Troilokyanath Mukhopadhyay, also known as T. N. Mukharji, was a remarkable person in British India. He worked as a curator at the Indian Museum in Calcutta, preserving India's cultural heritage. Beyond his museum work, Mukharji was a prolific writer in both English and Bengali. Trailokyanath, recognized as a pioneer in Bengali literature, left an indelible mark as a renowned writer. Among his notable works stands "Damru Charit", a collection of humorous and satirical short stories published posthumously in 1923. Troilokyanath's creations continue to delight people from generation to generation.
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তিনি টি.এন. মুখার্জি নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি কলকাতায় অবস্থিত ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম-এ কিউরেটর ছিলেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষায় তিনি একজন প্রসিদ্ধ লেখক ছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথকে বাংলা সাহিত্যের একজন পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বেশকিছু ধ্রুপদী ও পাঠকনন্দিত লেখা লিখেছেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা "ডমরু চরিত", যা ১৯২৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এটি মূলত হাস্যরসাত্মক এবং ব্যঙ্গাত্মক ছোটগল্পের একটি সঙ্কলন। ত্রৈলোক্যনাথের সৃষ্টকর্ম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আজও মানুষকে আনন্দ যোগায়।
‘সেরা রম্যরচনা। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়’ বইটির মলাট খুললে প্রথম ফ্ল্যাপে সুকুমার সেন এর একটি লেখা সবার আগে চোখে পড়ে। “শুধু বাঙ্গালা সাহিত্যে নয়, আমার জ্ঞানে সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪৭-১৯১৯) মত অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব ও আরও অদ্ভুত-জীবন লেখকের আবির্ভাব ঘটে নাই।…অতিশয়োক্তির আশঙ্কা স্বীকার করিয়া বলিতেছি, সেরভান্তের ডন কুইকসোট, কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস এবং আর্নেস্ট ব্রামার কাই লুঙের মতো ত্রৈলোক্যনাথের ডমরু-ধরও নিখিল সাহিত্যলোকে অমরত্বপ্রাপ্ত"। ২০১১ সালে বইটি যখন কিনেছিলাম, কয়েক পাতা পড়বার পর সুকুমার সেন এর কথাগুলোকে অতিশায়নে ভয়ানক দুষ্ট বলেই মনে হয়েছিলো! বুকশেল্ফের একটি কোনা ‘মোটা হউন’, ‘টাক মাথায় চুল গজান’, ‘৭ দিনে যৌনশক্তি ফিরে পানঃ একসাথে ১০ আউরাত কে খুশী রাখুন’ ইত্যাদির বিজ্ঞপ্তির বুকলেট সংগ্রহের জন্য উৎসর্গীকৃত। ত্রৈলোক্যনাথ এর বইটি এতদিন এই কোণটিতে এক সময়ের শখের জমানো বুকলেটগুলোর সাথে নিতান্ত অবহেলায় পড়ে ছিলো। কম বয়েসজনিত উগ্রতা কিংবা নির্বুদ্ধিতা, এর কোন একটিই সম্ভবত এ ধরনের ‘বিপিতাসুলভ’ আচরণ এর মূল। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য রথী-মহারথীগণ যখন শেলফের অন্য একটি কোনায় একসাথে বসে আছেন, ত্রৈলোক্যনাথ আমার কাছে তখন স্রেফ ‘বিশেষ অঙ্গের শক্তি মালিশ’ বেচা কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করছেন! বড় বে-ইনসাফি করে ফেললাম, সন্দেহ কী!
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত বইটিকে পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে ‘ডমরু-চরিত’ এর ৭টি গল্প। এরপর ‘কঙ্কাবতী’,’ ভূত ও মানুষ’, ‘মুক্তা-মালা’ ও ‘মজার গল্প’ এসেছে যথাক্রমে ২য়, ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম অধ্যায়ে। মূলত ‘ডমরু-চরিত’ নিয়েই এখানে আমার সকল উৎসাহ। ডমরুধর অনস্বীকার্য একটি চরিত্র এবং ডমরু-চরিত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিছু সৃষ্টির একটি, এটি মোটামুটি জোর গলায় এখন বলে দিতে পারি! টেনিদা, ঘনাদা, ফেলুদা কিংবা কাকাবাবুকে আমরা যে দৃষ্টিতে দেখি, ডমরুধর চরিত্রটিও সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি পাবার শক্তিশালী দাবীদার। ডমরুধর আসলে কে? ডমরুধর শ্রীহীন, কালো, ফোকলা দেঁতো ধনী কিন্তু ভীষণ কৃপণ সত্তোরোর্ধ এক বুড়ো। ডমরুধর তিনটি বিয়ে করেছে তবে সুযোগ পেলে এবং খরচ দিতে না হলে যে আরো তিনটি করতো না, তা বলা যায়না! প্রথম যৌবনের কপর্দকহীন ডমরুধরের প্রথম বিয়ে কন্যাপক্ষের কাছে বিশাল সম্পত্তির মিথ্যে বিবরণ দিয়ে। এরপর মোহর চুরি, অপরের জমি মেরে দেয়া, দুনম্বরি ব্যবসা, চাঁদাবাজি ইত্যাদি ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিশ্রমসাধ্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পদের মহীরুহ গড়ে তোলা। ডমরুধর ভয়ানক ধার্মিকও বটে। বারবার সে তার সমসাময়িকদের মনে করিয়ে দেয় সে মা দুর্গার কনিষ্ঠ পুত্র ষড়ানন এর অবতার (দুর্গা মাও বোধহয় তাঁর দুষ্টু এই পুত্রটিকে স্নেহ করেন সর্বাধিক! বারংবার বিপদ থেকে মা-ই তো ডমরুকে উদ্ধার করেন)। প্রতিবেশীর ন’বছর বয়েসী মেয়েটি যখন জ্বরের তাপে টিকতে না পেরে আকুল কণ্ঠে পানি খেতে চায়, একাদশীর উপবাসের ‘আইনে’ ডমরু তার পানি খাবার ওপর নিষেধ আরোপ করে। তৃষ্ণার্ত মেয়েটি শেষকালে ভেজা মেঝে চেটে গলা ভেজাতে চায় ও শিগগীরই ইহলোক ত্যাগ করে। সব দেখেশুনে ডমরুধরের উপলব্ধি, একাদশীর উপবাসকে উপেক্ষা করে ভেজা মেঝে চেটে পানি খাবার পাপের জন্যই মেয়েটির মৃত্যু হল, দণ্ডটি দিয়েছেন স্বর্গের দেবতারা। সময়ের পার্থক্য অপরাধের গুরুত্বকে একেবারেই মামুলী করে দিতে পারে। ছেলেবেলায় যখন আমি স্কুল পালাতাম, সেটি কখনো মা-কে জানতে দেইনি। অনেকগুলো বছর পরে যখন কলেজ শেষ করে বেরিয়ে আসছি, তখনই কেবল মা’র কাছে কলার নাড়িয়ে স্বেচ্ছায় কবুল করেছি স্কুল পালিয়ে সিনেমা হল কিংবা ভিডিও গেমের দোকানে লাইন দেবার ইতিহাস। না বললে হয়ত তিনি কখনো জানতেনও না, তবে যখন জানলেন, কিছু আর করার ছিলোনা তাঁর। ডমরুধরের ব্যাপারটিও অনেকটা তা-ই। ঘরোয়া মজলিসে ডমরুধর বন্ধু-বান্ধবদের কাছে একে একে তার সকল কীর্তির বর্ণনা শোনায়, স্বেচ্ছায়। বন্ধুরা কেউ কেউ হয়ত কটু মন্তব্য ছোঁড়ে দু'এক সময় কিংবা মনে করিয়ে দেয় তার চৌর্যবৃত্তির ইতিহাস, কিন্তু ডমরুধর যে ‘আমার মতই শেয়ানা’! সময় বুঝেই তো সে কবুল করেছে তার অপরাধের ইতিহাস। কিছু করবার জন্য তখন বড্ড দেরী হয়ে গেছে।
চলচ্চিত্রের জগতে ‘স্ল্যাপস্টিক’ বলে একটি ‘জনরা' (genre) আছে। কমেডি গুরু চার্লস চ্যাপলিন এই স্ল্যাপস্টিক ঘরানার ছবিই তৈরী করতেন। স্ল্যাপস্টিক এর বিশেষত্ব হল চরিত্রগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ভাঁড়ামি ও চোখে পড়বার মত বিচিত্র অঙ্গসঞ্চালন, যা স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি সম্পন্ন কেউ বাস্তব জীবনে প্রদর্শন করবেননা। ডমরু-চরিত এর গল্পগুলোর মাঝে সেই স্ল্যাপস্টিক এর উপস্থিতি খুব ভালোভাবে টের পাওয়া যায় (এটি একান্তই আমার নিজের উপলব্ধি এবং আমি এটিকে ‘লিখিত স্ল্যাপস্টিক’ বলেই জানবো!)। ডমরুধর তো আসলে আমাদের সমাজের ক্ষমতাবান পরিচিত অনেকগুলো ভীষণ দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের অপরাধগুলো একই রকম, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। ডমরুধরকে নায়ক বানাতে এবং একইসাথে তাকে হেয় করতেই ত্রৈলোক্যনাথ প্রয়োগ করেছেন তাঁর মাত্রাছাড়া রকম উদ্ভট কল্পনা শক্তির। এই উদ্ভটতা মনকে ভীষণ দ্বিধান্বিত করে, ‘কী পড়ছি এসব?’ বই থেকে মুখ তুলে জানালার বাইরে তাকালে দেখি ডমরুধরের উদ্ভট গল্পগুলোই আসলে বাস্তব। ডমরুধরেরা যুগে যুগে একে অপরেরই অবতার, ষড়াননের নয়। ধর্মকে ব্যবহার করবার পদ্ধতিও তাদের তাই হুবহু এক, জাত-কাল-ভূগোল নির্বিশেষে।
মনের ভেতরের চেপে রাখা সূক্ষ্ম কষ্টই ব্যঙ্গ হয়ে বেরোয় ব্যঙ্গশিল্পীর শিল্পে। চ্যাপলিন যখন ‘দি গোল্ড রাশ’ এ হাস্যকর ‘স্ল্যাপস্টিকীয়’ কায়দায় জুতো চিবিয়ে খান ক্ষিধের জ্বালায়, সেটা নিশ্চয়ই স্রেফ হাসি তামাশার জন্যই নয়। এর পেছনে গভীর এক কষ্টের দীর্ঘশ্বাসই টের পাওয়া যায়। ত্রৈলোক্যনাথের স্যাটায়ারেও হাসির কথার পিঠে মানুষ চেনার কষ্টই সওয়ার হয়েছে। মানব চরিত্র বিশ্লেষণে আমি দেখি চ্যাপলিনের স্ল্যাপস্টিক আর ত্রৈলোক্যনাথের ‘লিখিত স্ল্যাপস্টিক’ মিলে মিশে এক হয়ে গেছে।
" আমার জিহ্বা ও কন্ঠে সরস্বতী দেবী অধিষ্ঠাতা আছেন। মা দূর্গার বরপুত্র। সকল দেবতার আরাধনা করিয়া, সিদ্ধি লাভ করিয়াছি। কার্তিকের বরে কন্ধর্পের ন্যায় চেহারা হয়েছে। সরস্বতীর বরে বিদ্যান পুরুষ হইয়াছি "
উপরে সমুদয় কথা বললেন "ডমরুধর"। এ একেবারে নির্জলা সত্য। তার প্রমাণ ডমরুধর নিজেই। এ হেন সিদ্ধ পুরুষ ছাড়া কাহারো পক্ষে এত সব বিদঘুটে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নহে। এ শুধু ডমরুধর-ই পারে। শুধু কি বিপদ আপদ। এমন ঘটা করে দুগ্গা মায়ের পূজো ডমরুধর ব্যতীত ক-জন করতে পারে!! সেটা ও যদি বাদ দিই,ডমরুধরের মতো এত আজগুবি থুড়ি সত্য ঘটনা একটানা ক-জন বর্ণনা করতে পারে,তাও আবার প্রমাণ সমেত। ধন্য, তুমি ডমরুধর। তুমি ধন্য। তবে আফসোস একটা লম্বোদর ব্যাটাই খালি ডমরুধরে এই সত্য কাহিনির মর্ম বুঝিতে পারিলো না! বলে নাকি ডমরুধর খালি আজগুবি গল্প বলে। ব্যাটা নির্বোধ। সিদ্ধ পুরুষ কখনো মিথ্যা বলিতে পারে!! শুধু কি সিদ্ধ পুরুষ, তার চেয়ে এক কাঠি সরেস আমাদের ডমরুধর,সে জিলেট মন্ত্র প্রাপ্ত মহামানব।
আমার এতটুকু জীবনে পড়া শ্রেষ্ঠ রম্য গল্প " ডমরু চরিত"। ত্রৈলোক্যনাথ মহাশয় যদি আর কোন লেখা না ও লিখতেন,এই এক ডমরু চরিতের জন্য ই তিনি স্বরণীয় হয়ে থাকতেন। এত চমৎকার ডার্ক কমেডি আগে পড়ি নি। দারুণ,দারুণ। আমি পড়েছি বিশ্বসাহিত্য প্রকাশিত "শ্রেষ্ঠ রম্যগল্প "। সেখানে "ডমরু চরিত" ছাড়া ও আরো কয়েকটা গল্প ছিল। সবকটাই দারুণ। সবচে চমৎকার লেগেছে জাপানি উপকথা টা। অনবদ্য।