শিকার কাহিনী বিষয়ক বই বলতে আমরা শতকরা ৯০% লোকই বুঝি জিম করবেট আর কেনেথ এন্ডারসবনকে । এর অবশ্য কারণও আছে । শিকার যে শুধু আনন্দ পাওয়ার জন্যই নয় একে বইয়ের পাতায়ও সুন্দরভাবে বাঁধাই করে রাখা যায় তার প্রমাণ আমরা তাদের কাছ থেকেই আগে দেখি । আরেকটি কারণ হল আমাদের অজ্ঞতা । আমাদের কাছে জিম করবেট আর কেনেথ এন্ডারসন এর শিকার কাহিনীগুলো সবার আগে হাতে এসে পৌঁছেছে আর খুব সহজে পাওয়া যায় তাই আমরা তাদের সম্পর্কেই আগে জানি । কিন্তু একটা কথা আমরা ভুলে গিয়েছি জিম করবেট কিংবা কেনেথ এন্ডারসন কেউই এই দেশের লোক নন । তারা বিদেশী । এই দেশে তারা অন্য দেশ থেকে এসেছিল । কিন্তু বন জঙ্গল তো আর তাদের সাথে বিদেশ থেকে আসেনি । ভারত মহাদেশের শিকার কাহিনীর শুরু সুপ্রাচীন বাদশাহী আমল থেকে । কিন্তু আম জনতা শিকার কাহিনীর প্রথম স্বাদ পেয়েছিল এদের হাত ধরেই । তাই শিকার কাহিনীর নাম বললে এদের কথাই সবার আগে আমাদের মনে আসে । মানে শুরুটা হয়েছিল এদের হাত ধরেই । যার ফলশ্রুতিতে এখন হাল আমলে যে শিকার কাহিনী মূলক বই আমরা দেখি সেগুলো জিম করবেট আর কেনেথ এন্ডারসনের প্রথিকৃত বলা চলে । জিম করবেটকে পৃথিবী সুদ্ধ লোক জানে । কিন্তু আমাদের পাচাব্দী গাজীকে কয়জন জানে ? খোদ আমাদের দেশের লোকজই তো তার সম্পর্কে জানে না । এই আধুনিক যুগেও গুগল করলে তার সম্পর্কে জানার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে একটা বা দুটো পোস্ট অথবা সেবা থেকে বের হওয়া অনুলেখক হুমায়ুন খান রচিত “সুন্দরবনের মানুষখেকো” বইটি । অথচ পচাব্দী গাজী ছিলেন শুধু বাংলাদেশের নয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিকারিদের মধ্যে অন্যতম । এত কথা বলার কারণ যে বইটির কথা আজকে বলব তাতে উল্ল্যেখিত শিকার কাহিনীগুলো প্রায় জিম করবেট আর কেনেথ এন্ডারসনের সমসাময়িক কোন কোনটা তারও আগের । শুধু আমাদের হাতে হাতে পৌঁছেনি বলে তাদের সম্পর্কে জানতে পারিনি । বাঙ্গালী যে শুধু ঘরকুনো জাতি নয় । শিকার টিকারেও সমান দক্ষ্য আর সেই সম্পর্কে বই লিখে গিয়েছিল মেলা আগে তার প্রমান এই বইটি । আজাইরা প্যাঁচাল অনেক হইছে এইবার কাজর কথায় আসি । সম্প্রতি শেষ করলাম প্রায় ৪০০ পেজের সুবিশাল শিকার কাহিনী সংকলন “জঙ্গলে জঙ্গলে” । এতে রয়েছে আমাদের বাংলাদেশ আর কলকাতার বেশ কয়েকজন নাম করা শিকারির শিকার সংকলন ( যখনকার কথা বলা হয়েছে তখন সম্পূর্ণটাই ছিল অবিভক্ত ভারত । ) । বইটি শুধু একটা শিকার সংকলনই নয় বাংলা সাহিত্যের একটি মাস্টারপিস । বইটি পরে শুধু আফসোস জাগে আমাদের এই সাধারণ বাংলাদেশেই কত শত শিকার পাওয়া যেত । এক সময় মধুপুর গড়েই ছিল কয়েক প্রাজাতির বাঘ । যা আমাদের এই প্রজন্মের কাছে শুধুই স্মৃতি । (যদিও মধুপুর গড়ের বাঘ হারিয়েছে বেশদিন হয়নি ) । বইটিতে মোট ১১ জন লেখকের শিকার সংকলন আছে । ১. সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের - পালামৌ ২. কুমুথনাথ চৌধুরীর – ঝিলে জঙ্গলে শিকার ৩. জল্ধর সেনের – তিনটি গল্প সংকলন ৪. জিতেন্দ্রচন্দ্র চৌধুরীর –কোচবিহারে শিকার ৫. যশোহরে শিকার – অজ্ঞাত ৬.হেমেন্দ্রকিশোর আচার্্যের – খেদা ৭. বিহারিলাল সরকারের – হন্তী ৮. সূর্যকান্ত আচার্্যর – শিকার কাহিনী ৯. ভুপেন্দ্রচন্ত্র সিংহের –সুসঙ্গে শিকার ১০. রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের – মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্্য বাজাদুরের শিকার কাহিনী ১১. বিকাশকান্তি রায়চৌধুরীর –ওরাও প্রেমে পড়ে । এর মধ্যে কুমুথনাথ চৌধুরীর – ঝিলে জঙ্গলে শিকার এবং রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের – মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্্য বাজাদুরের শিকার কাহিনী গল্প না বলে সুদীর্ঘ উপন্যাসই বলা চলে । কুমুথনাথ চৌধুরীর ‘ঝিলে জঙ্গলে শিকার” একটি অসাধারণ শিকার কাহিনী বলা চলে । ১৯০০ সালের আগে পরে যে কয়েকজন শিকারি শিকার করেছেন কুমুথনাথ চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম । নিজের ছেলেমেয়েকে চিঠি লেখার ছলে বনের যে গল্প আর যে শিকার কাহিনী লিখে গিয়েছিলেন তা যে কি অমূল্য সম্পদ তা মনে হয়তো তিনিও জানতেন না । ছেলেমেয়েকে লিখিত তার সেই চিঠিগুলোই পরবর্তীতে বাংলায় অনুবাদ করে বই আকারে প্রকাশ করা হয় । তিবি শুধু শিকার কাহিনী বর্ণনা করেননি তিনি শুনিয়েছেন বনের প্রিতিটি গাছের পাতার গল্প । কি করে শিকার করতে হয় । কি করে শিকার করা উচিত । মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্্য ছিলেন আমাদের দেশেরই মানুষ । তিনি শুধু ময়মনসিংহের জমিদার ছিলেন না । ছিলেন একজন দুর্দান্ত শিকারি । যেহেতু তিনি ময়মনসিংহের মানুষ ছিলেন তাই তার শিকার কাহিনীগুলো গড়ে উঠেছে মধুপুর গড়ের মধ্যেই । বইতে তিনি প্রথম জীবনের শিকার কাহিনী শুনিয়েছেন । প্রথম জীবনে কি রকম নবীশ ছিলেন আর কিভাবে আস্তে আস্তে পাকি শিকারি হহয়ে উঠলেন তারই বর্ণনা তিনি দিয়েছেন এই গল্পে । হেমেন্দ্রকিশোর আচার্্যের ‘খেদা” পড়ে জানতে পারব কি করে খেদার মাধ্যমে হাতি ধরা হত ।(যারা এর চেয়েও ভালো ভাবে হাতি সম্পর্কে জানতে চান তারা প্রকীতেশ চন্দ্র বড়ুয়ার হাতির সঙ্গে পঞ্চাশ বছর বইটি অবশ্যই পড়ুন ।) বিকাশকান্তি রায়চৌধুরীর “ওরাও প্রেমে পড়ে” গল্পটিতে উঠে এসেছে পশু পাখিদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার কথা । ভালোবাসা যে শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় । পশু পাখিরাও যে প্রেম পড়ে তার বেশ কিছু উদাহরণ এই গল্পটিতে আছে ।