তানজীম রহমানের অনামিকা চুপ পড়ে শেষ করার পর দীর্ঘক্ষণ শব্দহীন বসে থাকতে হয়। ঠিক যেমনভাবে কেউ ঘন কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে—চারপাশ অস্পষ্ট, কিন্তু মন জানে ভয়াবহ কোন কিছু পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বইটাকে শুধুমাত্র হরর বা মোটা দাগে 'ভয়ের গল্প' বলতে আমি নারাজ। বাংলা সাহিত্যে হরর ঘরানায় নিরীক্ষা খুব বেশি হয়নি। তানজীম রহমান অনামিকা চুপে সেটা করে দেখিয়েছেন। শুধু অনামিকা চুপই নয়, তার 'তিনজন', 'বৃষ্টির দিন ভাড়া বেশি' বইগুলো পড়ার পরেও একই রকম চিন্তা মাথায় এসেছিল।
গল্পের কেন্দ্রে তিনজনের এক পরিবার—স্বামী, স্ত্রী ও তাদের ছেলে। ঢাকায় ভাড়াবাড়ি খোঁজার অস্থির বাস্তবতা থেকে শুরু সবকিছুর। শেষমেষ তারা গিয়ে ওঠে এমন এক ফ্ল্যাটে, যেখানে ষাট ডেসিবেলের বেশি শব্দ করলেই ‘কিছু একটা’ ঘটে যায়। এই ছোট্ট শর্তই এক ভিন্ন মাত্রার ভয় গেঁথে দেয় কাহিনীতে—একটা জায়গা যেখানে জোরে কথা বলা নিষিদ্ধ, শব্দ যেখানে শত্রু।
শুরু যতটা সাধারণ, পরের ঘটনাগুলো ঠিক ততটাই অপ্রত্যাশিত। গল্পে অশরীরির ছায়া আছে, তবে সেগুলো সোজাসাপ্টা নয়। খুব স্বাভাবিক কিছু বিষয় নিজের মত করে পাল্টে প্রচণ্ড অস্বস্তিকর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন লেখক।
কাহিনী বর্ণিত হয়েছে উত্তম পুরুষে। এতে পাঠক প্রতিটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে অন্তর্দৃষ্টির মতোন সংযুক্ত হতে পারবে। সংলাপ এখানে কম, কিন্তু বর্ণনা এতটাই চিত্রময় যে মনে হয়—একটা মূক থিয়েটার দেখছি। যেখানে প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি সিকুয়েন্স ভয়কে একটু একটু করে ছড়িয়ে দেয়। ভাষা কাব্যিক, এখানে সেখানে ছড়ানো আছে দার্শনিক কনটেমপ্লেশন।
এই বইয়ে হরর উপাদান নিছক দুঃস্বপ্ন বা ভৌতিক উপস্থিতির ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে হরর অনেকটা 'মনস্তাত্ত্বিক' । শারীরিক বিকৃতি, বীভৎসতা কিংবা মিউটিলেশন অবশ্য আছে, কিন্তু সেগুলো কাহিনীর প্রয়োজনে এসেছে।
গল্পের স্বামী-স্ত্রী চরিত্র দুটি দ্বিমুখী—একজন নির্লিপ্ত, অন্যজন পর্যবেক্ষক। কিন্তু সবচেয়ে জটিল ও আকর্ষণীয় চরিত্র আমার কাছে উইলি। পার্শ্বচরিত্রগুলোর নির্মাণও অনন্য—তারা গল্পে আসে, কিছুক্ষণ থেকে প্লটে কন্ট্রিবিউট করে, আবার হারিয়ে যায়—ঠিক বাস্তব জীবনের মতোই।
জাপানিজ বডি-হররের প্রভাব আছে, কিন্তু সেটা নিছক অনুকরণ নয়। বরং লেখক নিজস্ব এক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটিকে ব্যবহার করেছেন। পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্প, মেটাফোর ও অস্তিত্ববাদী দর্শন অনামিকা চুপকে রূপ দিয়েছে এক ধরনের বহুমাত্রিক সাহিত্যে। তানজীম রহমান এখানে শুধু হরর লেখেননি, লিখেছেন আধুনিক শহরের নিঃসঙ্গতার স্বরলিপি, ভাঙা সম্পর্কের অদৃশ্য কাহন। তার কাছ থেকে আবারও এরকম কিছু পাবো কখনো, এমন আশা রাখছি।
গতিশীল উপন্যাস। ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রগুলো তানজীম রহমানের নিজস্ব ধারায় অনন্য। একটা সংলাপ আছে এমন "পুরাণ আর কিংবদন্তি হচ্ছে জগতের গভীর সত্য বোঝার জন্য মানুষের ঘোলাটে প্রচেষ্টা। তবে সব পুরাণেই সত্য থাকে এবং সাথে মানুষের কল্পনা থাকে।" সেই সূত্র ধরে বলা যায়- ভৌতিক, অদ্ভুত, বীভৎস ঘটনার আড়ালে "অনামিকা চুপ" জগৎ ও জীবনের নিরর্থকতা, অন্তঃসারশূন্যতা ও রহস্যময়তা বোঝার জন্য লেখকের আরেকটি প্রয়াস। বইয়ের সেরা অংশ এর উপসংহার। "অনামিকা চুপ" আকারে আরেকটু প্রশস্ত হলে ভালো লাগতো। সবকিছু বড় বেশি দ্রুত ঘটে যায়।
এত রিভিউ দেখে, এত কাঠ খড় পুড়িয়ে, বইমেলায় গিয়ে কষ্ট করে প্রকাশনী খুঁজে, সেই প্রকাশনী আধও স্টল দিছে নাকি জেনে, আবার তার স্টল নাম্বার মেলার কোন কোনায় পড়ছে সেইটা খুঁজে বের করে বই কেনাটা এখন মনে হচ্ছে স্রেফ টাকা নষ্ট, আর কিচ্ছু না। রাগে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করতেছে। ফালতুর চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সবার রিভিউ এ দেখলাম শেষটা সুন্দর, হেন তেন। শেষটায় নাকি এমন কিছু আছে যা পুরা বইটার কাহিনি, প্লটই এক নিমিষে চেঞ্জ করে দিয়েছে। বইটা পড়া শুরু করার সাথে সাথেই মনে হচ্ছিল যে বইটা রেখে দেই। কিন্তু টাকা দিয়ে কিনছি। সবচেয়ে বড় কথা বইটা খুঁজে কিনতে যে কষ্ট করছি না পড়লে কেমন যেন লাগবে নিজের কাছেই তাই পড়া। প্রতি মুহুর্তেই বিরক্ত হচ্ছিলাম, সীমাহীন। কিন্তু সবার রিভিউ এ শেষটা সুন্দর শুনে পড়া চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু শেষটায়ও হতাশ হতে হলো। কিছু করার নাই। পুরা বইয়ের মধ্যে শেষটা ছিল সবচেয়ে জঘন্য। হতাশ হইলাম বইটা কিনে + বইটা পড়ে।
লেখক বইটা ভয়ংকর করার চেষ্টা করেছেন। সত্যি বলতে দুর্বল চিত্তের মানুষ ছাড়া আর বাচ্চা পোলাপান ছাড়া এই বই পড়ে কেউ ভয় পাবে বলে মনে হয় না।
একটা স্টার ও দিতে ইচ্ছা করতেছে না। কিন্তু তাও একটা স্টার দিলাম শুধু নিজে কষ্ট করে যেয়ে বইটা কিনেছি টাকা দিয়ে তাই!!!!
সত্যি কথা হলো, ‘অনামিকা চুপ’ বইটা আমার জন্য একটা cover buy। প্রচ্ছদটা দারুণ লাগায় প্রি-অর্ডার করেছিলাম। যেহেতু তানজীম রহমানের লেখা, জানতাম এক্সপেরিমেন্টাল হবে। কিন্তু হরর, এটা বুঝতে পারিনি।
আর হরর একেবারেই আমার জনরা না। আমি ভূত ভয় পাই। তারচেয়েও বেশি ভয় পাই gore. রক্ত, কাটাছেড়া, mutilation এসব সহ্যই করতে পারি না।
বই সম্পর্কে কিছু না জেনেই গতকাল বইটা পড়তে শুরু করি। শুরুটা এত চমৎকার! ঢাকা শহরের শব্দদূষণ নিয়ে আক্ষেপ থেকে শুরু হয় গল্প। এরপর আসে ভাড়া বাসার বিড়ম্বনা। দুই বিষয়ের সাথেই রিলেট করতে পারি শতভাগ!
কিছুদূর যেতেই শুরু হয় ভৌতিক ঘটনা। পড়তে থাকি। বর্ণনা পাই এমন সব দৃশ্যের যা আমি সাধারণত এড়িয়ে চলি। কিন্তু তবু বইটার শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলি যাতে ১. ভয় কমে যায় এবং ২. জানতে পারি শেষমেশ কী হয়!
এই বইয়ের ডার্ক হিউমার ভালো লেগেছে। বইয়ের শুরুর দিকে ঢাকায় বাস করতে কী যে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয় তা নিয়ে কিছু কমেন্টারি আছে, পড়ে হতাশায় হাসি চলে এসছে। ফ্যামিলি ডায়নামিক্স, চরিত্রদের সাইকোলজি বিশ্লেষণ ছিল অন পয়েন্ট। তবে যেহেতু হরর আমার পড়াই হয় না, তাই মনে হচ্ছে ঠিকমতো বইটার রিভিউ/রেটিং দিতে পারছি না।
ভয়ের বই, অস্বস্তির বই, দুঃস্বপ্নের মতো বই, আর একটানে শেষ করে ফেলার বই, এটুকু বলতে পারি।
নিয়ে এলাম আরেকটি ‘নট আ রিভিউ’! এবারের বই তানজীম রহমানের অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক উপন্যাস “অনামিকা চুপ”। যেহেতু বেশ আগে পড়া হয়েছে, বিস্তারিত অনেক তথ্যই স্মরণে নেই। তবে বইটি কী নিয়ে এবং আমার পাঠ অনুভূতিটি যথাসম্ভব তুলে ধরার চেষ্টা করব।
কাহিনি আবর্তিত হয়েছে এক পরিবারকে ঘিরে। পরিবারে তিনজন সদস্য- স্বামী, স্ত্রী এবং তাদের ১২ বছর বয়সী পুত্র সন্তান। পুরো গল্প আবার বর্ণনা করা হয়েছে উত্তম পুরুষে। গল্পকথক বা স্বামীর বর্ণনায় কাহিনি এগিয়ে যায়। আলাপ শুরু হয় ঢাকা শহরের শব্দ দূষণ সমস্যাটি নিয়ে। আর এই আলাপ শেষ হতে না হতেই আরেক সমস্যার উদ্রেক ঘটে, বাসা পরিবর্তন। যদিও কলিগের সহযোগিতায় নতুন বাসা খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। তবে সমস্যা আছে আরও। নতুন বাসায় রয়েছে অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ। যেখানে শব্দের মাত্রা ষাট ডেসিবলের বেশি হলেই অশরীরী ঘটনার আবির্ভাব ঘটে। ফলে জোরে কথা বলা বা শব্দ করা একেবারে নিষেধ। কিন্তু নিষেধে কি আর সমাধান মেলে? সময় পরিক্রমায় গোটা পরিবারের ওপর বিপদের পাহাড় ভেঙে পড়ে। গোটা গল্প-ঘটনার বর্ণনায় পাঠকেরা হারিয়ে যাবেন গা ছমছম করা এক আতঙ্কের দুনিয়ায়।
বইটির পাঠ অনুভূতি প্রকাশের পূর্বে কিছু কথা বলে নেওয়া জরুরি। এটা নিছক কোনো ভূতের গল্প নয়। বরং যাপিত জীবনের চেনা পরিচিত ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের মেলবন্ধনে কাল্পনিক এক জগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে অলৌকিক ও অশরীরী ঘটনা প্রকট রূপ ধারণ করে। সংকটাপন্ন অবস্থা তৈরি হয়। বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যকার দূরত্ব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। শুধু ভয় পাবার জন্য পড়ে গেলে আপনি এখানে কিছুই পাবেন না। কিন্তু যদি লেখকের বর্ণনার সঙ্গে কল্পনা করতে পারেন, তাহলে একের অধিক চমক আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
প্রযুক্তির ক্রমবিকাশে এখন প্রায় সকলের হাতেই মুঠোফোন রয়েছে। চাইলেই সিনেমা-সিরিজ যে কারও হরর চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এমনকি ১০-২০ সেকেন্ডের রিলসে থাকা দৃশ্যমান চিত্র-শব্দও পিলে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের তাৎক্ষণিক ফলাফল আশা করা বৃথা। ধীর গতিতে চরিত্র-ঘটনার সংঘাত তৈরিতে সময় লাগে। আর এখানেই লেখক তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। যেমন অসাধারণ গল্পশৈলী, তেমন অসাধারণ দৃশ্যায়ন। সীমিত সংলাপের সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা পুরোটা সময় মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। সেইসাথে রূপকের ব্যবহার, ব্যক্তিগত দর্শন, পাশ্চাত্যের শিল্পকর্মের উল্লেখ, লেখকের চমৎকার রসবোধ গল্প-কাহিনিকে ভিন্নমাত্রা এনে দিয়েছে। গল্পের প্রয়োজনেই বেশকিছু জায়গায় অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গির বর্ণনা, বীভৎসতা, অঙ্গচ্ছেদের মতোন দৃশ্যের উপস্থিতি মিলবে, যা পাঠকের হৃদয় কাঁপিয়ে দেবে নিশ্চিত।
বর্তমান সময়ে অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক জনরায় যে ধরনের বই প্রকাশিত হয়, তাতে নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেক্ষেত্রে “অনামিকা চুপ” নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম এবং দুর্দান্ত একটি উপন্যাস। যারা হরর-প্রেমী আছেন, তাদের জন্য মাস্ট রিড।
মাথাটা ঝিমঝিম করছে এখনো। লেখক একটা মিনিট ও রিলিফ দেয়নি আমাকে। একের পর এক ঘটনা গিলিয়েছে মাত্র। বিরক্তও হয়েছি খুব। নৃশংসতার চূড়ান্ত রুপ এই গল্পে পাওয়া গেলেও গল্পকথকের মধ্যে কোন হেলদোল নেই। সহানুভূতি নেই। সত্যি বলতে গল্পের সবগুলো চরিত্রই যান্ত্রিক। শেষ অংশটুকু পুরো গল্পটাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করেছে। এজন্যই একটা তাঁরকা বেশি।
শব্দ নিয়ে একটা সিনেমা দেখেছিলাম "আ কোয়াইট প্লেস" যেখানে অদৃশ্য ও ভয়ঙ্কর দানবেরা শব্দের প্রতি সংবেদনশীল এবং সামান্য আওয়াজ পেলেই আক্রমণ করে। তাই মানুষকে নিঃশব্দে বেঁচে থাকতে হয়। 'অনামিকা চুপ' যে তারই আদলে লেখা - একদমই তাই নয়। সেটা বলছিও না। বরং গল্পের উৎপত্তি ঐ শব্দকে ঘিরেই।
তানজীম রহমানকে এক্সপ্লোর করলে দেখা যায় - লেখক বরাবরই গল্প দাঁড় করায় ব্রিলিয়ান্ট সব কনসেপ্ট এ। 'অনামিকা চুপ' সে কনসেপ্ট এর দারুণ এক্সিকিউশন। তবে গল্পের শুরু ভালো হলেও মাঝে গিয়ে শ্লথ লাগছিল। এছাড়া জাপানিজ কিসিমের উদ্ভট উদ্ভট সব চারিত্রিক বর্ণনা গুলোয় ভয় পেয়েছি ভালোই। হুমায়ূন আহমদীয় কায়দার হিউমার যেটা হরর বইতে বোনাস হিসেবে ছিল, এঞ্জয় করেছি।
তবে মেইন ক্যারেক্টর গুলো কনক্রিট। খুব বেশি ঝড় হলে যেমন ছোটো গাছপালা গুলো অনেকটা অক্ষত থেকে যায় - এই ক্যারেক্টর গুলোও তেমন। নৃশংস এক একটা ঘটনায় তাদের হেলদোল কম। সবচেয়ে ভালো লেগেছে কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বইয়ের নাম। 'অনামিকা চুপ' - কি অসাধারণ!!
প্রকাশের ঘোষণার সময় থাইকাই বইটা পড়ার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। কারণ তানজীম রহমান এর বেশিরভাগ লেখাই আমি খুবই এনজয় করছি। আর এটার ক্ষেত্রে নাম শুইনাই মনে হইছে বইটা খুবই ইন্টারেস্টিং হবে। সো, বই পাইতেই পইড়া ফেললাম।
উত্তম পুরুষে বর্ণিত বইয়ের ঘটনাটা শুরু হয় একটা সংকটের মধ্য দিয়া। বাসা ভাড়ার সংকট। ঢাকা শহরে যেই সংকট বেশিরভাগ মানুষকেই লাইফটাইমে কয়েকবার পোহাইতে হয়। ১০ দিনের নোটিশে বাসা ক্যান ছাড়তে হইতেছে সেইটা পড়তে গিয়াই বইয়ের পরিবেশ হালকা হয়ে গেছে, ইন এ পজেটিভ ওয়ে। আমি এইখানে বললাম না, আপনারা পইড়েন, মজা পাবেন। যাই হোক, ১০ দিনের মধ্যে ঢাকা শহরে সুইটেবল বাসা পাওয়া অলমোস্ট অসম্ভব একটা ব্যাপার। এইখানেও তাই ঘটল এবং সেই সংকট থেকে উদ্ধার করলো গল্পকথকের এক কলিগ, নাম আঞ্জুম। তার খোঁজে এমন একটা বাসা আছে যেইটাতে চাইলে এই ১০ দিনেই ওঠা যাবে তবে ছোট্ট একটা সমস্যা আছে। আর সেইটা হইলো, ঐ বাসায় ভূতের ঝামেলা আছে কিন্তু এক হিসাবে লাভও আছে। বাসা ভাড়া কম। বাসায় ভূতের আছর থাকলে যে বাসা ভাড়া কম হইবো এইটাই স্বাভাবিক। তবে লেখক এইখানে গল্পকথকের মুখ দিয়া এমন একটা প্রশ্ন করাইলেন যে হাসি চাইপা রাখতে বেগ পাইতে হইলো। প্রশ্নটা হইলো, ‘ভাড়া কম কেন? ভাড়ার কিছু অংশ কি ভূতে দেয়?’ সিরিয়াসলি! মানে মানুষের মাথায় এই প্রশ্নও আসতে পারে? এইখানে বুইঝা গেলাম বইটা ফর শিওর ব্যাপক কমিক রিলিফ দিবে। হররে কমিক রিলিফ জিনিসটা কেমনে কাজ করে এইটা দেখার জন্যই এই বইটা পড়া যায়। যাই হোক, গল্পের কথা বলি। তো বাড়িওয়ালার সাথে দেখা সাক্ষাত কইরা, ভূতের ফিরিস্তি নিয়া বাসায় উঠলো গল্পকথক, তার ওয়াইফ অনামিকা (হ্যাঁ, বইয়ের নামের ক্যারেক্টার পাওয়া গেছে এইবার) আর তাদের একমাত্র পুত্র উইলি। উইলির বয়স ১২। এই পর্যন্ত গল্প লাইটই ছিল, এরপর শুরু হইলো ডার্ক। কেমন ডার্ক সেইটা বই পড়লেই বুঝতে পারবেন তবে আমি প্রিটি শিওর এইরকম হরর সচরাচর পড়া হয় না। আর টুইস্ট যেইটা আছে সেইটা তো একদম ‘থ’ খাওয়ায়ে দেয়ার মতো।
বই কেমন লাগছে? প্লটের বিবেচনায় বই দারুণ এক্সক্লুসিভ তবে স্রেফ প্লট নির্ভর বই যারা পড়তে চান তাদের এই বই ‘সো সো’ লাগতে পারে। তবে এইখানে প্লটের চাইতেও অসাধারণ জিনিস, লিখনশৈলী। তানজীম নামের মানুষজন যে একটু এক্সক্লুসিভ হয় (!) সেইটা তো আগেই জানতাম আর লেখকের লেখা তো প্রিয়ই, তাই লেখা ভালো হবে জানাসত্ত্বেও এই বইয়ের লেখার প্যাটার্ন আমাকে মুগ্ধ করছে। বইয়ে যেমন আছে প্রচুর কমিক রিলিফ, তেমন আছে দর্শন, এর কিছু আবার একদম বাঙালির নিজস্ব দর্শন আর আছে আইসবার্গের টিপ এর মতো প্রচুর রেফারেন্স। মোৎজার্টের রেফারেন্স, ফ্র্যান্সিসকো গয়ার ব্ল্যাক পেইন্টিং এর রেফারেন্স, সেই সাথে আছে কিছু পরিচিত ক্যারেক্টারর রেফারেন্স, যেমন : ডাক্তার ও চা গবেষক ওয়াফ��� হামিদ, উচ্চভিলাষী ছেলে তাকদীর ষষ্ঠ, শাহরুখ হক আর আরেকজন (তার নামটা বললাম না)। এদের উপস্থিতি অন্য লেখকদের বইতে দেখা গেলেও সেইগুলা খানিকটা আরোপিত লাগলেও এইটাতে লাগে নাই। তবে বইয়ের সবচাইতে ভালো লাগার বিষয় হইতেছে, দৃশ্য বর্ণায়ন (বর্ণায়ন বলে আদৌ কোনো শব্দ আছে কিনা জানা নাই, আমি আন্দাজে লিখলাম)। মানে প্রতিটা দৃশ্য অক্ষর দিয়ে এত যত্ন করে বানানো হইছে যে আপনে সিনে ঢুকতে বাধ্য। এবং হরর সিনগুলা এতোটাই ইউনিক আর ডিটেইলড লাগছে যে এই বই গত রাতে খানিকটা পইড়া একটু ভয় পায়া রাইখা দিছি। বইয়ের এই জায়গাটা সুপার স্যাটিসফ্যাক্টরী! আরেকটা জিনিস ভালো লাগছে, সেইটা হইলো; বইয়ের প্রচুর বেসিক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। এই জায়গাটা রিল্যাক্স মনে হইছে আমার কাছে। রেগুলার কথ্য ভাষায় একটা স্পেসিফিক সমাজ যেসব শব্দ ব্যবহার করে সেগুলো ব্যবহার করলে আমার কাছে ক্যারেক্টারে ঢুকতে, প্রেক্ষাপটে ঢুকতে সহজ মনে হয়। আর এইটা তানজীম রহমানের এই বইতেই বেশি দেখলাম। সুতরাং এইটা যে ইনটেনশনাল সেইটা বোঝা যাচ্ছে।
বইয়ের সবই কী ভালো? নাহ, সব ভালো লাগে নাই আমার। প্রথমত, এই বইটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হইলে আমার বেশ ভালো লাগতো। আরো ডিটেইলড পাইতাম আর কী! এইখানে একটা না-পাওয়া রয়ে গেছে। দ্বিতীয় ব্যাপার হইতেছে, বইয়ে প্রচুর প্রশ্ন জাগার সম্ভাবনা তৈরী হইছে বইলা মনে হবে। এই জায়গাটার কারণেই আমি বইটাকে নভেল হিসেবে দেখতে চাইছি। এমন না যে এগুলা না দেওয়ায় বই ঝুলে গেছে, তবে ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী পাইলে একদম খাপে খাপ হইতো। আর এইগুলা এইখানে বললে স্পয়লার মনে না হইলেও, বই পড়ার আগে বই নিয়ে একটা কনফার্মেশন বায়াস তৈরী হবার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং বই পড়া শেষ হইলে আলোচনা করতে আসলে, ওয়েলকাম। এত সময় কারো থাকে না, সো বাদ দিলেও সই। আরেকটা ব্যাপার, এইটা অবশ্য লেখকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন (যদি লেখক দেখে থাকেন বা এই বইয়ের প্রি-প্রোডাকশনের সাথে কেউ দেখে থাকেন)। শামসুল সাহেবের ক্ষুদ্র আত্মীয়দের কেসটা কী?
তো এই হইলো বই নিয়ে আলাপ। এর বাইরে আলাপ করলে করা যাইতে পারে পণ্য হিসেবে বই নিয়া। ১ম কথা হইতেছে, বইয়ের সেটাপে এত বেশি স্পেস দেয়া হইছে যে এই পৃষ্ঠায় ২৪-২৫ লাইনের বেশি আঁটে নাই (যেখানে রেগুলার সাইজের বুকস্ট্রিটের অন্য বইতে ৩৩-৩৫ লাইন পাইছি। আগে জীবনে নোটিস করি নাই, এইবার খটকা লাগায় দেখলাম)। আবার দুইটা প্যারার মাঝে এতখানি স্পেস/গ্যাপ দেয়া যে আমি শুরুর দিকে দুয়েকবার ভাবছি এইগুলা ডিফারেন্ট সিন (মানে ঐ গ্যাপটাকে সিনব্রেক মনে করছি)। আমি ইউজ্যুয়ালি এগুলা নিয়ে কথা বলি না বাট এই জিনিস পড়তে অস্বস্তি বোধ করাইছে দেখে বললাম। এইটা কোনো এক্সপেরিমেন্ট কিনা জানিনা তবে আমার ক্ষেত্রে অস্বস্তি লাগছে। এর মানে এই না যে এইসব বই বিক্রিতে কোনো ইম্প্যাক্ট রাখবে কিন্তু বই যেহেতু শখের জিনিস তো এইটা পাঠকের জন্য কমফোর্টেবল হওয়া উচিত। সো বুকস্ট্রীট, দেখেন ম্যাক্সিমাম পাঠক কী বলে, যেইটা বলে সেইটা শুইনেন প্লিজ। আর একটা ব্যাপার, আপনাদের বই ভালো ছাড়ে পাওয়া যায় সারাবছরই সেইটা জানি, তবু সেই হিসেব করলেও আমার কাছে মনে হইছে ১২৮ পেজের একটা বইয়ের জন্য মুদ্রিত মূল্য ৪০০ টাকা বেশি হয়ে গেছে। এইটা একটু কমানো যায় কিনা দেইখেন। এছাড়া প্রোডাকশনের এন্ড থেকে বাকিসব একদম ঠিকঠাক।
Brilliant! Absolutely brilliant! বইটার উপসংহার আমাকে সত্যিই এই কথাটা বলতে বাধ্য করেছে!
অনামিকা চুপ নিয়ে তানজীম ভাই যখন প্রথম পোস্ট করেন, তখন শুধু প্রচ্ছদটাই দেখে মনে হয়েছিল I have to get this book! একভাবে বলতে গেলে, শুরুতে বইটার প্রতি আমার আগ্রহটা ছিল শুধুই এর প্রচ্ছদ দেখে। কিন্তু বইটা পড়ে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি, এবং একটু অবাকও হয়েছি যে এটি আমাকে একটুও হতাশ করেনি (যেভাবে কিছু রিভিউ পড়ে ধারণা হয়েছিল, you can’t blame me!).
অনেকেই বলেন তানজীম ভাইয়ের লেখায় নাকি অনেক “অপ্রয়োজনীয় ইনফো ডাম্পিং” থাকে, যেটা অনেক সময় পাঠকদের বোর করে ফেলে। কিন্তু আমি বিষয়টাকে সেভাবে দেখি না, এবং আমার মনে হয় লেখকও একে ইনফো ডাম্পিং হিসেবে দেখেন না। কারণ, আপনি যখন একটা বই পড়ছেন, তখন এটা কোনো দেড়-দু ঘন্টার সিনেমা না, আপনি পুরোপুরি আপনার ইমাজিনেশনের উপর নির্ভর করে গল্পটা অনুভব করছেন। তাহলে কিছু বিষয় নিয়ে এক্সট্রা ইনফো না থাকলে আপনি লেখকের চোখ দিয়ে ঘটনাটা দেখবেন কীভাবে? হরর গল্পে যদি ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি বা কোনো ফাইট সিকুয়েন্সের একটু ডিটেইলস বর্ণনা না থাকে, পাঠকেরই বা সেটা কল্পনা করা সহজ হয় কেমন করে? হ্যাঁ, লেখকের বর্ণনা মাঝে মাঝে নন-ফিকশন ঘেঁষে যায়, সেটি মানছি, তাই হয়তো কিছু পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে।
আমি নিজে হরর জনরার পাঠক না, এই জায়গায় আমি উইলির সাথে একমত। অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলো আমার পার্সোনাল বিলিফের সাথে কনফ্লিক্ট করে, অনেক সময় সবই খুব ভুয়া মনে হয়। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক হরর আমি বরং খুব উপভোগ করি, আর অনামিকা চুপ-এ দুই দিকটাই সুন্দরভাবে মিশে গেছে। লেখকের ডার্ক হিউমার, চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ঢাকা শহরের শব্দদূষণ আর বাড়িভাড়া জনিত যন্ত্রণাগুলো সবকিছুই একদম অন পয়েন্ট ছিল।
সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গাটা ছিল এখানে চুপ থাকার কথা বলা হয়েছে এবং I love the sound of no one talking.
আর একটা কথা আলাদা করে বলতেই হয়, পঞ্চম জিহাদী ভাই, আপনি এই বছর যেভাবে একের পর এক মাস্টারপিস প্রচ্ছদ করছেন, সত্যিই ছক্কা মেরে দিচ্ছেন! :P
শেষে সালমানকে অসংখ্য ধন্যবাদ বইটা অবশেষে পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। :)
P.S. আচ্ছা, এই বই পড়তে গিয়ে কারো আজম খান-এর চুপ চুপ চুপ অনামিকা চুপ গানের কথা মনে পড়েছে?
তানজীম রহমানের নতুন বই অনামিকা চুপ। হরর জনরার বই। শুরুতে বেশ ভালো রকমের রহস্য সৃষ্টি করতে পেরেছেন, কেন উনি হরর জনরায় সেরাদের একজন সেটার ছাপ শুরুর দিকে স্পষ্ট ছিল। মাঝরাতে পড়তে গিয়ে একটু ভয় লাগছিল। সেইসাথে গল্পের বিভিন্ন জায়গায় সূক্ষ্ম রসবোধের ছাপ তো ছিলই। ছোট বই, দ্রুতই রহস্যের জাল গুটাতে হয়েছে। শেষে জ্বীনের সাথে ফাইট সিনটা ভালোই ছিল, আই সেইসাথে হালকা টুইস্ট। তবে নিকেতনের বাড়িতে জ্বীনের আগমনের কারণ আরও বিস্তারিত ও দৃঢ় হলে বেশি ভালো লাগতো। সবমিলিয়ে ভালোই লাগলো।
গুডরিডসে একটা সময় ছিল যখন রিভিউ দেখে কেনা বই পড়লে সময় নষ্ট হয়েছে বলে মনে হতো না। আজকাল মনে হয়। খাবার-দাবারের পেইড রিভিউয়ের মতো বইয়ের ক্ষেত্রেও মনে হয় পেইড/বায়াসড রিভিউর যুগ চলছে!
এতো জঘন্য বই আমি জীবনেও মনে হয় পড়ি নি! আক্ষরিক অর্থেই জঘন্য! কা��িনি জঘন্য, বর্ননা জঘন্য, সব মিলিয়ে গা গোলানো একটা অনুভূতি। লেখক কি পাঠকদের ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছেন, নাকি পাঠকদের পেটের খাবার উগড়ে দেওয়ার চেষ্টায় এই বই লিখেছেন, বুঝতে পারি নি।
আসলে উনি এমন উদ্ভট টাইপের বর্ননা লিখেছেন যা একজন মানুষ কল্পনা করতে পারে না। আর বই পড়ার আসল মজাই হচ্ছে যা পড়লাম তা কল্পনায় ভিজুয়ালাইজ করা। ওনার আরেকটা বই পড়া শুরু করেছিলাম, বিরূপকথা। সেটার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, আমি মাঝপথে বইটা বাদ দিয়েছি।
যাই হোক, রিভিউ দেখে হিসাব চিন্তা করে বই কিনবো এখন থেকে। এমনিতেই সময় পাই না! আর তার উপর আগডুম বাগডুম পড়ে সেই অল্প কিছু সময়কে নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
বইটা যদি শুধু 'বই' হিসাবে ধরি, তাহলে ভালোই বলতে হবে। মোটামুটি সাড়ে বারোটায় ধরে দুইটা দশ বাজার আগেই নামিয়ে ফেলেছি। গতি অনেক ভালো, কাহিনী হুক করে রাখে। তবে ভৌতিক কাহিনীগুলো তেমন ইম্প্রেসিভ লাগেনি। উইলির ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখার সময় আর আত্মা ডেকে আনার সময়ের দুইটা ঘটনা ভালো ছিল। তবে বাকিগুলো যত না ভৌতিক তার চাইতে বেশি অবিশ্বাস্য। কেন জানি বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব পেলাম। হয়তো আমিই বুড়িয়ে গেছি, জানি না।
এখানে কিছু কথা উল্লেখ করার দরকার মনে করছি। হরর অনেক প্রকারের হয়। কারো পছন্দ বিভৎস, পৈশাচিকতায় ভর্তি হরর যাকে বলা হয় Gore. আবার অনেক হরর আছে যেগুলোতে ভূত বা পৈশাচিকতা না দেখিয়েও ভয়ের ভাইব দেয়া হয়। অনামিকা চুপের বেশিরভাগ ঘটনাই Gore ক্যাটাগরির আওতায় পড়ে। সম্ভবত এজন্যই আমার ভালো লাগেনি। এই টাইপের রক্তারক্তিওয়ালা বিভৎস রসের গল্পকাহিনী রহস্য পত্রিকায় পড়েছি তাও দশ পনেরো বছর হবে। এখন আর vulgar জিনিসে পোষায় না তাই আমি সাইকোলজিক্যাল হরর বা সুপারন্যাচারাল হরর বেশি পছন্দ করি।
এই বইটা যে খারাপ তা নয়, তবে এটা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়।
সুপ্রাচীন নব্বই দশকের অন্যতম সদস্য হিসেবে বইয়ের নাম দর্শনমাত্রই প্রথমে মাথায় এলো পপ কিং আজম খানের সেই হৃদয় কাঁপানো দরাজ কণ্ঠের সুরেলো কতগুলো লাইনের ছবি।আজম খান আজ নেই, নব্বই দশক ও স্মৃতি বিস্মৃতির দোলাচলের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু বেঁচে আছে রোমন্থনের রোমাঞ্চকর সেইসব অনুভূতি।
এহেন রোমান্টিক ধরনের নামের বইয়ের শুরুতে প্রত্যাশা থাকে কোনো প্রনয়ের সূত্রপাতের সমাপনী পরিনয়ে অথবা পরিচয়ের রেশ ধরে পৃথিবীর এই পান্থপথে একলা চলার মাঝে বনলতা সেনের মতো তৃপ্তিদায়িনীর অধরা স্বপ্নের তৃষ্ণার্ত চাতকের বিহ্বলতা নিয়ে এগিয়ে চলার গল্প। লেখক সে সবের কিচ্ছুর ধার অবশ্য ধারেননি। নিজস্ব ভঙ্গিতে প্রচলিত ভাষায় নির্লিপ্ত ভাবে বর্ননা করে গেছেন আদিমতম অনুভূতি ভয়ের সাথে প্রাচীন পুরান মিথের মিশেলে তৈরি মনোজগতের আনাচে কানাচে লুকিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অব্যক্ত ইচ্ছে অবচেতন কামনা অবদমিত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ; একটি বাড়ি ,তিনটি পরিবারের আগমন পরবর্তী আধিভৌতিক অভিজ্ঞতার প্রত্যাবর্তন। যেখানে রয়েছে নিয়ম ভঙ্গের মাশুল স্বরুপ মূক বিমূঢ়তা, সঙ্গীহীন মৃত্যুর প্রতীক্ষা আর দৃষ্টি প্রদীপ হারিয়ে যাওয়ার দন্ড।
শহরের কোলাহলের কলতানে কাতর প্রানের আকুতি;নীরবতার এমন নির্মম পরিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিকেতনের বাড়িটি আপনাকে প্রথমে সস্তায় মিলে যাওয়া বাসস্থান পাবার স্বস্তি, আগামী শান্তিপূর্ণ দিনের অদেখা আনন্দের মাঝে সর্তক বানী আর শর্তগুলো কে নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ দিলেও নেহাতই নিরুপায় বা অ্যাডভেঞ্চারের আতিশয্যে আসন্ন শিরে সংক্রান্তির সমূহ সম্ভাবনার নাকচ করার আক্কেল সেলামী শিক্ষা দেয় চিরায়িত সেই অমোঘ বাণীর সস্তার তিন অবস্থা .
তানজীম রহমানের এমন এক্সপেরিমেন্টাল লেখাগুলো বরাবরই এক্সপেক্টেশনের পারদে সিংহভাগ প্রত্যাশা পূরন করে আসছে অনেক দিন ধরেই। ইবলিশ,জ্বীন ঘটিত ঘটনা যাপিত জীবনের সাথে জুড়ে দেওয়ার মুন্সিয়ানা সবার থাকে না। লেখক এখানে সার্থক একথা মুক্ত কন্ঠে বলতে বাধা নেই।তবে উইলির মতো এমন ইঁচড়ে পাকা অকালকুষ্মান্ড আমড়া কাঠের ঢেকির জন্য উচিত ছিল আরো বেশি শাস্তির। বড় অল্পেই গাধাটা ছাড়া পেয়ে গেলো। আফসোস!এই বয়সে এসেও আম্মুর কাছে অহরহ প্রহারের আহার জোটে সামান্যতম ভুলের বা কখনো কখনো সঠিক হবার কারনেও। মা তো আর লেখক নন,নইলে উইলির উইশডম নিয়ে আলোচনার বদলে উত্তম মধ্যম ওর প্রাপ্য হত নিশ্চিত।
একদম খাঁটি টান টান উত্তেজনার প্রবল অস্বস্তি সৃষ্টিকারি হরর। তালিব শা আসার আগে পর্যন্ত দুর্দান্ত ছিল তবে এরপরেই কিছুটা মিইয়ে গেল। মাঝেমধ্যে স্যাটায়ারের অংশগুলো সেই লেভেলের। মিয়ানমারের পিশাচ সৃষ্টিকরার কনসেপ্ট নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো উপন্যাস পেলে সেই হবে।
বেশ মজার বই। লেখকের ঢংয়ের লেখা নয়। পাগলামি গোছের লেখা। রস, কষ, সিঙাড়া, বুলবুলি, মস্তক। পড়লে মনে হয় অন্য কেউ এসে লিখে দিয়েছে (হবে হয়তো কোনো বদ জ্বীন)। বইতে খুবই ইম্প্রেসিভ দুটো ব্যাপার ছিল। প্রথমত, হরর এলিমেন্ট গুলো ছিল একচুয়ালিই ব্যতিক্রমী এবং ভয়ের। জুনজি ইতোর কল্পনার মতো এবস্ট্রাক্ট জিনিশপত্র। আর ছিল নানান ক্যাটাগরির মেটাফোরের ব্রিলিয়ান্ট ব্যবহার! তবে ভয়ের বই পড়ে বেহেহেহে করে হাসছি, বিষয়টা কাজের কথা হলো কিনা বুঝতে পারছিনা! পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে গল্পের অস্বাভাবিকতা, অপ্রকৃতস্থতা। চরিত্রগুলোর মাথা খারাপ। শুরুর দিকে হুমায়ুন আহমেদ এর ইনসেইনিটির কথা মনে পড়ছিল। বাক্য গঠনের দিক থেকে বলছিনা, গল্পের দিকটা বলছি। বইয়ের আধাআধি আসতে আসতে বুঝলাম সেইসব পার করে করে ফেলেছেন লেখক। শেষের মোচড়টাও জমেছে! ব্যতিক্রমী হরর বই। এই বইটা কারো ভালো লাগবে কারো একেবারেই লাগবেনা। তাই এধরণের বই রেকোমেন্ড করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনা। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ হয়েছে!
'অনামিকা চুপ' পড়ে শেষ করলাম।যতোটা ভয়, আতঙ্ক এবং শঙ্কা অনুভূতির আশা নিয়ে বই টা শুরু করলাম, তার অর্ধেকের বেশি নিরাশ হলাম।হরর মুভি, ক্রাইম সিন, থ্রিলার মুভি ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে মস্তিষ্কে আলাদা একটা জায়গা দখল করে আছে, তাই হয়তো সহজে স্যাটিসফাই হতে পারলাম না।বইয়ের শুরুর অংশ থেকে শেষ টা বেশ ভালো লা��লো।অনামিকা চুপ কেন?এটার একটা যথার্থ উত্তর পেলাম।
৩.৫/৫ যদিও এই নভেলাটি ভৌতিক, কিন্তু এতে নানা উপাদান যোগ করা আছে। বিশেষত লেখকের হিউমার আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। সমাজের নানা অসঙ্গতি সুনিপুণভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
বছরের প্রথম পড়া বই, ডার্ক কমেডি মারাত্মক, কিছু হরর সিক্যুয়েন্স আসলেই অস্বস্তি দেয়, বইয়ের মাঝখানে কাহিনী কোনদিকে কি যাচ্ছে একটু এলোমেলো লাগলো, অসাধারণ এন্ডিং এর জন্য বইয়ের ছোটখাটো কিছু অপূর্ণতা ভুলে গেলাম।
উত্তম পুরুষে বয়ান করা মূল চরিত্র, তাঁর স্ত্রী অনামিকা ও একমাত্র ছেলে উইলি নিতান্ত বাধ্য হয়ে যায় বাসা চেঞ্জ করতে। নতুন ভাড়া বাসায় আবার একটু ঝামেলা আছে। নীরবতাই কাম্য এই বাসায়। কারণ শব্দ ৬০ ডেসিবেলের বেশি হলে ঘটতে থাকে নারকীয় সব ঘটনা।
উপন্যাসের অনেক জায়গায় হাইলাইট করার মতো কথাবার্তা আছে। আছে ব্যাপক সার্কাজম। সেই সাথে ভয়ানক সব ঘটনার পরও আপাতদৃষ্টিতে কেন বেশিরভাগ চরিত্র এতটা ভাবলেশহীন তা ঐ চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানলে কিছুটা বুঝা যায়।
তানজীম রহমানের যেকোন নতুন বই আমাকে আগ্রহী করে। হরর গল্পের ফাঁকফোঁকড়ে তিনি জুড়ে দেন অদ্ভুত কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রাসঙ্গিক ফিলোসফি। ভয় সৃষ্টি করতে তিনি যে এক ধরণের তীব্র অস্বস্তি নিজস্ব গল্পকথনে তৈরি করতে পারেন তা প্রশংসনীয়। তাছাড়া তানজীমের কল্পনাশক্তির শক্তিমত্তাও কম নয়।
'অনামিকা চুপ'এ আমাদের নিত্তনৈমিত্তিক জীবনের অশ্লীল, আপত্তিকর কিন্তু বাস্তব সত্য যেমন সহজাতভাবে প্রকাশ পায় ঠিক তেমনি পুরাণ, কিংবদন্তি, স্মরনীয় সাহিত্য, আর্টও জ্বলজ্বলে প্রাসঙ্গিকতা পায়।
বইটি আরেকটু বিস্তৃত কলেবরে লিখা হলে হয়তো আরো ভালো লাগতো। শেষের দিকটা সামান্য রাশড মনে হলো। তারপরও এন্ডিংটা আসলেই মনে তৃপ্তি জুগিয়েছে।
অনামিকা কেন চুপ তা জানতে হলে এবং তানজীম রহমানের চমৎকার লেখনির সাথে পুনরায় দেখাসাক্ষাৎ করতে হলে এ দ্রুতগতিময়তার বই হরর / অকাল্ট / লিজেন্ডস / মিথে আগ্রহী পাঠকদের পড়া লাগতে পারে।
বই রিভিউ
নাম : অনামিকা চুপ লেখক : তানজীম রহমান প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০২৫ প্রকাশক : বুক স্ট্রিট প্রচ্ছদ : নসিব পঞ্চম জিহাদী জনরা : হরর রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ।
আপনি যখন তানজীম রহমানের বই পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন মাথায় থাকা প্রয়োজন তিনি স্বাভাবিক কোনো গল্প বলবেন না। তার প্রতিটি লেখা হয় পরীক্ষামূলক। আর এই পরীক্ষায় ভিন্নধর্মী স্বাদ পাঠকদের পাইয়ে দিতে কার্পণ্য করেন না।
“অনামিকা চুপ” বইটি তেমনই এক গল্প। এই গল্পের মূল কুশীলব তিনজন। স্বামী, স্ত্রী ও তাদের একমাত্র সন্তান। মঞ্চস্থ হওয়া দৃশ্যে আরো অনেকেই আসে, নিজেদের গুরুত্ব বোঝাতে সচেষ্ট হয়। কাহিনির প্রয়োজন মিটিয়ে আবার মঞ্চ থেকে বিদায় নেয়। কেউ আবার শেষ মুহুর্তে মঞ্চে আবির্ভূত হয়ে সকল আলো কেড়ে নেয়।
মূল কুশীলবের প্রধান যে, সে একজন কবি ও চিত্রশিল্পী। একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করে। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে স্বাভাবিক বসবাস তার। কিন্তু সমস্যা বাঁধায় তার বাড়িওয়ালা। ঢাকার বাড়িওয়ালা ও তাদের সন্তানদের বেখেয়ালি চরিত্র ভাড়াটিয়াদের যাবতীয় কষ্টের কারণ। এই যেমন গল্পের মূল চরিত্রকে হুট করেই তার বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দিতে বলে। কারণ হিসেবে দেখায়, তার মেয়ে বিড়ালের ব্যবসা করবে। বিদেশ থেকে বিড়াল আমদানি করার পর এখানেই রাখবে। ফলে তাদের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে
কী আর করার! অগত্যা বাসা খুঁজতে যাওয়া। এই বিলাসবহুল শহরে কম খরচে ভালো বাসা ভাড়া পাওয়া যুদ্ধ জয়ের শামিল। সেই যুদ্ধই যেন হুট করে জিতে নিলো প্রধান চরিত্র। একটা বাড়ির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যার বাসা ভাড়া অত্যন্ত কম। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। সেই বাসাতে কেউ টিকতে পারে না। ভূত, প্রেত, জীন — কিছু একটা আছে সেখানে। যাদের সাথে বাস করতে চাইলে কিছু শার্ট মানতে হবে।
কোনো মানুষকে যদি আপনি কথা বলতে দিতে না চান, তাহলে কেমন হবে? সঙ্গীর সাথে কথা না বলে কেউ থাকতে পারে? কিন্তু ওই বাসায় থাকতে গেলে ৮০ ডেসিবলের বেশি শব্দ করা যাবে না। করলেই সমূহ বিপদ। এই সমস্যা সমাধানের একটি উপায় ঠিকই পাওয়া গেল। স্বামী, স্ত্রী বা সন্তান— কেউ কারো সাথে কথা বলে না। যোগাযোগের মাধ্যম? মোবাইলে মেসেজিং।
কিন্তু কতকাল? কোনো একসময় তো ভুল হতেই পারে! আর এই ভুলের মাশুল দিতে হলে বীভৎস কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে। শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত নেমে আসে। কিন্তু যে অতিপ্রাকৃত শক্তির কবলে ওরা পড়েছে সেখান থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
একের পর এক ভয়ের ঘটনা ঘটে শুরু করেছে, যা বীভৎসও বটে! কিন্তু সেখান থেকে বাঁচবে কীভাবে? উপায় একটা পাওয়া গেল অবশেষে। তালিব শা নামের এক ব্যক্তিকে খুঁজে পেল ওরা। কিন্তু শেষে যখন তার পরিচয় জানা যায়, বিশ্বাস করা না করা একান্তই নিজস্ব। যেখানে বাস্তবতা ও অবিশ্বাসের এক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যে দ্বন্দ্বে ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত বিষয়কে থামিয়ে দেওয়ার উপায় কতটা জোরালো হবে?
শেষের কথাটা আগে বলি। “অনামিকা চুপ” বইটির শেষটা এত বেশি চমকপ্রদ, অবাক করার মতো যে লেখকের তারিফ এখানে না করলে অপরাধ হবে। এমনভাবে ভাবা যায়, সেটা হয়তো কারো মাথাতেই আসবে না। লেখক সেই কাজটা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ও রহস্যের মাঝে যে প্রশ্ন ছিল, মিসিং পাজল ছিল; সবকিছুর যোগসূত্র মিলিয়েছেন শেষে এসে। ফলে বইয়ের মাঝ অংশে যে মিশ্র অনুভূতি ছিল, সেটা বইটি শেষ করার পর তৃপ্তিদায়ক অনুভূতিতে ছেয়ে গিয়েছে।
তানজীম রহমানের লেখনশৈলী অত্যন্ত চমৎকার। সাবলীল বর্ণনাভঙ্গি। তিনি যেহেতু পরীক্ষামূলক একটি লেখা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন, সেহেতু গল্প বলার ধরনে ভিন্নতা আছে। উপন্যাসিকার প্রধান চরিত্র এখানে নিজেই গল্প বলে। নিজের গল্প, স্ত্রীর গল্প, সন্তানের গল্প, অন্য সবার গল্প। পরিস্থিতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তুলে ধরে। যেহেতু উত্তম পুরুষে বর্ণিত এ লেখা, সেহেতু আমরা যেভাবে কোনো ঘটনা বর্ণনা করি লেখক সেভাবেই লিখেছেন। সংলাপের পরিমাণ খুবই কম। অবশ্য নিজের কথা লেখাতে সংলাপ নির্ভর লেখাও লেখক লিখতে চাননি বোধহয়। আর এই বিষয়টা আমার ভীষন পছন্দ হয়েছে।
বই পড়তে পড়তে অনেক জায়গায় মনে হবে, আরো বিস্তারিত হয়তো হতে পারত। অনেক অংশে মনে হবে এই প্রশ্নের তো উত্তর পাওয়া গেল না। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি ছোট এই ধরনের উপন্যাসিকায় কিছু বিষয় পাঠকের ভাবনার উপর ছেড়ে দেওয়া যৌক্তিক। এতে এক ধরনের ঘোরলাগা কাজ করে। সমাপ্তির পরও এর রেশ থেকে যায়। প্রশ্নগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়।
বইটিতে এমন অসংখ্য বাক্য আছে, যেগুলো কোটেশন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। লেখকের লেখার ভাবনাটাই এমন। এছাড়া বইতে এমন অসংখ্য দর্শন আছে, যেগুলো ভাবনার পরিস্থিতি তৈরি করবে। দেশ ও দেশের বাইরের পরিস্থিতিকে গল্পের মধ্যে দিয়ে লেখক দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বেশ কিছু সিনেমা, চরিত্র, চিত্রের রেফারেন্সের পাশাপশি লেখক নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেসব বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। সিরিয়াস মুহূর্তে লেখকের হিউমারের প্রশংসা করতেই হয়। বইয়ে ভিন্নতা আনতে, আকর্ষণীয় করে তুলতে এগুলো বেশ জরুরি।
সেই সাথে মানুষের মনস্তত্ত্বের এক অন্যরকম দিক লেখক উন্মোচন করেছেন শেষাংশে। এখানে কাউকে অতিমানব দেখানো হয়নি। এমন পরিস্থিতি যে ক্ষতির কারণ হতে পারে বইটি তার চাক্ষুষ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। আর শেষটা নিয়ে তো বললামই! এমন ব্যতিক্রম সমাপ্তির পর আর কোনো অপূর্ণতা থাকে না।
সম্পাদনা বা ছাপার ভুল বইটিতে ছিল না বললেই চলে। আমার চোখে অন্তত পড়েনি। তবে সেটআপের ক্ষেত্রে চারিপাশে বেশ জায়গা ছেড়ে দেওয়া আর ফন্ট বৃদ্ধি ঠিক পছন্দ হয়নি। বইটির সবচেয়ে ইউনিক বিষয় প্রচ্ছদ। সিম্পল, তারপরও অসাধারণ। কেন অসাধারণ, সেটা বলতে পারব না। কিন্তু দেখতে ভালো লাগে। বুকস্ট্রিটের বাঁধাই এমনিতেই দুর্দান্ত। এ নিয়ে বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
পরিশেষে, একজন লেখকের সার্থকতা কোথায় জানেন? তিনি একটি ভয়ের দৃশ্য পাঠকের সামনে উপস্থাপন করবেন। সেটা পাঠকও অনুভব করছে। আর এই অনুভূতিতে গা শিরশির করছে। কী হবে, সেটা জানার তীব্র কৌতূহলের পাশাপাশি ভয় ধরানো অনুভূতি হয়। কোনো অঘটন ঘটবে না তো? মূল চরিত্রগুলোকে নিরাপদে রাখার আকাঙ্ক্ষা মনকে ঘিরে ধরে। কিন্তু পৃষ্ঠার এপাশে থাকা পাঠকের কী-ই বা করার আছে? সবকিছু তো কেবল লেখকের হাতে।
◾বই : অনামিকা চুপ ◾ লেখক : তানজীম রহমান ◾প্রকাশনী : বুকস���ট্রিট ◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫
অসংলগ্ন একটা বই। লেখকের অন্য সব বই আমার পছন্দের। এই বইটাও বিগত আড়াই মাস খুজে এক বুকশপে পাই। কিন্তু বই পড়ে মনে হচ্ছে এটা প্রকাশ না করে ৩/৪ বছর না লিখলেও ভালো ছিলো। মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে ১২৮ পেজ শেষ করতে গিয়ে। এককথায় জঘন্য!
হররের সাথে সার্কাজম এসছে ইদানীং এমন বই পড়ছি অনেক, বেশিরভাগই ভালো লাগেনি, ফেসবুকের ভাইরাল ডায়ালগসগুলা নিয়ে সস্তা রসিকতা দেখানোর চেষ্টা ওইসব বইগুলা এরকমই ছিলো। কিন্তু এই বইটা ওগুলোর চেয়ে অনেক ম্যাচুরড, সবকিছু পরিমিত, ঠিকঠাক। টুইস্টও ভালো ছিলো, কিছু জায়গায় ভয় পাওয়াতে সক্ষম।
পড়াশোনার চাপ যখন গলার কাছে ছুরি ঠেকিয়ে ধরেছে, তখনই একদিন জনৈক বইবন্ধু আমাকে এই বইয়ের খোঁজ দেয় । এই মানুষ আমাকে হরর সাজেস্ট করেছে আর পড়ে ভাল্লাগেনি এমনটা এখনো হয়নি। কাজেই চোখ বন্ধ করে নিয়ে নিলাম। বই হাতে পাওয়ার কয়েকদিন পর অলস এক সকালবেলায়, বইটা খুলে বসলাম। পড়তে পড়তে মনে হলো, এই বই আমার জন্যেই লেখা । নিকেতনের সেই বাড়ি—যেখানে নীরবতা আইন, শব্দ এক প্রকার অপরাধ—এমন একটা জায়গাই তো আমার স্বপ্ন। উচ্চ শব্দ আমার একদমই পছন্দ না, চট করে ট্রিগারড হই, আর সেই কারণে ভূতের আনাগোনা বাদ দিলে এই বাড়িটা আমার পারফেক্ট ঠিকানা হতে পারত।
গল্পটা শুরু হয় ঢাকার পরিচিত বাসা ভাড়া সংকট দিয়ে। ১০ দিনের নোটিশে বাসা ছাড়ার তাড়া, আর এর মধ্যেই এক কলিগের মাধ্যমে কম ভাড়ায় একটা "ভূতুড়ে বাড়ি"র সন্ধান। পরিবারের সঙ্গে সেখানে ওঠার পর শুরু হয় নীরবতার মাঝে জমে থাকা গা ছমছমে এক অভিজ্ঞতা। লেখকের লেখা বরাবরের মতোই একটা ধোঁয়াশা তৈরি করে। এটা কি আসলেই হরর, নাকি কমেডির ঢঙে মিশে থাকা জীবনের গল্প? “ভাড়া কম কেন? ভূত কি ভাড়ার কিছু অংশ দেয়?”—এমন সব প্রশ্ন হাসায়, কিন্তু হাসির পরেও একটা ঠাণ্ডা শিহরণ টের পাই।
তানজীম ভাইয়ের লেখার যে বিষয়টা আমাকে বরাবর মুগ্ধ করে, তা হলো তার গল্পে থাকা ডিটেইলিং। তার কল্পনার ভেতরে আপনি ঢুকবেন, আর বেরোতে চাইবেন না। এই গল্পেও একই জাদু। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই হাসির খোলসটা খুলে পড়ে। শেষের মোচড়? চুপ হয়ে যেতে বাধ্য করবে।
শামসুল সাহেব আর অনামিকার চরিত্র নিয়ে আরও গভীরতায় যাওয়া যেত। অনামিকার চুলচেরা বিশ্লেষণ আর অস্বাভাবিক পরিস্থিতিগুলোকে বাস্তবতার চোখে দেখার ক্ষমতা অসাধারণ, কিন্তু তাকে যেন আরও একটু সময় দেওয়ার দরকার ছিল।
লেখার গোর, বডি হরর আর মিউটিলেশন অংশগুলো চমকপ্রদ হলেও হরর এলিমেন্ট এত ঘনঘন এসেছে যে কোথাও কোথাও একটু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়েছে।
আরেকটা জিনিস হলো শেষের দিকে যে দুটো পার্শ্ব চরিত্র আসে, তাদের পরিচয়টা ধোঁয়াশা। এদের একটা ব্যাকস্টোরি পাওয়া গেলে, গল্পটা হয়তো আরও মুখরোচক মনে হতো।
তবুও, এটা তানজীম ভাইয়ের লেখা। লেপের তলায় শুয়ে শুয়ে, ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে, কিংবা রিডার্স ব্লক কাটানোর জন্য এমন বই খোঁজা হয়। এই তিন ক্যাটাগরির কোনটায় আপনি থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন ঝটপট। আর হ্যাঁ, সবসময় মনে রাখবেন, কথায় বিপদ, নীরবতায় নিরাপদ!
প্রবাদটির মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। 'অনামিকা চুপ' বইটা কিনেছিলাম প্রচ্ছদ দেখে। প্রচ্ছদটা এতোই ইউনিক লেগেছিলো যে সাতপাঁচ কিছু না ভেবেই কিনে ফেলেছিলাম। কিন্তু, এই গভীর রাতে বইটা শেষ করার পরে আমি রীতিমতো বিরক্ত।
বইটার গল্প হচ্ছে, এক দম্পতি তাদের ছেলেকে নিয়ে নতুন একটা বাড়িতে উঠে। যে বাড়িতে জ্বিন ভূতের উপদ্রব রয়েছে। মডার্ন ফ্যামিলি হওয়ায় জেনেশুনেই তারা এই বাড়িতে উঠে যায়। সমস্যাটা শুরু হয় তারপর থেকেই। জ্বিন ভূতের উপদ্রবে তাদের জীবন একদমই ওষ্ঠাগত। এরপর তারা খুঁজে চলে এই জ্বিনের হাতের থেকে মুক্তি পাবার উপায়।
গল্পটা শুনে হয়তো ভালো লাগতে পারে। তবে, আসলে আমার কাছে নিরেট অখাদ্যের কাছাকাছিই মনে হয়েছে। কিছু জায়গা ভালো লেগেছিলো তাই একদম পুরোপুরি অখাদ্য বলছি না। তবে, নিরেট অখাদ্যের খুবই কাছাকাছি। জাম্পস্কেয়ার টাইপ জিনিসপাতি হলেই চলবে টাইপ মানুষের কাছে এই বই ভালো লাগতে পারে। আমি বেশ কষ্টেই শেষ করেছি।
সবমিলিয়ে, বইটা পড়ার পরে আমার মেজাজ ভালোই খিঁচড়ে গেছে। এতো রাতে এরকম বই পড়ে ঘুমাতে যাওয়া আসলেও বিরক্তিকর। এই বইয়ের ব্যাপারে আর কিছু বলতেও ইচ্ছা করছে না। 'অনামিকা চুপ'-এর মতো আমারও চুপ হয়ে যাওয়াটাই বেটার। শুভরাত্রি!
২০২৫ সালে আমার পড়ে শেষ করা প্রথম বই।মানুষের মাথায় যে কত রকম উদ্ভুত চিন্তা আসে তার বড় উদাহরণ এই বই।ঢাকা শহরের বাসিন্দা আমি ছোটবেলা থেকেই।তাই উদ্ভুত,অলৌকিক কোন কাহিনি ঢাকা শহরে ঘটেছে তা শুনতে বা পড়তে আগ্রহী ।ঢাকার নিকেতনের একটা বাড়িতে ঘটা এমন ঘটনা যদি আপনার পাশের বাসায় বা এলাকায় ঘটে!!!বারংবার বাসা বদলের পরেও যদি অনিমন্ত্রিত অতিথিরা আপনার পিছু না ছাড়ে!!!! তাইলে কি করবেন!!! ওহ হ্যাঁ! ৬০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ করা যাবে না ঐ বাসায়।মনে থাকবে তো!!! ৩.৫/৫
প্রথম যখন বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেছিলাম,নাম দেখেছিলাম, আমি ভেবেছিলাম এটা প্রেমের বই বা অন্য কিছু। হররের কথা মাথাতেও আসেনি৷ হরর এটা দেখেছিলাম কার যেনো বইয়ের উইশলিস্টে। কেমন হরর হবে সেটা দেখতেই নেয়া। আগেই বলে রাখি, আমার হরর আমি খুব বেশি পড়িনি। ছোটবেলার টুকটাক বই আর বড়বেলার তারানাথ, সাথে অল্পস্বল্প এই সেই৷ এই হলো আমার দৌড়। কিন্তু তাও আমার পেটে অনেক হরর অভিজ্ঞতার কথা। জ্বিনে আমার বেশ ভয়। আমরা স্কুলে থাকতে, এই জ্বিনের কেচ্ছাকাহিনীর আসর বসতো। বান্ধবীরা বসে বসে তাদের মা-বাবা, চাচা,চাচী,দাদা দাদী কিংবা এমন কাছের কারোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতো। যেদিন শুনে আসতাম,সেদিন আমার ভয়ে হাত পা সেঁধিয়ে যেতো রাত হলেই। আবার খেয়াল করেছি আমার ভয় লাগলে বা ভয়ের কোনো ঘটনা পড়লেই সেই সবের কথা মনে পড়ে। তুলা গাছের নুপুর, কিংবা মাছ চাওয়া, কিংবা পান সেঁধে খাওনোর ছুঁতোতে ঘাড় মটকানো কিংবা কেউ ডাকলে পেছন ফেরা বা প্যারা বলে কোমর অব্দি কিংবা মাথার দিকে গেরে রাখার বিভিন্ন দৃশ্য ভাসে। আজও তেমন হয়েছে। সত্যি কথা বলতে শেষের দিকে আমি একদম ভয় পাইনি। ভয় যা পেয়েছি, গল্পের বিল্ডাপ আর মাঝামাঝি অংশে। এখন চিন্তা করছি এই ভয় নিয়ে আমি ঘুমুবো কীভাবে!
শুধু 'ভয়ের গল্প' বলে খাটো করে দেখা যাবে না — এটা শহুরে নিঃসঙ্গতা, ভাঙা সম্পর্ক আর অস্তিত্ববোধের এক তীক্ষ্ণ বর্ণনা। কাহিনীর কেন্দ্র এক স্বামী-স্ত্রী-ছেলে পরিবার; ঢাকার ভাড়াবাড়ির অস্থিরতা থেকে শুরু করে এমন একটি ফ্ল্যাটে পৌঁছায় যেখানে ষাট ডেসিবেলের উপরে শব্দ হলেই অদ্ভুত কিছু ঘটে — সেই ছোট শর্তটাই গল্পকে অদ্ভুত এক ভয়াবহ মাত্রা দেয়। ভাষা কাব্যিক ও চিত্রময়; সংলাপ কম, কিন্তু বর্ণনা মুক থিয়েটারের মতো দৃশ্য সাজায়। হররের উপাদান এখানে মনস্তাত্ত্বিক; শারীরিক বীভৎসতাও আছে, কিন্তু কাহিনীর প্রয়োজনে। পার্শ্বচরিত্র, বিশেষ করে উইলি, স্মরণীয়; জাপানি বডি-হররের ছোঁয়া থাকলেও লেখকের নিজস্ব ধারা প্রাধান্য পেয়েছে। উপসংহার শক্ত—অতন্ত্য গতিশীল কিন্তু গল্পটি একটু ধীরে প্রসারিত হলে আরও ভাল লাগত। সংক্ষিপ্তভাবে: ভীতিজনক, চিন্তাশীল এবং বাংলা হররে নতুন রঙ যোগ করলো। "পুরাণ আর কিংবদন্তি হচ্ছে জগতের গভীর সত্য বোঝার জন্য মানুষের ঘোলাটে প্রচেষ্টা। তবে সব পুরাণেই সত্য থাকে এবং সাথে মানুষের কল্পনা থাকে।"