা করেছেন—বিশেষ করে: রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ। হিন্দু শহীদদেরও—ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন ইত্যাদি জনকে!
এছাড়াও উনি দেখিয়েছেন ১৯০৫ সালে হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু ১৯৪৭ দেশভাগের আগে তারাই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল; আর মুসলিমরা উল্টোটি!
পুরো বইতে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বকে বিশেষভাবে হাইলাইট করেছেন, কিন্তু আফসোসের ব্যাপার—উনি পাকিস্তান আমলের কোনো বৈষম্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেননি; দুই-একটি ঘটনা ছাড়া তিনি সকল কিছু এড়িয়ে গেছেন, আর শেখ হাসিনার মতো খালি “উন্নয়ন উন্নয়ন” দেখিয়েছেন! ভাষা সৈনিকদের শহীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষকে শহীদ, হাজারও মা-বোনকে ধর্ষণ—এই সব বিষয়কে এড়িয়ে গেছেন।
বইয়ে উনি অনেক রেফারেন্স টেনেছেন—তার মধ্যে “আবুল মনসুর আহমেদ” থেকে তিনি উল্লেখ করেন: "বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙে নাই, দ্বিজাতিতত্ত্বও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর প্রস্তাব মতো দুই পাকিস্তান হইয়াছে। ... লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দটার উল্লেখ নাই, শুধু 'মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্রের' উল্লেখ আছে। তার মানে রাষ্ট্রের নাম পরে জনগণের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়ার কথা। পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্রের নাম রাখিয়াছে 'পাকিস্তান'। আমরা পূর্বীরা রাখিয়াছি বাংলাদেশ। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই"।
পরিশেষে বলব: এ বিষয়ে আমার জানা পর্যাপ্ত নয়, কিন্তু বইটি পড়ে আমার মনে হল তিনি অনেকটাই পক্ষপাতি , তাই এ নিয়ে আরও ব্যাপক পড়ার ইচ্ছে আছে।
সমসাময়িক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কাছের একজন মানুষ বলেছিলো যে যারা ধর্ম এবং রাজনীতিকে আলাদা ভাবে তাদের আসলে ধর্ম কিংবা রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা নেই। এই কথার মর্ম আমি বইটা পড়ে পেয়েছি। মূলত বইটা ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত উপমহাদেশের রাজনৈতিক উত্থানের ঘটনাবলি নিয়ে। কিন্তু গতানুগতিক ইতিহাসের বইয়ের মতো লেখক শুধু ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি বরং এই ঘটনাগুলোর পেছনের সাম্প্রদায়িক এবং সাংস্কৃতিক কারণগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন ।
যেকোনো জাতির ইতিহাসকে বুঝতে হলে শুধুমাত্র ঘটনাপ্রবাহ জানা যথেষ্ট নয় বরং সেই ঘটনাগুলোর অন্তর্নিহিত প্রেরণা, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ভূমিকা, এবং রাজনীতির সাথে মানুষের সম্পর্ক বুঝতে হবে। সংস্কৃতি এবং জাতিগত বৈচিত্র্যর জন্য উপমহাদেশের ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটভূমিতে ধর্ম এবং সংস্কৃতির ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ । রাজনৈতিক দলগুলো নানা অজুহাতে বিভিন্ন সময় ধর্মকে অবলম্বন করে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি অর্জন করেছে এবং বজায় রেখেছে। লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে শুরু করে ভারত বিভাজন পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে ধর্মের ভূমিকা কাজ করেছে। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) থেকে পাকিস্তান আন্দোলন (১৯৪৭) এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সৃষ্টি পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাগুলো কেবল ক্ষমতার লড়াই ছিল না, বরং সেগুলো ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
বইটি মুসলিম পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে লিখা এবং তৎকালীন অখন্ড ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলিম এই দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মুসলমানদের নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় চিত্রিত করেছেন । বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টির ঘটনাবলির পাশপাশি বইটি পলাশীর পর থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত তৎকালীন অখন্ড ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনাও রয়েছে । বইটি বঙ্গভঙ্গ থেকে সাতচল্লিশ পর্যন্ত ঘটনাবলির বর্ননার কথা বলেলেও বইটি মূলত বঙ্গভঙ্গ, পরবর্তী দেশভাগ আন্দোলন, ঢাকা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন যেসব অন্তর্নিহিত কারণ এসব ঘটনা ত্বরান্বিত করেছে তার ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছে ।
অন্য যেকোনো ইতিহাসের লেখনীর মতো এই বইটিও পক্ষপাতহীন নয় । কিছু ঘটনার বর্ণনায় লেখক সাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু বইটির রিসার্চ পেপার স্টাইলে লেখনী বইটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে । অধিকাংশ ব্যাপারে লেখক নিজের মতবাদ দেয়ার চেয়ে সমসাময়িক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বই,পত্রিকা,জার্নালে কিংবা ইন্টারভিউয়ের অংশ তুলে ধরে নিজের মতামতকে উপস্থাপন করেছেন।