প্রকাশের ঘোষণার সময় থাইকাই বইটা পড়ার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। কারণ তানজীম রহমান এর বেশিরভাগ লেখাই আমি খুবই এনজয় করছি। আর এটার ক্ষেত্রে নাম শুইনাই মনে হইছে বইটা খুবই ইন্টারেস্টিং হবে। সো, বই পাইতেই পইড়া ফেললাম।
উত্তম পুরুষে বর্ণিত বইয়ের ঘটনাটা শুরু হয় একটা সংকটের মধ্য দিয়া। বাসা ভাড়ার সংকট। ঢাকা শহরে যেই সংকট বেশিরভাগ মানুষকেই লাইফটাইমে কয়েকবার পোহাইতে হয়। ১০ দিনের নোটিশে বাসা ক্যান ছাড়তে হইতেছে সেইটা পড়তে গিয়াই বইয়ের পরিবেশ হালকা হয়ে গেছে, ইন এ পজেটিভ ওয়ে। আমি এইখানে বললাম না, আপনারা পইড়েন, মজা পাবেন। যাই হোক, ১০ দিনের মধ্যে ঢাকা শহরে সুইটেবল বাসা পাওয়া অলমোস্ট অসম্ভব একটা ব্যাপার। এইখানেও তাই ঘটল এবং সেই সংকট থেকে উদ্ধার করলো গল্পকথকের এক কলিগ, নাম আঞ্জুম। তার খোঁজে এমন একটা বাসা আছে যেইটাতে চাইলে এই ১০ দিনেই ওঠা যাবে তবে ছোট্ট একটা সমস্যা আছে। আর সেইটা হইলো, ঐ বাসায় ভূতের ঝামেলা আছে কিন্তু এক হিসাবে লাভও আছে। বাসা ভাড়া কম। বাসায় ভূতের আছর থাকলে যে বাসা ভাড়া কম হইবো এইটাই স্বাভাবিক। তবে লেখক এইখানে গল্পকথকের মুখ দিয়া এমন একটা প্রশ্ন করাইলেন যে হাসি চাইপা রাখতে বেগ পাইতে হইলো। প্রশ্নটা হইলো, ‘ভাড়া কম কেন? ভাড়ার কিছু অংশ কি ভূতে দেয়?’ সিরিয়াসলি! মানে মানুষের মাথায় এই প্রশ্নও আসতে পারে? এইখানে বুইঝা গেলাম বইটা ফর শিওর ব্যাপক কমিক রিলিফ দিবে। হররে কমিক রিলিফ জিনিসটা কেমনে কাজ করে এইটা দেখার জন্যই এই বইটা পড়া যায়। যাই হোক, গল্পের কথা বলি। তো বাড়িওয়ালার সাথে দেখা সাক্ষাত কইরা, ভূতের ফিরিস্তি নিয়া বাসায় উঠলো গল্পকথক, তার ওয়াইফ অনামিকা (হ্যাঁ, বইয়ের নামের ক্যারেক্টার পাওয়া গেছে এইবার) আর তাদের একমাত্র পুত্র উইলি। উইলির বয়স ১২। এই পর্যন্ত গল্প লাইটই ছিল, এরপর শুরু হইলো ডার্ক। কেমন ডার্ক সেইটা বই পড়লেই বুঝতে পারবেন তবে আমি প্রিটি শিওর এইরকম হরর সচরাচর পড়া হয় না। আর টুইস্ট যেইটা আছে সেইটা তো একদম ‘থ’ খাওয়ায়ে দেয়ার মতো।
বই কেমন লাগছে? প্লটের বিবেচনায় বই দারুণ এক্সক্লুসিভ তবে স্রেফ প্লট নির্ভর বই যারা পড়তে চান তাদের এই বই ‘সো সো’ লাগতে পারে। তবে এইখানে প্লটের চাইতেও অসাধারণ জিনিস, লিখনশৈলী। তানজীম নামের মানুষজন যে একটু এক্সক্লুসিভ হয় (!) সেইটা তো আগেই জানতাম আর লেখকের লেখা তো প্রিয়ই, তাই লেখা ভালো হবে জানাসত্ত্বেও এই বইয়ের লেখার প্যাটার্ন আমাকে মুগ্ধ করছে। বইয়ে যেমন আছে প্রচুর কমিক রিলিফ, তেমন আছে দর্শন, এর কিছু আবার একদম বাঙালির নিজস্ব দর্শন আর আছে আইসবার্গের টিপ এর মতো প্রচুর রেফারেন্স। মোৎজার্টের রেফারেন্স, ফ্র্যান্সিসকো গয়ার ব্ল্যাক পেইন্টিং এর রেফারেন্স, সেই সাথে আছে কিছু পরিচিত ক্যারেক্টারর রেফারেন্স, যেমন : ডাক্তার ও চা গবেষক ওয়াফি হামিদ, উচ্চভিলাষী ছেলে তাকদীর ষষ্ঠ, শাহরুখ হক আর আরেকজন (তার নামটা বললাম না)। এদের উপস্থিতি অন্য লেখকদের বইতে দেখা গেলেও সেইগুলা খানিকটা আরোপিত লাগলেও এইটাতে লাগে নাই। তবে বইয়ের সবচাইতে ভালো লাগার বিষয় হইতেছে, দৃশ্য বর্ণায়ন (বর্ণায়ন বলে আদৌ কোনো শব্দ আছে কিনা জানা নাই, আমি আন্দাজে লিখলাম)। মানে প্রতিটা দৃশ্য অক্ষর দিয়ে এত যত্ন করে বানানো হইছে যে আপনে সিনে ঢুকতে বাধ্য। এবং হরর সিনগুলা এতোটাই ইউনিক আর ডিটেইলড লাগছে যে এই বই গত রাতে খানিকটা পইড়া একটু ভয় পায়া রাইখা দিছি। বইয়ের এই জায়গাটা সুপার স্যাটিসফ্যাক্টরী! আরেকটা জিনিস ভালো লাগছে, সেইটা হইলো; বইয়ের প্রচুর বেসিক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। এই জায়গাটা রিল্যাক্স মনে হইছে আমার কাছে। রেগুলার কথ্য ভাষায় একটা স্পেসিফিক সমাজ যেসব শব্দ ব্যবহার করে সেগুলো ব্যবহার করলে আমার কাছে ক্যারেক্টারে ঢুকতে, প্রেক্ষাপটে ঢুকতে সহজ মনে হয়। আর এইটা তানজীম রহমানের এই বইতেই বেশি দেখলাম। সুতরাং এইটা যে ইনটেনশনাল সেইটা বোঝা যাচ্ছে।
বইয়ের সবই কী ভালো? নাহ, সব ভালো লাগে নাই আমার। প্রথমত, এই বইটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হইলে আমার বেশ ভালো লাগতো। আরো ডিটেইলড পাইতাম আর কী! এইখানে একটা না-পাওয়া রয়ে গেছে। দ্বিতীয় ব্যাপার হইতেছে, বইয়ে প্রচুর প্রশ্ন জাগার সম্ভাবনা তৈরী হইছে বইলা মনে হবে। এই জায়গাটার কারণেই আমি বইটাকে নভেল হিসেবে দেখতে চাইছি। এমন না যে এগুলা না দেওয়ায় বই ঝুলে গেছে, তবে ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী পাইলে একদম খাপে খাপ হইতো। আর এইগুলা এইখানে বললে স্পয়লার মনে না হইলেও, বই পড়ার আগে বই নিয়ে একটা কনফার্মেশন বায়াস তৈরী হবার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং বই পড়া শেষ হইলে আলোচনা করতে আসলে, ওয়েলকাম। এত সময় কারো থাকে না, সো বাদ দিলেও সই। আরেকটা ব্যাপার, এইটা অবশ্য লেখকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন (যদি লেখক দেখে থাকেন বা এই বইয়ের প্রি-প্রোডাকশনের সাথে কেউ দেখে থাকেন)। শামসুল সাহেবের ক্ষুদ্র আত্মীয়দের কেসটা কী?
তো এই হইলো বই নিয়ে আলাপ। এর বাইরে আলাপ করলে করা যাইতে পারে পণ্য হিসেবে বই নিয়া। ১ম কথা হইতেছে, বইয়ের সেটাপে এত বেশি স্পেস দেয়া হইছে যে এই পৃষ্ঠায় ২৪-২৫ লাইনের বেশি আঁটে নাই (যেখানে রেগুলার সাইজের বুকস্ট্রিটের অন্য বইতে ৩৩-৩৫ লাইন পাইছি। আগে জীবনে নোটিস করি নাই, এইবার খটকা লাগায় দেখলাম)। আবার দুইটা প্যারার মাঝে এতখানি স্পেস/গ্যাপ দেয়া যে আমি শুরুর দিকে দুয়েকবার ভাবছি এইগুলা ডিফারেন্ট সিন (মানে ঐ গ্যাপটাকে সিনব্রেক মনে করছি)। আমি ইউজ্যুয়ালি এগুলা নিয়ে কথা বলি না বাট এই জিনিস পড়তে অস্বস্তি বোধ করাইছে দেখে বললাম। এইটা কোনো এক্সপেরিমেন্ট কিনা জানিনা তবে আমার ক্ষেত্রে অস্বস্তি লাগছে। এর মানে এই না যে এইসব বই বিক্রিতে কোনো ইম্প্যাক্ট রাখবে কিন্তু বই যেহেতু শখের জিনিস তো এইটা পাঠকের জন্য কমফোর্টেবল হওয়া উচিত। সো বুকস্ট্রীট, দেখেন ম্যাক্সিমাম পাঠক কী বলে, যেইটা বলে সেইটা শুইনেন প্লিজ। আর একটা ব্যাপার, আপনাদের বই ভালো ছাড়ে পাওয়া যায় সারাবছরই সেইটা জানি, তবু সেই হিসেব করলেও আমার কাছে মনে হইছে ১২৮ পেজের একটা বইয়ের জন্য মুদ্রিত মূল্য ৪০০ টাকা বেশি হয়ে গেছে। এইটা একটু কমানো যায় কিনা দেইখেন। এছাড়া প্রোডাকশনের এন্ড থেকে বাকিসব একদম ঠিকঠাক।