আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মোট এগারোটি ডায়েরি থেকে প্রাপ্ত লেখা গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন শাহাদুজ্জামান। সবচেয়ে পেছনের ডায়েরিটি ১৯৬৮ সালের এবং সাম্প্রতিকতমটি ১৯৯৫ সালের।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার। তিনি মাত্র দুটি উপন্যাস রচনা করলেও সমালোচকরা তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঔপন্যাসিক হিসেবেই বিবেচনা করেন। এই দুটি উপন্যাসের বাইরে ইলিয়াস মাত্র তেইশটি ছোটগল্প এবং বাইশটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ইলিয়াস সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের একজন একাগ্র পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর লেখার চরিত্রগুলোকে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং অবস্থানের প্রতীক হিসেবে সুদক্ষভাবে রূপায়ন করতেন। লেখার সময় তিনি চেষ্টা করতেন ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল থাকতে, ফলে তিনি পাঠকের স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে লেখার অন্তর্নিহিত গুরুত্বকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুর ফলে তাঁর সৃজনশীল জীবন খুব দীর্ঘায়িত হতে পারেনি, কিন্তু তাঁর লেখাগুলো বাংলা সাহিত্যে ধ্রুপদী সৃষ্টি হিসেবে স্থান পেয়েছে।
Akhteruzzaman Elias was a Bangladeshi novelist and short story writer. Despite the fact that he only wrote two novels, critics consider him to be one of the finest Bengali novelists. Besides these two books, Elias wrote only 23 short stories and 22 essays. Elias was a good observer of society, state, and people as he created his characters symbolising social classes and positions. He always strived to be historically accurate when writing, even if it meant pushing readers out of their comfort zones. His creative life was cut short by a premature death from cancer, but his writings are regarded as Bangla literature classics.
ডায়েরি লেখার চল বেশ জোরেশোরেই ছিলো কয়েক দশক আগে, এখনো লোকে সেটা ধরে রেখেছে বলে জানি না। ব্লগে-ফেসবুকে-স্মার্টফোনে, চটজলদি লিখে ফেলা যায় দিনপঞ্জি- স্মরণীয় কোনো উপলক্ষ্য বা পছন্দের উদ্ধৃতি। চব্বিশ ঘন্টার লেখক ইলিয়াস এই কাজটি করে গেছেন বহুবিধ ব্যাংক আর কোম্পানির রেক্সিনে মোড়া ডায়েরিতে।
১৯৬৮ থেকে ১৯৯৫, এই সময়কালে বিক্ষিপ্তভাবে লেখা ইলিয়াসের ডায়েরির বিভিন্ন চুম্বক অংশ উঠে এসেছে শাহাদুজ্জামানের সম্পাদনায়। সংকলনে জায়গা পেয়েছে নানা দৈনন্দিন ঘটনা, লেখালেখি নিয়ে ইলিয়াসের ভাবনা, নানা কবি-লেখক-গ্রন্থ আর আল কুরআন থেকে প্রাপ্ত উদ্ধৃতি। আছে ইলিয়াসের কিছু লেখার খসড়া, এমন কী আছে সিনেমা-গান নিয়ে ইলিয়াসের আগ্রহের স্মারকস্বরুপ কিছু অ্যানেকডোটস’ও।
ডায়েরির ৬৯’ সালের অংশটুকু খানিক আলাদা আলোচনার দাবি রাখে বোধহয়। চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে রাজপথ-মানুষ আর তাদের অন্তর্দহনের যে অবিস্মরণীয় ক্যানভাসটি ইলিয়াস এঁকেছিলেন, ডায়েরির এই অংশটুকুতে ধরা যায় সেই ক্যানভাসের হোমওয়ার্কটা। রাজনীতির ছায়ায় ঢেকে গেছে সমসাময়িক জীবনযাত্রা, ইলিয়াস তা দেখছেন নিস্পৃহ থেকে- ডায়েরি লিখছেন পত্রিকার পাতা কপি করে।
নানা উৎস থেকে সংগ্রহ করা উদ্ধৃতিগুলোও খুব চমৎকার। রাইনার মারিয়া রিলকে, অথর্ব বেদ, সুকুমার রায়- একটি মানুষ জীবন থেকে কত বিচিত্র পথে স্বাদ নিচ্ছেন; এই বিষয়টী খুব স্পষ্ট হয় এইসব বাণী থেকে। ‘১০-১২টা মাঝারি ধরনের গল্প লিখে’ প্রতিষ্ঠা পাওয়া লেখকদের কাতারে দাঁড়াতে চাননি তিনি, এই সত্য ধরা পড়ে ইলিয়াসের দিনপঞ্জিতে। ‘১৯৪৩-১৯৮১’ প্রতিটি জন্মদিনেই এমন বিশেষায়িত এক একটি জার্নাল ফুটিয়ে তোলে এই অদ্ভূত মানুষটির জীবনতৃষ্ণা।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে শুধু রসটা নিয়েই ক্ষান্ত হন নি ইলিয়াস, ডায়েরির পাতায় পাতায় প্রায়ই রাসায়নিক যৌগের মতো তিনি বিশ্লেষণ করেছেন এক একটি লেখাকে। ম্যাকিয়াভেলি, রবি ঠাকুরের রচনার তীব্র তীক্ষ্ণ থিসিস তো আছেই, ইলিয়াসের জবানীতে জ্যাক নিকলসনের কালজয়ী সিনেমা ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্যা কাক্কুস নেস্ট’এর চমৎকার একটি রিভিউও পাঠককে আলোড়িত না করে পারে না।
শেষ করবো ৮৬’সালের ডায়েরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে। আমাদের ইতিহাসের সবচাইতে মূল্যবান অনুষঙ্গ যে মুক্তিযুদ্ধ- সেটি নিয়ে একটি উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছিলেন ইলিয়াস। স্থির করেছিলেন তার পটভূমি হবে মহাস্থানগড়ের একটি প্রাচীন পীর পরিবার। এই বছরের ডায়েরিতে আছে সেই পরিবারের একটি ফ্যামিলি-ট্রি। কত অভাবনীয় খুঁটিনাটি ইলিয়াস তার আতসী কাঁচের চোখে তুলে এনেছিলেন, ডায়েরির নানা খসড়ায় সেটি দেখে কেবলই সেই অসম্পূর্ণ উপন্যাসটির জন্যে শ্বাস ফেলতে হয়। মহাশ্বতা দেবী যে বলেছিলেন, ‘ইলিয়াসের নখের তুল্য ঔপন্যাসিক দুই বাংলায় নেই’, সে কথা স্মরণ করে আমাদের শ্বাস আরো প্রলম্বিত হয় কেবল।
প্রিয় ইলিয়াস, আপনি মারা গেলেন আমাদের জন্মের বছর দুয়েক আগে, আমরা জন্মালাম আপনি চলে যাবার পর - এই যে আমাদের সময় আর আপনার সময় এক হলো না, এই যন্ত্রণা কাকে বলি? যদি অক্টোবর ১১ কে আপনার লেখার শেষ দিন ধরি, তাহলে আপনি শেষ বেলায়ও লিখেছেন শিল্পের কথা, "শিল্প বোধহয় মানুষের চেয়ে বেশি সহৃদয়"। কাঁটা পা নিয়েও কি আপনি শেষ উপন্যাসের ছক কেটেছিলেন? যদি সত্যিই লিখে ফেলতে পারতেন এই টুকে রাখা খসড়া কথাগুলো থেকে আরেকটা উপন্যাস তাহলে বাংলা ভাষায় যুক্ত হতো আরেকটি এপিক উপন্যাস, মানুষ আপনার নাম নিলে বলতো আপনার লেখা উপন্যাসের সংখ্যা তিন, দুই নয়। কিন্তু সেটা তো হলো না, যে বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আপনি উপন্যাসের শুরুটা করেছিলেন, চরিত্রগুলো ভেবে রেখেছিলেন, এই দেশের, এই ভাষাভাষির মানুষদের সেটা পড়ার সৌভাগ্য হলো না। তবে আপনি বোধহয় মরে গিয়েই বেঁচে গেলেন! প্রতি জন্মদিনে আপনি টুকে রেখেছেন ডায়রিতে, আর কত? না, আপনাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। তবে এই যে গত প্রায় ২৫ বছর ধরে আপনি নেই, বইমেলা, টিভিসেট, সেমিনারে আপনি নেই, রাজনৈতিক মতামতে আপনি নেই - বলতে গেলে আরেকজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এই দেশ জন্ম দিতে পারলো কই? প্রতি বছর এই যে লেখকদের মেরে কেটে রেখে দেয়, জেলে ঢুকিয়ে রাখে, মিথ্যা মামলায় হয়রান করে, আমার বিশ্বাস আপনি থাকলে এর প্রবল প্রতিবাদ করতেন। এই যে প্রচন্ড অস্থির একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে এই দেশ যাচ্ছে, এই সময়ে আমাদের আরেকবার হাড্ডি খিজিরদের দরকার।।
রেটিং দেওয়াটা বেশ বেমানান। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ডায়েরি। এরপরও বই হিসেবে কমপাইল করছেন শাহাদুজ্জামান। এর পরিপ্রেক্ষিতেই রেটিংটা দেওয়া।
কারা পড়বেন? চিন্তাভাবনার খোরাক জোগানোর মতো প্রচুর এলিমেন্ট পেতে চান যারা, তাদের জন্য মোটামুটি রেকমেন্ডেড। আর যারা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বই পড়েছেন, তার ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে বুঝেছেন, তার সম্পর্কে আরও কিছু জানতে চান, তাদের জন্য।
জন্মদিনের দিনগুলোতে ডায়রির এন্ট্রি তে নিজেকে নিয়ে বেশ সতর্কতা , জীবনের আর কত সময় বাকি রইল কি রইল না , কী করা হল কি হল না এই নিয়ে বিহ্বলতা টা খুব রয়েছে । ৬৯'এর গণভ্যুত্থানের দিনগুলো তাঁকে খুব আলোড়িত করেছিল বুঝা যায় প্রায় রিপোর্টের মতন করা ডায়রির এন্ট্রিগুলো দেখে আর যার প্রত্যক্ষ ফসলও তাঁর চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাস টি । কিন্তু ৬৯ এর পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কী ভেবেছিলেন তাঁর আর কোন নথি নেই । সমস্ত লেখা জুড়ে প্রচুর সচেতনতা , শিল্প সচেতনতা, সামাজিক সচেতনতা, দায়িত্ববোধে, অধিকারে সচেতনতা আর নিজেকে নিয়ে সচেতনতা আর কেমন যেন একটা নির্লিপ্ততা ~
বইটি ক্ষুদ্র, দুই সন্ধায় পড়া শেষ হল। আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভক্ত, তাঁর দুইটি উপন্যা���ই পড়েছি, খোয়াবনামা বের হওয়ার মাস খানেকের মধ্যে।
খোয়াবনামা অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে হয়েছে, চিলেকোঠার সেপাই এ অপ্রকৃতিস্থতা ও সমকাম লেখকের কেন প্রয়োজন হল বুঝতে পারিনা; এইটুকু আমি পছন্দ করিনি।
তিনি একেকটি গল্প ও উপন্যাস রচনার জন্য রীতিমত গবেষণা করেছেন - গ্রামের নামের তালিকা করেছেন, চট্টগ্রাম শহরের রাস্তার মানচিত্র এঁকেছেন ডায়েরীতে (৭৩ পৃষ্ঠায়)। এসব আমার আগেও কিছু জানা ছিল, বিশেষ করে খোয়াবনামার জন্য উত্তরাঞ্চল ঘুরে ঘুরে শ্লোক সংগ্রহ করেছেন, আগে পড়েছি, তবে ডায়েরী পড়ে আরও বিস্তারিত জানতে পারলাম।
এমন পরিশ্রমী সাহিত্যিক আজকাল আর নেই।
তিনি ইউরোপীয় ধারার মনঃবিশ্লেষণ পছন্দ করতেন বলে মনে হয়। দস্তয়েফস্কির নাম কোথাও দেখিনি ডায়েরীতে, তবে যেন থাকা উচিত ছিল।
বিভূতিভূষণ সম্পর্কে তাঁর এক বাক্যের অভিধা অসাধারণ; বঙ্কিমকে বড় করে দেখেন নি, এতে আমি একমত নই। রবীন্দ্রনাথের গোরার নাম না ধরে একে উপন্যাস হিসেবে বড় না হলেও ব্যাক্তির সমাজকে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রথম উদহারন বলেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ মত। আমারও 'গোরা' কে মহৎ সাহিত্য বলে মনে হয় নি।
নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারনা ছিল। সবার সমালোচনা পছন্দ করেন নি, শুধু কয়েকটি গল্প লিখে কেউ সাহিত্যিক হতে পারে- এমন মনে করতেন না। উপন্যাস হল দর্শন - এমন একটি দীর্ঘ উধ্রিতি নোট করা ডায়েরীতে, ইংরেজি ভাষায়, নাকি তাঁর নিজেরই লেখা। এইই তাঁরও মত, তা তাঁর দুই উপন্যাস পড়ে বুঝতে পারি।
শাপলা চত্বরে এক পাগলকে দেখে অভিভুত হয়েছেন, ভেবেছেন পাগলরা করতে পারে এমন অনেক কিছু যা আমরা পারি না। এইখানে তাঁর জীবন অবলোকন ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে দেখতে পাই। পাগলের সব আচরণ আদরণীয় নয়, শুধু প্রচলিত নিয়ন ও সংস্কারকে উপেক্ষা করার শক্তি আমাদের আশ্চর্য করে। কিন্তু তিনি কেন বুঝতে পারলেন না যে সংস্কারকে উপেক্ষা করতে পাগল হওয়ার প্রয়োজন নেই, সাহসী ও নির্লোভ হওয়া প্রয়োজন। এখানে তাঁর ও বিভূতিভূষণের মধ্যকার পার্থক্য।
উপন্যাস আর ইউরোপের ইতিহাস অভিন্ন - এমন মন্তব্য দেখেছি বলে মনে পড়ে ডায়েরীতে। ইউরোপের উপন্যাস ব্যাক্তি-প্রধান; আত্ম-সমীক্ষা প্রধান, ইউরোপের সমাজও ক্রমশ ব্যাক্তি সর্বস্ব হয়ে উঠেছে, এই পথে চলতে গিয়ে প্রথমে গীর্জা, রাজতন্ত্র ও পরে ভুল করে পরিবারও ত্যাগ করেছে। ব্যাক্তি ও পরে ব্যাক্তিরও মনের অভ্যন্তরে ব্যাক্তি চেতনায় বিশ্বরুপ ধরতে চেয়েছে ইউরোপ। তাতে অধিকাংশ সময় প্রকৃতি ও রহস্যময়তার পথ জোর করে বাদ দিতে গিয়ে, সেকুলার হতে গিয়ে, উপন্যাস মানব মনের পঙ্কিল গতির বিবরণে পরিনত হয়েছে [দস্তয়েফস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট স্মর্তব্য]। এ মনঃসমীক্ষণের বিবরণ হয়, সাহিত্য হয় না। এ পাঠে মন পঙ্কিল হয়, আনন্দ হয় না, মুক্তি হয় না।
কারন শেষ পর্যন্ত ব্যাক্তিকে নিজের মুক্তির ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়, বাইরে থেকে কোন দার্শনিক, পণ্ডিত, সাহিত্যিক কাউকে মুক্তি দিতে পারেন না।
বিভূতিভূষণ উপন্যাস লিখতে গিয়ে ইউরোপের শাসন মেনে চলেন নি, তিনি প্রকৃতির রহস্যময়তা নিজে দেখেছেন - গহীন অরন্য থেকে তারানাথ তান্ত্রিক অবধি, মুগ্ধ হয়েছেন- আর আমাদের কাছে খুলে বলতে চেয়েছেন। ইলিয়াস সাহেব বলেছেন বিভূতিভূষণের উপন্যাস গল্পই রয়ে গেছে। আমি মনে করি ইছামতির নোবেল পুরষ্কার পাওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, আখতারুজ্জামান তা মেনে চলেছেন, অন্তত চিলেকোঠার সেপাইতে, রবীন্দ্রনাথ গোরায়। আমার মনে হয় খোয়াবনামায় তিনি বরং রহস্য ধরতে চেয়েছেন। ('৯০ এর দশকে পড়া উভয় উপন্যাস, হুবহু মনে নেই সব, আবার পড়ব ঠিক করেছি)।
সুন্দরবন দেখতে গিয়ে যে কবিতাটি লিখেছেন ডায়েরীতে সেটা অসাধারণ হয়েছে (৪০ পৃষ্ঠায়), আগে পড়িনি কখনো। প্রকৃতি ভালবাসতেন, কিন্তু শিক্ষা উপেক্ষা করতে পারেন নি, পাগল হতে পারেন নি। তাই তাঁর ডায়েরীতে সুন্দরবন দেখে সে বলেছেন "বটু যে আমার কি উপকার করলো" (৪০ পৃষ্ঠা) সুন্দরবন দেখিয়ে - কিন্তু তাঁর সাহিত্যে তার ছাপ কই? হয়তো ভেবেছেন ইউরোপের নির্দেশ না মানলে সাহিত্য হয় না। নিজে যা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, আমাদের তা দেখাতে পারেন নি; আমাদের উপকার করতে পারেন নি। অপ্রকৃতিস্থ মন ও সমকাম এর জঞ্জাল দেখিয়ে বিব্রত করেছেন।
ডায়েরি লেখার সঠিক কোন নিয়ম আছে কি না তা আমার জান নাই। ডায়েরি লেখার অভ্যাস বা ইচ্ছা কোনটাই নাই, তবে কারো অনুমতি নিয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারি। তেমন সুযোগ কখনও আসেনি। ডায়েরি অন্তরালে চর্চার বিষয়। এতে ফুটে থাকে একজন ব্যক্তিমদনসের মানচিত্র। সেই মানচিত্রে থাকে একটি কূল, একটি সমাজ।
প্রথম কোন ডায়েরি পড়লাম তবে তা বই আকারে।
১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে মারা যান আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। পারিবারিক ভাবে ঘনিষ্ঠতার কারনেই তাঁর স্ত্রী কাছ থেকে ডায়েরি গুলো পড়ার অনুমতি পান লেখক শাহাদুজ্জামান। মোট এগারোটা ডায়েরি ছিলো। লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর পরিবারের সাথে আলাপসাপেক্ষেই ডায়েরিগুলো প্রকাশ করেন লেখক শাহাদুজ্জামান।
ডায়েরি একটি সামাজিক দলিল। আর সেই ডায়েরি যদি হয় কোন নিষ্ঠাবান লেখকের তাহলে তাতে উঠে আসে লেখকের কৌতুহল, প্রস্তুতি, নিমগ্নতা অনুধাবন একটা পন্থা।
এই ডায়েরি গুলো প্রথম প্রকাশিত হয় নাঈম হাসান সম্পাদিত "নিরন্তর " পত্রিকায় ১৯৯৯ সালে। এগারোটি র মধ্যে সবচেয়ে পেছনের ডায়েরি টি ১৯৬৮ সালের এবং সর্বশেষটি ১৯৯৫ সালের। এর মাঝে বিচ্ছিন্ন, বিভিন্ন বছরের ডায়েরি। একটি লালা রেক্সিন মোড়া ছোট একটি নোটবুক, বাকি গুলো বিভিন্ন ব্যাংক, কোম্পানির নামে প্রকাশিত বাৎসরিক ডায়েরি বই।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খুব নিয়মিত ধারাবাহিক লিখতেন না। শুধু ১৯৬৮-৬৯ সালে কয়েকমাস গণঅভ্যুত্থানের দৈনন্দিন ঘটনার বিবরণ ছাড়া কখনও তিনি ঠিক দিনপঞ্জি লেখেন নি। ফলে পরবর্তী তে ঘটে যাওয়া দেশের রাজনৈতিক প্রধান অনেক ঘটনা সম্পর্কে তাঁর কোন মন্তব্য নেই ডায়েরিতে।
ডায়েরির অধিকাংশ পাতা শূণ্য, বিভিন্ন পৃষ্ঠা জুড়ে ক্লাস রুটিন, কতৃপক্ষের কাছে লেখা বিভিন্ন বিষয়ে দরখাস্তের খসড়া, বেতন, খরচ, পরিচিতদের ঠিকানা ইত্যাদি।
এমন অগোছালো ভাবে লেখা হলেও ডায়েরিতে পাওয়া যায় অনেক মূল্যবান অনুষঙ্গ।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়গুলোর প্রতিদিনকার উল্লেখযোগ্য তথ্য। "চিলেকোঠার সেপাই" এর পটভূমি, ঠুংরির কয়েকটি চরণ। বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়ানো ঠিটানো উক্তি -- আইনস্টাইন, মার্কস, ইয়েটস, সার্ভেন্তিস, দস্তয়ভস্কি থেকে শুরু করে বেদ, বাইবেল, কোরান অবধি।
তাছারা আছে কয়েকটি অলিখিত গল্পের কাহিনি সূত্র ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর পরিকল্পিত উপন্যাস টির প্রথমিক রূপরেখা। তাছার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররের গান ও নজরুল ইসলাম কে নিয়ে কিছু লেখা। নিজের জন্মদিন, বাবার জন্মদিন ও মায়ের অসুস্থতা নিয়েও আছে টুকরো কিছু লেখা। সব শেষে নিজের অসুস্থতা নিয়েও সামান্য লেখা।
লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর এগারোটি ডায়েরি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন লেখক শাহাদুজ্জামান। যার ফলে লেখকের একান্ত ভাবনাগুলোর কিছুটা জানা হলো। শক্তিমান লেখকের এলোমেলো চিন্তা আর আমাদের অমূল্য পাওয়া। ধারাবাহিক ভাবে লেখা কোন বই নয় তবুও পড়ার পর একটা ভালো লাগা কিছু হারিয়ে ফেলার অনুভূতি টা রয়ে গেলো। অসাধারণ কিছু অনুভূতি।
ডায়েরীর এক জায়গায় জ্যাক নিকোলসন অভিনীত "One Flew Over the Cuckoo's Nest" সিনেমার ছোটখাট একটা রিভিউ আছে, মতিঝিলে এক পাগলমত লোককে দেখে ইলিয়াসের ওই সিনেমার কথা মনে পড়ে। কিছুটা বিচ্ছিন্ন, প্রায় অসম্পূর্ণ মনে হলেও এই ক্ষুদ্র দিনলিপি তে ছোট পরিসরে হলেও ইলিয়াসের বিস্তৃত সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতি বিষয়ক অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়।
মানুষের ডায়েরি পড়ার অদম্য ইচ্ছা পূরণ হলো।ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে এই বই। প্রথম দিকে ভালো না লাগলেও শেষের দিকে ভালো লেগেছে আর W.B.Yeats এর কবিতা গুলো অসাধারণ লেগেছে আর কলম আর ঐখানে একটা গল্পের খসড়া দুটোই বেশ ভাল লেগেছে