বাংলা সাহিত্য প্রেমীদের কাছে জীবনানন্দ চিরকালীন মুগ্ধতার নাম। জীবনানন্দের নাম আসলে যেই নামটি প্রথমেই আসে সেটি বনলতা। আর কোন কবিতার একজন অদেখা প্রেয়সী এতটা শক্তিশালী হয়ে বাংলার সব তরুনের চোখে কিংবা স্বপ্নে পৌছতে পারেনি যতটা না বনলতা পেরেছে। মোনালিসার স্রষ্টা লিয়োনার্দো ভিঞ্চির মোনালিসা নিয়ে যেমন মানুষের আগ্রহের শেষ নেই তেমনি জীবনান্দের বনলতা সেনকে নিয়েও আগ্রহের কোন শেষ নেই। সেই বনলতাকে খুঁজতে আমার মতো অলসদের নাটোরে যাওয়ার দরকার নেই, বইয়ের মাধ্যেই খোঁজা যায় এমন ব্যবস্থা কিংবা বলা যায় গবেষনা করে রেখেছেন অনেকে। যদিও কবিতার অর্থ খুঁজতে যাওয়া, কবিতার কল্পিত চরিত্রকে খুঁজে বের করা আমার ভালোলাগার কাজ নয়। আমি আপনি না চাইলেও বন্ধ নেই খোঁজা-খুঁজির কাজ। সর্বশেষ বনলতা কে খুঁজেছেন আকবর আলীখান, সেই গবেষনামূলক খোঁজের নাম ‘চাবিকাঠির খোঁজে’। তাই অল্পকিছু টাকা দিয়ে গবেষনার কষ্ট থেকে দূরে থাকতেই বনলতা সেনকে খুঁজে বের করবোই এমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে বই মেলার প্রথমা প্রকাশনী থেকে বইটি নিয়ে বাসায় এসেছিলাম গত বই মেলায়।
বইটিকে লেখক তিনটি খন্ডে বিভক্ত করেছেন। প্রথম খন্ডে ব্যাক্তি জীবনানন্দের জীবনের কথা ওঠে এসেছে। আর্থিক্য স্বচ্ছলতা, চাকরি, কাব্য চর্চা, পড়ালেখার বিস্তৃতি, বিবাহ, বরিশাল-কলকাতার জীবনের নানান সময় আর সামাজিক পরিবেশকে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাক্তি জীবনানন্দেকে না জানা মানুষদের জন্যে এই অধ্যায়টি বেশ সু-পাঠ্য হবে আশা করি। দ্বিতীয় অধ্যায়টি হলো এই বইয়ের গবেষনার মূল প্রতিপাদ্য। জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের ৩০টি কবিতার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করেছেন লেখক। মূলত ৩০টি কবিতার কথা বললেও মূল গবেষনাটি কিংবা আলোচনাটি হয়েছে বনলতা সেন কবিতাকে ঘিরে। সবচেয়ে দুর্বোধ্য অথচ সীমাহীন জনপ্রিয় কবিতাটির নানান শব্দের অর্থ জানানো হয়েছে চাবিকাঠি খুঁজতে গিয়ে। সেই অর্থ জানার পর জীবনান্দের প্রতি আপনার মুগ্ধতা আরো বাড়বে, কারন আপনি জানবেন জীবনান্দের জানার বিস্তৃতিটা কত গভীর ছিলো, শুধু প্রতিভাবান ছিলেন না, ছিলেন অসম্ভব পরিশ্রমী লেখকও বটে। কিন্তু লেখকের কবিতাটির অর্থের সাথে আমি অনেকাংশে একমত নই। কোন অপ্রমাণিত বিষয়কে নিয়ে নিশ্চিত হয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায়না অথচ লেখক সেটি-ই করেছেন..!
লেখক নিশ্চিত হয়ে বলছেন প্রেমের কিংবা প্রেয়সীর খোঁজ করা মানুষ কখনো ক্লান্ত হয় না, কিন্তু আমি দেখেছি প্রেয়সীর খোঁজ কিংবা প্রেম দুটোই মানুষকে ক্লান্ত করে। তার অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে গানে কবিতায় কিংবা সাহিত্যে। এটি ছাড়াও জীবনের নানান সীমাবদ্ধতা, অপূর্ণতা, অপরাগতা প্রেমিককে ক্লান্ত করে। লেখক এটিকে অস্বীকার করে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছি এর অর্থ করেছেন ধর্মীয় ভাবে, বৌদ্ধ ধর্মে নির্বান বিশ্বাসী, তাই তারা হাজার বছর পথ হাঁটে। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী কবি বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে কবিতা লিখেছেন এমনটা আমার মনে হয়নি। এর পেছনে যুক্তি আছে। যেমন জীবনান্দ তার কবিতায় বলেছেন আবার আসিব ফিরে হয়ত মানুষ নয় শঙ্খচিল শালিকের বেশে। এই বিশ্বাস বৌদ্ধ ধর্মের সাথে যায় না, পুর্নজন্মতে হিন্দুরা বিশ্বাসী, বৌদ্ধরা নয়। আর একজন মানুষ দুই ধর্মের ম���ল বিষয়ে কখনো্ একসাথে বিশ্বাসী হতে পারে না। ক্লান্ত মানুষের কাছে জীবনের পথ চলার সময়টুকু হাজার বছর মনে হতে পারে কিংবা নিজের ক্লান্তিকর পথ চলার কষ্ট টুকু বুঝাতে হাজার বছর ধরে পথ চলিতেছি রুপক উপমা ব্যবহার করেছেন, এমন ব্যাখাটা বেশি গ্রহনযোগ্য হবে। আর সেই ক্লান্তিকর কষ্ট কতটুকু সেটা বুঝাতেই কবি ইতিহাসের কষ্টটুকুকে নিয়ে এসেছেন কবিতায়। যেমন বিম্বিসার, অশোক, বিদর্ভ নগরী ইত্যাদি। তবে যে ব��যাখাটিকে আমার সবচেয়ে অগ্রহনযোগ্য মনে হয়েছে সেটি হলো ” এতদিন কোথায় ছিলেন”? লেখক বলতে চেয়েছেন কবির ভালোবাসকে সরাসরি প্রত্যাখান করেই এই প্রশ্ন রেখেছেন বনলতা। কিন্তু কেউ যখন কাউকে ভালোবাসি বলে আর তার উত্তর যদি এমন হয় তাহলে সেটি প্রত্যাখান এর চেয়ে অপারগতার কষ্টকে বুঝায়, সীমাবদ্ধতার আক্ষেপকে বুঝায়। অর্থাৎ এমন সময় দেখা হয়েছে তাহাদের যখন তাহারা অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। তাই প্রশ্ন করেছেন এতদিন কোথায় ছিলেন, আরো আগে কেন দেখা হলো না..!
লেখক একটি অজানাকে নিশ্চিত ঠিক করে সেই পথ ধরে সব কবিতাকে ব্যাখা করেছেন বলেই বইটি আমাকে বেশ হতাশ করেছে.. সম্ভাবনাময় অন্যদিকগুলোকে তিনি কবিতাগুলোর অর্থ খুঁজেননি। আর বনলতা সেন কবিতাকে নিয়ে যত ব্যাপক আকারে ব্যাখা দিয়েছেন বাকী কবিতাগুলোতে ওইভাবে ব্যাখায় যাননি, কিছুটা অবহেলা করে দায়সারা চাবিকাঠি খুঁজেছেন..! শেষ অধ্যায়ে সামগ্রিক বিশ্লেষন নামে যে অধ্যায় আছে সেখানে কবিতার শ্রেণীবিভাজন করেছেন লেখক.. এবং কবিতাগুলোর উপর পরিবেশ, ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যাক্তি জীবনের প্রভাব সহ নানান দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন.. কিন্তু সেখানেও স্ব-ঘোষিত কিছু বক্তব্য আছে লেখকের যা বইটির আবেদন অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। তবে এ কথা ঠিক বইটি আপনার জানার পরিধিটিকে বেশ বাড়িয়ে দিবে, আপনি নিজেই যুক্তির বিপরীতে যুক্তি দাঁড় করাতে পারবেন.. আর অনেক কিছুকেই আপনি নিজেই নতুন করে ব্যাখা করতে পারবেন। তবে সেই ব্যাখায় আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারবেন না, কারন কবিতা কোন জড় পদার্থ নয় যে এটি কি কি অণু-পরমাণু দিয়ে গঠিত গবেষনা করে করে বলে দিবেন। কবিতার পূর্ণ অর্থ আর ব্যাখা কবি ছাড়া আর কারো পক্ষেই সম্ভব নয়, আর কবির নাম যদি জীবনান্দ হয় তাহলে তো সেটা আরও দুরুহ। আবার কবিতার সবটুকু অর্থ খোঁজাও পাঠকের কাছে আকর্ষনীয় নাও হতে পারে, কিছুটা অসংজ্ঞায়িত, কিছুটা অব্যক্ত থাকুক না অর্থ এমন পাঠকের সংখ্যাই বেশি বোধহয় কবিতার। কবিতা পুরোটা বুঝার জন্যে নয়, কবিতার বাস কিছুটা বোধের জগতে, কিছুটা কল্প জগতে আর কিছুটা বাস্তবতার বাতাসে। কবিতা থাকুক তার মতো করে, আর প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভালোলাগার কারণটুুক খুঁজে নিক।