বাংলা সাহিত্যের প্রায় সবকটি শাখায় এবং সেই সঙ্গে ইংরেজিতে রচিত বিভিন্ন সন্দর্ভে পুরীর মাহাত্ম্য, গুরুত্ব, সৌন্দর্য, আকর্ষণ ইত্যাদি যেভাবে বিবৃত হয়েছে, তার কিছু নমুনা সংগ্রহ করে বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে এই বইটিতে।
শুদ্ধভাবে মুদ্রিত, নয়নসুখকর বর্ণ-সংস্থাপনে শোভিত, রুচিশীল প্রচ্ছদ ও ইনার কভারে সমৃদ্ধ, সর্বোপরি আদ্যন্ত সুলিখিত বইটি একরকম হুশ্ করেই পড়া হয়ে গেল। আসলে আর পাঁচজন বাঙালির মতো পুরী আমারও বড়ো কাছের, 'আপন' জায়গা। তাই তাকে নিয়ে লেখা বই একবার ধরলে একেবারে শেষ না করে ছাড়া যায় না। বইটির 'প্রাক্কথন' অংশে লেখক বলেছেন, "বাঙালির কাছে পুরীর পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এই বইও তাই গাইড-বুক, রম্যরচনা, ভ্রমণকাহিনি, গবেষণাপ্রসূত রচনা, ইতিহাস, ধর্ম-মাহাত্ম্য— এ-সব কিছুই না।" তাহলে বইটা কী নিয়ে? আসলে বইটা উপরোক্ত সবকিছু নিয়েই— শুধু সেগুলো লেখক উদ্ধৃত করেছেন মহাজনেদের নানা বই থেকে। কিন্তু সেই কাজটি করা হয়েছে ঠিক বেড়াতে যাওয়া বাঙালির মতো করেই। অধ্যায়-বিন্যাস থেকে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। এতে আছে~ ১. পুরীর পথ; ২. সাগরপুরী; ৩. শ্রীমন্দির; ৪. জগন্নাথপুরী; ৫. নগরপুরী; ৬. স্থান-মাহাত্ম্য; ৭. পুরুষোত্তমের পথেঘাটে; ৮. রথযাত্রা ইত্যাদি; ৯. পত্রপত্রিকায় পুরী। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লেখক, গবেষক, ভ্রমণপিপাসু বাঙালি হাওড়া স্টেশনের বড়ো ঘড়ির নীচে দেখা করা থেকে আবার ফেরার ট্রেনে চাপা অবধি প্রতিটি পর্যায় নিষ্ঠাভরে, প্রায় আচারের মতো করেই পালন করেছেন। লেখকও সেই পর্যায়গুলো নিয়ে তাঁদের লেখাজোখা থেকে নানা অংশ তুলে এনে আমাদের নিয়ে গেছেন পুরীতে। কালের যাত্রার ধ্বনি সমুদ্রের গর্জন আর ভক্তদের "জয় জগন্নাথ"-এর মধ্য দিয়ে আমাদের কানে ধরা দিয়েছে লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে। বইয়ের শেষে থাকা বিস্তারিত 'তথ্যসূত্র ও উদ্ধৃতিসূত্র' পাঠককে আরও বেশি পড়তে উৎসাহ দেবেই। তবে বইটা ছোট্ট পরিসরেও সবচেয়ে বেশি করে কোন কাজটা করবেন বলুন তো? ঠিক ধরেছেন। বইটা আপনাকে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে। পরের ছুটি কবে, ট্রেনে টিকিট পাওয়ার ঝক্কি, থাকার ব্যবস্থা কোথায় করা যাবে, এবার গজাগুলো কোত্থেকে কেনা যায়, দর্শনটা ভোরে করা ভালো না রাতে— এইসব প্রশ্ন আপনার মাথায় এসে পড়বেই। আরে বাবা, লেখক যে কথাগুলো লিখেছেন সেগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে না? চলুন, পুরী ঘুরে আসি।
"নীল! নীল! সবুজের ছোঁয়া কি না, তা বুঝি না, ফিকে গাঢ় হরেক রকম কম-বেশি নীল! তার মাঝে শূন্যের আনমনা হাসির সামিল ক'টা গাঙচিল!"
প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাগর থেকে ফেরা কবিতার এই কটা পঙক্তি খুব মিষ্টি করে সমুদ্রকে ধরেছে। আমি যখন প্রথম সমুদ্র দেখি, তখন বুক ফাঁকা করে দেয়া একটা অনুভূতি হয়েছিল। অনেক বিশাল কিছুর সাথে আকাশের পর তো সেই প্রথম পরিচয়! আকাশকে আসলে খুব নিজের লাগে, তবুও উষ্ণ কোন সন্ধ্যায় তারাভরা আকাশের দিকে ছাদে শুয়ে তাকিয়ে থাকার অনুভূতিটা অলীক।
আকাশ ছেড়ে আবার সমুদ্রতে আসি। কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে দার্জিলিং আর পুরীর মতো ভ্রমণপছন্দনীয় স্থান বোধহয় আর দুটি নেই। বাদশাহী আংটির শুরুতেই তোপসের বয়ানে, 'এর আগে প্রত্যেক ছুটিতে দার্জিলিং নাহয় পুরী গিয়েছি।' সেবার লখনৌ বেড়াতে যাওয়ার আগে তোপসের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত মানসিকতার নতুনকে নিয়ে সংশয়টা চমৎকার করে দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ।
প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তের এই সাহিত্যের পুরীটা তাঁর সাহিত্যের দার্জিলিং এর দ্বিতীয় খণ্ডই বলা যায়। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, কোন কোন সাহিত্যে পুরী কীভাবে এসেছে তা নিয়েই বইটি।
এই ধরনের বই পড়ার একটা বিরাট সুবিধা রয়েছে আমার জন্য। চুম্বক অংশসমেত পুরীকাহিনীগুলো কিংবা আগের বার দার্জিলিং এর লেখাগুলোর একটা রেফারেন্স খুব লোভনীয়ভাবে দুই মলাটের মধ্যে উপস্থিত হয়, ফলে আমি আরো বই পছন্দ করতে পারি পড়ার জন্য।
বইটাকে কয়েকটা অধ্যায়ে সাজিয়েছেন লেখক। একেবারে রেলযাত্রা করে পুরী পৌঁছানোর পর, প্রথমবার সাগর দেখার অভিজ্ঞতা, পুরীতে বেড়াবার অভিজ্ঞতা এইসবই এসেছে একের পর এক, কিন্তু লেখকের নিজের চোখ দিয়ে নয় পুরোপুরি। কখনো তা রম্যাণি বীক্ষের লেখক সুবোধকুমারের চোখ দিয়ে, কখনো অবনঠাকুর বা রবিঠাকুর, আবার কখনো সমরেশ বসু কিংবা সত্যজিৎ রায়৷ এছাড়াও অনেক অনেক লেখক যাঁরা পুরী-ভুবনেশ্বর গিয়েছেন, তাঁদের লেখার অংশ পর পর সাজিয়েই এগিয়ে চলেছেন লেখক।
পুরীর সমুদ্র ছাড়াও স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য মিলিয়ে শিল্পসম্মত আরেকটি অংশ রয়েছে। অনেক পর্যটক এই পুরাকীর্তিসমূহ দেখার জন্যও পুরী ভ্রমণ করেন। তবে সবচেয়ে যে কারণে বিখ্যাত এই পুরী তা নি:সন্দেহে পুরীর জগন্নাথমন্দির। পুরী যে হিন্দুদের একটা গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান তা ভুলে গেলে মোটেও চলবে না। আর এই দিকটাকে উপজীব্য করে আবার রচিত হয়েছে অন্যরকমের কিছু সাহিত্য, যাতে দেবমাহাত্ম্য এবং পুরাণ ইত্যাদিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। পুরী শীর্ষক আলোচনায় এই অংশটিকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। তার উপর আবার পুরীতে রয়েছে রহস্যেরও ঘনঘটা। শ্রীচৈতন্যদেবের অন্তর্ধান প্রসঙ্গেও পুরী চলে আসে অবধারিতভাবে।
তবে মন্দির এবং অলৌকিক পুরীর চাইতে সমুদ্রের নোনা হাওয়া মাখা পুরীর বিবরণ পড়তেই আমার বেশি ভালো লাগল।
বিশালত্বের সামনে পড়লেই বোধহয় প্রায় সব লেখকের লেখা হয়ে ওঠে আশ্চর্য মায়াময়। তাই দার্জিলিং বা পুরীকে ঘিরে সৃষ্ট হয়েছে অসংখ্য মনোমুগ্ধকর সব সাহিত্য-চলচ্চিত্র। মানুষের চেতনার রঙে সমুদ্র-পাহাড়-অরণ্যের এই রূপসম্ভার। এই অনুভূতিগুলোর রসাস্বাদন এর ক্ষমতা মানুষ হিসেবে জন্ম নিতে পেরে তৃপ্তি দেয়।