আটচল্লিশ বছর ন'দিনের দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর গাঁয়ে ফিরে শুধু সম্পর্কের সুতো খুঁজে বেড়ানো। কেমন আছে ফালানি? আদৌ বেঁচে আছে কি সে? কেমন আছে অন্ধ আজগর চাচার পরিবার? মোদি ভাবী বেঁচে আছে কি? কি গতি হল আইলাকেশীর? মাঝখানে গেছে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ - সে সময় দিঘপাইত কি জল জঙ্গলের আড়ালেই রইল? না কি সেখানেও পাকিস্তানি সেনারা হানা দিল? সে সবেরই উত্তর উঠে এসেছে এই কাহিনীতে।
"দয়াময়ীর কথা"র ছোট্ট দয়া গ্রামের শৈশব ছেড়ে কলকাতা যাবার পর কেটে গেছে আটচল্লিশ বছর। তারপর একদিন ছোট্টবেলার সেই নাড়ির টানে দয়া ফিরে এলেন তাঁর মাটির কোলে। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের দগদগে ঘা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে তাঁর গ্রাম ও গ্রামের মানুষেরা। এইসব কাহিনী নিয়েই এই স্মৃতিকথা।
"দয়াময়ীর কথা" ভালো লেগেছিল দেশভাগের ক্ষত গ্রামীণ জনপদে কিভাবে আঁচড় কেটেছে, তার সরল, সাবলীল বর্ণনার জন্য। "দয়াময়ীর ফিরে দেখা" তে লেখিকা একই রকম সরল বর্ণনায় তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের কথা। ফ্ল্যাশ ব্যাক ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড করেছেন বারবার, তাঁর কলকাতায় কাটানো সময়গুলোতে যেভাবে তাঁর শৈশবের গ্রামকে মিস করেছেন, আর এতদিন পর গ্রামে এসে চেনা পুরনো মানুষগুলোকে হাতড়ে খুঁজেছেন - এসবের মাঝে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কলকাতায় বসে বাংলাদেশের এক ছোট্ট গ্রামকে নিয়ে চিন্তা আর উৎকণ্ঠার বিপরীতে অনেকদিন পরে দেশে ফিরে পরিচিত মানুষের মুখে যুদ্ধের সময়ের কাহিনী, ক্ষয়ক্ষতির গল্প শোনা - এই পুরো হৃদয় বিদারক ব্যাপারটাকে খুব আলতো কলমে বলে গেছেন লেখিকা - এটাই এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
উপমহাদেশের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় দেশভাগ। সেই দেশভাগের ফলাফল হিসেবেই সুনন্দা পাড়ি দেন অন্য পাড়ে। কিন্তু যে গাঁয়ে বড় হয়েছেন তিনি তার কথা ভোলেন কী করে? তাই দীর্ঘ ৪৮ বছর পর আবার ফিরে আসেন তিনি। বাংলাদেশে। খুঁজতে থাকেন প্রিয় মুখ, যাদের কেউ বেঁচে আছে, কেউ মারা গেছে। কিন্তু অসংখ্য স্মৃতি আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে চেনা গাঁয়ের বাঁকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা এত দরদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গীয় কোন বইয়ে খুব কম পড়েছি৷ এত নিখুঁতভাবে আপামর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ছবি এঁকেছেন লেখিকা, যা নাড়ির টান না থাকলে সম্ভব নয়। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে শশী আর আখতারের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের গল্প, উঠে এসেছে হিন্দু-মুসলিমের এক হয়ে লড়াইয়ের গল্প। আবার পূর্বে হিন্দুদের শোষণের কথাও এসেছে। নিরপেক্ষ একটা স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে লেখিকার, যেটা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে আজকালকার লেখায়।